রাস্তা যেন গাড়ির ‘কবরস্থান’, মামলার আলামতের বোঝা বইছে ঢাকা

রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকা বনানী। প্রায় ৬০ হাজার পরিবারের বাস। ঝা চকচকে কর্পোরেট অফিস। দামি রেস্টুরেন্ট, বিলাসবহুল হোটেল আরো কত কী।

কিন্তু ৭ নাম্বার রোডের অবস্থা দেখলে বোঝার জো নেই এটা আলো ঝলমলে বনানী, নাকি 'গাড়ির কবরস্থান'।

রাস্তার পাশে সারি সারি মরচে পড়া প্রাইভেট কার, কঙ্কালসার মোটরসাইকেল আর সিএনজি। কোনটির বডির রঙ নেই, কোনটির ইঞ্জিন উধাও। দুয়েকটি গাড়ির ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে গজিয়ে ওঠা ঝোপঝাড়।

এসব গাড়ি পুলিশের জব্দ করা, মামলার আলামত। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে জমতে জমতে বাসিন্দাদের জন্য রাস্তাটি পরিণত হয়েছে বিষফোঁড়ায়।

ডাম্পিং জোনের সংকট, রাস্তায় গাড়ির ভাগাড়

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রায় কোনো থানায়ই জব্দ করা যানবাহন রাখার পর্যাপ্ত জায়গা নেই। দীর্ঘদিন আগারগাঁওয়ের খোলা মাঠে কিছু গাড়ি ডাম্পিং করে রাখা হলেও সেটিও এখন কানায় কানায় পূর্ণ।

শ্যামপুর পোস্তগোলা ব্রিজের পাশেসহ আরো কিছু জায়গায় পুলিশ সাময়িকভাবে গাড়ি রাখলেও ঢাকার ৫১টি থানায় এই মুহূর্তে ঠিক কত গাড়ি জব্দ আছে তার সঠিক কোনো হিসাব নেই। শুধু বনানী থানাতেই পড়ে আছে প্রায় একশ জব্দ করা গাড়ি।

এ নিয়ে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা। বছরের পর বছর থানার সামনের রাস্তা দখল করে এভাবে গাড়ি ফেলে রাখায় মানুষের ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে।

বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সালাউদ্দিন আলাপ-কে বলেন, "আমি কিছুদিন হলো দায়িত্ব নিয়েছি। বছরের পর বছর ধরে গাড়ি জমে সাত নম্বর রোডটি একদম সংকুচিত হয়ে গেছে। অনেক সময় থানার সামনে আমরা গাড়ি রাখলেও পাশ দিয়ে অন্য গাড়ি পার হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।"

"এসব গাড়ির অধিকাংশই অনেক আগে অকেজো হয়ে গেছে। যেহেতু এগুলো আদালতের আলামত, তাই ফেলে রাখাও যাচ্ছে না, আবার পর্যাপ্ত ডাম্পিং জোন না থাকায় সরাতেও পারছি না। তবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে”, যোগ করেন মো. সালাহউদ্দিন।

রাস্তার পাশে সারি সারি মরচে পড়া প্রাইভেট কার, কঙ্কালসার মোটরসাইকেল আর সিএনজি। কোনটির বডির রঙ নেই, কোনটির ইঞ্জিন উধাও। দুয়েকটি গাড়ির ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে গজিয়ে ওঠা ঝোপঝাড়।

নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সম্পত্তি

মাদক, হত্যা, সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা ছিনতাইয়ের মতো মামলায় বছরের পর বছর ধরে এসব যানবাহন জব্দ করা হয়েছে। মামলার চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত এসব আলামত নষ্ট করা বা সরানোর কোনো আইনি সুযোগ নেই।

তাই খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে পচে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। আছে চুরির ঝুঁকিও। পুলিশের নজরদারির অভাবে অনেক গাড়ির পার্টসও চুরি হয়ে গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, থানার নিজেদের গাড়ি রাখারই জায়গা নেই, সেখানে আলামতের এত গাড়ি রাখা প্রায় অসম্ভব। যেসব মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে কিন্তু আদালত থেকে নিলামের অনুমতি মেলেনি, সেসব গাড়ি বিক্রিও করা যাচ্ছে না। তাই বছরের পর বছর খোলা আকাশের নিচে থেকে এগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

তবে বনানীবাসীর দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি নিরসনে এবার উদ্যোগী হয়েছে পুলিশ। ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার রুহুল কবীর খান আলাপ-কে বলেন, "খুব দ্রুত আমরা সমস্যার সমাধানের দিকে এগোচ্ছি। পূর্বাচলে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বহু বছরের জমে থাকা এই আলামতগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে। এতে বনানী সোসাইটিও আমাদের সহযোগিতা করছে।"

তিনি জানান, ইতোমধ্যে গাড়ি অপসারণের প্রাথমিক কাজও শুরু হয়েছে।

জব্দ করা সম্পত্তি রাখার জন্য সরকারিভাবে কোনো কেন্দ্রীয় ‘ডাম্পিং ইয়ার্ড’ নেই। মাত্র ৬টি থানায় শেডযুক্ত ডাম্পিং সুবিধা আছে।

অন্য থানায়ও একই চিত্র

শুধু বনানী নয়, রাজধানীর প্রায় প্রতিটি থানার একই দশা। থানার প্রাঙ্গন পেরিয়ে আলামতের গাড়ি ঠাঁই নিয়েছে গলিতে বা মেইন রোডে।

কিছুদিন আগে পর্যন্ত শাহবাগ থানার সামনেও ছিল একই দৃশ্য। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান আলাপ-কে বলেন, "সম্প্রতি ডেমরা, তুরাগ ও বসিলায় কিছু জায়গা পাওয়া গেছে। সেখানকার জব্দ করা গাড়িগুলো আমরা সরিয়ে নিয়েছি। মাত্র দুটি গাড়ি বাকি আছে, আদালত থেকে নিলামের অনুমতি পেলেই সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে।"

আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, থানার সামনের রাস্তায় আলামতের গাড়ি জমে যেমন যানজট তৈরি হচ্ছে, তেমনি এগুলো পাহারা দিতে গিয়ে পুলিশের সময় ও জনবল নষ্ট হচ্ছে।

তিনি বলেন, "যেসব আলামতের মালিক খুঁজে পাওয়া যায় না, আদালতের অনুমতিক্রমে তিন মাসের মধ্যে সেগুলো নিলামে তুলে টাকা সরকারি কোষাগারে জমা রাখা যেতে পারে। পরবর্তীতে মূল মালিক পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী তাকে সেই অর্থ বুঝিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া মামলা চলাকালীন আদালতের জিম্মায় গাড়ি মালিকের হাতে ফেরত দিলেও রাস্তাগুলো ঠিক থাকত।"

সারাদেশে হাজার হাজার যানবাহন আটকা

সারা দেশের পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ। সম্প্রতি জানা যায়, সারা দেশের থানায় জব্দ হয়ে আছে প্রায় ৩৬ হাজার যানবাহন। অন্যদিকে এগুলো পাহারা ও দেখভাল করতে গিয়ে সরকারের মোটা অঙ্কের টাকাও খরচ হচ্ছে।

গত জুলাই মাসে এক রিটের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতে দেওয়া পুলিশের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের থানা ও আদালতের মালখানায় ১৪ লাখ ২৪ হাজার ৭৭টি আলামত ও সম্পত্তি সংরক্ষিত আছে। যার মধ্যে শুধু গাড়ি ও নৌযানই রয়েছে ৩৫ হাজার ৫৮৮টি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জব্দ করা এসব সম্পত্তি রাখার জন্য সরকারিভাবে কোনো কেন্দ্রীয় ‘ডাম্পিং ইয়ার্ড’ নেই। মাত্র ৬টি থানায় শেডযুক্ত ডাম্পিং সুবিধা আছে।

যেসব থানার আশেপাশে খোলা জায়গা নেই, তারা রাস্তার ওপর, থানার গেটে বা খোলা জায়গায় বাস, ট্রাক, কার ও মোটরসাইকেল ফেলে রাখে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্মকমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন আলাপ-কে বলেন, "আমরা সব থানার জন্য জায়গা খুঁজছি। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে নগরীর সব থানা থেকেই জব্দ করা গাড়ি সরিয়ে সেখানে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। ঢাকার সড়কগুলোও দীর্ঘদিনের এই জট থেকে মুক্ত হবে।"

গুলশান বিভাগের উপকমিশনার রুহুল কবির খান আলাপ-কে জানান, মঙ্গলবার থেকে আমরা গাড়ি অপসারণের কাজ আরম্ভ করেছি।