৯৯৯-এ অর্ধেকেরও বেশি কল ভুয়া, মামলা করতে চায় পুলিশ

চলন্ত লঞ্চে সন্তানসম্ভবা এক নারীর প্রসববেদনায় কাতর। কোথাও এক তরুণ ঝুলে আছে উঁচু গাছের ডালে অজ্ঞান অবস্থায়। আরেক জায়গায় মাদ্রাসা ছাত্রের উপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ। বিপদের এসব মুহূর্তে সহায়তার জন্য ফোন করা হয়েছিল জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ। সাড়া মিলেছে, পৌঁছেছে সহায়তা।    

কিন্তু একই নাম্বারে ফোন করে কেউ চান প্রেমের সম্পর্ক, কেউ দেন বিয়ের প্রস্তাব। কেউ অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেন, কেউ হুমকি দেন পুলিশ সদস্যদের। আবার আগুন বা দুর্ঘটনার খবর দিয়ে জরুরি সেবা কর্মীদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় এমন জায়গায় যেখানে আদতে কিছুই ঘটেনি।

জরুরি সময়ে মানুষের সহায়তার জন্য চালু করা এই সাভির্সের ফোন লাইনই এখন আটকে থাকে এইসব ভুয়া, অপ্রয়োজনীয় ‘প্র্যাঙ্ক কল’ দিয়ে। ৯৯৯ হটলাইন সার্ভিসের প্রধান বলছেন জরুরি সেবায় ফোন দিয়ে এখন অপেক্ষা করতে হচ্ছে দুই মিনিট পর্যন্ত। এই অপেক্ষার মধ্যে কারও হয়তো অ্যাম্বুলেন্স দরকার, কোথাও হয়তো আগুন জ্বলছে অথবা কেউ বিপদে পড়ে পুলিশের সহায়তা চাইছেন। 

পরিস্থিতি সামাল দিতে তাই এবার ভুয়া ও অপ্রয়োজনীয় কলদাতাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা ভাবছে পুলিশ।

মোট কলের অর্ধেকের বেশি অপ্রয়োজনীয়

বছরের ৩৬৫ দিনই এভাবে কাজ করে যাচ্ছে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯। সারা দেশের মানুষের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে এই সেবা। কিন্তু ভুয়া ও অপ্রয়োজনীয় ফোনকল বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে এর কার্যক্রমে।

টোল-ফ্রি এই নাম্বারে অপ্রয়োজনীয় ও ভুয়া কল দিয়ে যাচ্ছেন কিছু মানুষ। এসব কল গ্রহণ করতে গিয়ে বিব্রত হচ্ছেন পুলিশের নারী সদস্যরাও। পাশাপাশি, অপ্রয়োজনীয় কলের কারণে লাইন ব্যস্ত থাকছে। ফলে প্রকৃত জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা চাওয়া ব্যক্তিরা সময়মতো সেবা পাচ্ছেন না।

৯৯৯-এর কন্ট্রোল রুমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১২ই ডিসেম্বর যাত্রা শুরুর দিন থেকে ২০২৬ সালের ৩০এ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৭ কোটি ৫১ লাখ ৫৭ হাজার ১৫১টি কল গ্রহণ করেছে এই সেবা।

এর মধ্যে সেবা দেওয়া হয়েছে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৬৮ হাজার ৮০৬টি কলে। যা মোট কলের ৪৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অন্যদিকে, সেবা দেওয়া হয়নি এমন কলের সংখ্যা ৪ কোটি ১৩ লাখ ৮৮ হাজার ৩৪৫টি। অর্থাৎ মোট কলের ৫৫ দশমিক ০৭ শতাংশ।

ভুয়া ও অপ্রয়োজনীয় কলকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্ল্যাংক কল বা শব্দহীন কল গ্রহণ করা হয়েছে ৩ কোটি ২৪ লাখ ৩৯ হাজার ৩২৫টি। এসব কলে ফোন করে কলাররা নিশ্চুপ থাকেন।

প্র্যাঙ্ক বা ক্র্যাঙ্ক কলের সংখ্যা ২ কোটি ৭১ লাখ ৮ হাজার ৮১০টি। আর সিমড কল এসেছে ৬ কোটি ২ লাখ ৩০ হাজার ২১০টি। হিসাব অনুযায়ী, মোট কলের ৫৫ দশমিক ০৭ শতাংশই ভুয়া ও অপ্রয়োজনীয়।

এ সময়ে ২৩ লাখ ৮৬ হাজার ৩৪০টি ফোনকলে পুলিশসংক্রান্ত সেবা দেওয়া হয়েছে। অগ্নিদুর্ঘটনাসংক্রান্ত সেবা দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার ৩৩৩টি ফোনকলে। আর ২ লাখ ৩৯ হাজার ৯১০টি ফোনকলে অ্যাম্বুলেন্সসংক্রান্ত সেবা দিয়েছে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯।

ফোনে প্রেম ও বিয়ের প্রস্তাব

৯৯৯-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট কলের অর্ধেকেরও বেশি ভুয়া বা অপ্রয়োজনীয়। এখানে কর্মরত একাধিক পুলিশ সদস্য জানান, তাদের নানা ধরনের অদ্ভুত কল গ্রহণ করতে হয়।

কখনো আগুন লাগার খবর দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা চাওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ফায়ার সার্ভিস স্টেশনকে জানিয়ে দেওয়া হলে কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন, সেখানে এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। কখনো সড়ক দুর্ঘটনার খবর দেওয়া হয়। কিন্তু ঘটনাস্থলে গিয়ে দুর্ঘটনার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।

এমনকি কোনো শিশু ভাত খেতে না চাইলে পুলিশকে দিয়ে তাকে ভয় দেখিয়ে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে বলা হয়। আবার কোনো বয়স্ক ব্যক্তি ঘুমাতে পারছেন না, তাই তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। এ ধরনের বিরক্তিকর ও অপ্রয়োজনীয় কলও গ্রহণ করতে হয় তাদের।

তবে সবচেয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন নারী কলটেকাররা। জরুরি সেবার এই নাম্বারে নারী কণ্ঠ শুনে কলাররা প্রেমের প্রস্তাব দেন। কখনো কখনো প্র্যাঙ্ক কলের মাধ্যমে বিয়ের প্রস্তাবও দেওয়া হয়।

এখানে কর্মরত একজন সদস্য আলাপ-কে জানান, কলাররা কখনো অকারণেই অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। এমনকি সরাসরি পুলিশ বাহিনীকে লক্ষ্য করেও আক্রোশ প্রকাশ করেন। নারী কিংবা পুরুষ, যিনিই কল গ্রহণ করুন না কেন, তাকে হুমকি দেওয়ার নজিরও রয়েছে।

ভুয়া কল ও হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে মামলা

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর প্রধান ও পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মহিউল ইসলাম আলাপ-কে জানান, অপ্রয়োজনীয় ও ভুয়া কলের কারণে এখন জরুরি কল গ্রহণ করতে প্রায় দুই মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

তিনি বলেন, “বিশ্বের কোথাও জরুরি সেবায় এত দীর্ঘ অপেক্ষার নজির নেই। এই অপেক্ষার কারণে মুমূর্ষু রোগীর জন্য জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সহায়তা প্রয়োজন হলে কিংবা কোথাও আগুন বা ডাকাতির ঘটনা ঘটলে ভুক্তভোগী ও তথ্যদাতারা সময়মতো সেই তথ্য দিতে পারছেন না।”

আগে এসব কলারকে এক সপ্তাহ থেকে এক মাসের জন্য ব্লক করা হতো। তবে এখন তাদের বিরুদ্ধে মামলাও করার কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

তিনি আরও বলেন, লাগাতার জনসচেতনতামূলক প্রচারের কারণে এসব কলের সংখ্যা কিছুটা কমে এসেছে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১-এর ৭০ ধারায় অযৌক্তিক ও বিরক্তিকর ফোনকলকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে বাস্তবে এ আইনের প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ মনে করেন, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর পরিসর বাড়ানো জরুরি। আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের প্রথম ও একমাত্র জাতীয় জরুরি সেবায় কর্মরত সদস্যদের পর্যায়ক্রমে দেশের বাইরেও উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

জরুরি মুহূর্তে পাশে ৯৯৯

গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে বরিশাল থেকে ঢাকাগামী ‘দোয়েল পাখি-১০’ লঞ্চে এক সন্তানসম্ভবা নারীর প্রসববেদনা শুরু হয়। লঞ্চটি তখন ঢাকার পথে। উপায় না দেখে ৯৯৯-এ ফোন করেন কেউ একজন। খবর পেয়ে কোস্টগার্ডের একটি দল স্পিডবোট নিয়ে গিয়ে ওই নারীকে উদ্ধার করে সদরঘাটে পৌঁছে দেয়।

আরেক ঘটনায়, ১৭ বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় শিক্ষক রফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই ছাত্রের অভিযোগ, মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর থেকেই ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে বলাৎকার করতেন শিক্ষক। সর্বশেষ ৩১ আগস্ট রাতে এ ঘটনা ঘটলে অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। পরে তার মা বিষয়টি জানতে পারেন। স্থানীয় লোকজন মাদ্রাসা ঘেরাও করলে শিক্ষক অভিযোগ স্বীকার করেন বলে জানা যায়। পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।

২১ সেপ্টেম্বর রাতে ভোলার তজুমদ্দিনের করিম বাজার থেকে ৯৯৯-এ ফোন করে জানানো হয়, একটি তেঁতুলগাছের ৫০ থেকে ৬০ ফুট ওপরে এক যুবক অজ্ঞান অবস্থায় ঝুলে আছেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় তাকে নামিয়ে আনা হয়। পারভেজ নামের ওই যুবক মানসিকভাবে অসুস্থ বলে জানা গেছে।

এর আগে, ১২ আগস্ট সকালে সাভারের গোপের বাড়ি সাদাপুর এলাকায় একটি হেফজখানার পাশে কালো টেপে মোড়ানো প্রেসার কুকারসদৃশ বস্তু দেখতে পান স্থানীয়রা। বোমা সন্দেহে ৯৯৯-এ ফোন করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে ডিএমপির বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট বস্তুটি উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিষ্ক্রিয় করে।

এ ঘটনাগুলোতে ৯৯৯-এ ফোন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ, কোস্টগার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ব্যবস্থা নেন।

জনবল বাড়েনি, পুরোনো প্রযুক্তিতেই চলছে সেবা

একজন কর্মকর্তা জানান, উদ্বোধনের সময় ৪৭০ জন জনবল নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯। এত বছরেও জনবল বাড়ানো হয়নি।

তথ্য অনুযায়ী, একসঙ্গে ৮০টি কল গ্রহণ করা সম্ভব। মোট কল স্টেশন রয়েছে ১০০টি। চারটি দলে ভাগ হয়ে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিয়ে যাচ্ছে ৯৯৯। এর মধ্যে ২৮২ জন পুরুষ সদস্য ও ৯০ জন নারী কলটেকার রয়েছেন।

ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, দেশের বিভিন্ন ইউনিট থেকে জনবল এনে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তাদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট ইউনিট থেকে।

তবে এখনো আগের প্রযুক্তি, অর্থাৎ সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার ব্যবহার করেই চলছে এই সেবা। তাই নতুন প্রযুক্তি সংযোজন প্রয়োজন। পাশাপাশি জনবল বাড়ানো হলে সেবা কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে মনে করেন তিনি।

হত্যাকাণ্ডের পর লাশ ফেলে রাখা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারী ও শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতন, সুন্দরবনের মতো গভীর জঙ্গলে কিংবা গভীর সমুদ্রে নৌকাসহ জেলেদের জিম্মি বা আটকে পড়ার ঘটনা এসব তথ্যও আসে ৯৯৯-এ।

এ ছাড়া মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাসে ডাকাতি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের খবরও পাওয়া যায় এই নাম্বারে। এমনকি সম্ভাব্য অপরাধ বা সংঘাতের আগাম তথ্য পাওয়ার পর স্থানীয় পুলিশের মাধ্যমে দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং অভিযুক্তদের হাতেনাতে গ্রেপ্তারের বহু নজির রয়েছে বাংলাদেশে।

জরুরি মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এই সেবার কার্যক্রমে তাই ভুয়া কল বড় বাধা হয়ে উঠেছে। এসব কলের কারণে জরুরি সহায়তা চাওয়া মানুষের যেন সময় নষ্ট না হয়, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।