‘অন ক্যামেরা’ অভিযান-জেরা, নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার কোথায়

টর্চের আলো মুখে পড়তেই শুরু হয়েছিল তর্ক। ২০১৮ সালের ২৩এ অক্টোবর, ঢাকার রামপুরায় টিভি সেন্টারের কাছে পুলিশ চেকপোস্টে সিএনজি অটোরিকশায় বসা এক তরুণীর সাথে পুলিশ সদস্যের তর্কাতর্কির ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।

এক পর্যায়ে এক পুলিশ সদস্য বলে বসেন, “আপনি কিন্তু এত বিশ্বসুন্দরী না।” পরদিন ওই দুই পুলিশ সদস্যকে শনাক্ত করে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।

সেদিন প্রশ্ন উঠেছিল পুলিশের আচরণ নিয়ে। কিন্তু আরেকটি প্রশ্ন চাপা পড়ে গিয়েছিল, ওই তরুণীর অনুমতি নিয়ে কি কেউ ভিডিওটি করেছিল?

সাত বছর পরও প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক। বরং পুলিশের চেকপোস্টে, ভোক্তা অধিকারের মোবাইল কোর্ট, বিভিন্ন রেস্ট্রুরেন্টে, বার অথবা হোটেলে অভিযান, মাদকবিরোধী অভিযান, সবখানেই এখন মোবাইল ক্যামেরা চলছে। জেরার মুখে পড়া সাধারণ নাগরিকের ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে, এমনকি প্রচার করছে মূলধারার গণমাধ্যমও।

ভাইরাল হওয়ার নেশায় মিডিয়া ট্রায়াল

শুধু সামাজিক মাধ্যম নয়, গণমাধ্যমও অনেক সময় এ ধরনের ভিডিও প্রচার করে।

এ বছরের ১১ই অক্টোবর একটি গণমাধ্যমের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায় ট্রাফিক পুলিশ একজন মোটরবাইক চালককে মডিফাইড বা উচ্চ শব্দের সাইলেন্সার ব্যবহার করার কারণে চেকপোস্টে আটকেছেন।

আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্বরত ওই পুলিশ সদস্য চালককে ক্যামেরার সামনে জেরা করছেন। তাকে বলা হচ্ছে, “মানুষকে কষ্ট দিয়ে আপনার লাভ আছে?”,  “আপনি কি সঠিক কাজ করেছেন নাকি বেঠিক কাজ করেছেন, বলেন?”, “ভুল করেছেন?”, “এটার জন্য আপনি কি অনুতপ্ত? ভবিষ্যতে কি এরকম করবেন?”

এছাড়া, ২০২৫ সালের ৪ঠা জুন আরেকটি মূলধারার গণমাধ্যমের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ‘মাদক সেবনকারীকে কষে চড় মারলেন পুলিশ’ শিরোনামের ভিডিওতে দেখা যায়, প্রকাশ্যে একজন নাগরিককে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে শারীরিক লাঞ্ছনা করা হচ্ছে।

মাদক সেবন কিংবা মডিফাইড সাইলেন্সার ব্যবহার করা আইন অনুযায়ী অপরাধ। এজন্য জরিমানা বা আইনি ব্যবস্থা পুলিশ চাইলে নিতে পারে। কিন্তু একজন নাগরিককে রাস্তায় আটকে, ক্যামেরা ধরে, জেরার ভিডিও ধারণ করা কিংবা সামাজিক মাধ্যমে ‘ভাইরাল নিউজ’ হিসাবে প্রচার করা কি ব্যক্তির গোপনীয়তা নষ্ট করছে? একইসঙ্গে এ ধরনের ভিডিও কি নাগরিকের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ করার ক্ষেত্র তৈরি করছে কি-না, এ সব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

ইচ্ছা হলেই কি কারো ভিডিও করা যায়

ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করতে মোবাইল কোর্টের অভিযানের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে বেশ জনপ্রিয়। এমনকি অনেক গণমাধ্যমও ভ্রাম্যমান কোর্টের অভিযান প্রচার করে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিকের এই ‘মিডিয়া ট্রায়াল' ও প্রকাশ্য জেরা কেবল প্রচলিত সাইবার আইনেই শুধু অপরাধ নয়, এটি সংবিধান পরিপন্থিও।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তি গোপনীয়তা বা প্রাইভেসির অধিকার দিচ্ছে।

একইসঙ্গে ফৌজদারি আইনের মূল ভিত্তি ‘আদালতে বিচার শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি মানুষই নির্দোষ’ ধারণারও পরিপন্থি।

ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী পুলিশের তল্লাশি বা অভিযান চালানোর আইনি ক্ষমতা আছে। তবে আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে সামাজিক মাধ্যমে কিংবা গণমাধ্যমে কারও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার মতো ফুটেজ প্রকাশ করার কোনো আইনি ভিত্তি নেই বলছেন আইনজীবীরা।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মিতি সানজানা জানান, এ ধরনের ভ্রাম্যমান আদালতের কার্যক্রম আদালতের নিয়ম ও ডেকোরাম মেনে করতে হয়। 

“সাধারণত আদালতের অনুমতি ছাড়া ভেতরে কোনো ভিডিও কিংবা অডিও রেকর্ড করার নিয়ম নেই। কেউ যদি করে সেটা আদালত অবমাননা হয়। সুতরাং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময়ও এই নিয়ম মেনে চলতে হয়”, বলেন তিনি। 

মিতি সানজানা আরও বলেন, কেউ যদি মোবাইল কোর্টের অভিযানের ছবি তুলতে কিংবা ভিডিও করতে চান তাহলে অবশ্যই জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিতে হবে। কিংবা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।

অনুমতি ছাড়া করলে সেটা অবশ্যই একজন ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুন্ণ হয় বলেও মনে করেন তিনি। 

এছাড়াও চেকপোস্টে জেরার ভিডিও বিভিন্ন ইউটিউবার কিংবা গণমাধ্যমও প্রচার করে থাকে। এ বিষয়টিকেও আইনপরিপন্থি হিসাবে দেখেন মিতি সানজানা।

তিনি আলাপ-কে বলেন, “যাত্রী কিংবা বাইকারদেরও দেখা যায় চেকপোস্টে আটকে জেরা করা হচ্ছে। তাদের অনুমতি ছাড়া ভিডিও করে সেটা প্রচার করলে আমাদের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ অনুযায়ী অপরাধ।” 

একজন নাগরিককে মিডিয়া ট্রায়ালের মুখোমুখি করা কোনোভাবেই সাংবিধানিক নয় বলে তিনি জানান।

ভিউ বাণিজ্যের শিকার নাগরিক

পুলিশের কিংবা মোবাইল কোর্টের অভিযান সম্পর্কে জনমানুষের জানার অধিকার আছে। সেক্ষেত্রে নাগরিকের গোপনীয়তার সঙ্গে জনস্বার্থের তথ্য জানার অধিকারের মধ্যে কোনো সীমারেখা আছে কি-না এমন প্রশ্নের উত্তরে জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো আসিফ বিন আলী মনে করেন একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন আর কৌতূহল এক বিষয় নয়।

তিনি বলছেন, গণমাধ্যমগুলোকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। এছাড়াও ঠিক করতে হবে কোনটা জনস্বার্থে প্রচার করা দরকার এবং কোনটা একজন মানুষের গোপনীয়তার লঙ্ঘন।

“পুলিশ কী করছে, সেটা জানার অধিকার জনগণের আছে। কিন্তু তাই বলে যাকে পুলিশ জেরা করছে, তার মুখ দেখাতে হবে কেন? গণমাধ্যমের কাজ পুলিশের ওপর নজরদারি করা, সাধারণ মানুষকে বিব্রত করা না”, আলাপ-কে বলেন তিনি। 

অন্যদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খায়ের মাহমুদ মনে করেন  সাংবাদিকদের স্বাধীনতারও সীমা আছে।

“সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ প্রয়োজন না হলে তার মুখ ঝাপসা করা, গাড়ির নাম্বার ও ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা, অপমানজনক জেরা প্রচার না করাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা। সংবাদ প্রকাশের নামে কাউকে ‘কনটেন্টে’ পরিণত করা সাংবাদিকতা নয়”, আলাপ-কে বলেন তিনি।

তবে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের অংশ হিসাবে পুলিশ প্রয়োজনে প্রমাণ সংরক্ষণের জন্য ভিডিও ধারণ করতে পারে জানিয়ে খায়ের মাহমুদ বলেন, তবে ওই ভিডিও কখনোই মিডিয়া কিংবা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া আইন প্রয়োগের অংশ হতে পারে না। 

এক্ষেত্রে তিনি আইনি অস্পষ্টতার কথাও তুলে ধরেন। তার মতে, প্রকাশ্য স্থানে ভিডিও করার বিষয়ে বাংলাদেশের স্পষ্ট আইন নেই।

“কেউ ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলেও তিনি জনসমক্ষে অপমানিত না হওয়ার অধিকার হারান না। ভিডিও প্রকাশ করে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা একধরনের বিচারবহির্ভূত শাস্তি।”

এ ধরনের ভিডিও কি নাগরিকের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ করার ক্ষেত্র তৈরি করছে কি-না, এ সব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের প্রকাশ্য লঙ্ঘন

ক্যামেরার সামনে নাগরিককে হেনস্তা করার এই সংস্কৃতি জাতিসংঘের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের (ইউডিএইচআর) একাধিক অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

সনদের ১২ নাম্বার অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো নাগরিকের প্রাইভেসি ও সম্মানের ওপর এমন আক্রমণ করা যাবে না। অথচ মাঠপর্যায়ে অভিযানের ভিডিও ভাইরাল করে প্রতিনিয়ত এই অধিকার খর্ব করা হচ্ছে।

শুধু তাই নয়, আদালতে অপরাধ প্রমাণ হওয়ার আগেই সামাজিক মাধ্যমে কাউকে অপরাধী বানিয়ে দেওয়া সনদের ১১ নাম্বার অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। যেখানে বলা হয়েছে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক অভিযুক্তই নির্দোষ।

এছাড়া প্রকাশ্য রাস্তায় বা ক্যামেরার সামনে নাগরিকদের মানসিক ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা ৫ নাম্বার অনুচ্ছেদের ‘অপমানজনক আচরণ বা শাস্তি’ নিষেধাজ্ঞার সরাসরি লঙ্ঘন। বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক সনদগুলোর স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত।