যুক্তরাষ্ট্রে ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় বেঁচে যাওয়ার পর প্রবলভাবে ফিরে এসেছে একটিই প্রশ্ন, তাকে কি আবারও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে কি না?
গত ৩০এ সেপ্টেম্বর টেনেসির রিভারবেন্ড ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশনে ওই নারীকে বিষপ্রয়োগ করা হয়। পরপর দুই ডোজ দিলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার তাকে নেওয়া হয় লাইফ সাপোর্টে। তাকে চিকিৎসার চেষ্টা চলছে।
ভেবে দেখুন, একজন মানুষকে আদালত মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিলো। নির্ধারিত দিনে কারাগারের ভেতর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রক্রিয়াও শুরু হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষটি মারা গেলেন না এবং প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকলেন?
তাহলে কী হবে? তিনি কি মুক্তি পাবেন? নাকি আবারও তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার চেষ্টা করা হবে?
রাষ্ট্র যদি একবার কাউকে মৃত্যুদণ্ড দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়, মানুষটি যদি মৃত্যুকূপ থেকে ফিরে আসে, তাহলে দ্বিতীয়বার কি সেই একই শাস্তি কার্যকর করা আইনসম্মত?
এমন ঘটনা বাংলাদেশে বিরল হলেও, দৃষ্টান্ত রয়েছে অন্য দেশে। যুক্তরাষ্ট্রে এর আগেও একই ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকবার।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টার পরও বেঁচে ফিরেছিলেন কেউ কেউ। পরে তাদের সঙ্গে কী ঘটেছিলো?
আর বাংলাদেশের আইনে কী বলা আছে?
কে এই ক্রিস্টা পাইক, যেভাবে বেঁচে আছেন
ক্রিস্টা পাইকের ঘটনা পুরোনো প্রশ্নগুলোকে আবার নতুন করে সামনে এনেছে। যে নারীকে নিয়ে এত আলোচনা, তিনি আসলে কে?
ক্রিস্টা পাইক যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা। তিন দশক ধরে বন্দি আছেন সেখানকারই একটি কারাগারে। টেনেসির ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত কয়েদি হলেন পাইক। কারণ, তিনিই ওই অঙ্গরাজ্যের একমাত্র নারী আসামি, যাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটা ১৯৯৫ সালের ঘটনা। সহপাঠী কোলিন স্লেমারকে হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত হন। ক্রিস্টা তখন ১৮ বছর বয়সি। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ১৯৯৬ সালে তাকে দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ডের আদেশ। হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত হন তিনি। মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
ক্রিস্টা পাইককে ৩০ বছর কারাগারে রাখা এবং তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে দীর্ঘ সময় লাগার মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের জটিল ও দীর্ঘ আইনি আপিল প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত আইনি লড়াই।
ক্রিস্টা পাইকের আইনজীবীরা গত ৩০ বছর ধরে তার সাজা কমানোর জন্য স্থানীয় আদালত থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত একাধিক স্তরে আইনি লড়াই ও আবেদন চালিয়ে গেছেন। এই আইনি প্রক্রিয়াগুলো শেষ হতে কয়েক দশক সময় লেগে যায়।
পাইকের আইনজীবীরা বারবার যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ১৯৯৫ সালে যখন তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটান, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। ছোটোবেলায় তিনি বড় হয়েছেন তীব্র যৌন নির্যাতন, অবহেলা এবং পারিবারিক ট্রমার মধ্য দিয়ে।
আর এর ফলে পরবর্তীতে তার মধ্যে ধরা পড়ে বাইপোলার ডিজঅর্ডার এবং পিটিএসডি বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার।
ক্রিস্টার আইনজীবীদের দাবি ছিলো, ১৯৯৬ সালের মূল ট্রায়ালের সময় তার তৎকালীন ডিফেন্স টিম এই মানসিক সমস্যা ও ট্রমার বিষয়গুলো জুরির কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছিলো। এই পয়েন্টের ওপর ভিত্তি করে সাজা পুনর্বিবেচনার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আবেদন করা হয়।
এছাড়া হত্যাকাণ্ডের সময় ক্রিস্টা পাইকের বয়স ১৮ বছর হওয়ায় তিনি আইনত প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু একই অভিযোগে তার প্রেমিক ও সহযোগী ট্যাডারিল শিপের বয়স ১৭ বছর (অপ্রাপ্তবয়স্ক) হওয়ায় তিনি মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পান এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান।
পাইকের আইনজীবীরা এই বয়সের সামান্য ব্যবধান এবং সাজার এই বিশাল বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ করে দীর্ঘদিন ধরে আদালতে লড়াই করেছেন।
কিন্তু হেরে যান ক্রিস্টার আইনজীবীরা। ৩০ বছর সাজাভোগের পর তাকে মুখোমুখি করা হয় মৃত্যুদণ্ডের। এবং অন্যতম কঠিন পদ্ধতির মাধ্যমে তার মৃত্যু নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
আইনগতভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে প্রধানত ৫টি ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি।
এগুলো হলো- বিষাক্ত ইনজেকশন প্রয়োগ করে মৃত্যু, নাইট্রোজেন হাইপোক্সিয়া বা গ্যাস চেম্বারে মৃত্যু, বৈদ্যুতিক চেয়ারে শকের মাধ্যমে মৃত্যু এবং ফায়ারিং স্কোয়াড ও ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যু।
এর মধ্যে সবচেয়ে কষ্টদায়ক হলো গ্যাস চেম্বার ও বিষাক্ত ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যু।
কোন পদ্ধতিতে দণ্ড কার্যকর করা হবে, তা নির্ধারণ করা হয় দেশটির বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধির ওপর ভিত্তি করে।
৩০এ সেপ্টেম্বর ২০২৬। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে প্রস্তুত করা হয় ক্রিস্ট্রা পাইককে। এরপর তার দেহে প্রয়োগ করা হয় বিষাক্ত ইনজেকশন। দেওয়া হয় পরপর দুটি দুটি ডোজ। শুরু প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট। বিষের তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন পাইক।
কিন্তু বিষাক্ত ইনজেকশন দুই ডোজ দেওয়ার পরও অলৌকিকভাবে বেঁচে থাকেন পাইক। ইনজেকশন কাজ না করায় তাকে নেওয়া হয় হাসপাতালের ভেন্টিলেশনে। এরপর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। তবে তার শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা আইনজীবীরা।
পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ব্যর্থ হওয়ার পর টেনেসি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর বিল লি ওই অঙ্গরাজ্যের সমস্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ২০২৬ সালের জন্য স্থগিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ডের পর আগে যা হয়েছে
মার্কিন বিচার বিভাগ, আইনজীবী, মানবিকার কর্মী এবং কৌশুলীদের সামনে এখন প্রশ্ন হলো ক্রিস্টা পাইক বেঁচে থাকলে, তার কী হবে? তাকে কি ফের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে?
এ বিষয়ে এখনো অবশ্য কিছু জানায়নি সরকার বা কারাগার কর্তৃপক্ষ। তবে পাইকের আইনজীবীরা বসে নেই। জোরালো আইনি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছেন তারা।
আইনজীবীদের যুক্তি, একবার বিষাক্ত ইনজেকশন দেওয়ার পরও যদি কেউ বেঁচে যায়, তাহলে আবারও তাকে একই পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার চেষ্টা করা হলে, তা হবে মার্কিন সংবিধানের পরিপন্থি এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও অস্বাভাবিক শাস্তি।
আইনজীবীদের এই যুক্তি ফেলে দেওয়ার মতো নয়। কারণ, একজন মানুষকে সাঁজা দেওয়ার জন্য কেন তাকে বারবার মৃত্যুর মতো যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে?
আবার আমেরিকাতে এরকম ঘটনা নতুনও নয়। এর আগেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়ার বেশকিছু ঘটনা আছে। সেখান থেকে কেউ বেঁচে ফিরেছেন। কেউ আবার মারা গেছেন ফের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগেই। আবার কাউকে দ্বিতীয় দফার চেষ্টায় কার্যকর করা হয়।
১৮৩৩ সালে পেনসিলভেইনিয়াতে স্ত্রীকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয় চার্লস গেটার নামে এক অপরাধীকে। তাকে নেওয়া হয় ফাঁসির মঞ্চে। গেটারের গলায় পরানো হয়েছিলো রশি। ফাঁসির মঞ্চের লিভার টেনে দেন জল্লাদ। দম আটকে ছটফট করতে থাকে গেটার। এই অবস্থায় দড়ি ছিঁড়ে তিনি মাটিতে পড়ে যান এবং জীবিত থাকেন।
কিন্তু তখন আরও শক্তিশালী একটি দড়ি নিয়ে আসা হয়। এবং তখনই ফের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় গেটারের।
তবে সৌভাগ্যবান ছিলেন আরেক অপরাধী। তার নাম উইল পারভিস। তিনি ফাঁসির মঞ্চ থেকে জীবিত ফিরে এসেছিলেন।
১৮৯৪ সালে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় পারভিসকে। কিন্তু দড়ির ফাঁস আলগা হয়ে যাওয়ায় ব্যর্থ হয় ফাঁসি। দড়িতে ঝুলে ঘাড় ভেঙে মারা যাওয়ার পরিবর্তে বেঁচে যান পারভিস।
তবে গেটারের মতো তখনই তাকে আবারও ফাঁসিতে ঝোলানো সম্ভব হয়নি। কারণ, ব্যর্থ ফাঁসির চেষ্টার পর, নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বসেন পারভিস। তাকে পুনরায় ফিরিয়ে নেওয়া হয় কারাগারে।
পারভিসকে যেন ফের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা করা না হয়, সেই আবেদন করেন তার আইনজীবীরা। তবে তারা ব্যর্থ হন। কারণ, আইনত তার ফাঁসিই হওয়ার কথা ছিলো।
তারপরও ফাঁসি এড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন পারভিস। মিসিসিপির গভর্নর তাকে ক্ষমা করে দেন। এরপর তিন বছর কারাভোগ করেন তিনি।
মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে পারভিসই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি এমন ক্ষমা পেয়েছিলেন এবং কারাগার থেকে একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবেই বের হয়ে আসেন তিনি।
১৯ শতকের শেষ পর্যন্ত আমেরিকায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রধান মাধ্যম ছিলো ফাঁসি। কিন্তু অনেক সময়ই সফল হতো না ফাঁসি। জল্লাদের সামান্য ভুলের কারণে অনেক সময়ই আসামির ঘাড়ের হাড় ভাঙতো না। এবং এরপর দীর্ঘক্ষণ দম আটকে ছটফট করে মারা যেত। এটা ছিলো অত্যন্ত নিষ্ঠুর দৃশ্য।
এই নিষ্ঠুরতা এড়াতে এবং আসামির দ্রুত ও যন্ত্রণাহীন মৃত্যু নিশ্চিত করতে মার্কিন প্রশাসন খুঁজছিলো ফাঁসির চেয়ে একটি আধুনিক ও মানবিক বিকল্প। তখনই আসে বৈদ্যুতিক চেয়ারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি।
ফাঁসি বা শিরশ্ছেদের চেয়ে বিদ্যুৎ দিয়ে মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা অনেক দ্রুত এবং ব্যথাহীন। তবে এতেও সফলতার হার শতভাগ না। মানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে বৈদ্যুতিক চেয়ারেও ব্যর্থতার হার কম না।
১৯৪৬ সালে একটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হয় লুইজিঅ্যানা অঙ্গরাজ্যে। অপরাধীর নাম উইলি ফ্রান্সিস। কৃষ্ণাঙ্গ ওই ১৬ বছর বয়সি তরুণের বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছিলো হত্যার অভিযোগ।
দণ্ড কার্যকর করতে তাকে বসানো হয় বৈদ্যুতিক চেয়ারের ওপর। সে সময় বৈদ্যুতিক চেয়ারকেই মনে করা হতো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সবচেয়ে মানবিক পদ্ধতি হিসাবে। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ব্যর্থ হয় মৃত্যুদণ্ড।
তবে ফ্রান্সিস যা অনুভব করেছিলেন তা কোনোভাবেই মানবিক মনে হয়নি। চেয়ারে বসানোর পর যখন বৈদ্যুতিক প্রবাহ তার শরীরে পৌঁছালো, তখন তিনি খিঁচুনি দিয়ে ছটফট করতে লাগলেন। জল্লাদ আবারও সুইচ টিপলেন। আবারও খিঁচুনি দিয়ে ছটফট। কিন্তু মারা গেলেন না ফ্রান্সিস।
এরপর তিনি দ্বারস্থ হলেন আদালতের। যুক্তি দিলেন, একবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা হওয়ায়, আবার যদি তাকে একই শাস্তির মুখোমুখি করা হয় হয়, তাহলে তা হবে সংবিধানের লঙ্ঘন। মামলাটি গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। শুনানির পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করারই আদেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। এরপর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ফ্রান্সিসের।
তার মানে, বহু আগে থেকে একই ধরনের প্রশ্নের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত ও আইনসভা। একবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ব্যর্থ হলে, রাষ্ট্র কি আবারও সেই চেষ্টা করতে পারে?
এরপর আসে বিষাক্ত ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি। আইনগতভাবে শুরু হয় ১৯৭৭ সালে এবং এর প্রথম বাস্তব প্রয়োগ ঘটে ১৯৮২ সালে। কিন্তু এটাও সফল না। একবিংশ শতাব্দীতেই ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডের কার্যকরের কয়েকটি ব্যর্থতার নজির আছে।
২০০৯ সালে ওহাইও অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হয় রোমেল ব্রুম নামের এক অপরাধীকে। ইনজেকশনের জন্য শিরা খুঁজে পেতে টানা দুই ঘণ্টা ধরে চেষ্টা করে জল্লাদরা। কিন্তু শিরা না পাওয়ায় হাল ছেড়ে দেন ফাঁসির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা।
রোমেল ব্রুমই হয়ে ওঠেন একবিংশ শতাব্দীতে মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া প্রথম ব্যক্তি। অবশ্য হাল ছাড়ে না রাষ্ট্র। তাকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয় আইনি লড়াই। কিন্তু দ্বিতীয়বার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগেই ২০২০ সালে করোনাভাইরাসে মারা যান রোমেল ব্রুম।
একই অপরাধে দ্বিতীয় দফায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা কি সংবিধান পরিপন্থি
২০২৪ সালে আমেরিকার আইডাহোতে কার্যকর করা যায়নি থমাস ক্রিচ নামে এক অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড। ইনজেকশনের মাধ্যমে তাকে মৃত্যু নিশ্চিত করার কথা ছিলো। কিন্তু কারাগার কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেনি। প্রায় এক ঘণ্টা পর চেষ্টার পর হাল ছেড়ে দেন জল্লাদ ও সংশ্লিষ্টরা।
এরপর যথারীতি শুরু হয় আইনি লড়াই। ফের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টার বিরুদ্ধে আদালতে লড়াই শুরু করেন ক্রিচ। তার যুক্তি ছিলো, তাকে যদি আবারো মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার চেষ্টা চালানো হয়, তাহলে তা হবে ‘ডাবল জেপার্ডি’ বা একই অপরাধে দ্বিতীয়বার সাঁজা দেওয়ার চেষ্টা।
এখানেই কিন্তু বড় প্রশ্ন। সাঁজা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে, পুনরায় আবারও কি সাঁজা দেওয়া যাবে?
অনেকেই ব্যাখ্যা দেন, একবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা হয়েছে, তাই দ্বিতীয়বার চেষ্টা করলে সেটি হবে, ডাবল জেপার্ডি বা একই অপরাধে দ্বিতীয়বার সাঁজা দেওয়ার চেষ্টা।
কিন্তু মার্কিন আইন বলছে ভিন্ন কথা। ডাবল জেপার্ডি মূলত প্রযোজ্য হয়, একই অপরাধে একজনকে পুনরায় বিচার করার ক্ষেত্রে। সাঁজা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নয়।
বাংলাদেশের আইন কী বলে
বাংলাদেশের আইনে কী আছে, এই ফাঁকে সেটা একটু দেখে আসি। বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রধান এবং আইনগত পদ্ধতি হলো ফাঁসি।
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি এবং ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত রায় বহাল থাকলে তার গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে কার্যকর করার বিধান রয়েছে।
ফৌজদারি কাযবিধির ৩৬৮-এর ১ ধারায় লেখা আছে, “মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসির রশিতে ঝুলিয়ে দণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হলো।” তার মানে যতক্ষণ মৃত্যু না হবে, ততক্ষণ ফাঁসির দঁড়িতে ঝুলিয়ে রাখা হবে।
তবে বিশেষ ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রমী আইনি বিধানও রয়েছে। যেমন- ফায়ারিং স্কোয়াড।
বাংলাদেশের বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ অনুযায়ী, গুরুতর কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে আদালত চাইলে ফাঁসির পরিবর্তে ফায়ারিং স্কোয়াড বা গুলির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দেওয়ার বিশেষ ক্ষমতা রাখেন। তবে বাস্তবে এই পদ্ধতির প্রয়োগ প্রায় দেখাই যায় না বললেই চলে।
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় ২০১৭ সালে ১০ জন এবং ২০২১ সালে ১৪ জন হুজি জঙ্গিকে "ফায়ারিং স্কোয়াডে প্রকাশ্যে" মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেন বিশেষ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড মামলায় একই ঘটনা ঘটেছিলো। ১৯৯৮ সালে ওই মামলার রায়ে ১৫ জন আসামিকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছিলেন ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত।
কিন্তু পরে উচ্চ আদালত ফায়ারিং স্কোয়াড পরিবর্তন করে ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কাযকরের আদেশ দেন।
বিল অব রাইটস
আবার আমেরিকার ঘটনাতে আমরা ফিরে যাই। সার্বিকভাবে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হলো আদালতের দেওয়া একটি সাজা। আর সেই সাঁজা কার্যকর হয় মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে। তাই প্রথম ‘এক্সিকিউশন’ ব্যর্থ হলেই মূল ‘কনভিকশন’ বা ‘ডেথ সেনটেন্স’ নিজে থেকেই বাতিল হয়ে যায় না।
কিন্তু এখানেই শেষ হচ্ছে না তর্ক। দ্বিতীয়বার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে গেলে প্রশ্ন আসবেই।
একজন বন্দি যদি প্রথমবারের চেষ্টায় গুরুতর শারীরিক ক্ষতির শিকার হন? তার মানসিক বা শারীরিক সক্ষমতা যদি আঘাতপ্রাপ্ত হয়? অথবা প্রথম ব্যর্থতা যদি প্রমাণ করে যে ‘এক্সিকিউশন প্রটোকল’-এই রয়েছে বড় ধরনের ঘাপলা? তাহলে কী হবে?
আমেরিকাতে সম্প্রতি ক্রিস্টা পাইককে বিষাক্ত ইনজেকশন দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় তিনি যে কষ্ট ও যন্ত্রণা পেয়েছেন, তার দায় কে নেবে?
এছাড়া দ্বিতীয়বারের ‘এক্সিকিউশন’ নিয়ে তৈরি হচ্ছে সাংবিধানিক প্রশ্ন। বিশেষ করে এখানে চলে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী। এটা পরিচিত বিখ্যাত 'বিল অব রাইটস' নামে। কার্যকর ১৭৯১ সাল থেকে।
সেখানে পরিষ্কারভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ‘নিষ্ঠুর এবং অস্বাভাবিক শাস্তি’। তাই ফের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টার আগে প্রশ্ন আসছেই, ওই মানুষকে আবার মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি করা কি সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য?
আর ক্রিস্টা পাইকের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা আরো জটিল। কারণ, তাকে প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগ করা হলেও বেঁচে আছেন। বিষ প্রয়োগের পর তার কষ্ট ভোগ, যন্ত্রণায় ছটফট করাসহ সবকিছু মিলিয়ে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যা যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ডের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা বলে বর্ণনা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আরো প্রশ্ন হলো, তিনি দ্বিতীয়বার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টার জন্য উপযোগী কিনা? আর প্রথম চেষ্টায় তার কোনো সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কিনা?
রাষ্ট্র যদি কারো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই মানুষকে আবারও মৃত্যুর মুখোমুখি করা কতটা মানবিক? তিনি কি মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে শাস্তির সীমা পেরিয়ে যাননি?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো আইনে নেই। এগুলো জড়িয়ে আছে মানবাধিকার, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং মৃত্যুদণ্ডের নৈতিকতার সঙ্গে।