ঢাকার মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ‘রাজা’ ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’ গাজীপুর থেকে নয়, পালিয়েছে পুরান ঢাকা থেকেই।
তদন্তে উঠে এসেছে তাকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরাই। এ বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে তদন্তকারী দল।
ঘটনার সাতদিন পেরিয়ে গেলেও আলোচিত এই রাজার অবস্থান নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। কেউ কেউ বলছেন, দেশ ছেড়ে পালিয়েছে পিচ্চি রাজা।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা এসআই প্রবীর কুমার ও চালক নায়েক কামাল হোসেনকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার পরপরই তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার মহিউল ইসলামকে প্রধান করে গঠিত এই তদন্ত কমিটির বাকি দুই সদস্য হলেন কোনাবাড়ী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার আবু নাসের আল-আমিন ও কোনাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইফতেখার হোসেন।
যেভাবে পালিয়েছিলো রাজা
গত ২৭এ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকায় নিম্ন আদালতে হাজিরা শেষে সন্ধ্যার পর কারাগারের পথে রওনা দেয় প্রিজন ভ্যান। সেখানে আরো অন্তত ৩০জন বন্দি ও কয়েদি ছিলো।
তখন জানা গিয়েছিলো, গাজীপুরের নওজোড়া এলাকায় প্রিজন ভ্যান থামিয়ে পিচ্চি রাজাকে ওয়াশরুমে নেওয়া হয়। সেখান থেকেই হাওয়া হয়ে যায় পিচ্চি রাজা। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তাকে পাওয়া যায়নি।
পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, ঢাকাতেই অন্ধকারাচ্ছন্ন কোনো একটি জায়গায় পিচ্চি রাজাকে কার্যত পালিয়ে যেতে দেওয়া হয়েছে।
এতে সহযোগিতা করে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরাই। তার পালানো নিশ্চিত হওয়ার পরই বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়।
প্রাথমিকভাবে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে প্রিজন ভ্যানে থাকা এসআই প্রবীর কুমার, কনস্টেবল মো. জাকির হোসেন, মো. সাকিব শাকিল হোসেন এবং প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনসহ ৫ জন পুলিশ সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।
ওই ৫ জনের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা ঢাকা থেকে রাজার পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আলাপ-কে নিশ্চিত করেছেন।
পিচ্চি রাজার অপরাধের নেটওয়ার্ক বেশ বিস্তৃত। ধারণা করা হয়, নানা স্তরে তার শক্তিশালী যোগাযোগ আছে। প্রশাসনের অনেকের সাথে আছে ঘনিষ্ঠতা।
তাদের কারো সহায়তায় রাজা পালিয়ে যেতে পেরেছেন কি-না এই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, "আমরা সেদিন প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন রকম বক্তব্য পেয়েছি। তারা কখনো ঢাকা, কখনো কোনাবাড়ির কথা বলছেন। তবে এখন পর্যন্ত আমরা নিশ্চিত, পিচ্চি রাজা ঢাকা থেকেই পালিয়ে গেছে।”
তিনি জানান, এ ঘটনার সাথে কার কী ধরনের সংশ্লিষ্টতা আছে, বাইরে কারো ইন্ধন আছে কি-না সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
রাজা এখন কোথায়
পুলিশ হেফাজত থেকে পিচ্চি রাজা ফেরার হওয়ার পর থেকেই চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। সাত দিন পার হতে চললেও সে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
তাকে খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করতে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার কথা বলছে পুলিশ। যদিও ফলাফল এখনও শূন্য।
তবে একটি গোয়েন্দাসূত্র আলাপ-কে জানিয়েছে তাদের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পিচ্চি রাজা বাংলাদেশ ছেড়ে গেছে।
সূত্রটি বলছে, প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে একটি গাড়িতে করে জামালপুরের সীমান্ত এলাকায় পৌঁছায় রাজা। সেখান থেকে অবৈধপথে পাড়ি দেয় ভারতের মেঘালয়ে।
সেখান থেকে তিনি পিচ্চি রাজা ভারত থেকে নেপাল চলে যেতে পেরেছে বলেও প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এসব তথ্য যাচাই বাছাই করে দেখছে গোয়েন্দারা।
রাজার দেশত্যাগের শঙ্কা অবশ্য উড়িয়ে দিয়েছেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান।
আলাপ-কে তিনি বলেন, "রাজার পালানোর খবর পাওয়ার পরই আমরা দেশের সব ইমিগ্রেশন সিল করে দিয়েছি, যার কারণে তার পালানোর পথও বন্ধ হয়ে গেছে।"
জেনেভা ক্যাম্পেও আলোচনায় রাজা
মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের প্রায় সবার মুখে এখন পিচ্চি রাজার অন্তর্ধানের গল্প। এ বিষয়ে ক্যাম্পের তিনজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলাপ-এর সঙ্গে কথা বলেছেন।
তারা জানান, পিচ্চি রাজার হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা ক্যাম্পজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। তাদের একজন বলেন, "পিচ্চির লোকজন জেনেভা ক্যাম্পে এখনো রয়েছে। তারা মাদক ব্যবসা, মারামারিসহ অনেক অপরাধে যুক্ত। তাই সে পালিয়ে যাওয়ার খবরে অনেকেই খুশি।"
অন্য একজন বলেন, "এই ধরনের অপরাধী কারাগারে থাকলেই আমরা অনেকটাই নিরাপদ থাকি।"
রাজার পরিবারের দুইজন সদস্যের মোবাইল ফোন নাম্বার পেয়েছে এই প্রতিবেদক। তবে দুইটি নাম্বারই বন্ধ পাওয়া গেছে।
যা বলছেন তদন্তকারীরা
রাজার পালানোর ঘটনায় সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয় প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা পাঁচজন পুলিশ সদস্যকে।
তাদের হেফাজতে নিয়ে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা পুলিশ দক্ষিণ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) সাহেব আলী পাঠান আলাপ-কে জানান, "সব জায়গা থেকে আমরা সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছি, সন্দেহভাজনদের কললিস্ট হাতে আছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।"
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত সেদিন প্রিজন ভ্যানের দায়িত্বে থাকা ইনচার্জসহ কয়েকজনের দায় পাওয়া গেছে। পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকা থেকে রাজার পালানোর তথ্য তারা পেয়েছেন।
এছাড়াও ঢাকার ভেতরের একাধিক পয়েন্টের কথাও তাদের বিবেচনায় আছে। একইসঙ্গে পুরো ঘটনায় সুনির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্যও পাওয়া গেছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার আলাপ-কে বলেন, "তদন্ত চলছে, পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তারের বিষয়েও অগ্রগতি আছে। খুব শিগগিরই প্রেস ব্রিফিং করে আমরা সব জানাবো।"
ছায়াতদন্তে এসআরবি
জেনেভা ক্যাম্প এলাকার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী পিচ্চি রাজা ২৫টি মামলার আসামি। তার পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ছায়াতদন্তে নেমেছে এসআরবি-২। রাজার অপরাধ সাম্রাজ্য নিয়ে পুলিশের এই বিশেষ ইউনিটের হাতেও রয়েছে অনেক গভীরের তথ্য।
এসআরবি-২ এর অধিনায়ক অ্যাডিশনাল ডিআইজি নয়মুল হাসান আলাপ-কে বলেন, "পিচ্চি রাজাকে নিয়ে আমরা এর আগেও কাজ করেছি। এখনও অনেক কাজ বাকি আছে। পিচ্চি রাজা এই মুহূর্তে কোথায় আছে, সেটা আমরা এখনই বলতে পারছি না।"
সন্তোষজনক কোনো অগ্রগতি হলেই তাৎক্ষণিকভাবে তা জানানো হবে বলে জানান এসআরবি'র এই কর্মকর্তা।
২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের পর থেকে বেপরোয়া হতে শুরু করে পিচ্চি রাজা। শক্তিশালী হতে শুরু করে তার গ্যাং সদস্যরা।
ক্যাম্পের ভেতর মাদক ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ আর খুনোখুনিতে সব কিছুতেই আসতো পিচ্চি রাজা গ্যাংয়ের নাম। তার গ্রুপের হাতে অবৈধ অস্ত্রের ভাণ্ডারও বেশ বড় বলে ধারণা গোয়েন্দাদের।
এ বছরের ১৯এ মে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে, নেপাল থেকে ফেরার পথে স্ত্রী ও শ্যালকসহ তাকে গ্রেপ্তার করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।