পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের প্রতিযোগিতায় যেভাবে হেনস্তা হচ্ছে নির্দোষ মানুষ

আপনার নিশ্চয়ই রনজিলা পারভীনের কথা মনে আছে, যিনি অগাস্ট মাসের শেষের দিকে সংসদ ভবনের সামনে ছিতকারীদের হামলায় নিহত হয়েছিলেন। ওই শিক্ষক হত্যায় জড়িত সন্দেহে গ্রেফতার ও আলামত জব্দের ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন বয়ান ও আলামতের তথ্য দিয়েছিলো পুলিশেরই দুটি ইউনিট–ডিবি ও র‌্যাব, সম্প্রতি যার নাম পরিবর্তন হয়ে এখন এসআরবি। 

ঘটনার পরপরই তিনজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এরপর নেওয়া হয় রিমান্ডে, তারপর পাঠানো হয় কারাগারে। র‍্যাবের দাবি অনুযায়ী, যে মোটরসাইকেলে ছিনতাইকারীরা ছিলেন, সেটিও জব্দ করা হয়। 

র‌্যাব দাবি করে, তাদের করে তাদের গ্রেপ্তার করা তিনজনই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। 

কিন্তু এরপর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ বা ডিবির তদন্তে যা বের হয়, তা ছিলো র‌্যাবের সম্পূর্ণ বিপরীত। 

ডিবি গ্রেপ্তার করে দুইজনকে। তাদেরকেও রিমান্ডে নেওয়া হয়, পাঠানো হয় কারাগারে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন তারা। 

ছিনতাইয়ে ব্যবহার হওয়া মোটরসাইকেল জব্দ করার দাবি করেছে ডিবিও।  তদের দাবি, তাদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া দুজনই ওই ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত। 

তাহলে কী ঘটলো? একটি ঘটনা। পুলিশের দুটি ইউনিট দুই রকম বর্ণনা ও আসামি নিয়ে হাজির। 

শুধু রনজিলা ঘটনায় নয়, কোনো একটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড বা অপরাধের পর আসামি গ্রেপ্তারের সাফল্য তুলে ধরতে প্রায়ই তৎপরতা দেখা যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। 

এমনভাবে ঘটনার আড়ালের দৃশ্যায়ন করেন, তাতে মনে হতেই পারে, যেন সবকিছুই জেনে ফেলেছেন তারা।  

সংবাদ সম্মেলন হয়, প্রকাশ করা হয় আসামির পরিচয়, রহস্য উন্মোচনের দাবি করে বলা হয়, গোয়েন্দা তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই এই গ্রেপ্তার।

কিন্তু সমাধানের বদলে আরো ঘনীভূত হয় রহস্য। কিছুদিন বা কয়েক বছর পর একই ঘটনার তদন্তে যুক্ত হয় অন্য আরেক ইউনিট বা তদন্তকারী সংস্থা। তখন সামনে আনা হয় ভিন্ন আসামি, ভিন্ন তথ্য, কখনো ভিন্ন মোটিভসহ সম্পূর্ণ ভিন্ন বয়ান। 

তখন প্রশ্ন ওঠে, প্রথমে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিলো, তারা যদি নির্দোষ হন, তাহলে তাদের গ্রেপ্তার, রিমান্ড, কারাভোগ এবং সামাজিক হেনস্তার দায় নেবে কে? 

আর ভুল তদন্ত বা ভুল আসামি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর জবাবদিহি কোথায়?

আরও বড় প্রশ্ন, অপরাধী ধরতে তাড়াহুড়ো করার ফলে যদি প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে জনসমক্ষে তুলে ধরা হয় এবং পরের তদন্তে সেই দাবি ভুল প্রমাণিত হলে, ওই ভুলের জন্য কি কোনো কর্মকর্তা জবাবদিহির মুখোমুখি হন? 

নাকি গ্রেপ্তারের কৃতিত্ব নেওয়ার পর ভুলের দায়টা পড়ে থাকে সেই ব্যক্তি ও তার পরিবারের ওপর?

অগাস্ট মাসের শেষের দিকে সংসদ ভবনের সামনে ছিতকারীদের হামলায় নিহত হন শিক্ষক রনজিলা পারভীন।

সংসদ ভবনের সামনে রনজিলার মৃত্যু ও দুই রকম আসামি

জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনা পুরোনো ওইসব প্রশ্ন সামনে এনেছে আবারো নতুন করে। 

রনজিলা মৃত্যুর পর তিনজনকে গ্রেপ্তার করে সন্দেহভাজন হিসেবে সামনে আনে তখনকার র‍্যাব (এখন এসআরবি)। তাদের রিমান্ডে শেষে পাঠানো হয় কারাগারেও।

কিন্তু কয়েক দিন পর ডিবি জানায়, ঘটনার সঙ্গে ওই তিনজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি, বরং সিসিটিভি ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তারা নতুন করে গ্রেপ্তার করে দুজনকে। উদ্ধার করে রনজিলার ব্যাগ, মোবাইল ফোন এবং ঘটনায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল।

গত ২৯এ অগাস্ট ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে চলন্ত রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন রনজিলা পারভীন (৫৬)। তিনি ছিলেন বগুড়ার বাগবাড়ী সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন তাকে।

ঘটনার পরদিন ৩০এ অগাস্ট তখনকার র‍্যাব-২ দাবি করে, ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত সন্দেহে দুজনকে গ্রেপ্তার করে তারা। তাদের নাম পনি ওরফে প্যারা পনি ওরফে পনি গাজী এবং সেড্রিক জুলিয়ান। 

পরে মোটরসাইকেলের মালিক মো. রাকিব হোসেনসহ মোট তিনজনকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়।

র‍্যাবের ভাষ্য ছিলো, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ‘পর্যাপ্ত প্রমাণ ও তথ্য উপাত্ত’ পাওয়ার পরেই তদন্তের অংশ হিসেবে সন্দেহভাজন হিসাবে গ্রেপ্তার করা হয় তাদের।

আটকের পর এক ব্রিফ্রিংয়ে তখনকার র‍্যাব-২ এর অধিনায়ক নয়মুল হাসান বলেন, পনির বিরুদ্ধে আগের বেশ কিছু মামলা রয়েছে। 

এরপর ৫ই সেপ্টেম্বর রনজিলার মৃত্যুর ঘটনার মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান আসামি মো. পনিসহ তিনজনের রিমান্ড শেষ হলে পাঠানো হয় কারাগারে। এখনো কারাগারেই রয়েছেন তারা।

যেভাবে বদলে গেল রনজিলার ঘটনার আসামির তালিকা

তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করলো র‌্যাব, বিমান্ড শেষে তাদের পাঠানো হলো কারাগারে। কিন্তু দৃশ্যপট নাটকীয়ভাবে বদলে গেলে ১৬ই সেপ্টেম্বর।

নতুন বয়ান নিয়ে ঘটনার মধ্যে হাজির হয় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। 

রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় মো. খোকন ও রাজীব মাতুব্বরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান ডিবি কর্মকর্তারা। 

তারা দাবি করেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেই শনাক্ত করা হয়েছে তাদের। এমনকি তাদের কাছ থেকে রনজিলার ব্যাগ, মোবাইল ফোন এবং ঘটনায় ব্যবহার হওয়া মোটরসাইকেল উদ্ধারের কথাও জানানো হয়।

ডিবি প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার তিনজনের সঙ্গে রনজিলার মৃত্যুর ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। 

র‍্যাব যে মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছিলো, সেটিও ঘটনার সময় ব্যবহার হওয়া মোটরসাইকেল নয় বলে দাবি করেন ডিবির প্রধান। 

ওইদিন ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রনজিলা পারভীনের স্বামী আবদুল মতিনও।

ডিবির উদ্ধার করা ভ্যানিটি ব্যাগ ও মোবাইল ফোন দেখে তিনি নিশ্চিত করেন যে, সেগুলো তার স্ত্রীর।

আব্দুল মতিন জানান, ঘটনার সময় মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ছিনতাইকারীর মুখ একঝলক দেখেছিলেন তিনি। ডিবির তদন্তকারীদের কাছে তিনি সেই চেহারার বর্ণনা দেন। 

খোকনকে গ্রেপ্তারের পর তাকে দেখে আবদুল মতিন ওই ব্যক্তিকে ছিনতাইকারী হিসেবে শনাক্ত করেন।

ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া দুইজন, রাজীব ও খোকন ১৭ই সেপ্টেম্বর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে আলাপ-কে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলাম। 

তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকার পৃথক দুই মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।

আসামি মো. খোকন এবং রাজীব মাতবরকে আদালতে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম।

ডিবির হাতে মূল আসামি ধরা পড়ার পর র‍্যাব-২ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তের অংশ হিসেবে ওই তিনজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছিলো। এরমধ্যে পনি পেশাদার অপরাধী। তবে তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া না গেলে অভিযোগপত্র থেকে তাদের বাদ দেওয়া হবে।

“আমরা আমাদের কাজ করেছি, তারা (ডিবি) তাদের কাজ করেছে। আমরা কেউই চাই না, কোনো নির্দোষ ব্যক্তি শাস্তি পাক,” বলেন তিনি। 

কিন্তু, একই ঘটনায় র‌্যাব ও ডিবির পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন আসামি ধরা ও আলামত উদ্ধারের ঘটনায় সমস্যা দেখছেন মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন। 

আলাপ-কে তিনি বলেন, “আইনগতভাবে তদন্তে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেপ্তারের সুযোগ আছে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন তদন্তের পর্যায় শেষ হওয়ার আগেই সংবাদ সম্মেলনে কাউকে অপরাধের সঙ্গে জড়িত হিসেবে জনসমক্ষে উপস্থাপন করা হয়, আর পরে অন্য তদন্তে তার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় না।” 

“সেই ভুল গ্রেপ্তারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিলো, নির্দোষ ব্যক্তিরা কোনো ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন কিনা, কিংবা ভুল তথ্য দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি হয়েছিলো কিনা, এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা কখনো পাইনি,” বলেন নুর খান লিটন।

রনজিলা পারভীনের মৃত্যুর ঘটনার শুরু থেকেই সিসিটিভি ফুটেজ ও উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলের সঙ্গে তাদের মক্কেলদের সম্পৃক্ততা ছিলো না বলে দাবি করেন র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার আসামি রাকিবের আইনজীবী মেহেদী হাসান।

“ডিবির হাতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে রনজিলার ব্যাগ ও প্রকৃত মোটরসাইকেল উদ্ধারের পর আগের গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন আরো জোরালো হয়েছে।” 

মেহেদী বলেন, তিন নম্বর আসামি রাকিবের জামিনের জন্য আবেদন করা হয়েছিলো চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে। তবে আবেদন মঞ্জুর হয়নি। উপরন্তু গত ২৬এ ফেব্রুয়ারি ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়ের হওয়া একটি চুরির মামলাতেও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, যে মামলায় তার নামই নেই।

র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের পরিবারের অভিযোগ, অপরাধে জড়িত না থেকেও তাদের স্বজনদের গ্রেপ্তার হতে হয়েছে, রিমান্ডে যেতে হয়েছে এবং কারাগারে থাকতে হচ্ছে। এখন ডিবির বক্তব্যে তাদের সংশ্লিষ্টতা না পাওয়ায় তাদের সেই ভোগান্তির প্রতিকার কী হবে, এ প্রশ্নও তুলছেন ওই পরিবারগুলোর সদস্যরা।

রাকিব হোসেনের স্ত্রী সুমাইয়া ইসলাম আলাপ-কে বলেন, “নির্দোষ হওয়ার পরও আমার স্বামী গ্রেপ্তার হয়ে রিমান্ড ও কারাগারে গেলেন। এই হেনস্তার প্রতিকার কী?” 

যাদের কারণে তিনি ও তার পরিবার এই ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন, রাষ্ট্রের কাছে তাদের বিচারও দাবি করেন তিনি।

পনি গাজীর ভাই রনি গাজী বলেন, “আমার ভাইয়ের নামে আগের কিছু মামলা আছে। ওইসব মামলায় যদি তাকে বিচারের আওতায় নেওয়া হয়, তাতে কোনো আপত্তি নেই।

“কিন্তু শিক্ষিকার ব্যাগ ছিনতাই ও তাকে হত্যার ঘটনায় তার ভাই জড়িত না থেকেও পরিবারকে পড়তে হচ্ছে হেনস্তার মুখে।” 

সংশ্লিষ্ট র‍্যাব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তারা আইনি ব্যবস্থা নেবেন বলেও জানান তিনি।

ঢাকায় পুলিশের উপপরিদর্শক গৌতম রায়, রাজশাহীতে অধ্যাপক একেএম শফিউল ইসলামে হত্যা আর দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানম ও তার বাবার ওপর হামলার ঘটনায়ও বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার তথ্যে গড়মিল দেখা যায়।

রনজিলার মতোই রয়েছে আরো ঘটনা

২০১০ সালের ১৯এ এপ্রিল ঢাকার বংশালে আসামি ধরতে গিয়ে নিহত হন পুলিশের উপপরিদর্শক গৌতম রায়। ঘটনার পর পুলিশ ও র‍্যাব আলাদা ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। 

র‍্যাব আলী হায়দার ও জাকির হোসেনকে গ্রেপ্তারের পর দাবি করেছিলো, হত্যাকাণ্ডে তারাই জড়িত। অন্যদিকে, পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিলো আহম্মেদ আলী ওরফে হায়দার ও জাকির হোসেনকে। 

একই ঘটনায় একই ধরনের নামে চারজন গ্রেপ্তার হওয়ায় দুই সংস্থার মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে চলে আসে। 

পরে ডিবির তদন্তে র‍্যাবের গ্রেপ্তার করা আলী হায়দার ও জাকিরকে বাদ দেওয়া হয় অভিযোগপত্র থেকে। 

২০১১ সালে চারজনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। র‍্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া দুই ব্যক্তির নাম শেষ পর্যন্ত ওই মামলার অভিযোগপত্রে থাকেনি।

এই ঘটনায় র‍্যাব-পুলিশের অবস্থানের এমন প্রকাশ্য বিরোধ তখনকার শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক পর্যন্ত গড়িয়েছিলো।

২০১৪ সালের ১৫ই নভেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন চৌদ্দপাই এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক একেএম শফিউল ইসলামকে। ওই হত্যাকাণ্ড নিয়েও র‍্যাব ও পুলিশের বক্তব্য ও অবস্থানে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়।

ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব দাবি করেছিলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এক নারীর সঙ্গে ‘অসৌজন্যমূলক’ আচরণকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটে। মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন আবদুস সামাদ পিন্টু।

অন্যদিকে পুলিশ তখন হত্যাকাণ্ডে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানায়। আনসার আল ইসলাম সদস্যসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানায় তারা। 

পরদিনই র‍্যাব ও পুলিশের বক্তব্যের এই পার্থক্য সংবাদ শিরোনাম হয়। পরে পুলিশের অবস্থান আবার বদলায় এবং র‍্যাবের দেওয়া ব্যক্তিগত আক্রোশের তথ্যকে সামনে রেখে তদন্ত এগোনোর কথা জানানো হয়।

২০২০ সালের ২রা সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখের ওপর হামলা হয়। ওই ঘটনাতেও প্রথমদিকে র‍্যাব ও পুলিশের বক্তব্যে ভিন্নতা পাওয়া যায়।

আসাদুল ইসলাম, নবীরুল ইসলাম ও সান্টু কুমার দাসকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। র‍্যাবের প্রাথমিক বক্তব্য ছিলো, চুরির উদ্দেশ্যে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এরপর পুলিশ গ্রেপ্তার করে ইউএনও কার্যালয়ের সাবেক মালি রবিউল ইসলামকে। 

রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি তখন জানান, হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন রবিউল। পরবর্তী তদন্তে রবিউলকে একমাত্র আসামি করে দেওয়া হয় অভিযোগপত্র। ২০২১ সালে তার বিরুদ্ধে অভিযোগও গঠন করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক আলাপ-কে বলেন, “পুলিশের এক ইউনিট যখন কাউকে অপরাধী হিসাবে সামনে আনে, পরে অন্য ইউনিট যখন বলে তিনি জড়িত নন, তখন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সত্যটি পরিষ্কার করার দায় কার? 

“যাদের কারণে পরিবারগুলো সামাজিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হলো, তাদের কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ভুল স্বীকার করার ইতিহাস নেই। অতীতেও বিভিন্ন সময় এমন ঘটনা আমরা দেখেছি।” 

আলোচিত ঘটনার সময় ‘ক্রেডিট’ নেওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো না করে, প্রমাণসহ দোষী ব্যক্তি গ্রেপ্তার করার বিষয়ে জোর দিতে পরামর্শ দেন তিনি।

রনজিলা পারভীনের ঘটনা শেষ পর্যন্ত কোন তদন্তে কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, সেটি আদালত ও তদন্তের বিষয়। কিন্তু এই ঘটনায় এরই মধ্যে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তার গভীরতা অনেক। 

অপরাধী শনাক্তের আগে আসামি হিসাবে কাউকে জনসমক্ষে তুলে ধরার দায় কতটা, আর ভুল হলে তার প্রতিকার কী?

একজন নির্দোষ মানুষকে গ্রেপ্তার করা মানে শুধু তার কয়েকটি দিন কেড়ে নেওয়া নয়; তার স্বাধীনতা, সামাজিক মর্যাদা, কর্মজীবন ও পরিবারের ওপরও পড়ে এর প্রভাব। অথচ অতীতের একাধিক ঘটনায় তদন্তের বয়ান বদলালেও ভুল গ্রেপ্তার বা ভুল তথ্যের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির নজির তেমন একটা নেই। 

তাই অপরাধী ধরার সাফল্যের কৃতিত্ব নেওয়ার চেয়ে প্রমাণভিত্তিক ও নির্ভুল তদন্তই গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত বলে মনে করে বিশ্লেষকরা। কারণ, একজন অপরাধীকে ধরতে দেরি হওয়ার ক্ষতি যেমন গুরুতর, তেমনি একজন নির্দোষ মানুষকে অপরাধী বানিয়ে ফেলার ক্ষতি তার থেকেও বেশি গুরুতর।