হোয়াটসঅ্যাপের ‘মিটআপ’ গ্রুপ থেকে মসজিদে জমায়েত, নতুন ছকে পুরোনো নেটওয়ার্কের ছায়া

সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপে গ্রুপ খুলে আলোচনা, তারপর মসজিদে একসঙ্গে ২৩ জন। 

পুলিশ প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে, ওই জমায়েত নিছক কোনো বন্ধুত্বপূর্ণ ‘মিটআপ’ নয়। এর আড়ালের তৎপরতা ছিলো আসলে উগ্রবাদী মতাদর্শ ছড়ানো।

গ্রুপের নেতৃত্বে থাকা শিহাব উদ্দিন ও সাব্বির আহমেদের বিরুদ্ধে আগের মামলার তথ্যও সামনে এসেছে। 

কিন্তু এখানেই প্রশ্ন—‘মিটআপ’ গ্রুপের আড়ালেই কি অনলাইনে তৈরি হচ্ছে নতুন কোনো উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক? 

তারা কি আগে থেকেই নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, নাকি নিজেদের মতো করে নতুন কাঠামো গড়ে তুলছিলো? 

রিমান্ড আবেদনে বলা হয়েছে, মিটআপ গ্রুপের সদস্যরা ধর্মীয় উগ্রবাদ ছড়ানোর কথোপকথন এবং উগ্রবাদী সংগঠনের সাথে জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

তবে কোন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে তারা যুক্ত, এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

তাহলে তেজগাঁও কলেজের মসজিদে সেই জমায়েতের আসল উদ্দেশ্য কী ছিলো? ‘মিটআপ’ নামের গ্রুপের আড়ালে আসলে কী চলছিলো? 

‘মিটআপ’ গ্রুপ সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে 

অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচার ও আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে দেশে নাশকতার পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, আনসার আল ইসলাম, ইমাম মাহমুদ কাফেলা, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া, হিযবুত তাহরীর ও নব্য জেএমবির মতো উগ্র সংগঠনগুলো।

এবার এই আলোচনায় যুক্ত হয়েছে ‘মিটআপ’ গ্রুপ। এনক্রিপ্টেড অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল ও টেলিগ্রামে চলে ‘মিটআপ’ গ্রুপের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড। ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামে চলে প্রচারণা।

শুক্রবার বিকালে তেজগাঁও কলেজ মসজিদের দ্বিতীয়তলা থেকে ২৩ জনকে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। 

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহজনক জঙ্গি হিসাবে আটকের পর প্রথমে তাদের নেওয়া হয় তেজগাঁও থানায়। পরে সন্ধ্যায় নেওয়া হয় মিন্টো রোডের সিটিটিসি কার্যালয়ে।

ঘটনার পরপরই ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, তাদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। আটক ব্যক্তিরা কোন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিস্তারিত পরে জানানো হবে।

সিটিটিসি প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার শামসুল হক বলেন, “আমরা যাচাই-বাছাই করছি। যাচাই-বাছাই শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।”

এর আগে পুলিশের এক ওয়্যারলেস বার্তায় বলা হয়, জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহে শিহাব উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে ২৫ থেকে ৩০ জনের একটি দল মসজিদের দ্বিতীয়তলায় ‘মিটআপ’ করছিলো।

গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে বিশেষ অভিযান চালানো হয় বলে সিটিটিসি থেকে বলা হচ্ছে। 

‘মিটআপ’ গ্রুপের সদস্যরা কি আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত কোনো জঙ্গি সংগঠনের সাথে যুক্ত, নাকি নতুন সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কর্মকাণ্ড শুরু করেছে তারা?

তাদের নেপথ্যে কারা আছে, তারা কি বৈশ্বিক জঙ্গি তৎপরতার অংশ- সেসব বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলেননি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

তবে এটা বলা হচ্ছে, “তাদের মোবাইল ডিভাইসে জঙ্গি কার্যক্রমের আলামত পাওয়া গেছে।”

মিটআপ’কে ঘিরে এখনো অনেক প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

শীর্ষ দুই নেতা 

তেজগাঁও থানায় নেওয়ার সময় শিহাব নামের একজন প্রিজনভ্যান থেকে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে আমরা একত্রিত হয়েছিলাম মসজিদে।”

পুলিশ বলছে, শুক্রবার জঙ্গি সন্দেহে আটক হওয়া ২৩ জনের দলনেতা ছিলেন শিহাব উদ্দিন ও সাব্বির আহমেদ।

আটক ১২ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং ১১ জন মুচলেকা দিয়ে পরিবারের জিম্মায় মুক্ত হয়েছেন।

শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, উগ্রবাদের সঙ্গে 

জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার দেখানো ১২ জনের বিরুদ্ধে ৫৪ ধারায় মামলা হয়েছে। 

দলনেতা শিহাব উদ্দিন ও সাব্বির আহমেদের বিরুদ্ধে আগেই মামলা আছে। শিহাব রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলার আসামি। আর ডাকাতি মামলার আসামি সাব্বির।

শিহাবের বিরুদ্ধে নরসিংদীর পলাশ থানায় মামলা হয় ২০১৯ সালের ১৬ই মার্চ। আর ২০২৩ সালের ২৭এ এপ্রিল ঢাকার তেজগাঁও থানায় মামলা হয় সাব্বিরের বিরুদ্ধে। 

শিহাবের বাড়ি গাজীপুরের কাপাসিয়ায় এবং সাব্বিরের বাড়ি ঢাকার শেরেবাংলা থানার ইন্দিরা রোডে।

আরো যাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, তারা হলেন- ঢাকার তেজগাঁও থানার পূর্ব রাজাবাজারের বাসিন্দা মারজুক হোসেন, রাজাবাজারের সাজ্জাদ হোসেন, হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানার কালিকাপাড়ার বাসিন্দা সাইফুর রহমান খান, লাখাই থানার বেগুনাই গ্রামের বাসিন্দা রাস্মি মিয়া, রাজবাড়ী জেলার কালুখালী থানার জামালপুর গ্রামের কামিছুল ইসলাম, ভোলা সদরের জামিরালতা গ্রামের আফিফ আহমেদ, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর থানার ভরাডুল গ্রামের মোহাইমিনুল হক, কক্সবাজার সদরের কলাতলী এলাকার জাওজি চৌধুরী, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থানার শাহারপাড় এলাকার শাহাদাত হোসেন ও গাজীপুরের কাপাসিয়া থানার শালদই এলাকার জুনায়েদ আহমেদ।

রিমান্ড আবেদনে যা বলা হয়েছে

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গ্রেপ্তার ১২ জনকে ৩ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর হক দিদার।

তিনি বলেন, কেন তারা মসজিদে একত্রিত হয়েছিলেন তা জানতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চাওয়া হয় ৭ দিনের। আদালত ৩ দিন মঞ্জুর করেছেন। 

তাদের মোবাইল ডিভাইসে জঙ্গি কার্যক্রমের আলামত পাওয়া গেছে বলেও জানিয়েছেন আজিজুর হক দিদার।

রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন সিটিটিসির পরিদর্শক আখতার মোর্শেদ। 

আবেদনে বলা হয়, মিটআপ গ্রুপের সদস্যরা ধর্মীয় উগ্রবাদ ছড়ানোর কথোপকথন এবং উগ্রবাদী সংগঠনের সাথে জড়িত বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। মামলার এক নম্বর আসামি শিহাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে উগ্রবাদে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে। ‘মিটআপ’ গ্রুপের অ্যাডমিন তিনি। তার বিরুদ্ধে আগেও মামলা আছে। 

তবে মিটআপ’কে ঘিরে এখনো অনেক প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছে পুলিশ। আটক ব্যক্তিরা আসলে কী উদ্দেশ্যে সংগঠিত হয়েছিলেন, তাদের অনলাইন যোগাযোগ কতটা বিস্তৃত, এবং কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগসূত্র আছে কি না– এসবের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। 

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গড়ে ওঠা ছোট ছোট নেটওয়ার্ক কীভাবে বাস্তব জগতে মানুষকে সংগঠিত করতে পারে, তেজগাঁওয়ের ঘটনাটি আবারও সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে।