আবদুল ওয়াদুদ অবসরে গিয়ে জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে বাড়ি তৈরি করলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন বাড়িটি মৃত্যুর আগেই সন্তানদের নামে লিখে দেবেন। কিন্তু জুড়ে দিবেন শর্ত। বলা হবে, যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন বাড়িটিতে তিনি থাকবেন। এতদিন এমন সুযোগ আইনে না থাকলেও সংসদে পাস হওয়া নতুন সংশোধনী সেই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে আবদুল ওয়াদুদের মতো অসংখ্য বাবা-মায়ের।
রবিবার ১৮৮২ সালের ‘দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি’ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল সংসদে পাস হয়। বিলে নতুন সংশোধনীতে ‘১২২এ’ ও ‘১২২বি’ ধারা যুক্ত হয়। এর মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর বা দান করার পরও আজীবন ভোগ করার অধিকারও পাওয়া যাবে।
যদিও নতুন সংশোধনীকে ‘কোরআন-সুন্নাহবিরোধী’ অভিযোগ এনে সংসদে বিলটি পাসের বিরোধিতা করেছে বিরোধী দল। তাদের আপত্তির পরও বিলটি সংসদে পাস হয়।
আইনের উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই বলে সংসদে জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। কিন্তু তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “আমরা কি কোরআনের মূলনীতি রাখবো, নাকি বাদ দেবো?”
ইসলামি আইনের সঙ্গে কতটা সাংঘর্ষিক
আগের আইনে কাউকে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তর করতে হতো নিঃশর্তভাবে। বর্তমান সংশোধনীর ফলে বাবা-মা চাইলে নিজের মৃত্যু পর্যন্ত ভোগ দখলের শর্ত যুক্ত করতে পারবেন।
আইনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিতি সানজানা আলাপ-কে বলেন, “আগে হেবাতে কোনো শর্ত রাখা যেতো না। আইন অনুযায়ী হস্তান্তর করে দিতে হতো। ফলে পিতা বা মাতার নিরাপত্তাহীন হয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিলো। নতুন সংশোধনীর কারণে সেই ঝুঁকি কমে আসবে। কারণ এখন ভোগ দখল তারা আজীবন রাখতে পারবেন।”
মিতি সানজানা মনে করেন আগের আইনে আরেকটা বড় সমস্যা ছিলো একবার সম্পত্তি দান করলে সেটা আর বাতিল করা যেতো না। এখন সেই সুযোগও থাকছে। আর তাই তিনি এই আইনকে যুগান্তকারী পরিবর্তন হিসাবেও দেখছেন।
জামায়াতের আমির এবং সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান যুক্ত হওয়া ধারাকে ইসলামি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান আলাপ-কে বলেন, এই আইন কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক নয়।
“এখানে দুইটা আইন প্রযোজ্য আছে। মুসলিম আইনও আছে, ট্রান্সফার আইনও আছে। এখন রাস্তা দুটা। আপনার যেটা ভালো লাগে, সেটা বেছে নেবেন। কেউ যদি মনে করেন তিনি লাইফ ইন্টারেস্ট আমলে নেবেন না। একেবারেই দান করবেন, সেটা তার ইচ্ছা।”
ইশরাত হাসান এও জানান, “এই চমৎকার আইনের সঙ্গে ধর্মকে মেলানো আইনজীবী হিসাবে যৌক্তিক মনে করি না।”
আইনের দিক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মিতি সানজানা বলেন, “অনেক বাবা-মা সম্পত্তি সমানভাবে ভাগ করতে চান। তখন মেয়েকে দান করতে হয়। পরে দেখা গেলো মেয়ে তার বাবা-মার দায়িত্ব নিলো না। তখনও তো বাবা-মা অসহায় হয়ে পড়েন। কিন্তু এখন ভোগ দখল করতে পারবেন আবার ঝামেলা হলে বাতিল বা পরিবর্তনও করতে পারবেন।”
মিতি সানজানা মনে করেন ইসলাম বাবা-মাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছে। এই আইন হয়েছে বাবা-মা’র কল্যাণের জন্য।
“বাবা-মা’র কল্যাণে যদি ভোগ দখলের অধিকার দেওয়ার হয়। আমি মনে করি না এখানে ইসলামিক আইন কোনো বাধা তৈরি করবে”, আলাপ-কে বলেন সানজানা।
যদিও সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী কাজী জাহিদ ইকবাল এই সংশোধনীকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে দেখছেন।
তিনি মনে করেন সংশোধনীর আগেও অনেক বাবা-মা নিজেদের সম্পত্তি সন্তানকে লিখে দিলেও নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। কিংবা ছেলেমেয়েরা চাইলে সেটা বাবা-মায়ের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতো।
তিনিও ইসলামি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু দেখতে পাচ্ছেন না বলেও আলাপ-কে জানান। তবে এও বলেন, “যদি বিরোধী দল মনে করে এখানে কোনো অস্পষ্টতা কিংবা সাংঘর্ষিক কিছু আছে, তাহলে তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেও বিষয়টা ঠিক করতে পারেন।”
এদিকে এই বিলটি তৈরির জন্য আইনমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা সোমবার এক ফেসবুক পোস্টে বলেন, “সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী দেশের কোটি বৃদ্ধ বাবা-মাকে স্বস্তি দিবে। আমরা এমন বহু পরিবারের ঘটনা জানি যেখানে বাবার থেকে সম্পদ নিয়ে সেই বৃদ্ধ বাবা মাকেই বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়।”
ইসলামি আইন অনুযায়ী ‘হেবা’ বিষয়ে ব্যারিস্টার রুমিন উল্লেখ করেন, এই আইনের ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, এই ধারায় দান বা গিফট কোনোভাবেই হেবা’র বিধানকে সংকুচিত করবে না।
এই সংশোধনকে সরাসরি ‘শরিয়াবিরোধী’ বলা যেমন সরলীকরণ হবে, তেমনি এর সঙ্গে শরিয়ার কোনো প্রশ্ন নেই- এমন কথা বলা ঠিক হবে না বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. বাহাউদ্দিন আল ইমরান।
“ইসলামি আইনে মিরাস, হেবা ও ওসিয়ত পৃথক বিষয়। জীবিত অবস্থায় কাউকে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়া আর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ হওয়া—দুটি আলাদা বিষয়। জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি দিয়ে দিলে সেটি আর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ হয় না। তবে সম্পত্তি দেওয়ার সময় মালিকানা ও ভোগের অধিকার কার কাছে থাকবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।”
আর তাই সংশোধিত ধারাগুলো প্রচলিত হেবা-নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সে বিষয়ে আলেম ও ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের সুস্পষ্ট মতামত প্রয়োজন বলে মনে করেন মো. বাহাউদ্দিন আল ইমরান।
আইন নিয়ে যা আলোচনা হয়েছে সংসদে
সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে ওঠা বিলটিকে গুরুত্বপূর্ণ ও মানবিক প্রস্তাব বললেও দাবি করেন সংশোধনীর কারণে সমাজে বিভ্রান্তি এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।
রবিবার সংসদে নিজের বক্তব্যে বলেন, “সুরা নিসার ১১, ১২, ১৩, ১৪ চারটি আয়াত এক্ষেত্রে প্রযোজ্য। প্রথম দুটি আয়াতে মূলনীতি বলা হয়েছে, যে মিরাস (ইসলামি উত্তরাধিকার ব্যবস্থা) কীভাবে আবর্তিত হবে। আর দুইটি আয়াত হচ্ছে তার পরিণতির ব্যাপারে। ভালো এবং খারাপ দুটো। এখানে স্পষ্টত একটা কনট্রাডিকশন আছে শরীয়তের সাথে।”
বিরোধীদলীয় নেতা জানান ইসলামি আইন অনুযায়ী যার নামে উইল হবে, তিনি তখন থেকেই পূর্ণ মালিকানা ভোগ করবেন। যদি এই মালিকানা ভোগ না করা হয়, তাহলে উইল কার্যকর থাকবে না।
এ বিষয়ে তিনি একটি হাদিসের প্রসঙ্গ এনে বলেন, “হজরত আয়েশা (রা.) এর একটি হাদিস আছে। তার বাবা তাকে ২০ ওয়াসক খেজুরের একটা উইল করেছিলেন। কিন্তু তিনি কোনোদিন এটা ভোগ করেন নাই। পরে বাবা বলে দিলেন, যেহেতু তুমি ভোগ করো নাই। সেহেতু এটা আর কার্যকরি না। তার মানে হচ্ছে যাকে দেওয়া হবে, সে এটার মালিক হবে, সে এটা ভোগ করবে।”
তিনি বক্তব্যে আরও উল্লেখ করে বলেন, কেউ যদি বলেন যে মারা যাওয়ার পর ভোগ করবেন, তাহলে সেটা হেবা বা উইল হবে না। সেটা হবে ওসিয়ত।
বিরোধী দলীয় নেতা আশংকা করেন যে এই বিলের ফলে হকদারের হক বিনষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি দাবি করেন শরিয়াহ আইন বিষয়ে যারা বিশেষজ্ঞ তাদের কাছে যেন বিলটি পাঠিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরিক্ষা করা হয়।
এছাড়াও আইনটি কোরআন-সুন্নাহবিরোধী উল্লেখ করে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, “নির্বাচনের আগে বিএনপি বলেছিল, তারা কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করবে না।”
তিনি বলেন, “পিতা-মাতা সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর অনেক সময় পিতা-মাতাকে বের করে দেওয়া হয়। এটা বাস্তবতা ও দুঃখজনক ঘটনা। কিন্তু এই সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ইসলামি বিধানকে পাস কাটানোর সুযোগ নেই।”
আইনমন্ত্রী আরও জানান এই আইন সব বাংলাদেশিদের জন্য করা হচ্ছে। ইসলামিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না দাবি করে তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি হেবার জন্য যে আইন আছে সেটা ঠিক থাকছে। সেটা এ আইনের মধ্যে ১২২এ সাব সেকশন ফোরে স্পষ্টভাবে আমরা বলে দিয়েছি।”
বিল নিয়ে বিতর্কের একপর্যায়ে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই তারা আবার ফিরে এসে বিতর্কে অংশ নেন। পরে কণ্ঠভোটে বিরোধী দলের প্রস্তাবগুলো নাকচ হয় এবং বিলটি পাস হয়।
সংশোধনীতে যা আছে
নতুন ১২২এ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তার সম্পত্তি ‘দান’ বা ‘গিফট’ করার পর যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন সম্পত্তি ভোগ বা ব্যবহার করতে পারবেন। এটিকে আইনের ভাষায় ‘জীবনকালীন ভোগদখলের অধিকার’ বলা হচ্ছে।
অর্থাৎ বাবা তার বাড়ি ছেলেকে দান করলেন, কিন্তু দলিলে লিখে রাখলেন যে বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত বাড়িটি তিনি নিজেই ব্যবহার করবেন। ১২২এ ধারা অনুযায়ী এ ধরনের শর্তসাপেক্ষে দানকে বা গিফটকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে এই ধরনের দান যে কাউকে করা যাবে না। শুধুমাত্র রক্তের সম্পর্কের ভেতর বৈধতা দেওয়া হয়েছে। বাবা-মা তাদের সন্তান বা নাতি-নাতনিকে, সন্তান বা নাতি-নাতনি বাবা-মাকে, অথবা স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে এ ধরনের দান করতে পারবেন।
নতুন ধারায় এও উল্লেখ আছে, যাকে দান করা হলো তিনি যদি বেঁচে থাকতেই মারা যান, তাহলে কী হবে।
১২২এ সংশোধনী ধারা বলছে, সেক্ষেত্রে সম্পত্তি দানগ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে। তবে দাতার নিজের জীবনকালীন ভোগের অধিকার বহাল থাকবে।
অর্থাৎ বাবা যদি তার বাড়ি ছেলের নামে লিখেন দেন। কিন্তু বাবার আগেই যদি ছেলে মারা যান। তখন বাড়িটি ছেলের আইনগত উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে। কিন্তু বাবা যতদিন জীবিত থাকবেন, তার ভোগের অধিকার থাকবে।
দ্বিতীয় সংশোধনী ১২২বি ধারা বলছে, ১২২এ-এর অধীনে নিবন্ধনের পর করা দান বাতিল করা যাবে না।
তবে যে দান করলেন এবং যে গ্রহণ করলেন, তাদের দুজনের সম্মতিতে বাতিল করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য কোনো প্রকৃত প্রয়োজনের কথা আইনে বলা হয়েছে।
আবার কোনো পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অক্ষম বা আইনগতভাবে অক্ষম হলে অন্য পক্ষ জেলা জজের কাছে আবেদন করতে পারবেন। আদালত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নোটিশ দিয়ে এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।