নির্বাচনে প্রার্থীদের হাতে বৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি

দরজায় কড়া নাড়ছে নির্বাচন। ১১ই ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়। নির্বাচনের তারিখ ১২ই ফেব্রুয়ারি ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই দলগুলো প্রস্তুতিতে নেমেছে। এরই মধ্যে প্রার্থীদের নিরাপত্তা দিতে যোগ হয়েছে নতুন এক নীতিমালা।

আগে নির্বাচনের আগে যাদের বৈধ অস্ত্র আছে সেগুলো জমা দিতে হতো, এখন সেখানে তাদের অস্ত্র ফেরত দেয়া হচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা পাচ্ছেন সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষী। তবে অস্ত্রসহ প্রার্থীদের এই বাড়তি নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে।

নির্বাচনের সময় আগ্নেয়াস্ত্র সঙ্গে থাকলে পরিস্থিতি ভীতিকর অবস্থায় দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যু এবং তারপর ঘটে যাওয়া সহিংসতাগুলো যেন আরও নাড়া দিচ্ছে জনমনে।

ভোটারদের মনে আতঙ্ক

একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত বিথী রহমান বলছেনন,  যখন কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটবে, তখন যার হাতে অস্ত্র আছে, সে সেটা বের করবে। 

“কোনো একটা গুলি আমার গায়েও এসে পড়তে পারে। তাই ভোট দিতে যাবো কি না, ভাবছি।

‘‘আমি আসলে নিরাপদ বোধ করছি না। কারণ আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? দেশের এই পরিস্থিতিতে আমি রাস্তাতেই নিরাপদ না, সেখানে ভোটকেন্দ্রে কি হতে পারে সেটা নিয়ে আমার মনে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।’’

স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ইসরাত ঊর্মি এবার নতুন ভোটার । তিনি বলেন, ‘‘প্রথমবার ভোট দেওয়ার অনুভূতিটা অন্য রকম ছিল।

‘‘তবে যখন জানলাম অনেক প্রার্থীদের হাতেই অস্ত্র থাকবে, তখন খুব ভয় কাজ করছে। আসলে প্রথমবার তো। তবে আমি যাবো কারণ এই আনন্দটাও হারাতে চাচ্ছি না। কিন্তু মনে একটা ভয় থাকবে।’’

কী আছে নীতিমালায়?

১৫ই ডিসেম্বর জারি হওয়া এই নতুন নীতিমালার অধীনে, নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এবং প্রার্থীরা এখন থেকে সহজে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স এবং 'রিটেইনার' নিয়োগের অনুমোদন পাবেন।

‘আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ও রিটেইনার নিয়োগ নীতিমালা ২০২৫’ -এ বলা হয়েছে, 'রিটেইনার' হলেন সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা প্রার্থীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত ও অনুমোদিত সশস্ত্র ব্যাক্তি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কিছু প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র দেখা গেছে। কোথাও কোথাও এসব অস্ত্র প্রকাশ্যে বহনের অভিযোগও উঠেছে। এতে সাধারণ ভোটাররা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ কমে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।

কেন এই নীতিমালা

জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা এবং নির্বাচনকালীন সহিংসতা প্রতিরোধে এই নীতিমালা জারি করা হয়েছে, বলে প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।

ইনকিলাব মঞ্চ-এর  মুখপাত্র ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যাচেষ্টা ঘটনার পরই নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে নানা আশঙ্কা তৈরী হয়।

১১ই ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়; বলা হয় ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট।

তফসিল ঘোষণার পর সারাদেশ যখন ভোটের আমেজে, ঠিক তার পরদিনই টার্গেট করা হয় তরুণ রাজনীতিক ওসমান হাদিকে। ঢাকার পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে প্রকাশ্যে গুলি করা হয় হাদিকে, যিনি  ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচন করার জন্য ভোটের প্রচারণায় নেমেছিলেন ।

একটি বাইকের পেছনে বসা হামলাকারীর নিশানা ছিল নিখুঁত; গুলিটি হাদির মাথার এক পাশ দিয়ে ঢুকে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়।

এই ঘটনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা ও উৎকণ্ঠার জন্ম দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় - জীবন বাঁচাতে অস্ত্রোপচারের সময় খুলে ফেলতে হয় মাথার খুলি। পরে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারের ব্যবস্থাপনায় ১৫ই ডিসেম্বর তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুর পাঠানো হয়। সেদিনই  ‘আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ও রিটেইনার নিয়োগ নীতিমালা ২০২৫’ এর প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।

সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ১৮ই ডিসেম্বর  মারা যান ওসমান হাদি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হবে এবং আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। 

হাদির মৃত্যু ও নানা সহিংসতায় বাড়ছে আতঙ্ক

হাদির মৃত্যু ও নানা সহিংসতায় আতঙ্ক যেন আরও বেড়েছে। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকায় একদল হামলাকারী দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের কার্যালয়ে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। তার কিছুপরেই ছায়ানট ভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ আর তার পরদিন উদিচীর কার্যালয়ে।

২২এ ডিসেম্বর প্রকাশ্যে গুলি করা হয় নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি, এনসিপি’র খুলনা বিভাগীয় প্রধান মোতালেব শিকদারকে। এ সব ঘটনার মধ্যে প্রার্থীদের হাতে অস্ত্র নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

ছবি আলাপ

যা বলছেন পর্যবেক্ষকরা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল‍্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের বক্তব্যেও উঠে আসে একই আশঙ্কার কথা।

তিনি আলাপ-কে বলেন, ‘‘নির্বাচনের সময় তো সকল ধরনের অস্ত্র সেটা বৈধ হোক অবৈধ হোক, লাইসেন্সের অনুমোদন থাকুক, সকল ধরনের অস্ত্র সেটা পুলিশের বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিম্মায় নেওয়া হয়। যাতে কেউ কোন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কোন ঘটনা সৃষ্টিতে এই অস্ত্রগুলো ব্যবহার করতে না পারে।’’

‘‘এই অস্ত্র যখন কারো কাছে থাকবে প্রয়োজনে সেটা ব্যবহার করতে পারবে, সেটা যেভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বা আত্মরক্ষার জন্য, সেটা কারণ ওপেন ফায়ার করুক অথবা যে আক্রমণ করে বার করুক এই জায়গাটাতে যারা ভোটার বা জনগণ আছেন, তাদের মধ্যে তো একটা আতঙ্ক ছড়াবে।’’

একই ধরনের বক্তব্য উঠে আসে ব্র্যাকের প্যানেল সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসুচি বিভাগের অ্যাডভোকেট মোঃ এনামুল করিম শাহীনের কথায়। তিনি আলাপকে বলেন, ‘‘প্রার্থীর নিরাপত্তা নিয়ে সর্বপ্রথম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে ১৯৮৫ সালের ১৬ই ও ২০এ মে বাংলাদেশের প্রথম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন।’’

‘‘সেই নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো অংশগ্রহণ না করে নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে ভোটারদের নিরাপত্তা বিবেচনায় ভোট কেন্দ্রগুোলতে সার্বক্ষনিক সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকলেও কোন প্রার্থীকে গানম্যান বা রিটেইনার দেওয়া হয়নি।

‘‘এবারে ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনা বিষয়টিকে ভীতিকর দিকে নিয়ে গিয়েছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণ হবে, তা নির্ভর করে সরকারের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও সঠিক কার্যকর সিদ্ধান্তের উপর।’’

‘‘প্রার্থীদের লাইসেন্সকৃত অস্ত্র সঙ্গে রাখার অনুমতি প্রদান সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রের অপব্যবহার হওয়াটাই স্বাভাবিক। যা উৎসবমুখর নির্বাচনের পরিবেশকে ভীতিকর ও বাধাগ্রস্ত করতে ভুমিকা রাখবে।’’

 যা বললেন প্রধান উপদেষ্টার মুখপাত্র

এদিকে প্রার্থীরা চাইলেই সবাইকে অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া সম্ভব না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

তিনি আলাপ-কে বলেন, ‘‘কেউ কেউ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সিকিউরিটি ওয়াইজ সিকিউরিটি এজেন্সিগুলো ভালো ব্যাখ্যা দিতে পারবে। এবার যদি কেউ মনে করেন যে আমি, গান লাইসেন্স দিলে আমি নিরাপদ থাকবো, সেটা অবশ্যই আমাদের ভেবে দেওয়া উচিৎ।’’

‘‘কারণ আমরা তো সবাইকে গান লাইসেন্স দিতে পারবো না। সবাইকে তো গানম্যান দিতে পারবো না, প্রটেকশন দিতে পারবো না।’’

যা বলছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

নির্বাচনে প্রার্থীদের ঝুঁকি কিভাবে নির্ধারণ করা হবে জানতে চাইলে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের উপসচিব আবেদা আফসারী আলাপকে বলেন, ‘‘কেউ যদি মনে করেন, তিনি ঝুঁকিতে আছেন, তাকে আবেদন করতে হবে। তবে আমরা সবাইকে রিটেইনার দিচ্ছি না। খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা তাদের আবেদনের ওপর ভিত্তি করে এবং ঝুঁকি বিবেচনা করেই দেয়া হচ্ছে। সেটাও সরকার বিবেচনা করে তারপর দেবে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘শুধুমাত্র সত্যিকার অর্থে নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলে রিটেইনার নিয়োগ অনুমোদনযোগ্য হবে। রাজনৈতিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে কিংবা ভয়ভীতি দেখানোর উদ্দেশ্যে রিটেইনার নিয়োগ করা যাবে না।’’

একজন রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা পদপ্রার্থীর জন্য সর্বোচ্চ একজন রিটেইনার নিয়োগ করতে পারবেন। রিটেইনার নিয়োগের পর তার মেয়াদ ১৫ দিন। নির্দিষ্ট মেয়াদের পর রিটেইনারের মেয়াদও শেষ হবে।