৬৩ জেলায় ৩০ মিনিটে ৫০০+ বোমা ফাটানো এক বোমারু নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছিল যেভাবে

একের পর একের বিস্ফোরণে কেঁপে উঠলো ৬৩টি জেলা। বাকি থাকে শুধু মুন্সীগঞ্জ।  বিস্ফোরণগুলো প্রাণঘাতী নয়। কারণ তেষট্টিটি জেলায় একযোগে শত শত বোমা হামলা চালানোর পরও মারা গিয়েছেন মোটে দুই জন। আহত আরো শতাধিক। সম্ভবত অস্তিত্ব ও সক্ষমতার জানান দিতে এবং দেশব্যাপী বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি করাই ছিলো হামলার মূল উদ্দশ্যে।

১৭ই অগাস্ট, ২০০৫ সাল - বুধবার - বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টা। একুশ বছর আগের এই তারিখটি মনে রাখুন - এদিন সূর্য মধ্যগগনে উঠতে না উঠতে বাংলাদেশের ধর্মীয় সহনশীলতার মানচিত্রে ঘটে গিয়েিছিল বিরাট বদল।

সেদিন বোমা হামলা চালানো হয় সুপ্রিম কোর্ট, জেলা আদালত, বিমানবন্দর, মার্কিন দূতাবাস, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের কার্যালয়ে, প্রেস ক্লাবে, সরকারি-আধা সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে কিংবা এসব স্থাপনার কাছাকাছি। 

আল-কায়েদার মতোই ভীতি জাগানিয়া এক সংগঠন

বোমা বিস্ফোরণ স্থানের পাশে ফেলে রাখা ছিল লিফলেট। তাতে উল্লেখ করা একটি সংগঠনের নাম - জেএমবি, যার পূর্ণরূপ জামাআ’তুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ।

হামলার পরপরই দায় স্বীকার করে জেএমবি।

জেএমবি প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণার উৎস সৌদি আরব ও মিসরের মুসলিম ব্রাদার হুড। সামরিক প্রশিক্ষণ হয় পাকিস্তানে। লস্কর-ই-তৈয়বার আদলে গড়ে ওঠে জেএমবি। 

১৭ই অগাস্টের আগে ও পরে সারা দেশে আরো ২৬টি ‘অপারেশন’ চালিয়ে ৭৩ জনকে হত্যা করে জেএমবি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চালানো ওইসব হামলায় আহত হন ৮০০ জনেরও বেশি মানুষ। 

বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার ঘটনা সেটিই প্রথম ছিলো না, কিন্তু ২০০৫ সালের ১৭ই অগাস্টের ঘটনা ছিলো নজিরবিহীন এবং এর তাৎপর্য ছিলো সুদূরপ্রসারী। 

মাত্র আধা ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে ৫৫৯টি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিষিদ্ধ সংগঠন জামাআ’তুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) কেবল আতঙ্কই ছড়ায়নি, বরং বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে একটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও উগ্রবাদ-কবলিত রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করেছিলো।

দেশজুড়ে একযোগে হামলা চালানোর সেই ঘটনা এখনো দৃষ্টান্ত হয়ে আছে

সৌদি আরবের মতাদর্শিক প্রভাব, পাকিস্তানের প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় উগ্রবাদের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই 'বোমারু নেটওয়ার্ক' তখন বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।

সেই ঘটনার পর সারাবিশ্বের মিডিয়ায় বাংলাদেশ চিত্রিত হয়েছিলো ভিন্নভাবে। একযোগে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

নজিরবিহীন ওই ঘটনার পর বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি অত্যন্ত নেতিবাচক এবং উদ্বেগজনক বার্তা গিয়েছিল, যার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের ভাবমূর্তির সংকটে পড়ে বাংলাদেশ। 

ওই ঘটনা আরো একটি নজির সৃষ্টি করে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের কোনো দেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন এভাবে সারা দেশজুড়ে একযোগে হামলা চালানোর সেই ঘটনা এখনো দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। 

জেএমবি'র প্রতিষ্ঠাতা কে এই শায়খ রহমান

২০০৬ সালের ২রা মার্চ গ্রেপ্তার হওয়ার পর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমান। 

তিনি জানান, জামালপুরের কামাল খান হাট সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে ১৯৭৮ সালে ফাজিল পাসের পর রাজশাহীর সুলতানগঞ্জ ইসলামিয়া মাদ্রাসায় কামিল পড়েন।

১৯৮০ সালে বৃত্তি নিয়ে চলে যান সৌদি আরবের মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ইসলামের মূলনীতি ও ধর্ম প্রচার নিয়ে পড়াশোনা করে দেশে ফেরেন ১৯৮৫ সালে।

জবানবন্দিতে শায়খ রহমান জানান, সৌদি আরবেই তার সঙ্গে যোগাযোগ হয় মিশরভিত্তিক মুসলিম ব্রাদারহুডের। বাংলাদেশে ‘ইসলামি হুকুমত’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে জিহাদকে বেছে নেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন তিনি।

কিন্তু দেশে ফিরে জামায়াতে ইসলামীর কার্যপদ্ধতির সঙ্গে তার নীতিগত পার্থক্য হয় বলে জানান রহমান। এমন প্রেক্ষাপটেই ‘ইসলামিক আইন’ কায়েমের জন্য জিহাদি সংগঠন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন তিনি। 

শায়খ রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালের এপ্রিল মাসে গঠিত হয় জেএমবি। প্রতিষ্ঠাতা তিনি নিজেই। শুরা সদস্য নির্বাচিত হন খালেদ সাইফুল্লাহ, হাফেজ মাহমুদ, সালাউদ্দিন, নাসরুল্লাহ, শাহেদ বিন হাফিজ ও রানা।

জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমান

ছয়টি প্রশাসনিক বিভাগে ভাগ করে শুরু হয় কার্যক্রম। প্রথমদিকে দাওয়াতের মাধ্যমে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। পরে দাওয়াতের পাশাপাশি লিফলেট বিতরণসহ চালানো হতে থাকে প্রচার-প্রচারণা। 

শুরুর দিকে সংগঠনটির কর্মকাণ্ড ছিলো দিনাজপুর, পঞ্চগড়, বগুড়া, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, টাঙ্গাইল, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা এবং বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলের মধ্যে। 

২০০৩, ২০০৪ ও ২০০৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলে মাওবাদী হিসাবে পরিচিত বামপন্থী গোপন সংগঠন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের হত্যা করে দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে আলোচিত হয় জেএমবি। 

ওই অঞ্চলের আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও বাসদ নেতাদেরও টার্গেট করে জেএমবি। 

লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতিপর্বে পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার নেতা আবদুল করিম টুন্ডার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন শায়খ রহমান। যাত্রাবাড়ির একটি মাদরাসায় বৈঠকও করেন তারা। 

টুন্ডা সেসময় মাদরাসা ছাত্রদের একটি মেসকে ব্যবহার করতেন অফিস হিসাবে। ১৯৯৭ সালের শেষের দিকে টুন্ডার সঙ্গে পাকিস্তান সফর করেন শায়খ রহমান। 

প্রথমে লাহোর, সেখান থেকে মুজাফফরাবাদ- একেবারে সরাসরি লস্কর-ই-তৈয়বার প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে। বিশ দিন ধরে অস্ত্র, বিস্ফোরক, রণকৌশল ও গোপনীয়তা রক্ষার কৌশলের ওপর প্রশিক্ষণ নেন শায়খ রহমান। এরপর তিনি ফিরে আসেন বাংলাদেশে। 

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, জেএমবি প্রতিষ্ঠার পর ২০০২ সালে আবারো পাকিস্তান সফর করেন রহমান। সেসময় লস্কর-ই-তৈয়বার ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুস সালাম ভাট্টিসহ অন্যান্য নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাদেরকে জেএমবির গঠনতন্ত্র, লক্ষ্য ও কর্মসূচি সংবলিত আরবিতে লেখা চার পৃষ্ঠার একটি লিখিত পুস্তিকা দেন শায়খ রহমান।

ওই পুস্তিকায় বাংলাদেশে কেন 'কিতাল' বা 'জিহাদ' প্রয়োজন, তাও উল্লেখ ছিলো। কারণগুলো হলো, 'বাংলাদেশে ইসলামি হুকুমত কায়েম নেই', 'ভারতের আগ্রাসী মনোভাব', 'বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভারতের তৎপরতা' এবং সারা দেশে বিভিন্ন 'পশ্চিমা মিশনারির ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড'।

শায়খ রহমানের তত্ত্বাবধানে বোমারু বাহিনী

শায়খ রহমানের নেতৃত্ব জেএমবিতে কীভাবে বোমারু বাহিনী গড়ে উঠেছিলো, তা পাওয়া যায় মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম ওরফে ‘বোমারু মিজান’ নামে এক জঙ্গির জবানবন্দিতে।

সেখানে তিনি বলেছেন, তার বেড়ে ওঠা জামালপুরের ধলীবন্ধ গ্রামের একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে। সংগঠনে মোহাম্মদ মুন্না ও কাওসার নামেও পরিচিত ছিলেন। বাড়ি ছেড়েছিলেন বড় ভাইয়ের সাথে রাগ করে। পরে আর ফেরা হয়নি।

ঢাকায় এসে পোশাক তৈরির কারখানায় চাকরি নেন, থাকতেন খিলগাঁওয়ের তালতলায় একটি মেসে। সেখানেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় বলে ওই জবানবন্দিতে উল্লেখ আছে। 

২০০০ সালে সুমন নামে এক ব্যক্তির উৎসাহে জেএমবিতে যোগ দেন বোমারু মিজান।

১৯৭৯ সালে জন্ম নেওয়া বোমারু মিজানের জীবনের গল্প সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। তার গুরু ছিলেন শাকিল আহমেদ ওরফে মোল্লা ওমর। বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন তার কাছ থেকেই। সে সময় তাদের সঙ্গী ছিলেন ‘হাতকাটা মাহফুজ’।

সংগঠনে আব্দুস সবুর খান, সোহেল মাহফুজ ও জয় নামেও পরিচিত এই হাতকাটা মাহফুজ। তাদের সমন্বয় করতেন শায়খ রহমান নিজেই। পাকিস্তানে পাওয়া বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ কাজে লাগান বোমারু বাহিনী গড়ে তুলতে। 

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, বোমারু মিজান, মোল্লা ওমর ও হাতকাটা মাহফুজের হাত ধরেই জেএমবি’র অসংখ্য কর্মী বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। ধ্বংসাত্মক আইইডি বা ‘ইম্প্রোভাইসড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস’ তৈরি করে ত্রাস সৃষ্টি করা এই ‘বোমারু মিজানরাই’ ছিলেন ২০০৫ সালের ১৭ই অগাস্ট দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার কুশীলব। ওই দিন ৬৩ জেলায় একযোগে ৫৫৯টি বোমা বিস্ফোরিত হয়।

২০০৯ সালের ১৫ই মে ঢাকার কাফরুলের তালতলা থেকে গ্রেপ্তার হন মিজান। এরপর তার দেওয়া জবানবন্দি থেকে ১৭ই অগাস্ট বোমা হামলার অনেক তথ্যই পাওয়া যায়। 

২০১৪ সালের ২৩এ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে হামলা চালিয়ে ও পুলিশ হত্যা করে বোমারু মিজানসহ জেএমবির তিন নেতাকে ছিনিয়ে নিয়েছিলো জঙ্গিরা। এরপর ভারতে পালিয়ে যান মিজান।

২০১৮ সালের ৬ই অগাস্ট ভারতের বেঙ্গালুরুর রামনগর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হন তিনি।

১৭ই অগাস্টের পরে যা ঘটে 

পুলিশ সদর দপ্তর ও র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পরপরই সারাদেশে ১৫৯টি মামলা দায়ের হয়।

এর মধ্যে ১৪২টি মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল হয়েছে। ১৭টি মামলায় ঘটনার সত্যতা থাকলেও আসামি শনাক্ত করা ছাড়াই চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে।

সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে ৯৬১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। আর বিভিন্ন সময়ে দেওয়া অভিযোগপত্রে আসামি করা হয় ১ হাজার ৭২ জনকে।  

১৫৯টি মামলার মধ্যে আছে চলমান ৪১টি। নিম্ন আদালতে বিচারিক কার্যক্রম শেষে প্রায় শতাধিক মামলায় ৩৫০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।

এরমধ্যে জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমানসহ ২৭ জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। যাদের মধ্যে আট জনের দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। 

এছাড়াও বিচারিক আদালত থেকে ৩৪৯ জনকে অব্যাহতি এবং ৩৫৮ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

আট জঙ্গির ফাঁসি

১৭ই অগাস্ট সিরিজ বোমা হামলার আসামি হলেও অন্য মামলায় আট জেএমবি জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। তারা হলেন জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমান, শায়খ রহমানের ভাই আতাউর রহমান সানি, জামাতা আবদুল আউয়াল, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই, ইফতেখার হোসেন মামুন, খালেদ সাইফুল্লাহ ফারুক, আসাদুল ইসলাম ওরফে আরিফ ও আসাদুজ্জামান চৌধুরী ওরফে পনির ওরফে আসাদ।

সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই

জেএমবি জঙ্গিদের আত্মঘাতী বোমা হামলায় ২০০৫ সালের ১৪ই নভেম্বর ঝালকাঠিতে দুই বিচারক নিহত হন। ওই মামলায় আদালত ২০০৬ সালের ২৯এ মে সাতজনকে ফাঁসির আদেশ দেন। 

সাতজনের মধ্যে ছয়জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ২০০৭ সালের ২৯এ মার্চ। এই জঙ্গিরা হলেন, জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, শায়খ রহমানের ভাই আতাউর রহমান সানি, জামাতা আবদুল আউয়াল, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই, ইফতেখার হোসেন মামুন ও খালেদ সাইফুল্লাহ ফারুক। 

আরেক আসামি আসাদুল ইসলাম ওরফে আরিফের ফাঁসি কার্যকর হয় ২০১৬ সালের ১৬ই অক্টোবর।

সবশেষ নেত্রকোনায় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় হতাহতের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি আসাদুজ্জামান চৌধুরী ওরফে পনির ওরফে আসাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয় ২০১৬ সালের ১৫ই জুলাই। 

২০০৫ সালের ৮ই ডিসেম্বর নেত্রকোণায় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় আট জন নিহত হন। ওই হামলার মূল কুশীলব ছিলেন আসাদ।

দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় শতাধিক মামলার রায় দিয়েছেন নিম্ন আদালত। এর মধ্যে কিছু মামলা হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগে শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। 

চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর জামিনের হিড়িক

কারা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা আলাপ-কে জানান, ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট পরবর্তী সময়ে ১৭ই অগাস্ট সিরিজ বোমা হামলা মামলায় অনেক আসামিই জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তবে কয়েকজন ফাঁসির আসামি রয়েছেন কারাগারে। 

আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহজাহান খান বলেন, “সিরিজ বোমা হামলার আসামিদের সবার জামিন হয়নি। যাদের সাজা কমানো হয়েছে তারা বের হয়ে গেছে। যাদের ফাঁসির দণ্ড হয়েছে তারা আপিল করেছে। বিষয়টি এখন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারাধীন আছে।”

জঙ্গিবাদ দমনে এরসঙ্গে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ড. মো. তৌহিদুল হক। 

আলাপ-কে তিনি বলেন, “আমরা দেখছি এইসব ঘটনা তদন্তে দীর্ঘ সময় লাগে এবং তদন্তের জায়গাটা নড়বড়ে হয়ে যায়। এটা কাম্য নয়। সেই সময় যাদের নাম এসেছে, যারা ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বৈশ্বিক বিষয়টিও এখানে মাথায় রাখতে হবে।”  

“যখন আমাদের দেশে মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, বড় ধরনের নাশকতা সংঘটিত হয়, অপরাধমূলক ঘটনাগুলো ঘটে- তখন আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সুবিধা মতো ওইসব ঘটনা ব্যবহার করে,” মন্তব্য করেন তিনি। 

২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ছিলো জেএমবি'র উত্থানের সময়। এরপর শীর্ষ নেতৃত্বের গ্রেপ্তার হওয়া, মতবিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে সংগঠনটি।

জেএমবি সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যোগ দেয় আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক ইসলামিক স্টেট (আইএস) বা নব্য জেএমবিতে। অনেকেই আবার আল-কায়েদার বাংলাদেশ শাখা আনসার আল ইসলামেও যুক্ত হয়েছেন বলে জানাচ্ছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।