দেশজুড়ে পুলিশের নিরাপত্তা সতর্কতার নেপথ্যে কী কারণ

শনিবার রাতে দেশজুড়ে সতর্কতা জারির পর চেকপোস্ট, টহল ও নজরদারি বাড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকাসহ সারাদেশের প্রায় ৮শ’ কেপিআই (কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন) প্রতিষ্ঠানের সামনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ঢাকার গুলশান, বনানী, বারিধারা, শাহবাগ, ইসিবি চত্বরসহ ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ৪৮টি পয়েন্টে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। রবিবার সকাল থেকেই সন্দেহজনক প্রাইভেট কার, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ১৫ই অগাস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠন কর্মসূচী পালন করতে পারে- এমন গোয়েন্দা তথ্য আছে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জমায়েতসহ ঢাকা ও ঢাকার বাইরে জমায়েতের পরিকল্পনাও আছে তাদের। এছাড়া মতিঝিল, মিরপুর-১০ ও ফার্মগেইট এবং সাভারের আশুলিয়ায় বোমাতঙ্ক ও বোমা উদ্ধারের ঘটনাও আছে। এ নিয়ে উদ্বেগ উৎকন্ঠা রয়েছে। এছাড়া উগ্রপন্থীদের তৎপরতা, পতাকা উত্তোলনের ঘটনাও পুলিশ সদর দপ্তর আমলে নিয়েছে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই সতর্কতা জারি করা হয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন আলাপ-কে বলেন, “যে কোন উগ্রপন্থার বিষয়ে সতর্ক আছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।”  

দেশজুড়ে সতর্কতা জারি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটা বিশেষ কোন সতর্কতা না। নিয়মিত যেসব বার্তা দেয়া হয় তারই অংশ এই সতর্কতা।”

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম আলাপ-কে বলেন, “পুলিশের যানবাহনে হামলার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য নেই। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক বোমাতঙ্ক ও সন্দেহজনক বস্তু উদ্ধারের ঘটনার প্রেক্ষাপটে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই সতর্কতা আসলে রিমাইন্ডার।”  

বোমাতঙ্ক-বোমা উদ্ধারের চার ঘটনা

গত ২৪এ জুলাই ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে একটি ‘দূর-নিয়ন্ত্রিত আইইডি’ বা ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। 

পরে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা দ্রুত মতিঝিলে পৌঁছে ডিভাইসটি নিষ্ক্রিয় করায় বড় ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক পরিকল্পনা ভেস্তে যায় বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা সেসময় জানিয়েছিলেন।

আইইডি উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার বর্ণনা থেকে জানা গেছে, ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু হওয়া সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহ্যবাহী উল্টোরথযাত্রার মিছিলটি জাতীয় প্রেস ক্লাব ও মতিঝিল হয়ে স্বামীবাগের দিকে যাওয়ার কথা ছিলো। আর বিস্ফোরকটি রাখা হয়েছিলো সেই পথের সংবেদনশীল পয়েন্টেই।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সাভারের আশুলিয়ার খেজুর বাগান এলাকায় এক মুদি দোকানের সামনে বেঞ্চের ওপর পরিত্যক্ত ব্যাগ দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দারা। দীর্ঘসময় ব্যাগটি পড়ে থাকতে দেখে তাদের সন্দেহ হয়। পরে ব্যাগটি খুলে ভেতরে প্রেশার কুকার আকৃতির বোমাসদৃশ বস্তু দেখতে পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পুলিশে খবর দেয়া হয়। খবর পেয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ঘটনাস্থলে যায় এবং সেটি বিস্ফোরণের মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় করে।

ই চারটি ঘটনার সাথে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সম্প্রতি চালানো অভিযানে অস্ত্র, বিস্ফোরক, ককটেল, পেট্রোল বোমা উদ্ধারের ঘটনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। দেশজুড়ে সতর্কতা জারির নেপথ্যে এটি একটি বড় কারণ। 

সবশেষ শনিবার দুপুরে মিরপুর-১০ ও ফার্মগেইটে সন্দেহজনক বস্তু ঘিরে ছড়িয়ে পড়ে বোমাতঙ্ক। এদিন, নিরাপত্তার কারণে মিরপুর-১০ মেট্রো স্টেশনে প্রায় দেড় ঘণ্টা থামেনি কোনো ট্রেন। পরে অবশ্য কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের বোমা নিষ্ক্রিয় দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তল্লাশি চালিয়ে সেখানে কোনো বোমা খুঁজে পায়নি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তা জানান, প্রথম ও দ্বিতীয় ঘটনায় আতঙ্কের সাথে ছিলো বড় ধরণের ঝুঁকি। মিরপুর ও ফার্মগেইটের ঘটনায় ঝুঁকি ছিলো না, তবে আতঙ্ক ছিলো। এই চারটি ঘটনার সাথে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সম্প্রতি চালানো অভিযানে অস্ত্র, বিস্ফোরক, ককটেল, পেট্রোল বোমা উদ্ধারের ঘটনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। দেশজুড়ে সতর্কতা জারির নেপথ্যে এটি একটি বড় কারণ। 

রবিবার রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আশুলিয়া ও মতিঝিলে বোমা সদৃশ বস্তু উদ্ধার এবং নিষ্ক্রিয় করার বিষয়ে কথা বলেন। জানান, সিটিটিসি ও ডিএমপি'র বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল বোমা সদৃশ বস্তু নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করেছে। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। “তুলনামূলক বিচারে দেশে অপরাধ প্রবণতা বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের হার বর্তমানে অত্যন্ত কম। তারপরও সরকার সতর্ক অবস্থায় রয়েছে”- বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সতর্কবার্তায় যেসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছে

শনিবার রাতে পুলিশ সদর দপ্তর দেশজুড়ে সতর্কতা জারি করে। একইসঙ্গে পুলিশের সব ইউনিটকে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার নির্দেশও দেওয়া হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন্স নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে পাঠানো জরুরি বার্তায় বলা হয়, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, পুলিশের ব্যবহৃত জিপ, পিকআপ ও বাসসহ বিভিন্ন যানবাহন হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে দায়িত্বরত অবস্থায় কোনো যানবাহন সাময়িকভাবে থামানোর প্রয়োজন হলে সেটি অবশ্যই নিরাপদ স্থানে রেখে পুলিশের নজরদারিতে রাখতে হবে।  

বার্তায় বিষয়টি ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ উল্লেখ করে দেশের সব মহানগর, রেঞ্জ, জেলা ও ইউনিটের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।