সাত মাস বয়সি রাফা মনি তখনো ঠিকমতো বসতে শেখেনি। গত ১৫ই জুলাই সন্ধ্যায় উত্তরার সিরাজ মার্কেট এলাকায় স্ত্রীর সঙ্গে সংসার খরচ নিয়ে ঝগড়ার একপর্যায়ে মেয়েকে রাস্তায় আছড়ে মারেন বাবা কবির ইসলাম।
প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে, পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় রাফা মনিকে। কিন্তু দুই দিন পর মারা যায় শিশুটি।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে রিপোর্ট হওয়া এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম নয়। বরং একটি বড়সড় ও উদ্বেগজনক প্রবণতার সবশেষ সংযোজন মাত্র।
বাংলাদেশজুড়ে গত ছয় মাসে ঘটা শিশুহত্যার প্রতি তিনজন অপরাধীর একজনই ছিলেন বাবা-মা কিংবা নিকট আত্মীয়।
পরিসংখ্যান যা বলছে
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন 'শিশুরাই সব'-এর একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মোট ৮৬ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। সংখ্যাটা আগের পুরো বছরের তুলনায় যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে সারা বছরে মোট শিশু হত্যার সংখ্যা ছিল ১২৪ জন।
অর্থাৎ প্রতি মাসে শিশু হত্যার গড় বছরে ১১ থেকে বেড়ে হয়ে গেছে প্রায় ১৪ জন।
তবে আসল উদ্বেগের জায়গাটা হলো- এসব হত্যাকাণ্ড কোথায় এবং কার হাতে ঘটছে?
প্রতিবেদন বলা হচ্ছে, মোট শিশুহত্যার প্রায় ৫০ দশমিক ৫৯ শতাংশ ঘটেছে পারিবারিক পরিবেশে, নিজের বাড়ি অথবা আত্মীয়ের বাসায়। বাকি ৪১ দশমিক ১৮ শতাংশ ঘটেছে খোলা জায়গায়। যেমন- রাস্তা, মাঠ বা বাজারের আশপাশে।
পারিবারিক পরিসরে ঘটা প্রায় প্রতিটি ঘটনার পেছনেই মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কলহ বা দ্বন্দ্ব।
অপরাধীর পরিচয় দেখলে চিত্রটা আরও স্পষ্ট হয়। মোট হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৩৪ শতাংশের জন্য দায়ী বাবা-মা কিংবা নিকট আত্মীয়। এর মধ্যে ১৭ জন শিশু খুন হয়েছে খোদ নিজের বাবা-মায়ের হাতে। আর ১১ জন খুন হয়েছে চাচা, নানা-দাদা বা ভাইবোনের মতো নিকট আত্মীয়ের হাতে।
প্রতিবেশী বা পরিচিতজনের হাতে খুনের হার ২৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, মোট হত্যাকাণ্ডের অর্ধেকের বেশিতেই জড়িত ছিল শিশুটির পরিচিত কেউ।
কারণ হিসেবে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে রাগ বা পারিবারিক ঝগড়া। এই কারণে হত্যার হার প্রায় ২২ শতাংশ।
এখানে দাম্পত্য কলহ বা পারিবারিক উত্তেজনাই প্রধান হিসেবে উঠে এসেছে। এর বাইরে নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ শিশুর। পরকীয়া, আর্থিক টানাপোড়েন কিংবা 'শাসন' করতে গিয়ে বাড়াবাড়ির ঘটনাও উঠে এসেছে কারণ হিসেবে।
বাবা-মায়ের হাতে সন্তান খুন হওয়াটা একটি “ডিস্টার্বিং ট্রেন্ড” অভিহিত করে ‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেছেন, শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারা পৃথিবীতেই শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে তাদের পরিচিত মানুষজনের কারণে।
“শিশুরা আসলে বড়দের বিরোধের বলি হচ্ছে। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ একটা কারণ। এছাড়া প্যারেন্টসরা মেন্টালি ডিস্টার্বড থাকলেও এই ধরনের ঘটনা ঘটছে; তাদের মাদকাসক্তিও এর পেছনে ভূমিকা রাখে।”
“আর বিশেষ করে, কোভিড মহামারির পর ফাইনান্সিয়াল স্ট্রেসের কারণেও এরকমটা হচ্ছে, সেটাও অবশ্য মানসিক কারণ,” আলাপ-কে বলেন তিনি।
“বাংলাদেশে এই উদ্বেগজনক প্রবণতা তুলনামূলক নতুন” বলে মনে করেন লায়লা খন্দকার।
তিনি বলেন, “এর পেছনের কারণ নিয়ে সমাজ বিজ্ঞানী ও অপরাতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের গবেষণা করা দরকার।”
যৌন নির্যাতনেও একই চিত্র
শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, একই সময়ে যে ৩৩৬ জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, সেখানেও অপরাধী হিসেবে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক কিংবা অন্যান্য পরিচিতজনদের নাম।
অপরিচিত ব্যক্তির হাতে ঘটা ঘটনার সংখ্যা তুলনামূলক অনেক কম।
বিশ্বজুড়ে শিশু নির্যাতন নিয়ে গবেষণাগুলোতেও দীর্ঘদিন ধরে একই কথা উঠে এসেছে। অচেনা মানুষের চেয়ে পরিচিত মানুষই বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।
জবাবদিহিতা ও বিচার
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৮৬টি শিশু হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৪৪টি ঘটনায় আসামি গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বাকিগুলোর বেশিরভাগেরই তদন্ত চলছে।
তবে ১৪টি ঘটনায় কোনো ধরনের আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে গণমাধ্যমে কোনো তথ্যই পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে বিচার শেষ হওয়া দুটি আলোচিত মামলা দেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ৮ বছরের শিশু মনিরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামিকে জুলাই মাসে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার দায়ে প্রতিবেশী দম্পতিকে মাত্র ১৬ দিনের তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
একটি জাতীয় শিশু কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে প্রতিটি প্রশাসনিক পর্যায়ে শিশু সুরক্ষার জন্য নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ এবং স্কুল-মাদ্রাসাসহ যেসব প্রতিষ্ঠানে শিশুরা থাকে, সেখানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলেছে 'শিশুরাই সব'।
সংগঠনটি বলছে, অভিভাবকদেরও নিশ্চিত করতে হবে শিশুরা যেনো যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে, এমনকি আত্মীয়কেও, প্রয়োজনে 'না' বলতে পারে।
আর শিশুদের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে শোনার এবং পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষার দোহাই দিয়ে তা এড়িয়ে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ‘শিশুরাই সব’।