‘হালালা সেন্টার’ বিতর্ক: ধর্ম ব্যবহার করে ডিজিটাল প্রতারণা

ফেসবুকে ‘হালালা সেন্টার’ নামের কথিত উদ্যোগ ঘিরে সামনে এসেছে, ধর্মীীয় আবেগের অপব্যহার ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ভাইরাল এই ঘটনাটি একইসঙ্গে নৈতিক অবক্ষয় এবং ডিজিটাল প্রতারণার একটি উদ্বেগজনক উদাহরণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

হিল্লা বা হালালা বিয়ে নিয়ে সমাজে এমনিতেই বিভ্রান্তি আছে। সেই অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়েই একটি চক্র মানুষের ধর্মীয় আবেগ, ব্যক্তিগত দুর্বলতা এবং সামাজিক কৌতূহলকে পুঁজি করে প্রতারণার ফাঁদ তৈরি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

যেভাবে আলোচনায়

ঘটনার শুরু ‘সানজিদা আক্তার’ নামের একটি ফেইসবুক আইডিকে কেন্দ্র করে। ওই আইডি থেকে হিল্লা বিয়ের জন্য আগ্রহী পুরুষদের কাছ থেকে সিভি আহ্বান করা হয়।
বিজ্ঞাপনে বলা হয়, হাফেজ, আলেম, শিক্ষক, ইমাম, ব্যবসায়ী ও প্রবাসীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

এরপর ইমেইলে আবেদনকারীদের সিভি, ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্য পাঠাতে বলা হয়। তবে বিয়ের কোনো বাস্তব প্রক্রিয়া শুরু না করে কয়েক দিনের মধ্যে অন্তত ৮০ জন আবেদনকারীর সিভি, ইমেইল, ছবি ও ফোন নম্বরের স্ক্রিনশট প্রকাশ করে দেওয়া হয়।

এতে ভুক্তভোগীরা সামাজিকভাবে অপমান, ট্রল, বিব্রতকর ফোনকল এবং ডিজিটাল হয়রানির মুখে পড়েন।

বারবার বদলেছে আইডির নাম

গণমাধ্যমের তথ্য বলছে বারবার এই আইডির নাম বদলেছে। ‘সানজিদা আক্তার’ নামের আইডির একটি পোস্টে কমেন্ট করেছেন নায়িম হাসান নামে এক ব্যক্তি। সেখানে তিনি বলেছেন, আইডিটি ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর খোলা হয়। একই দিনে এর নাম পরিবর্তন করে ‘মুফতি জিয়া বিন কাসেম’ রাখা হয়।

পরে ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল নাম পরিবর্তন করে ‘স্বপ্নের ব্যাখ্যা– ড্রিম এক্সপ্ল্যানেশন’, একই বছরের ১০ অক্টোবর ‘মুহাদ্দিসা অপু’ এবং সর্বশেষ চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি পুনরায় ‘সানজিদা আক্তার’ নাম ব্যবহার করা হয়।

ফেসবুকে প্রতরাণার প্রতীকী ছবি। এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

আইডিতে ব্যবহৃত প্রোফাইল ছবিটি রিভার্স ইমেজ সার্চে দেখা যায়, সেটি একটি টিকটক অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া। একইভাবে কভার ফটোটি দোলা মল্লিক নামের আরেকটি টিকটক অ্যাকাউন্ট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ধর্মীয় আবেগই প্রতারণার পুঁজি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে, বাংলাদেশে ধর্মীয় আবেগ এখনো প্রতারণার সবচেয়ে সহজ টার্গেটগুলোর একটি। ধর্ম মানুষের বিশ্বাস, পরিচয় ও আবেগের জায়গা। অনেক সময় ধর্মের নামে কোনো দাবি সামনে এলে মানুষ সেটিকে যুক্তি, আইন বা নৈতিকতার আলোকে যাচাই না করেই বিশ্বাস করতে শুরু করে।

প্রতারক চক্রগুলো ঠিক এই জায়গাটিই ব্যবহার করে। তারা জানে, ধর্মীয় লেবেল দিলে অনেক মানুষ দ্রুত আস্থা রাখবে, প্রশ্ন কম করবে এবং ব্যক্তিগত তথ্য দিতেও দ্বিধা করবে না।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আবুসালেহ সেকেন্দার এই ঘটনাকে ধর্মের লেবাসে আধুনিক প্রতারণা হিসেবে দেখছেন।

তার মতে, হিল্লা বিয়ে নিয়ে ধর্মীয় বিতর্ক বা মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু এই ঘটনার মূল উদ্দেশ্য ধর্মীয় ব্যাখ্যা নয়, বরং প্রতারণা।

তিনি বলেন, “এখানে ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং পরে সেই তথ্য প্রকাশ করে সামাজিকভাবে অপদস্থ করা হয়েছে। এটি শুধু ধর্মীয় বিষয় নয়, আইন ও নৈতিকতারও বিষয়।”

নিউইয়র্কের টুরো ইউনিভার্সিটির এই টিচিং ফেলো আরও বলেন, বাংলাদেশ ধর্মীয় আইনে পরিচালিত রাষ্ট্র নয়। তাই ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি প্রতারণা করে, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে বা মানুষকে হয়রানির মধ্যে ফেলে, সেটি অবশ্যই প্রচলিত আইনের আওতায় আসা উচিত।

তার মতে, সরকারের উচিত এ ধরনের ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া, কারণ ধর্মের নামে প্রতারণা হলে সেটি শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষতি করে না, সমাজে ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

‘হালালা’ নিয়ে অস্পষ্ট ধারণা

এই ঘটনায় সমাজমনস্তত্ত্বের একটি বড় দিকও সামনে এসেছে। কেন শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত ও পেশাজীবী অনেক মানুষও এমন বিজ্ঞাপনে সাড়া দিলেন? 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর একটি কারণ হতে পারে হিল্লা বিয়ে সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারণা। আরেকটি কারণ হতে পারে ধর্মীয় ভাষায় উপস্থাপিত কোনো প্রক্রিয়াকে বৈধ মনে করে নেওয়া।

“কারও কারও ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা গোপন উদ্দেশ্যও কাজ করতে পারে। তবে যেকোনো কারণেই হোক, প্রতারক চক্রের কাছে এটি সুযোগ তৈরি করেছে”- বলেন আবুসালেহ সেকান্দার।

বিশ্লেষকদের মতে, হালালা বা হিল্লা বিয়ের নামে যে প্রক্রিয়া প্রচার করা হচ্ছে, সেখানে নারীকে অনেক সময় মানুষ হিসেবে নয়, বরং একটি ধর্মীয় বা সামাজিক সমস্যার ‘সমাধানের মাধ্যম’ হিসেবে দেখানো হয়। ফলে নারীর মর্যাদা, সম্মতি, নিরাপত্তা ও মানবিক অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়ে।

তারা বলছেন, এই ধরনের প্রচারণা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যা এবং যৌন সুযোগ নেওয়ার প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

ইসলামি ইতিহাস ও সংস্কৃতি অলিম্পিয়াডের চেয়ারম্যান মুসা আল হাফিজ বিষয়টির ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন, ইসলামের দৃষ্টিতে পূর্বপরিকল্পিত হালালা সম্পূর্ণ নিন্দনীয়। 
তিনি বলছেন, “কোনো ব্যক্তি স্ত্রীকে তালাক দিলে এবং পরে সেই নারী অন্য কোনো পুরুষকে প্রকৃত ও স্বাভাবিকভাবে বিয়ে করলে, সেই দ্বিতীয় বিয়ে যদি স্বাভাবিক কারণে বিচ্ছেদে শেষ হয় বা দ্বিতীয় স্বামী মারা যান, তাহলে ইদত শেষে নারী প্রথম স্বামীর সঙ্গে পুনরায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন।”

তবে  শুরু থেকেই যদি পরিকল্পনা থাকে যে একজন পুরুষ সাময়িকভাবে ওই নারীকে বিয়ে করবে, পরে তালাক দেবে, যাতে নারী প্রথম স্বামীর জন্য ‘হালাল’ হন তাহলে সেটি ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয় বলে জানান এই বিশেষজ্ঞ।

মুসা আল হাফিজ বলেন, বিয়ের উদ্দেশ্য হলো স্থায়ী দাম্পত্য জীবন, পরিবার গঠন, চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষা এবং বৈধ সম্পর্কের মাধ্যমে সামাজিক ও নৈতিক জীবন গড়ে তোলা।

তবে হালালা ব্যবসার মধ্যে বিয়ে পণ্যে পরিণত হয়, নারীকে ব্যবহারযোগ্য করার মাধ্যমে পরিণত করা হয় এবং শরীয়তের বিধানকে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে মত দেন তিনি।

“‘হালালা সেন্টার’ বা ‘হালালা সার্ভিস’ ধরনের উদ্যোগ ইসলামের নামে বিয়েকে উপহাসে পরিণত করে এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যভিচার, প্রতারণা ও শোষণের দরজা খুলে দেয়”, বলেন মুসা আল হাফিজ। 

তিনি বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে তিনটি স্তর ব্যাখ্যা করেন। প্রথমত, পূর্বপরিকল্পিত ও চুক্তিবদ্ধ হালালা যেখানে বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিয়ে করে পরে তালাক দিতে হবে। এটি সম্পূর্ণভাবে হারাম ও প্রত্যাখ্যাত।

দ্বিতীয়ত, কোনো লিখিত বা প্রকাশ্য চুক্তি না থাকলেও যদি কারও মনের উদ্দেশ্য হয় সাময়িকভাবে বিয়ে করে পরে নারীকে প্রথম স্বামীর জন্য হালাল করা, সেটিও অধিকাংশ আলেম নিন্দনীয় বলেছেন। 

তৃতীয়ত, প্রকৃত সংসারের উদ্দেশ্যে স্বাভাবিক বিয়ে, যা পরে স্বাভাবিক কারণে ভেঙে গেলে নারী পূর্ববর্তী স্বামীর সঙ্গে নতুন করে বিয়ে করতে পারেন এটি বৈধ প্রক্রিয়া।

এই ব্যাখ্যা থেকে স্পষ্ট, ‘হালালা সেন্টার’ ধরনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা বাণিজ্যিক প্রচারণা ইসলামের মূল বিবাহ-ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ এখানে বিয়ে পারিবারিক ও নৈতিক বন্ধন হিসেবে নয়, বরং একটি ব্যবসায়িক সেবা হিসেবে উপস্থাপিত হয়। 

আইনগত দিক থেকেও বিষয়টি গুরুতর। যদি মিথ্যা পরিচয়, ভুয়া প্রতিষ্ঠান বা প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কারও ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি প্রতারণার প্রশ্ন তৈরি করে। আবার কারও অনুমতি ছাড়া নাম, ছবি, ফোন নম্বর, ইমেইল, পেশা বা সিভি প্রকাশ করা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন এবং ডিজিটাল হয়রানির শামিল হতে পারে।

ভুক্তভোগীরা সামাজিকভাবে অপমানিত হলে, হয়রানির শিকার হলে বা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়লে বিষয়টি সাইবার অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। 

এই ঘটনায় বেশ কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। ধর্মীয় আবেগের নামে অনলাইন বিজ্ঞাপন কতটা যাচাই করা হচ্ছে এবং ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার আগে মানুষ কতটা সতর্ক। 

এ ছাড়া ধর্মীয় ভুল ব্যাখ্যা ও সামাজিক কুসংস্কার প্রতারণার ক্ষেত্র তৈরি করছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।