এক নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে উত্তাল হয়ে উঠেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। ১৩ই মে রাত ১০টার দিকে সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর মিছিল বের হয় জাবির অঙ্গনে, তবে মিছিলের দাবিটি কী, তা নিয়েই উঠে এসেছে মতবিরোধ।
১২ই মে রাত ১১টা ১২ মিনিটের দিকে এক নারী শিক্ষার্থী হেঁটে যাচ্ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো ফজিলতুন্নেসা হল সংলগ্ন আল-বেরুনী এক্সটেনশনের মাঝের রাস্তা দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একজন পুরুষ তখন এই শিক্ষার্থীকে অনুসরণ করতে থাকেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বরাত দিয়ে পরিচয় গোপন রেখে তার অভিজ্ঞতা এক ফেইসবুক স্ট্যাটাসে তুলে ধরেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ক্যামেলিয়া শারমিন চূড়া। সেখান থেকে জানা যায়, ভুক্তভোগীকে টি-শার্ট ও কালো প্যান্ট পরা এক ব্যক্তি অনুসরণ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে অনুসরণকারীর পরিচয় জিজ্ঞেস করলে বলেন- তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮তম আবর্তনের শিক্ষার্থী।
স্ট্যাটাস অনুযায়ী, ভুক্তভোগীকে সেই ব্যক্তি দড়ি-সদৃশ কোনোকিছু দিয়ে গলায় টান দিয়ে রাস্তার ধারে জঙ্গলে নিয়ে যান এবং ধর্ষণ ও হত্যার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে তার চিৎকার শুনে কিছু ব্যক্তি জড়ো হলে আক্রমণকারী ঝোপঝাড়ের ভেতর পালিয়ে যায়।
এ পর্যায়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা আক্রমণকারীকে খোঁজার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন এবং ভুক্তভোগীকে মেডিকেল সেন্টারে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য নিয়ে যান এবং আক্রমণকারীকে শনাক্ত করতে প্রক্টর অফিসে যান তারা।
“প্রক্টর স্যার বললেন সকালে নাকি চিঠি দিতে হবে তারপর বিশ্ববিদ্যালয় স্টেপ নিবে। আমার পাশে থাকা শিক্ষার্থীদের চাপে পরে পুলিশকে কল দিয়েছেন তিনি, তারপর রাতেই কমপ্লেইন দেওয়া হয়েছে। সকাল ৮ টায় নাকি জিডি হবে। আমার সবার কাছে প্রশ্ন - পুরো বিশ্ববিদ্যালয় চুপ কেনো? আপনাদের ভয়েস রাইজ করার জন্য আমার কী মারা যাওয়াই উচিত ছিলো?” লিখে ছিলো সেই স্ট্যাটাসে।
পরেরদিন ১৩ই মে রাতে ঘটনার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীদের একটি বড় আকারের মিছিল বের হয় ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে, এবং বিভিন্ন দাবি-দাওয়া পেশ করা হয় প্রশাসনের কাছে। তবে সেখানেও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বিভিন্ন কথা শোনা যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে। কোন দাবি কে তুলেছিলেন, তা নিয়েও মিশ্র বার্তা শোনা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম আলাপ-কে বলেন, “ক্যাম্পাসের দুই একটা প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রতিবাদ হয়েছে এই ব্যাপারটা নিয়ে, এটার যেন দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হয় এবং ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থাটা যেন স্ট্রেনদেন করা হয়। রাতে একটা মিছিল ছিলো। রাত ১০টায় আমাদের ক্যাম্পাসের নারী শিক্ষার্থীদের আহ্বানে।”
মিছিলের পরিসর নিয়ে তিনি বলেন, “এই মিছিলটা জাহাঙ্গীরনগরের ঐতিহাসিক মিছিলের মতো। সকল স্তরের নারীরা, ছেলেরাও এসে যুক্ত হয় এই মিছিলে। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীবৃন্দ’ ব্যানারে ডাকা হয়েছে। কয়েক হাজার শিক্ষার্থী সেখানে অংশ নিয়েছিলেন।”
মাজহারুল ইসলাম বলেন, “মিছিলের মাঝে হঠাৎ করে এই ব্যাপারটা নিয়ে একটা বিভাজন তৈরি হয়। কতিপয় প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের এই ব্যাপারটাকে ভিসি এবং প্রক্টর পতন আন্দোলনের স্লোগান দেওয়া শুরু করলে শিক্ষার্থীরা একটু বিভ্রান্ত হয়। সর্বশেষে কিছু মিশ্র পরিস্থিতি তৈরি হয়, এবং রাতের শেষভাগে এটা উপাচার্য অফিসে আলোচনার মাধ্যমে শেষ হয়।”
তবে কামেলিয়া শারমিন চূড়ার আরেক ফেইসবুক পোস্টে ভিন্ন বয়ান দেখা যায়। তিনি লিখেন, “আজকের এই আন্দোলন যদি কেউ সত্যিই স্যাবোটাজ কইরা থাকে সেটা নিঃসন্দেহে ছাত্রদল। মেয়েরা অনেক স্লোগানের পাশাপাশি ভিসি আর প্রক্টরকে উল্লেখ করে স্লোগান দিলেই তারা পরিকল্পিতভাবে এদিক ওদিক থেকে বিচ্ছিন্ন স্লোগান দিয়ে মেয়েদের ভয়েস ডমিনেট করে গেছে পুরা রাস্তা।”
তিনি আরও লিখেন, “পরশু রাত থেকে গতরাত পর্যন্ত এতবড় ট্রমা নিয়েও এই মিছিলে ভিক্টিম নিজে তার নিপীড়নের নিশান নিয়ে আমাদের সাথে হাঁটছে, জাকসু আর প্রশাসন কে ধিক্কার জানাইছে।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর ফেইসবুক পোস্টের কিছু ছবিতে একটি লিখিত দাবিসমূহের তালিকা দেখা যায়, যা ডেপুটি রেজিস্ট্রার সাক্ষর করে গ্রহণ করেছেন। সেই তালিকা অনুযায়ী প্রথম দাবিটি ছিলো, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীকে গ্রেফতার করে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করা। দ্বিতীয় দাবি ছিলো, প্রথম দাবি পূরণে ব্যর্থ হলে প্রক্টর ও প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগ।
এ বিষয়ে জাকসুর সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, “মিশ্র কিছু মানসিকতার নারীরা সবাই মিলে ওখানে ছিলো। কারা এই দাবিটা দিয়েছে সেটা নিয়ে এখনো আমরা আসলে কনফিউজড। জাকসুর পক্ষ থেকে আমরা ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছি, সেই জায়গাগুলো থেকে আমরা এটার বাস্তবায়ন করাবো, এটাই আমাদের প্ল্যান।”
পুরো ঘটনায় জাকসুর শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের ভূমিকার বিষয়ে মাজহারুল ইসলাম বলেন, “আমরা সন্ধ্যাবেলা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে জরুরি একটি বৈঠক ডাকি। এই বৈঠকের মাধ্যমে আমরা ৮ থেকে ৯টি কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আমরা আমাদের দাবিদাওয়াগুলো উপস্থাপন করি।”
তবে ভিন্ন বয়ান শোনা যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৪৯তম আবর্তনের এক শিক্ষার্থীর কাছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই শিক্ষার্থী আলাপকে বলেন, “ভিপি জিএস মেয়েদের সাথে কলাবরেশনের চেষ্টা করেছেন। এরপরে যদিও উনাদের কোনো কার্যক্রম আমাদের চোখে পড়ে নাই, কালকে সারাদিনও না, আজকেও কোনো কার্যক্রম আমাদের চোখে পড়ে নাই। জাকসু থেকে ভিক্টিমের সাথে কোনো কন্ট্যাক্ট কেউ করে নাই।”
“১১ টা ১৩ মিনিটের ঘটনা, ২টা ২৪ মিনিটে জাকসুর নারী সদস্যরা জাস্ট একটা মুখ দেখানোর মতো করে দেখা করেছে। ভোর সাড়ে ৬টা পর্যন্ত মেয়েরা প্রক্টোর অফিসে ছিলো, ভিক্টিমও ওখানে ছিলো। তখন পর্যন্তও ভিসি স্যারকে প্রক্টোর স্যারের সাথে কোনোরকম কথা বলতে দেখিনি। ভিসি স্যার এসেও একবার দেখা করতে পারতেন,” বলেন এই শিক্ষার্থী।
উত্থাপিত দাবির তালিকা নিয়ে তিনি বলেন, “এই দাবিগুলোর মধ্যে অনেক কিছু অপোজ করার মতো ছিলো। আমরা যখন ভিসি স্যারের রুমে কথা বলতে ঢুকি, ওখানেও এগুলোর বিরোধিতা করছিলো একপক্ষ। তাদের লোকবল খুবই কম হওয়ায় সেই পক্ষের ভয়েস আর উঠে আসতে পারেনি।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু প্রক্টর নয়, উপাচার্যেরও পদত্যাগের দাবি তোলে জাতীয় ছাত্রশক্তির সাথে সম্পৃক্ত আরেকপক্ষ। তিনি বলেন, “ তারা দাবি তুলেন, শুধু প্রক্টর কেন, ভিসিরও উচিত পদত্যাগ করা। সামিহা নামের একটা মেয়ে এই দাবিটা তুলেছিলো, ওর একটা পলিটিক্যাল ভিউ ছিলো, সেটা হলো ছাত্রশক্তি।”
মিছিলের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নিয়ে তিনি বলেন, “ছাত্রশক্তি ছিলো রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের সামনে, প্রক্টর অফিসের সামনে ছাত্র ইউনিয়ন। প্রক্টর অফিসে ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের এক অংশ, রেজিস্ট্রার অফিসের সামনে যারা ছিলো তাদের ‘ভুয়া ভুয়া’ বলতে থাকে, আর দুই পক্ষের মধ্যে একটু ধাক্কাধাক্কির মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়।”
এই শিক্ষার্থী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করেছেন যে প্রধানমন্ত্রী নিজেই এ বিষয়ে পুলিশ সুপারের সাথে কথা বলেছেন।
ভুক্তভোগীর ওপর আক্রমণের পর তার চিকিৎসা ও বিশ্ববিদ্যালয় এবং পুলিশ প্রশাসনের সাথে কথা বলার সময় সম্পৃক্ত নারী শিক্ষার্থীরা তার পরিচয় গোপন রেখেছেন, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষার্থীদেরও গোপনীয়তা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়টির বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মির্জা সাকি এক ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “ভিকটিমের প্রাইভেসিকে সর্বোচ্চ সম্মান জানিয়েছি আমরা। এই সম্মানটা আপনারাও জানাবেন বলেই আমি বিশ্বাস রাখি। নাম, ব্যাচ, ডিপার্টমেন্ট এগুলো কেউ সামনে এনেন না প্লিজ।”
ক্যাম্পাসে নারীদের সার্বিক নিরাপত্তা ও বিচারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে এই শিক্ষার্থী লিখেন, “এই ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমরা থাকবো। প্রশ্ন করবো। লড়াই করবো আমাদের বোনের জন্য। আসেন লড়াইটা একসাথে করি। নাহয় আজ উক্ত ভিকটিম, কাল আমি, পরশু আপনি বা আপনার কোনো বান্ধবী/বোন/মা/প্রেমিকা হবো এই নরপিশাচদের শিকার। এই ঘটনার সুরাহা না হলে, “জাহাঙ্গীরনগর মেয়েদের জন্য স্বর্গ” এই ন্যারেটিভটা আর এক্সিস্টই করবে না!”