কুড়ি বছর কারাগারে, জীবনাবসান হতে পারতো ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলে। জামিনে বের হয়ে আসেন চব্বিশের অগাস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের পর।
কিন্তু মুক্ত পৃথিবীতে থাকতে বাঁচতে পারলেন না খুব বেশিদিন। মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিহত হলেন তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন।
জেল থেকে বের হয়ে আসার পর আদালতে হাজিরা না দিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন টিটন। তাকে খুঁজছিল পুলিশ, খুঁজে বেড়াচ্ছিল প্রতিপক্ষের ঘাতকরাও।
অবশেষে খুনিদের কাছেই ধরা পড়ে গেলেন, রাস্তায় পড়ে থাকলো গুলিবিদ্ধ টিটনের রক্তাক্ত মরদেহ।
গত ১০ই নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় আরেক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তারিক সাঈফ মামুনকে।
টিটন ও মামুন দুইজনই একসময় ছিলেন একই গ্যাংয়ের সদস্য, আরেক ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ সানজিদুল ইসলাম ইমনের সহযোগী।
ইমন-মামুন দুজনই চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী ও সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু হত্যা মামলার আসামি।
এই দুই হত্যা মামলায় টিটনের নাম না থাকলেও আরেক হত্যা মামলায় তিনি মৃত্যুদণ্ড পেয়েছিলেন।
জামিন পেয়ে লাপাত্তা হওয়ার পর থেকেই তাকে খুঁজতে থাকে পুলিশ। জামিন পাওয়া অন্য সন্ত্রাসীদের সন্ধান চলছে।
কিন্তু ছয়মাসের ব্যবধানে দুই শীর্ষ সন্ত্রাসীর হত্যাকাণ্ড নিয়ে নানা জল্পনা মুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, আবার কি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডনরা?
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে অন্তঃকোন্দল বেড়ে যাওয়ার কারণেই খুনোখুনি হচ্ছে। তাই পুলিশকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
“ফাইট বিটউইন ক্রিমিনালস অ্যান্ড পুলিশ একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে এরা যাতে মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে সেটা কন্ট্রোল করতে হবে,” আলাপ-কে বলেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মুহাম্মদ নুরুল হুদা।
টিটন-এর গ্রেপ্তার, মৃত্যুদণ্ড ও জামিন
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও নিউ মার্কেট এলাকায় টিটন এবং তার ভাইদের রাজত্ব শুরু হয়।
শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন (ক্যাপ্টেন ইমন) টিটনের বোন শাহনাজ পারভীন লিনাকে বিয়ে করেন।
এর ফলে টিটন, তার ভাই মামুন এবং কিলার রসু মিলে একটি শক্তিশালী পারিবারিক অপরাধী বলয় তৈরি করেন। শুরু হয় তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড।
টিটনকে ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তখনকার সরকার দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় দুই নম্বরে অন্তর্ভুক্ত করে।
এরপর ২০০৪ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে একটি অবৈধ পিস্তলও উদ্ধার করা হয়েছিল।
জেলে থাকা অবস্থায় দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চাঞ্চল্যকর বাবর এলাহী হত্যা মামলায় টিটনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয় আদালত।
এরপর থেকে তিনি কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির সেলে বন্দি ছিলেন।
তবে ২০২৪ সালের অগাস্টে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি মেলে তার। একই সময় কারাগার থেকে মুক্তি পান শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল হাসান ইমনও।
টিটনকে খুঁজে পায়নি পুলিশ
বিভিন্ন গণম্ধ্যমের খবর, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অন্তত ২৭জন শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এর মধ্যে একজন হলেন- টিটন।
জামিনে থাকা অবস্থায় তাকে খুঁজছিল পুলিশ। তবে টিটনকে খুঁজে পায়নি তারা।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস ) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “সে দীর্ঘদিন জেলে ছিল। ৫ই অগাস্টের পর ১৩ই অগাস্ট সে জামিনে মুক্তি পায়। এরপর সে পালায় ছিল। আমরা কিন্তু তাকে ট্রেস করার চেষ্টা করেছি, পাই নাই।”
পুলিশ তাকে জীবিত অবস্থায় খুঁজে না পেলেও তার শত্রুরা টিটনকে ঠিকই খুঁজে পেয়েছিল।
থ্রিলার অ্যাকশন
মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। আলো-আঁধারির মাঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকা থেকে হেঁটে নিউমার্কেটের দিকে যাচ্ছিলেন টিটন। এই তথ্য আগে থেকেই ছিল তার প্রতিপক্ষের কাছে।
শহীদ শাহ নেওয়াজ হলের গেটের কাছে মোটরসাইকেলে অপেক্ষা করছিলেন ক্যাপ ও মাস্ক পরা দুইজন ব্যক্তি।
টিটন রেঞ্জের মধ্যে আসলেও অপেক্ষা করছিলেন তারা। আরও কাছে আসতেই একজন মোটরসাইকেল থেকে নেমে গুলি ছোড়া শুরু করেন। চারটি শব্দ শোনা যায় এ সময়।
গুলিবিদ্ধ হয়ে টিটন মাটিতে পড়ে গেলে হামলাকারীর চলে যেতে গিয়েও আবার ফিরে আসে। এগিয়ে গিয়ে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে আরেকটি গুলি করে নিশ্চিত করা হয় মৃত্যু।
ঘটনার সময় উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা এভাবেই বর্ণনা দিয়েছেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে।
এ সময় আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে হামলাকারীদের ধাওয়া দিলে ফাঁকা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায় হত্যাকারীরা।
নিউ মার্কেট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোল্লা শাহাদাত বলেন, “খুব কাছ থেকে তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাঁচ থেকে ছয়টি গুলি করা হয়। এরপর দ্রুততম সময়ে পালিয়ে যায় তারা।”
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পথচারীরা টিটনকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ৮টা ২৭ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলেও জানান তিনি।
তবে এই ঘটনায় এখনো কোনো মামলা হয়নি বলে বুধবার দুপুরে আলাপ-কে জানিয়েছেন নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আইয়ুব।
বাড়ছে খুনের ঘটনা
কেন এই হত্যা? এই প্রশ্নের উত্তর নেই পুলিশের কাছে।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “আমরা মনে করছি তাদের লেভেলেই সন্ত্রাসী যারা আন্ডার ওয়ার্ল্ড, তাদের লেভেলেই কেউ না কেউ এই ঘটনাটা ঘটাইছে। এখনো ডিটেক্ট করতে পারি নাই।”
ওসি মো.আইয়ুব আলাপ-কে বলেন, “আমরা সিসি টিভি ফুটেজ পেয়েছি। সেগুলো আমাদের বিভিন্ন টিম বিশ্লেষণ করছে। তবে এখনো হত্যাকারী শনাক্ত করা যায়নি।”
এদিকে এপ্রিলের প্রথম ১৫ দিনেই ঢাকায় অন্তত ১৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।
গত জানুয়ারি থেকে মার্চ-এই তিন মাসে রাজধানী ঢাকায় ১০৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে মার্চে ৩৩টি হত্যাকাণ্ড হয়।
এছাড়া ফেব্রুয়ারিতে ৩৮ এবং জানুয়ারিতে খুনের ঘটনা ঘটে ৩৬টি।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত সারা দেশে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৮৫৪টি।
এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। আর ফেরুয়ারিতে ২৫০ ও মার্চে খুন হয় ৩১৭টি।
চলতি মাসেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনা ঘটে। যার সব শেষ সংযোজন টিটন হত্যা।
তবে এখনো উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু হয়নি বলে মনে করেন সাবেক আইজিপি মুহাম্মদ নুরুল হুদা।
“এ ধরনের হত্যা চলমান প্রক্রিয়া। তাই পুরো বিষয়ের ওপর নজরে রাখতে হবে।”