যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শেষ প্রান্তে। ৮ই এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতি শেষ হচ্ছে ২২এ এপ্রিল।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বিশ্লেষণ বলছে, শুরু থেকেই এই যুদ্ধবিরতি ছিল ‘ভঙ্গুর’ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসে ভরা। যে সমাধানের আশা করা হয়েছিল তাও এখন অনিশ্চয়তার দোলাচলে।
২৮এ ফেব্রুয়ারি ইরানি ভূখণ্ডে হামলা চালায় ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে হামলা চালাতে শুরু করে তেহরান।
মিত্রদের কাছ থেকে চাপে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। ‘ট্রাম্প কার্ড’ হিসাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে।
এমন পরিস্থিতিতে শর্তসাপেক্ষে সমঝোতার মাধ্যমে শুরু হয় যুদ্ধবিরতি। মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় পাকিস্তান।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য খুলে দিতে হবে। আর ইরান জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ হলে তবেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে।
এই কৌশলগত বিরতিতে জটিল হয় লেবানন ইস্যুতে।
ইরানে যুদ্ধ থামলেও লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল ইসরায়েল। ইরান দাবি করে, লেবাননে হামলা বন্ধ যুদ্ধবিরতিরই অংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাবি, লেবানন যুদ্ধবিরতির বাইরে।
মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়, লেবাননে শান্তি না থাকলে বৃহত্তর শান্তি আলোচনা সম্ভব নয়।
এমন অবস্থায় ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা আয়োজনের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। শুরু থেকেই আলোচনায় মতপার্থক্য স্পষ্ট ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত কাঠামো ও ইরানের শর্তের মধ্যে ‘বিরাট ফারাক’ রয়েছে বলে বিবিসির এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়।
যুদ্ধবিরতির মাঝে বড় আকারের হামলা বন্ধ থাকলেও রাজনৈতিক দূরত্ব ছিল স্পষ্ট। ক্রমেই পরিস্থিতি জটিল হতে থাকে। ১৩ই এপ্রিল ইরানের বিরুদ্ধে নৌ- অবরোধ জারি করে যুক্তরাষ্ট্র। একে তেহরান সরাসরি যুদ্ধবিরতির শর্তের লঙ্ঘন হিসাবেই দেখে।
উত্তেজনা আরও বাড়ে যখন মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালির কাছে একটি ইরানি পতাকাবাহী জাহাজ জব্দ করে। ইরান এই ঘটনাকে ‘সশস্ত্র জলদস্যুতা’ এবং ‘যুদ্ধবিরতির স্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে নিন্দা জানায়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কূটনৈতিক প্রক্রিয়াও প্রায় ভেঙে পড়ে। ইরান জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক দাবি’ এবং অসঙ্গত আচরণের কারণে তারা নতুন করে আলোচনায় অংশ নেওয়ার ব্যাপারে অনিশ্চিত।
একই সঙ্গে ইরান অভিযোগ তোলে যে, “যুদ্ধবিরতি শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র তা লঙ্ঘন করে আসছে।”
পুরো সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় হরমুজ প্রণালি। এটি বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেলের সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হওয়ায় এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তোলে।
যুদ্ধবিরতির সময়ও এই প্রণালিতে গুলিবর্ষণ, জাহাজ জব্দ এবং চলাচলে বিঘ্ন হওয়ায়। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও অস্থিরতা তৈরি হয়। ইরানের অবস্থান ছিল স্পষ্ট, তারা কখনোই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না।
যুক্তরাষ্ট্র একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার কথা বললেও অন্যদিকে সামরিক চাপ অব্যাহত রাখে। আলোচনার প্রস্তুতির মধ্যেই হামলা ও সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এই যুদ্ধবিরকে অনেক বিশ্লেষেই বলেছেন ‘ট্যাকটিক্যাল পজ’ বা কৌশলগত বিরতি।
যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে সতর্কতা জোরদার করে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখে।
ইরান মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর প্রভাব বজায় রেখে আঞ্চলিক চাপ ধরে রাখার কৌশল নেয়। সরাসরি সংঘর্ষ না হলেও ‘প্রক্সি উত্তেজনা’ অব্যাহত থাকে।
কূটনৈতিক অঙ্গনেও অচলাবস্থা স্পষ্ট। ইউরোপীয় শক্তিগুলো যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করার আহ্বান জানালেও কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তেলের দাম ওঠানামা করতে থাকে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করে।
শেষ দুই দিনের ঘটনাপ্রবাহে উত্তেজনা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওমান উপসাগরে মার্কিন জাহাজ লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার দাবি করে ইরান। যদিও এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
তেহরান আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্র জানায় তারা ইরান ও আশেপাশে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখবে এবং যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকবে। কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে সামরিক প্রস্তুতি কমেনি। তাই পরিস্থিতি এখন এক ধরনের অচলাবস্থার দিকে যাচ্ছে, মুখে শান্তির আলাপ থাকলেও বাস্তবে আছে সংঘাতের প্রস্তুতিও।
যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার ঠিক আগে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানে দ্বিতীয় দফা আলোচনা হবে কি-না, সেটিও অনিশ্চিত। দুই পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করছে।