যুক্তরাষ্ট্রে একের পর এক ‘নিখোঁজ ও হত্যার' শিকার বিজ্ঞানী, গবেষক ও সেনা কর্মকর্তাদের বিষয়ে তদন্তের আদেশ

পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন, তত্ত্বাবধান ও গবেষণার সাথে সম্পৃক্ততা থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নিহত ও নিখোঁজ থাকা গবেষক, বিজ্ঞানী ও সেনা কর্মকর্তার বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। 

গত কয়েক বছরে অন্তত ১০ জন গবেষক, বিজ্ঞানী ও সেনা কর্মকর্তা নিখোঁজ ও নিহত হয়েছেন বলে মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 

গত মার্চে বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল উইলিয়াম নিল ম্যাক্যাসল্যান্ড নিখোঁজ হওয়ার পরই আগের ঘটনাগুলো আলোচনায় আসতে থাকে।

উইলিয়াম ম্যাক্যাসল্যান্ড অবসর নেওয়ার আগে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি প্রোগ্রামের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে ছিলেন বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট। 

তার নিখোঁজের পরই বিজ্ঞানী, গবেষক ও সেনা কর্মকর্তাদের ‘রহস্যজনকভাবে’ নিখোঁজ ও মৃত্যুর খবর সামনে আসতে থাকে। 

ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত করা হয় যে, উইলিয়ামের নিখোঁজের ঘটনার সাথে ২০২৫ সালের জুন মাসে গবেষক মনিকা হাসিন্তো রেজার নিখোঁজ হওয়ারও যোগসূত্র থাকতে পারে।

মনিকা হাসিন্তো রেজা কাজ করতেন নাসা ও এয়ারফোর্স রিসার্চ ল্যাবরেটরির অর্থায়নে চলা ‘এরোজেট রকেটডাইন’-এ। এই গবেষণাগারের তত্ত্বাবধানে ছিলেন উইলিয়াম ম্যাক্যাসল্যান্ড। 

মনিকা রেজার গবেষণার উদ্দেশ্য ছিলো, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর বিদেশি প্রপালশন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানো।

প্রপালশনের প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করা আরেকজন বিজ্ঞানী এমি এর্স্কিনের মৃত্যুও আলোচনায় এসেছে। তিনি গবেষণা করতেন ‘অ্যান্টিগ্র্যাভিটি’ নিয়ে। 

কাজের কারণে তার ওপর ‘চাপ ও হুমকির’ কথা বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলে আসছিলেন এর্স্কিন। তার মৃত্যু হয় ২০২২ সালের ১১ই জুন। কর্তৃপক্ষের মতে, তিনি গুলি করে আত্মহত্যা করেছিলেন। 

ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনের পর থেকে অনলাইন বিশ্বে বিভিন্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে এমন আরও ৮টি নিখোঁজ ও নিহতের ঘটনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। 

সামরিক প্রযুক্তির সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের পরিকল্পিতভাবে গুম-খুন করা হচ্ছে কিনা, সেই বিষয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে।

সেগুলোর মধ্যে একটি হলো কন্ট্রাক্টর স্টিভেন গার্সিয়ার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। গার্সিয়া একটি অস্ত্র উৎপাদন ফ্যাসিলিটির দায়িত্বে ছিলেন, যেখান থেকে পারমাণবিক অস্ত্রের বিভিন্ন উপাদান উৎপাদন করা হতো। তিনি ২০২৫ সালের ২৮এ অগাস্ট নিজের লাইসেন্স করা অস্ত্রসহ বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন। 

নাসার আরেকজন গবেষকের মৃত্যু আলোচনায় আসে। ২০২৩ সালের জুন মাসে বিজ্ঞানী মাইকেল ডেভিড হিক্স মারা যান। তার মৃত্যুর কারণ কিংবা ময়নাতদন্তের কোনো ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। আর এর ফলে আলোচনা চলছে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ নিয়ে। 

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির (এমআইটি) পদার্থবিজ্ঞানী ছিলেন নুনো লুরেইরো। তিনি পরমাণু ও পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন। ২০২৫ সালের ১৫ই ডিসেম্বর নিজ বাসভবনে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। 

আরেক অধ্যাপক অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট কার্ল গ্রিলমেয়ারকে গুলি করে হত্যা করা হয় এই বছরের ১৫ই ফেব্রুয়ারি। তিনি মহাকাশ নিয়ে গবেষণা ও দূরের গ্রহ পর্যবেক্ষণ করতেন। 

এছাড়া নাসার গবেষক ফ্র্যাঙ্ক মেইওয়াল্ড ও মাইকেল ডেভিড হিক্স এবং ফার্মাসিউটিক্যাল বিজ্ঞানী জেসন থমাসের মৃত্যু, যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বিভাগের গবেষণাকেন্দ্র লোস আলামোসের মেলিসা কাসিয়াস ও অ্যান্থনি শাভেজের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাগুলোও আলোচনায় এসেছে। 

বুধবার হুয়াইট হাউজের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ফক্স নিউজের একজন সাংবাদিক ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লিভিটকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে পুরো বিষয়টি নিয়ে পুনরায় আলোচনা শুরু হয়।

প্রশ্নের উত্তরে লিভিট বলেন, যে ঘটনাগুলো সত্য হলে সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখবে।

১৬ই এপ্রিল ফেডেরাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনকে (এফবিআই) ডনাল্ড ট্রাম্প নির্দেশ দেন যে, ঘটোনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কিনা তা তদন্ত করে দেখতে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউক্লিয়ার থ্রেটস ইনিশিয়েটিভ-এর স্কট রোয়েকার সিবিএস নিউজকে বলেন, “আপনি বিদেশি প্রতিপক্ষের দিকে তাকালে ইরানের কথা মাথায় আসতে পারে। যেহেতু ইরানের পারমাণবিক বিজ্ঞানীদেরও হত্যা করা হয়েছে।

“তবে আমরা ইরানের মতো না। আমাদের হাজার হাজার বিজ্ঞানী আছে। আমাদের শক্তিশালী অবকাঠামো আছে। সুতরাং মৃত্যুগুলো দুঃখের হলেও, ১০ থেকে ২০জন পারমাণবিক বিজ্ঞানীকে হত্যা করে ইরান তেমন কিছু হাসিল করতে পারবে না।” 

ইতোমধ্যে নিখোঁজ ও নিহতের ঘটনাগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্রের কথা নিশ্চিত করেনি যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ।

তবে ভার্চুয়াল বিশ্ব বসে নেই, তদন্তের ফলাফল না আসা পর্যন্ত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও নানা সন্দেহে সয়লাব অনলাইন জগৎ।