খামেইনির পর ইরান: শূন্যতার ঝুঁকি সামলাতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র?

খামেনির মৃত্যু ইরানকে শুধু নেতৃত্বহীন করেনি, এটি খুলে দিয়েছে এমন এক ‘পাওয়ার ভ্যাকুয়াম’, যার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় শাসনের শীর্ষ স্তর নড়বড়ে হলেও, যে প্রশ্নটা এখন আরও বড় হয়ে উঠছে তা হলো যে এই শূন্যতা সামলানোর মতো বাস্তব কোনো কৌশল ওয়াশিংটনের আছে কি না।

কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে, একটি রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেওয়ার পর যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, সেটি বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে থামানো যায় না; বরং সেই শূন্যতার ভেতর থেকেই জন্ম নেয় নতুন ও আরও বিপজ্জনক হুমকি।

ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি ছিল সরল: ইরানই যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-হুমকি, তাই শাসনব্যবস্থাকে “নির্মূল” করলেই ঝুঁকি শেষ। কিন্তু ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে, শাসন পতনের পর হুমকি কমে না, অনেক সময় বহুগুণ বেড়ে যায়। অস্ত্রভাণ্ডার ছড়িয়ে পড়ে, নিরাপত্তা-চেইন ভেঙে যায়, জবাবদিহিতা হারিয়ে যায়; আর সেই সুযোগটাই নেয় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। ইরানের ক্ষেত্রে ভয়টা আরও বড় কারণ এবার শূন্যতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারমাণবিক উপাদান, বিজ্ঞানী-নেটওয়ার্ক ও একটি যুদ্ধরত রাষ্ট্রের ভেঙে পড়া নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা,  যা ‘পোস্ট-স্ট্রাইক’ পরিস্থিতিকে আগের যেকোনো উদাহরণের চেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ব্যাপারে ট্রাম্পের কোনো পরিকল্পনা ছিল না বলে অভিযোগ করছেন বিশ্লেষকরা। ট্রাম্প বলেছেন, একদিনেই যুদ্ধ শেষ করে দিতে পারেন তিনি। তার এমন ঘোষণা শুধু তার চিন্তার সীমাবদ্ধতাই প্রকাশ করছে না বরং হুমকিকে দেখার ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতাও প্রকাশ পেয়েছে।

ট্রাম্পের হামলার এই অভিযানে কোনো কৌশল ছিল না। শুধুমাত্র অনুমানের ওপর নির্ভর করেই এই হামলা চালানো হয়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি, তাই তাদের নির্মূল করলেই অ্যামেরিকা নিরাপদ থাকবে এমন একটা ধারণা থেকেই হামলা চালানো হয়েছে। এর আগে ইরাক থেকে শুরু করে লিবিয়া পর্যন্ত সবখানেই এই বিশ্বাস থেকে হামলা চালানো হয়েছে।

আয়াতোল্লাহ আলি খামেইনি

তখনো এই কৌশল ভুল প্রমাণ  হয়েছে, আর এবারও এই কৌশল ভুল  প্রমাণিত হতে যাচ্ছে।

আকাশ  থেকে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রক্ষমতা ধ্বংস করার অসাধারণ সক্ষমতা আছে যুক্তরাষ্ট্রের। কিন্তু সেই ধ্বংসের পর যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা সামাল দেওয়ার মতো সমমানের সক্ষমতা তার নেই।

কারণ ক্ষমতার শূন্যতা নিখুঁত অস্ত্রে নিশানা করে ধ্বংস করা যায় না, স্যাটেলাইট চিত্রে তা মানচিত্রে আঁকা যায় না। ফলে মার্কিন কৌশলগত চিন্তাভাবনায় এই শূন্যতার ঝুঁকিকে নিয়মিতভাবেই কম করে দেখা হয়।

এটি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে বারবার দেখা দেওয়া এক ধরনের পক্ষপাত। যেসব হুমকিকে সামরিক শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা যায় না, সেগুলোকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। আর যেগুলোতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব, সেগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকি প্রায়ই তৈরি হয় তখনই, যখন কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে, অস্ত্রভাণ্ডার ছড়িয়ে পড়ে, দায়িত্বশীল তদারকির শৃঙ্খল ভেঙে যায়, আর জবাবদিহিতা বিলীন হয়ে যায়।

ইরাক যুদ্ধেই এটি স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন সাদ্দাম হুসেইনের প্রশাসনের বিরুদ্ধে হামলা চালায়, তখনো বলা হয়েছিল যে ইরাকের অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

এর পর ইরাক দখল ও সাদ্দামের ফাঁসিও হয়। কিন্তু এরপর সুরক্ষা আসেনি, এসেছিল বিশৃঙ্খলা। কয়েকদিনের মধ্যে শত শত অস্ত্রাগার লুট হয়। কালোবাজার ছেয়ে গিয়েছিল   অস্ত্র, গ্রেনেড, মর্টার রাউন্ড দিয়ে। এমন ব্যক্তিদের কাছে এই অস্ত্র পৌঁছে গিয়েছিল, সাদ্দাম হুসেইন থাকতে যা ভাবাও যায়নি।

এর একটি উদাহরণ হলো ইসলামিক স্টেট (আইএস)। ইরাকের ভেঙে পড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ধ্বংসস্তূপ থেকেই উঠে আসে এই জঙ্গি গোষ্ঠীটি । ২০১৪ সালে তারা যখন মসুল দখল করে, তখন ইরাকি সেনাঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা বিপুল অস্ত্রভাণ্ডার তাদের হাতে চলে যায়। রাষ্ট্র ধ্বংসের প্রাথমিক পদক্ষেপ থেকে ছড়িয়ে পড়া অস্ত্রের এক দ্বিতীয় পর্যায়ের বিস্তার ঘটে।

আর এটি আকস্মিক কোনো ঘটনা ছিল না, ছিল  কাঠামোগত।

লিবিয়ায় আক্রমণের সময় বিষয়টি আমলে নেওয়া যেত। কিন্তু তা হয়নি।  ২০১১ সালে ন্যাটোর সহায়তায় মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর দ্রুত ভেঙে পড়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। ১২ হাজার ভূমি-থেকে-আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, যা বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করতে সক্ষম তা উধাও হয়ে যায়। পরে সেগুলোর কিছু অংশ সাহেল, সিনাই, গাজা এবং অন্যান্য অঞ্চলের অস্ত্রবাজারে আবার দেখা যায়।

দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর রাষ্ট্রে নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার পরিণতি নিয়ে করা প্রায় সব পদ্ধতিগত গবেষণাই দেখিয়েছে যে এর ফল স্থিতিশীলতা নয়, বরং খণ্ডিত হয়ে পড়া। ইরানের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না। তবে সেখানে শাসনব্যবস্থা পতনের পর যে সম্পদ বা সক্ষমতা ছড়িয়ে পড়তে পারে, তা আরপিজি বা ম্যানপ্যাডসের মতো ক্ষেপণাস্ত্রের য়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক হতে পারে।

২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্র- ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের কাছে ৪৪১ কেজি ইউরেনিয়াম ছিল যার ৬০ শতাংশই বিশুদ্ধ। অল্প কিছু কারিগরি পদক্ষেপের মাধ্যমেই তা অস্ত্রে পরিণত করা যেত।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম নিয়ে দশটি পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব।  আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার পরিদর্শকরাও জানিয়েছেন ইরানের কোথায় ইউরেনিয়াম মজুদ রেখেছে এবং তার পরিমাণ নিয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, মাটির গভীরে কোনো স্থাপনায় মজুদ আছে এই ইউরেনিয়াম। যদিও নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। ইরান সরকারের বিবৃতি, গোয়েন্দা তথ্য ও স্যাটেলাইট ছবির মাধ্যমে এই ধারণা তৈরি হয়েছে। আর এই সবগুলোই পরিবর্তন করা যায়।

ট্রাম্প প্রশাসনের যে সব ভেঙেচুড়ে ফেলার নীতি এটা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশ্লেষকদের।

শাসনব্যবস্থা ধ্বংসের যে কৌশল, তার ভেতরের বড় স্ট্র্যাটেজিক আয়রনি হলো, যখন স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পারমাণবিক উপাদান ছড়িয়ে পড়ে, তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা হয় অনুপস্থিত থাকেন বা মনোবলহীন হয়ে পড়েন। ঠিক  তখনই উপাদান চুরি বা ভিন্ন পথে সরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি তৈরি হয়।

অর্থাৎ, হুমকি কমানোর বদলে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা উল্টো পারমাণবিক বিস্তার (প্রলিফারেশন) ঝুঁকিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

ঝুঁকির সম্ভাবনা কম হলেও বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। পারমাণবিক নিরাপত্তার মূল নীতি হল, যে কোনো বিভাজ্য উপাদান যদি কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে সেটিকে গড় সম্ভাবনার ভিত্তিতে নয়, বরং সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ধরে মূল্যায়ন করতে হবে।

অতীতে যখন সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কগুলোর হাতে কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র (ম্যানপ্যাডস) পৌঁছেছিল, সেটিই ছিল বড় বিপর্যয়। কিন্তু যদি কোনো জঙ্গি গোষ্ঠী অস্ত্র-উপযোগী পারমাণবিক উপাদান হাতে  পায়, তাহলে পারমাণবিক সুরক্ষা ব্যবস্থাই ভেঙে দিতে পারে।

শত্রু রাষ্ট্রেরও রাজধানী আছে, নেতা আছে, জনগণ আছে। এই জনগণকে তারা সুরক্ষা দিতে চায়। তাদের যদি সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে ১৯৪৫ সালে পর থেকে যেই কাঠামো পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার ঠেকিয়ে রেখেছিল, সেটি ভেঙে পড়বে। অস্থিতিশীল ও ভঙ্গুর প্রশাসনের সঙ্গে কোনো ‍চুক্তি হয় না। যেখানে সরকারই নাই, সেই দেশকে বাধ্য করা যায় না।

বর্তমানে পরমাণু অস্ত্র যারা তদারকি করেন, তারা শত্রু হতে পারে। কিন্তু তারাই একমাত্র দেয়াল যারা এই অস্ত্র ব্যবহার থেকে বিরত রাখছে। তারা না থাকলে পরমাণু হামলা ঠেকানো কঠিন হবে, অসম্ভবও হয়ে পড়তে পারে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস এখানে বলা যেতে পারে। ১৯৯১ সালে যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ভেঙে যায় তখন এরকম পারমাণবিক দ্রব্য উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ধনকুবের জর্জ সোরোস তখন সোভিয়েত বিজ্ঞানীদের জন্য একটি ফাউন্ডেশন তৈরি করেন। এটার লক্ষ্য ছিল পরমাণু বিস্তার রোধ করা।

ইরানের অবস্থাও এখন অনেকটা এ রকম। বছরের পর বছর ধরে তারা অনেক বিজ্ঞানী তৈরি করেছে যারা এই ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ। তারা যদি কাজ হারিয়ে বসে, তখন অনেকেই তাদের নিয়োগ দিতে চাইবে। তখন অপরিশোধিত যেকোনো পরমাণু দ্রব্য দিয়ে বিস্ফোরক তৈরির চেষ্টা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র মনে করে প্রতিপক্ষকে হামলা করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু দৃশ্যমান শত্রুকে পরাস্ত করলেই বিপদ থেমে যায় না। বিপদ অনেক সময় বাড়তেও পারে। যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ না এটা বুঝবে, বাগদাদ ও ত্রিপোলি থেকে শিক্ষা না নিবে, তারা এমন এক বিপদের মুখে পড়বে যা কোনো ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েও ঠেকানো যাবে না।

খামেইনির মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে অনেককে আনন্দ করতে দেখা যায়। তবে শোক প্রকাশ করা মানুষের সংখ্যা তার চেয়েও বেশি। হাজার হাজার মানুষকে খামেইনির জন্য কাঁদতে, আহাজারি করতে দেখা গেছে ভিডিওতে। কারবালা ট্র্যাজেডি নিয়ে ইরানিরা যেমন মাতম করে কান্না করে, সেই দৃশ্যই যেন আবার ফুটে উঠেছে।

খামেনির হত্যাকাণ্ড ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে একেবারে মৌলিক প্রশ্নগুলোকে সামনে এনে দিয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক চলছে যে ইরান কি একটি ইসলামি রাষ্ট্র, নাকি প্রজাতন্ত্র?

শাসনের ভিত্তি কি কোরআনে বর্ণিত শরিয়াহ, যার চূড়ান্ত ব্যাখ্যার অধিকার সুপ্রিম লিডারের হাতে? নাকি রাষ্ট্র পরিচালিত হবে সংবিধানে নির্ধারিত মানুষের আইনের ভিত্তিতে, যেখানে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নীতিনির্ধারণে প্রধান ভূমিকা রাখবে?

প্রায় অর্ধশতক ধরে এই প্রশ্নগুলো কট্টরপন্থী ও বিভিন্ন সংস্কারপন্থী বা মধ্যপন্থী গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করে রেখেছে।

দেশটির জনগণও বিভক্ত। ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত অনেকগুলো আন্দোলন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল খামেইনি প্রশাসনকে। খামেইনির মৃত্যুর পর এই চ্যালেঞ্জ হয়তো কমবে না। 

হার্ভার্ডের ইতিহাসবিদ ক্রেন ব্রিনটন ‘দ্য অ্যানাটমি অব অ্যা রেভ্যুলশন’  এ লিখেছেন, “কোনো বিপ্লবের শেষ পর্যায় হলো ‘কনভালেসেন্স’-অর্থাৎ এমন এক পুনরুদ্ধারকাল, যখন সমাজ এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়ে যে স্থিতিশীলতাই তার প্রধান চাওয়া হয়ে ওঠে।”

তবে ইরানের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাব্য ‘পুনরুদ্ধার’ কেমন হতে পারে, কিংবা জনগণ আসলে কোন ধরনের স্থিতিশীলতা চাইছে তা স্পষ্ট নয়।

ইরান প্রশাসনের যা অবশিষ্ট আছে তা আরও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ইরানি রাজনৈতিক বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, খামেনির মৃত্যু অনিশ্চয়তার একটি মুহূর্ত তৈরি করেছে, কিন্তু তা তাৎক্ষণিক শাসনপতন নয়।

তিনি বলেন, “ইসলামি প্রজাতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরেই ‘পরদিনের পরিস্থিতি’ বিবেচনায় রেখে প্রস্তুতি নিয়েছে এবং এমন একাধিক ওভারল্যাপিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, যা বিশেষ করে নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামোর ভেতরে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম।”

খামেনির ‘বায়ত’ শিয়া পরিভাষায় একজন ধর্মীয় নেতার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ‘গৃহ’ বা কার্যালয়। এর সঙ্গে চার হাজারের বেশি মানুষ কাজ করতেন। তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন আরও চল্লিশ হাজারের বেশি ব্যক্তি। এগুলো নির্বাহী, আইনসভা, পার্লামেন্ট বা সামরিক কাঠামোর বাইরে আলাদা একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক, যা রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের অন্যান্য চাকরির সঙ্গেও সরাসরি মিশে যায় না।

মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় সামরিক বাহিনী রয়েছে ইরানে। তাদের সৈন্য সংখ্যা ছয় লাখ। 

হামিদরেজা আজিজির মতে, “অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব কাঠামোর দ্রুত সক্রিয় হওয়া এবং সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকা ইঙ্গিত দেয় যে ইরানে ক্ষমতা ইতোমধ্যে এমন সমষ্টিগত সিদ্ধান্তগ্রহণকারী সংস্থা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট শক্তির দিকে সরে গেছে, যারা সংকট পরিস্থিতিতে কাজ করতে সক্ষম।”

তবে দীর্ঘমেয়াদে ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন আজিজি। খামেনি ছিলেন “বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর মধ্যে চূড়ান্ত মধ্যস্থতাকারী।” তার অনুপস্থিতিতে উত্তরাধিকার প্রশ্নটি যুদ্ধকালীন চাপের মধ্যেই অভিজাত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

তিনি আরও বলেন, “একটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট হতে পারে “নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক নেতৃত্বের দিকে আরও বেশি ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া।” আরেকটি হতে পারে “দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে ধীরে ধীরে ক্ষয়,” যদিও আজিজি সতর্ক করে বলেন, সেটি “অবশ্যই একটি মসৃণ বা সুস্পষ্ট রূপান্তর হবে না।”

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির ফেলো প্যাট্রিক ক্লসন বলেছেন, “অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি এখন ক্ষমতার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামবেন, একই সঙ্গে সামরিক হামলা এড়ানোর চেষ্টাও চালাবেন।” 

তবে তার মতে, শাসনব্যবস্থা টিকে থাকলে এবং নতুন কোনো সর্বোচ্চ নেতা মনোনীত হলেও, সেই ব্যক্তি শুরুতেই খামেনির মতো একই মাত্রার মর্যাদা বা আনুগত্য পাবেন না। ফলে প্রশাসন থাকবে ভঙুর।

সব মিলিয়ে প্রশ্নটা তাই কেবল ‘ইরানে হামলা’ নয় প্রশ্ন হলো, এই শূন্যতা কি সামলাতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র? দৃশ্যমান শত্রুকে পরাস্ত করলেই বিপদ থেমে যায় না, অনেক সময় তখনই শুরু হয়। বাগদাদ ও ত্রিপোলি থেকে শিক্ষা না নিলে ওয়াশিংটন এমন এক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, যা কোনো ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েও ঠেকানো যাবে না।

(প্রজেক্ট সিন্ডিকেট ও নিউ ইয়র্কার অবলম্বনে)