যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, হামলা করবেন ট্রাম্প?

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার পারদ নতুন করে চরমে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এখন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অবস্থান করছে যেখান থেকে ইরানে হামলা চালানো সম্ভব। একই সঙ্গে তেহরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সামরিক হামলায় গেলে তার জবাব হবে “গুরুতর”।  

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের কঠোর অবস্থান, ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি, আঞ্চলিক দেশগুলোর সতর্ক দূরত্ব এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সামরিক মহড়া– সব মিলে পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেকোনো সময়  পুরোদমে সংঘাত শুরু হতে পারে পরমাণু শক্তিধর দুই দেশের মধ্যে। 

ইরানে ক্রমেই খারাপ হতে থাকা অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিবাদে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে বিক্ষোভ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ক্ষমতায় থাকা দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে তারা দেশটিতে ক্ষমতায় রয়েছেন।

গত ২০এ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “সাহায্য আসছে।” তার এই মন্তব্যের পর ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপ আসন্ন কি না, তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা শুরু হয়।

হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে আগেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে ব্যাপক দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক হামলার পথেও যেতে পারে। 

ইরানের দমন অভিযানে ইতোমধ্যে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন এবং আরও বহু মানুষ আটক রয়েছেন। 

পাল্টাপাল্টি মহড়া

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডে (সেন্টকম) মঙ্গলবার জানিয়েছে, তারা একটি ‘সামরিক মহড়া’ পরিচালনা করবে।

এই মহড়ার লক্ষ্য সেন্টকমের আওতাধীন এলাকায় যুদ্ধবিমান দ্রুত মোতায়েন, ছড়িয়ে দেওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালনার সক্ষমতা প্রদর্শন করা।

তবে এই মহড়ার নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। তবুও, ইরানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে এই মহড়াকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রক্ষেপণের সক্ষমতার একটি স্পষ্ট প্রদর্শন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ট্রাম্প একে ‘আরমাডা’ বলছেন। বড় ধরনের সামরিক নৌবহর মহড়া বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়।

আরমাডা বলতে সাধারণ কোনো নৌ-মোতায়েন নয়, বরং সমন্বিত নৌ, আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাসম্পন্ন একটি বড় যুদ্ধবহরকে বোঝানো হয়, যা স্বল্প সময়ের নোটিশেই পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানে যেতে পারে।

ধারণা করা হচ্ছে, ইরান সরকারকে ফেলে দেওয়ার জন্য ইসরায়েলি বিমানের মাধ্যমে হামলা পরিচালনা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন নৌবহরগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ারও রয়েছে। তবে এখনো সেগুলো চূড়ান্ত অবস্থানে পৌঁছায়নি।

ইরান জানিয়েছে, যে কোনো হামলাকেই তারা ‘পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচনা করবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, “আশা করি,  এই সামরিক মহড়া কোন সংঘাতের প্রস্তুতি না। তবে আমাদের সামরিক বাহিনী সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুত রয়েছে। এ জন্য ইরানজুড়ে উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।”

এ ছাড়া  হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি আকাশসীমায় সামরিক মহড়া চালানোর ঘোষণাও দিয়েছে ইরান। মহড়ার অংশ হিসেবে সেখানে সরাসরি গোলাবর্ষণসহ সামরিক কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

ঘোষণা অনুযায়ী, ২৭এ থেকে ২৯এ জানুয়ারি পর্যন্ত এই মহড়া চলবে। মহড়ার সময় ওই এলাকার আকাশসীমা ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৫ হাজার ফুট উচ্চতা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

উত্তপ্ত আঞ্চলিক পরিস্থিতির মধ্যে ইরানের এই সামরিক তৎপরতা হরমুজ প্রণালী ঘিরে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস।

তিনি বলেন,  ইরানকে কেন্দ্র করে চলা  উদ্বেগগুলো সংলাপ,  কূটনীতি ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।

এ জন্য সবপক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান তিনি।

ইরানের পরিস্থিতি

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম  দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিকভাবে উত্তপ্ত  এই পরিস্থিতিতে ইরানের রাজপথের আন্দোলন আরও চাঙা হয়ে উঠবে।

সংবাদমাধ্যমটিতে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়,  ইরানজুড়ে মর্গ ও কবরস্থানে মৃতদেহের সংখ্যা এতটাই বেড়ে যায় যে অনেক হাসপাতাল ও ফরেনসিক ইউনিট কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মরদেহে ভর্তি ট্রাক ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। কবরস্থান ও ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের কর্মীরা পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছেন ‘সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল’ হিসেবে। তাদের অভিযোগ, নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আড়াল করতেই দ্রুত ও গণহারে দাফনের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল।

একটি মর্গে কর্মরতদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটা সময় মরদেহ ভর্তি একের পর এক ট্রাক এসে পৌঁছায়, যা ওই সামাল দেওয়া ঐ প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার বাইরে ছিল। কর্মীরা আপত্তি জানালে দু’টি ট্রাক অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু পরে মর্গকর্মীরা যখন খোঁজ নেন, তখন জানতে পারেন ঐ এলাকার অন্য কোন মর্গ বা ফরেনসিক প্রতিষ্ঠানে ওই মরদেহগুলো পৌঁছায়নি।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, মরদেহগুলো সম্ভবত গণকবরে দেওয়া হয়েছিল, যার মাধ্যমে মৃতের প্রকৃত সংখ্যা গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার শঙ্কা

ইরানে বারবার হামলার কথা বলেছে যুক্তরাষ্ট্র। জল্পনা উঠেছিল দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ একাধিক রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা আমেরিকার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

ইরানে গণআন্দোলন শুরুর সময় ডনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার হামলার হুমকি দিয়েছেন। গত সপ্তাহেই তিনি বলেছেন ইরান অভিমুখে আরমাডা পাঠাবেন যেন ইরানের সামরিক পদক্ষেপ জরুরি হলে ব্যবস্থা নিতে পারেন।  

এ ছাড়া প্রভাবশালী রিপাবলিকান সেনেটর টেড ক্রুজ বলেছেন, আয়াতুল্লাহ খামেনিকে উৎখাত করতে সাধারণ বিক্ষোভকারীদের অস্ত্র সরবরাহ করা উচিত যুক্তরাষ্ট্রকে।

এক্স এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, “আমাদের উচিত ইরানের বিক্ষোভকারীদের অস্ত্র দেওয়া। আয়াতুল্লাহ-যে স্বৈরশাসক নিয়মিতভাবে আমেরিকার মৃত্যু চায়, তাকে উৎখাতে ইরানের জনগণের জন্য এটা করতে হবে। তাহলে আমেরিকা আরও নিরাপদ হবে।”

আঞ্চলিক পরিস্থিতি

ইরানের এই উত্তেজনা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও ইরানের প্রতিপক্ষ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছন, “ইরান যদি ইসরায়েলে হামলা চালায় তবে তারা চরম ভুল করবে। ইরানকে এমন জবাব দেওয়া হবে যা তারা কখনো দেখেনি।

এই বক্তব্যের কয়েকদিন আগেই হোয়াইট হাউজের সিনিয়র অ্যাডভাইজার স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। 
সেই বৈঠকে ‘আঞ্চলিক ইস্যু’ নিয়ে কথা হয়েছে বলেও জানিয়েছিলেন উইটকফ।  

এরপর ইরানের ইসলামি রেভ্যুলশনারি গার্ড কোরস (আইআরজিসি)-এর একজন কমান্ডার বলেছেন,  কোনো প্রতিবেশী দেশকে ব্যবহার করে যদি হামলা চালানো হয় তবে তাদেরও প্রতিপক্ষ মনে করবে ইরান।

তিনি বলেন, “প্রতিবেশীরা আমাদের বন্ধু। কিন্তু তাদের আকাশ, জল কিংবা স্থল যদি আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয় তবে আমরা তাদের শত্রু বিবেচনা করবো।”

এরইমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলো ইরানে হামলার জন্য নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেবে না বলে জানিয়েছে। 
ইরানের  আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ সৌদি আরবও জানিয়েছে নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ রাখতে তারা।

তবে ভূমধ্যসাগরে মার্কিন রণতরীর মোতায়েন করে আমেরিকা স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, তৃতীয় পক্ষের কোনো সহায়তার দরকার নেই তাদের।  

হামলার আশঙ্কায় জরুরি প্রস্তুতিতে ইরান

যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কার মধ্যে জরুরি প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে ইরান। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সংকটকালে রাষ্ট্রযন্ত্র সচল রাখতে একগুচ্ছ জরুরি ব্যবস্থা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোর গভর্নরদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দ্রুত আমদানির নির্দেশ দেন।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানানো হয়, পেজেশকিয়ান প্রাদেশিক প্রশাসনের হাতে বাড়তি ক্ষমতা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাতে গভর্নররা সরাসরি বিচার বিভাগ ও অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তার ভাষায়, “আমরা প্রদেশগুলোর হাতে কর্তৃত্ব দিচ্ছি, যাতে তারা নিজেরাই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”

বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো নিরাপত্তা উদ্বেগ। শীর্ষ নেতৃত্বের কেউ লক্ষ্যবস্তু হলে যেন প্রশাসনিক কার্যক্রম থমকে না যায়, সে প্রস্তুতিও এর মধ্যে রয়েছে। একই সময়ে ইরানের রেভ্যুলশনারি গার্ডস অঞ্চলটির দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, নতুন কোনো হামলা হলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। উত্তেজনাপূর্ণ এই প্রেক্ষাপটে ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ও হুঁশিয়ারি আঞ্চলিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।

হামলা হলে কী হবে

ইরানের হামলা করলেও যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি জয় নিশ্চিত করতে পারবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স এর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক উপপরিচালক এলি গেরানিয়াহের মতে, ট্রাম্পের জয়ের সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, ইরান এখন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক হুমকিতে নিজেদের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করবে।

“ট্রাম্প যেমন কড়া আঘাতের কথা ভাবছেন তা হয়তো হবে না। তবে ইরানই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এটা নিশ্চিত।”

গেরানিয়াহ বলেন, হামলার পক্ষে যারা কথা বলছেন তাদের যুক্তি এতে বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে আর সরকারেরও পতন হবে। কিন্তু গত দুই দশকে আমেরিকার এমন আগ্রাসনে দেখা যায় অস্থিরতা ও রক্তপাতই বেশি বেড়েছে।

“এর চেয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় দেশগুলোর চেষ্টা করা উচিত যে কীভাবে দ্রুত ইরান পরিস্থিতি শান্ত করা যায়,” বলেন এই বিশ্লেষক।

(দ্য গার্ডিয়ান, আল-জাজিরা, ফিন্যানসিয়াল টাইমস, বিবিসি এর প্রতিবেদন অবলম্বনে)