মতামত

যেভাবে মানবসভ্যতার জন্যই হুমকি হয়ে উঠেছেন ট্রাম্প

ডনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতির দিকে তাকালেই একটি ধারাবাহিক চিত্র স্পষ্ট হয় - পাঁচ বছর আগে আমেরিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানো সেই অভ্যুত্থানচেষ্টা থেকে শুরু করে গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে তাদের ভূখণ্ডে অভিযান; কিংবা কিউবা, কলম্বিয়া ও গ্রিনল্যান্ডের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক হুমকি - সবকিছুই একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। 

তবে এখানেই শেষ নয়, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ বা নীতি আসলে পুরো সভ্যতাকেই হুমকির মুখে ফেলেছে।

যেকোনো সভ্য সমাজের উদ্দেশ্য থাকে দুর্বলের ওপর যেন সবল আক্রমণ বা নিপীড়ন না চালায়। নাহলে আমরা স্থায়ীভাবে এমন এক বর্বর যুদ্ধে লিপ্ত হবো যেখানে শুধুমাত্র শক্তিমানেরাই টিকে থাকবে।

আমেরিকার সার্বভৌমত্বের যে মূল ভিত্তি, সেই স্বাধীনতার সনদেও এই নীতি অন্তর্ভূক্ত। এ কথা বলা রয়েছে দেশটির বিল অব রাইটসেও।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার নেতৃত্বে যে আন্তর্জাতিক আইন করা হয়েছে, জাতিসংঘের যে সনদ - সবখানেই গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইন সমুন্নত রাখার কথা বলা হয়েছে।

কিন্তু এই ভঙ্গুর নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে খুব সহজেই লঙ্ঘিত হচ্ছে। এই আদর্শকে ঠিক রাখতে হলে, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোকে স্বল্পমেয়াদের জয় থেকে নিজেদের বিরত রাখতে হবে এবং তারা যদি সেটা না মানে, তবে জবাবদিহির আওতায়ও আনতে হবে।

যখনই কোনো ব্যক্তি, করপোরেশন কিংবা রাষ্ট্র– যারা অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে বেশি শক্তিশালী, তারা দুর্বলদের ওপর আক্রমণ ও শোষণ চালায়, তখন সভ্যতার ভিত ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে শুরু করে। এই আগ্রাসন যদি সময়মতো নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, সেই ক্ষয় একসময় ভাঙনে রূপ নেয়।

আর যদি এমন আচরণ থামানো না হয়, তাহলে বিশৃঙ্খলা ও যুদ্ধের পথে এগিয়ে যায় পৃথিবী। ইতিহাস বলে, এটি নতুন কিছু নয়, এমন পতন আমরা আগেও দেখেছি।

আমরা এখন এমন এক সমাজ ও বিশ্বব্যবস্থায় বাস করছি, যেখানে বৈষম্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ক্রমেই সীমিত কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

এই বাস্তবতা শক্তিশালীদের জন্য দুর্বলদের শোষণ করা সহজ করে তোলে—কারণ তারা নিজেদের প্রায় সর্বশক্তিমান মনে করতে শুরু করে।
ইলন মাস্ক, জেফ বেজোস, মার্ক জাকারবার্গ, ল্যারি এলিসন, চার্লস কোচ— এমন হাতে গোনা কয়েকজনের সম্পদের পরিমাণ সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে।

বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, তেল কোম্পানি, সামরিক করপোরেশনগুলো এখন সারাবিশ্বেই প্রভাব বিস্তার করে রাখছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মাধ্যমে এই সম্পদ আর ক্ষমতা আরও কেন্দ্রীভূত হবে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনে যে বিধ্বংসী ক্ষমতা আছে তা মানব ইতিহাসে আর কখনো কারও কাছে ছিল না।

কংগ্রেসের ভিত ও আপসকামী রিপাবলিকান সদস্যদের সমর্থন এবং সুপ্রিম কোর্টের অনুগত সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে ডনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্সিকে ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী, এবং একইসঙ্গে সবচেয়ে জবাবদিহিহীন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রূপান্তরিত করেছেন।

এই সবকিছু মেলালে একটা অশনিসংকেত স্পষ্ট হয়।

পাঁচ বছর আগে ট্রাম্পের অভ্যুত্থানচেষ্টা ও গত সপ্তাহে নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে আসা- দুটোই বেআইনি এবং দুটোই ক্ষমতার অপব্যবহার করে করা হয়েছে। কিউবা, কলম্বিয়া ও গ্রিনল্যান্ডের ওপর ট্রাম্পের যে হুমকি তা সেই ধারবাহিকতারই অংশ।

ইউক্রেনে ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধ কিংবা তাইওয়ানের ওপর শি জিনপিংয়ের হুমকিও এই একই ছকের।

বিশ্ববাজারে একচেটিয়া উপস্থিতি নিশ্চিত করে লুটপাট চালায় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও তেল কোম্পানিগুলো। রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবেররাও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদের সঙ্গে একীভূত করেছে। তারা হয়ে উঠেছে আরও শক্তিশালী।

নিয়ন্ত্রণহীন বা সীমাহীন শক্তি আসলে কিছুই ঠিক করে না, বরং অস্থিরতা তৈরি করে ও যুদ্ধের শঙ্কা বাড়ায়।

ইতিহাস বলে, ক্ষমতাবানদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে যে আইন ও নীতিমালা গড়ে তোলা হয়, সেগুলো শেষ পর্যন্ত তাদেরই সুরক্ষা দেয়।

এই নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়লে ক্ষমতা ও সম্পদের প্রতি সীমাহীন লোভ একসময় তাদের নিজেদের পতন ডেকে আনে, সঙ্গে ডুবে যায় করপোরেশন, রাষ্ট্র কিংবা সাম্রাজ্য। আর বিশ্বে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়।

ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য আইন-অমান্য করার প্রবণতা আমেরিকা, গোটা বিশ্ব এবং মানবসভ্যতার ওপরই দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আগামী বছরগুলোতে তা ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হবে। 

লেখক: রবার্ট রেইচ, 
সাবেক মার্কিন শ্রমমন্ত্রী, 
অধ্যাপক, পাবলিক পলিসি, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া 

(দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত কলাম থেকে রূপান্তর)