আমাকে অপহরণ করা হয়েছে: নিকোলাস মাদুরো

‘আপনার পরিচয় নিশ্চিত করুন’। সামনে দাঁড়ানো ষাটোর্ধ্ব প্রৌঢ় মানুষটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন বিচারক অ্যালভিন হেলারস্টাইন। 

লোকটির পরণে নীল ও কমলা রঙের পোশাক আর খাকী রঙের প্যান্ট। নিউইয়র্ক সিটি কারাগারের বন্দিদের এই পোশাকই পরিয়ে রাখা হয়। 

নিউইয়র্ক সিটির আদালতের প্রবেশদ্বার দিয়ে তিনি যখন ঢুকলেন তখন শেকলের ঝমঝম শব্দ শোনা যাচ্ছিল। লোকটিকে শেকলবন্দী করে রাখা হয়েছে।

আদালত কক্ষ ছিল জনাকীর্ণ। দরজা থেকে এজলাসের সামনে পর্যন্ত আসার পথে দর্শকসারিতে বসা কয়েকজনের দিকে ফিরে অভিবাদন জানাতে দেখা যায় লোকটিকে।

“আমি নিকোলাস মাদুরো, স্যার, আমি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট,” শান্ত গলায় বললেন তিনি। 

“আমি গত তেসরা জানুয়ারি থেকে এখানে আছি, আমাকে অপহরণ করে আনা হয়েছে", স্প্যানিশ ভাষায় বলছিলেন তিনি। একজন দোভাষী তার বক্তব্য ইংরেজিতে অনুবাদ করে দিচ্ছিলেন। 

“ভেনেজুয়েলার কারাকাসে আমার বাড়ি থেকে আমাকে ধরে আনা হয়েছে”, আদালতের উদ্দেশে বলেন মাদুরো। 

এ পর্যায়ে এসে তাকে থামিয়ে দেন বিরানব্বই বছর বয়েসি বিচারক।

মাদুরোর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনি এসব বলার জন্য ‘উপযুক্ত সময় এবং সুযোগ’ পাবেন।

আমেরিকান সময় সোমবার বিকেলে প্রথমবারের মতো নিউইয়র্কের আদালতে হাজির করা হয় নিকোলাস মাদুরো আর তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে।

সব মিলিয়ে চল্লিশ মিনিটের মতো তারা ছিলেন সেখানে। এসময়ে নাটকীয় এক দৃশ্যের অবতারণা হয়। 

তাদের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র সংক্রান্ত অভিযোগ এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। 

এসব অভিযোগে নিজেেদেরকে নির্দোষ দাবি করেন মাদুরো ও তার স্ত্রী।

আমেরিকার আদালতে মাদুরোর বিরুদ্ধে নার্কো-সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্র, কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র এবং মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে।

“আমি নির্দোষ। আমি একজন ভদ্র মানুষ,” বলেন মাদুরো। তার স্ত্রী ফ্লোরেসও বলেন, তিনি “সম্পূর্ণ নির্দোষ”।

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে আমেরিকার ডেল্টা ফোর্স গত শনিবার রাতে আচমকা হামলা চালায়। 

ওই হামলার পর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন, তারা মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ‘গ্রেপ্তার’ করেছে এবং তাদেরকে নিউইয়র্কে নিয়ে আসা হয়েছে।

আদালত কক্ষে মাদুরো ও তার স্ত্রী - দুজনের কানেই ছিল হেডফোন। ইংরেজি থেকে স্প্যানিশ অনুবাদ শোনার জন্য এই ব্যবস্থা। 

দুজনের মধ্যিখানে বসেছিলেন ব্লেজার পরিহিত একজন আইনজীবী।

একটি হলুদ লিগ্যাল প্যাডে নোট নিচ্ছিলেন মাদুরো।

নোটপ্যাডটি যাতে নিজের কাছে রাখতে পারেন সেজন্য বিচারকের কাছে অনুমতিও চেয়ে নেন মাদুরো।

চল্লিশ মিনিট দীর্ঘ শুনানিজুড়ে তিনি ছিলেন শান্ত ও নির্লিপ্ত।

এক পর্যায়ে দর্শকসারি থেকে একজন ব্যক্তি হঠাৎ চিৎকার করে ওঠেন এবং মাদুরোর উদ্দেশে বলেন, আপনাকে ‘অপরাধের মূল্য দিতে হবে’।

সে সময়েও নির্লিপ্ত ছিলেন মাদুরো। তবে ওই ব্যক্তিটির দিকে ফিরে তিনি উচ্চস্বরে বলেন, “আমি একজন প্রেসিডেন্ট এবং একজন যুদ্ধবন্দী।”

চিৎকার করে ওঠা ওই ব্যক্তিকে অবশ্য পরে আদালত থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে লোকটির চোখে পানি ছিল।

ভেনেজুয়েলার একজন সাংবাদিক মাইবোর্ট পেতিত। তিনি বহুদিন ধরে মাদুরো প্রশাসনের সংবাদ কভার করছেন। মাদুরোকে ধরতে গিয়ে আমেরিকা কারাকাসে যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, তাতে এই সাংবাদিকের পারিবারিক বসতবাড়িরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

কারাবন্দীর পোশাকে আমেরিকান মার্শালদের পাহারায় নিকোলাস মাদুরোকে একটি আদালতকক্ষে হাজির হতে দেখার ঘটনাটি একটি “অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা", বলছিলেন মাইবোর্ট পেতিত।

মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের কপাল ও চোখের কাছে ছিল ব্যান্ডেজ। সম্ভবত আটকের সময় আহত হয়েছিলেন তিনি।

সোনালি চুল পেছন থেকে টাইট করে বাঁধা। কথা বলছিলেন মোলায়েম কণ্ঠে।

তার আইনজীবীরাই আদালতের কাছে অনুরোধ জানান, সিলিয়া ফ্লোরেসকে চিকিৎসা করানোর। তারা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের স্ত্রীর এক্সরে করানোরও দাবি জানান। আইনজীবীদের দাবি পাঁজরে আঘাত পেয়েছেন সিলিয়া এবং সম্ভবত পাঁজরের হাড়ে চিড় বা ফাটল ধরেছে।

আপাতত ফেডারেল হাজতখানাতেই থাকতে হবে মাদুরো আর তার স্ত্রীকে। 

সোমবারের শুনানিতে জামিন আবেদন করেননি তারা। তবে পরেও জামিন চাইবার সুযোগ আছে তাদের।

আমেরিকার আদালতে মাদুরোর বিরুদ্ধে নার্কো-সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্র, কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র এবং মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হয়েছে।

মাদুরোর সঙ্গে তার স্ত্রী, ছেলে এবং আরও কয়েকজন অভিযুক্ত রয়েছেন এই মামলায়।

পরবর্তী শুনানি হবে ১৭ই মার্চ।

(বিবিসি অবলম্বনে)