একের পর এক গ্রহ জয়ের স্বপ্ন দেখা ধনকুবের ইলন মাস্ক হঠাৎ ক্ষমা চাইলেন ভারতের এক কোটিপতির কাছে। তবে ক্ষমা মানে ক্ষমা নয়। কার্যত খোঁচা দিয়েই নিজের এক্স হ্যান্ডেলে লিখে বসলেন, “আমি বুঝতে পারিনি, আপনিই ভারতের ‘রিয়েল বস’। এজন্য আমাকে ক্ষমা করবেন।”
পোস্টে মুকেশ আম্বানিকেই প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সম্বোধন করেছেন মাস্ক। এটি গত ৯ই অক্টোবরের ঘটনা।
কিন্তু মহাকাশ জয়ের অন্যতম কারিগর ইলন মাস্কের মতো পরাক্রমশালী ব্যক্তি কেন হুট করে প্রকাশ্যে এমন উষ্মা জানালেন। এর নেপথ্যে আছে ভারতের কোটি কোটি ডলারের স্যাটেলাইট বাজার আরু ইলন মাস্কের স্টারলিংকের আটকে থাকা এক লাইসেন্স।
অভিযোগের তীর ও বিতর্ক
ভারতে নিজের স্যাটেলাইট ব্র্যান্ড স্টারলিংকের ব্যবসার অনুমোদন নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই চরম অসন্তোষ প্রকাশ করছিলেন ইলন মাস্ক। এই দেরি হওয়ার জন্য তিনি পরোক্ষভাবে আম্বানির একচেটিয়া ব্যবসা বা মনোপলিকেই দায়ী করছেন।
স্টারলিংক চালুর চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে কেন দেরি হচ্ছে, এই প্রশ্ন তুলে সরাসরি আম্বানিকে নিশানা করেন মাস্ক। আগেরদিন, অর্থাৎ ৮ই অক্টোবর তিনি অভিযোগ করেন, ‘কিছু নাম না জানা শক্তিশালী কায়েমী স্বার্থগোষ্ঠী’ ভারতে তার স্টারলিংকের প্রবেশ আটকে দিচ্ছে।
ভারতের সবচেয়ে বড় মোবাইল নেটওয়ার্ক 'জিও'-র মালিকানা আম্বানির রিলায়েন্স গ্রুপের হাতে। মাস্কের অভিযোগ, “নির্দিষ্ট কিছু অলিগার্ক ভারতীয় গ্রাহকদের ওপর নিজেদের একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখতে চাইছে।”
তিনি যোগ করেন, "আপনারা খুব সহজেই ধরে নিতে পারেন তারা কারা" এবং ভারতে স্টারলিংককে বাধা দেওয়াকে "ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে এক ধরনের অপরাধ" হিসেবে আখ্যা দেন।
দিল্লির জবাব ও আম্বানির নীরবতা
ভারতের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় অবশ্য মাস্কের এসব অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা জানিয়েছে, দেশটির স্যাটেলাইট যোগাযোগ নীতি পুরোপুরি নিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্টারলিংক, ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েব এবং জিও স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন্স, তিনটি সংস্থাই অনুমোদন প্রক্রিয়ার প্রায় একই পর্যায়ে আছে।
বাণিজ্যিকভাবে সেবা শুরু করার আগে তিনটি প্রতিষ্ঠানকেই চূড়ান্ত নিরাপত্তা ছাড়পত্র ও তরঙ্গ বরাদ্দের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ভারতের নীতি বৈষম্যমূলক, মাস্কের এমন ইঙ্গিতকে তারা "ভিত্তিহীন ও ভুল ধারণাপ্রসূত" বলে উড়িয়ে দেয়।
সরকারের এই জবাবে অবশ্য মন গলেনি মাস্কের। ক্ষোভ উগরে দিয়ে এক্সে লেখেন, "১৬৫টিরও বেশি দেশে স্টারলিংক অনুমোদিত এবং পাঁচ বছর ধরে আমরা ভারত সরকারের প্রতিটি আইন ও শর্ত পুরোপুরি মেনে চলছি। তাহলে এখনও কেন লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না? আম্বানিই কি ভারতের আসল বস?"
এই বাক্যবাণের বিষয়ে মুকেশ আম্বানি বা রিলায়েন্স গ্রুপ প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। সম্প্রতি দিল্লির 'ইন্ডিয়া মোবাইল কংগ্রেস'-এ সাংবাদিকরা এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে রিলায়েন্স জিও ইনফোকমের চেয়ারম্যান আকাশ আম্বানি (মুকেশ আম্বানির ছেলে) স্রেফ এড়িয়ে গিয়ে বলেছেন, "আমরা কোনো বিতর্কে না গিয়ে মাথা নিচু করে ভারতীয় গ্রাহকদের সেরা মূল্যে সেবা দিতে চাই।"
প্রতিযোগিতার জটিল সমীকরণ
এই বিতর্ক এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ভারতের উদীয়মান স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাজারে রিলায়েন্স জিও এবং ভারতী এয়ারটেলও নিজস্ব সেবা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তবে সমীকরণটি বেশ জটিল। স্টারলিংক এরই মধ্যেই রিলায়েন্স জিও এবং ভারতী এয়ারটেল, দুই ভবিষ্যত প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথেই কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে। ২০২৫ সালের মার্চে দুই প্রতিষ্ঠানই ভারতে স্টারলিংকের যন্ত্রপাতি ও সেবার জন্য স্পেসএক্সের সাথে চুক্তি করেছিল। যদিও বিষয়গুলো চূড়ান্ত সরকারি অনুমোদনের ওপর নির্ভর করে।
নিরাপত্তা আর দাম
ভারতের বাজারে স্টারলিংকের ব্যবসা শুরুর বাধাগুলোর অন্যতম হলো 'নিরাপত্তা সংক্রান্ত দুশ্চিন্তা'। ২০২৪ সালে ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে মাদক বিরোধী অভিযান এবং মণিপুরে সেনা অভিযানে স্টারলিংকের যন্ত্রাংশ উদ্ধারের দাবি করেছিল। মাস্ক অবশ্য পরিষ্কার জানিয়েছিলেন, ভারতে স্টারলিংকের সেবা কখনও চালু করা হয়নি, ফলে উদ্ধার হওয়া যন্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
আরেকটি বড় প্রশ্ন, দাম। ভারতে যেখানে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের সাশ্রয়ী ইন্টারনেটের প্রয়োজন, সেখানে স্টারলিংক কতটা মানানসই হবে?
যুক্তরাষ্ট্রে স্টারলিংকের প্রাথমিক 'রেসিডেন্সিয়াল প্যাক'-এর খরচই প্রতি মাসে ৫৫ ডলার। ভারতের বাজার বিশ্লেষকদের মতে দেশটির সাধারণ গ্রাহকের জন্য এটি বাজেটের বাইরে। যদিও মাস্ক দাবি করেছেন, ভারতে সেবা চালুর মাধ্যমে তারা সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেবেন।
বিশ্বের ১৬৫টি দেশে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া ইলন মাস্কের স্টারলিংক মহাকাশের কক্ষপথে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখছে। কিন্তু ভারতের বাজারে ঢুকতের পারেনি।
আর এর ফয়সালা 'স্পেসএক্সের' রকেটে নয়, বরং দিল্লির নীতি আর আম্বানিদের কৌশলেই নির্ধারিত হবে।