সৌদির বিমানবন্দরে হামলা, বাংলাদেশিসহ ১২ জন নিহত

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১২ জন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে আরো ৩০৯ জন। 

নিহতদের মধ্যে দুইজন বাংলাদেশি নাগরিক। আরো আছেন চারজন সৌদি নাগরিক এবং আমেরিকা, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান এবং মিশরের একজন করে নাগরিক। 

কিং খালেদ বিমানবন্দরে হামলায় যারা আহত হয়েছে তাদের অ্যাম্বুলেন্স ও হেলিকপ্টারযোগে হাসপাতালে নেওয়া হয়।  এদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। 

রিয়াদে এই হামলার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ঢাকা–রিয়াদ–ঢাকা রুটের বিজি৩৩৯ ও বিজি৩৪০ ফ্লাইট দুটি পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত করেছে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় বিমানবন্দরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফ্লাইট দুইটির নতুন সময়সূচি পরে জানানো হবে। ভোগান্তিতে পড়া যাত্রীদের বিমানের কল সেন্টারে যোগাযোগ করার বা নিকটস্থ টিকিট কাউন্টারে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

সৌদি নেতৃত্বাধীন একটি সামরিক জোট এই ঘটনার জন্য হুথি বিদ্রোহীদের দায়ী করেছে।  তারা এই হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং কঠোর জবাব দেবার ঘোষণা দিয়েছে।

হুথি মিডিয়া অফিসের প্রধান এক্স-এ দেয়া একটি পোস্টে দাবি করেছেন, তার “রিয়াদের আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে”। 

তারা বলছে, ইয়েমেনের সৌদি সমর্থিত সরকার সোমবার থেকে হুথিদের উপর হামলা শুরু করার পর সৌদি আরবকে যুদ্ধাঞ্চল ঘোষণা করেছে। বিদেশি বিমানগুলোকে সৌদি আকাশসীমা এড়িয়ে চলতে বলেছে তারা।
গত এক সপ্তাহের মধ্যে রিয়াদের বিমানবন্দরে এই নিয়ে তৃতীয়বারের মত একটি হামলা হল।  গত এক দশকে সৌদি আরবে এই রকম ভয়াবহ হামলার ঘটনা আর একটিও ঘটেনি। 

এমন সময়ে এই ঘটনা ঘটলো যখন ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবে তাদের অবস্থান পোক্ত করার জন্য জোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। 

এ ধরণের হামলার জন্য দেশটিতে ঝুঁকি সতর্কতা ব্যবস্থা থাকলেও এই হামলার ব্যাপারে কোন সতর্কতা জারি করা যায়নি আগেভাগে। হামলাটি ছিল একেবারেই আকস্মিক। 

হুথিদের সাথে সংঘাতের এই সময়ে এ ধরণের হামলা মোকাবেলার ক্ষেত্রে সৌদি সতর্কতা ব্যবস্থা যে কতটা দুর্বল তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো শনিবারের এই হতাহতের ঘটনা। 

এই হামলার পর বিমানবন্দরটির সকল কার্যক্রম স্থগিত আছে বলে জানিয়েছে দেশটির সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। ফ্লাইট ট্র্যাকার সাইট ফ্লাইটরেডার টোয়েন্টিফোর থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, রিয়াদ অভিমুখী সব ফ্লাইট হয় বাতিল হচ্ছে নয়তো ঘুরিয়ে দেয়া হচ্ছে ভিন্ন গন্তব্যে।  শুধুমাত্র রিয়াদের ওই বিমাবন্দরের ওপর একটি হেলিকপ্টারকে চক্কর কাটতে দেখা যাচ্ছে। 

এমন সময় রিয়াদের বিমানবন্দরে একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে যখন শহরটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বিনিয়োগ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে।  আয়োজকরা বলছেন শনিবারের এই হামলার পরও তারা সম্মেলন বাতিল করবেন না।   

প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান

শনিবারের এই হামলার একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলছেন, তিনি হঠাত একটি বিস্ফোরণ ঘটতে দেখেন এবং সাথে সাথে বেশ কিছু মানুষকে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখেন।

এর কিছু পরেই কয়েক ডজন অ্যাম্বুলেন্স ছুটে আসে সেখানে।  রয়টার্সের নিশ্চিত করা একটি ভিডিওতে দেখা যায় এয়ারপোর্টের দিকে অ্যাম্বুলেন্স ছুটে আসছে। 

একজন আহত যাত্রী রয়টার্সকে বলেন, তিনি আকাশ থেকে একটি উড়ন্ত বস্তু ছুটে আসতে দেখেন। তারপরই বহির্গমন গেটের কাছের ছাদ ভেঙে পড়ে। 

সৌদি আরবের জেনারেল অথরিটি অব সিভিল এভিয়েশনের এক্স হ্যান্ডেলের পোস্ট

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

রিয়াদের মার্কিন দূতাবাস বলছে, তারা ‘হামলা সম্পর্কে অবগত’ এবং ওই এলাকায় নিজেদের নাগরিকদের চলাচল এড়িয়ে যেতে পরামর্শ দিয়েছে। 

এই হামলার পরই হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে সাংবাদিকেরা জিজ্ঞেস করেন, হুথিবিরোধী হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের যোগদানের কোন পরিকল্পনা আছে কি-না? 

জবাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন,“আমরা হয়তো এটা করবো।  এটা খতিয়ে দেখছি। সাম্প্রতিক হামলার বিষয়টি কেবলই জানলাম। এখন একটা সিদ্ধান্ত নেব।”

“আমরা দ্রুতই সিদ্ধান্ত নেব”, বলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিও হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, তারা নির্দোষ বেসমারিক মানুষের জীবনের প্রতি নগ্ন অবজ্ঞা প্রদর্শন করলো।”

এ হামলার নিন্দা জানিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, জাতিসংঘ, মিশর, কাতার, ফিলিস্তিন এবং জাপান।

হুথি-সৌদি দ্বন্দ্ব

হুথিদের ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে বিতাড়িত করতে সৌদি আরব ২০১৫ সালে ইয়েমেন যুদ্ধে জড়ায়। এর আগের বছরগুলোতে ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে হুথিরা দফায় দফায় হামলা চালিয়ে আসছিলো। 

এই যুদ্ধ প্রলম্বিত এবং রক্তক্ষয়ী হয়েছে। যুদ্ধে এবং দুর্ভিক্ষে ইয়েমেনে লাখলাখ প্রানহাণি হয়েছে। সংঘাত বন্ধে ২০২২ সালে হুথিদের সাথে একটি শান্তিচুক্তিতে একমত হয় সৌদি আরব।  তবে গত গ্রীষ্মে সেই শান্তিচুক্তি ভেঙ্গে পড়ে।