বিরোধীরা হয়তো একটু বাড়িয়েই কথা বলেন। কিন্তু তারপরও শনিবার দিনভর দিল্লিতে যা ঘটেছে তার কিছুটা নমুনা মিলতে পারে কংগ্রেস নেতা শশি থারুরের একটি মন্তব্যের মধ্যে দিয়ে।
ককরোচ জনতা পার্টির কর্মসূচি ঠেকাতে শনিবার দিল্লিতে যে পরিমাণ পুলিশ ও প্যারা মিলিটারি মোতায়েন করা হয়েছে, শশি থারুরের ভাষায় সেটার তুলনা হতে পারে স্রেফ ‘যুদ্ধকালীন’ পরিস্থিতির সঙ্গে, যা অত্যন্ত ‘লজ্জাজনক’।
সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লিখেছেন, “বেলা দুটোর দিকে আমি রাজধানীতে ফিরে যা দেখেছি তা কদাচিৎ প্রত্যক্ষ করেছে দিল্লি।”
“চলাচলের স্বাধীনতাকে পুরোপুরি শৃঙ্খলিত করা হয়েছে” - লিখেছেন তিনি।
শশি থারুরের এই বক্তব্যের মাধ্যমে কীভাবে দিল্লির শনিবারের চিত্র ফুটে উঠে সেই বিবরণ দেয়ার আগে জানিয়ে রাখি, সোশ্যাল মিডিয়ায় দিল্লির চিত্র খুব বেশি আসছে না।
কারণ রীতিমত অ্যাডভাইজরি জারি করে দিল্লিতে সোশ্যাল মিডিয়া ব্লকেড তৈরি করেছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার, যেমনটি বাংলাদেশের মানুষ দেখেছিলো ২০২৪ সালের জুলাই মাসে।
তারপরও দিল্লির বিমানবন্দরে অবতরণ করা বিমান থেকে যখন ককরোচ জনতা পার্টির প্রধান ব্যক্তি অভিজিত দিপকে-কে পুলিশের তুলে নেওয়ার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছে মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ।
“তোমরা যদি মনে করে কারাগারের ভয় দেখিয়ে আমাদের থামিয়ে দেবে তাহলে তোমরা ভুল করছো”, আটক হবার সময় বলেন অভিজিত দিপকে।
এ বছরই একটি সোশ্যাল মিডিয়া মিমকে কেন্দ্র করেই অনলাইনে লাখ লাখ কর্মহীন ভারতীয়ের জমাট ক্ষোভকে একটি আন্দোলনে রূপ দেয়ার মূল কারিগর একত্রিশ বছর বয়সী এই অভিজিত দিপকে।
দিপকে’র আটকাবস্থার মধ্যেই ঘটে গেছে তার জীবনের অত্যন্ত বেদনাদায়ক এক ঘটনা। দিল্লি থেকে বহুদূর মহারাষ্ট্রের হিঙ্গলি এলাকার গ্রামের বাড়িতে মারা গেছে তার বৃদ্ধ দাদী। আটক অবস্থায় দাদীর শেষকৃত্যেও হয়তো যোগ দিতে পারবেন না দিপকে।
অভিজিত দিপকে-কে আটক করার পর ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) তাদের আপৎকালীন নেতা ঘোষণা করেছে আজিঙ্কা সিন্ধে’কে।
শুক্রবার রাত থেকে সিজেপির শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দলটির দাবি।
একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সারকে আটক করা হয়েছে - যিনি জার্মানি থেকে ভারতে এসেছিলেন শনিবারের দিল্লির এই কর্মসূচিতে যোগ দেয়ার জন্য।
তার ওপর প্রধানমন্ত্রী মোদীর ব্যক্তিগত ক্ষোভ থাকার জোর সম্ভাবনা আছে।
বিগত জাতীয় নির্বাচনের সময়েই মোদীবিরোধী অবস্থান নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় জোর প্রচারণা চালিয়েছিলেন জার্মানপ্রবাসী ভারতীয় নাগরিক ধ্রুব রাঠি।
ভারতের গণমাধ্যমকে তিনি মনে করতেন মোদীর অনুসারী এবং নাম দিয়েছিলেন ‘গোদি মিডিয়া’।
অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, বিগত নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি যে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি তার পেছনে কিছুটা হলেও ভূমিকা রয়েছে এই ধ্রুব রাঠির।
এমন ব্যক্তি এরকম একটি অস্থির সময়ে সরকারের ভাষায় ‘সহিংসতা উসকে দিতে’ ভারতে এলে তাকে যে আটক করা হবে, এমন ধারণা তিনি নিশ্চয়ই আগেই করে রেখেছিলেন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যভোটে হারিয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা যে নারী মুখ্যমন্ত্রীর দলকে বিরোধীর আসনে পাঠিয়েছে বিজেপি, সেই তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জিকেও আটক করেছে নরেন্দ্র মোদীর পুলিশ।
বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া রিপোর্ট করেছে, দলবল নিয়ে যন্তর মন্তর উপলক্ষে যাত্রা শুরু করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। সাউথ অ্যাভিনিউ এলাকায় পুলিশ আটকে দিলে সেখানেই তিনি বসে পড়েছিলেন। সেখান থেকেই আটক করা হয় তাকে।
মমতা ব্যানার্জিকে থানায় নেয়ার পর দলের চারজন এমপিকে নিয়ে সেখানেই তিনি অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন বলে এখন শোনা যাচ্ছে।
দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই ভিজায়ানকেও আটক করেছে দিল্লি পুলিশ।
একদিনে দিল্লি পুলিশ আটক করলো তিনজন সাবেক মুখ্যমন্ত্রীকে।
আটক হয়েছেন তরুণ আন্দোলনকারীদের একজন প্রিয় মুখ নেহা বোরা।
দক্ষিণ দিল্লির সফদরজঙ্গ বিমানবন্দর ফ্লাইওভারের কাছ থেকে পুলিশ আটক করে। তিনি দিল্লি হাট নামের একটি জায়গায় কর্মসূচি পালন করছিলেন। এ কারণে ফ্লাইওভারে চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
নেহা বোরা তখন স্লোগান দিচ্ছিলেন, “দিল্লি হাটই আমাদের যন্তর মন্তর। জ্ঞানেশ কুমার নিপাত যাক।”
নেহা বোরা ও তার সমর্থকদের যখন একটি বাসে করে ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো পুলিশ, অন্য আন্দোলনকারীরা তখন বাসটিকে বেশ কিছুক্ষণ অবরুদ্ধ করে রাখে।
পুলিশ এদিন আটক করে একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদকেও । তিনি যন্তর মন্তর যাচ্ছিলেন একটি প্ল্যাকার্ড হাতে করে।
পুলিশের এই আটক অভিযানে ক্ষুব্ধ হয়ে ভারতীয় অ্যাকটিভিস্ট সোনাম ওয়াংচুক ঘোষণা দিয়েছেন, আটককৃতদের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে মুক্ত করা না হলে তিনি আরেকটি অনশন করবেন নাহলে পদযাত্রা কর্মসূচি শুরু করবেন।
গত জুলাই মাসে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে সিজেপির প্রথম আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে ছাব্বিশ দিন টানা অনশন করেছিলেন ওয়াংচুক।
যেখানেই বাধা সেখানেই যন্তর মন্তর
শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তর অভিমুখে সকল রাস্তা বন্ধ করে দেয় পুলিশ।
দশ হাজারের বেশি পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। অর্ধশতাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেয়া হয়।
এদিন দিল্লির প্রধান রেলওয়ে স্টেশনে বহু ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়।
স্টেশনে আটকে পড়েন শত শত যাত্রী।
দিল্লির কেন্দ্রস্থল কনট প্লেসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক জায়গা যন্তর মন্তর।
যন্তর মন্তর থেকে ৫ মিনিটের হাঁটাপথ জনপথ মার্কেট। শনিবার বিকেলে এই জায়গাটায় খুব ভিড় হয়।
দিল্লিতে আসা ট্যুরিস্টরা সাধারণত এই মার্কেট থেকেই তাদের কেনাকাটা সারেন।
কিন্তু এই শনিবারটা ছিলো ভিন্ন।
বিবিসির একজন সাংবাদিক বিকেলবেলা সেই জায়গায় গিয়ে দেখতে পেয়েছেন ‘লকডাউনের মত’ পরিস্থিতি।
মার্কেটের চারদিকের সরু গলিগুলোর মুখে বসানো ছিলো ভারী ভারী লোহার ব্যারিকেড।
কাউকেই ঢুকতে দিচ্ছিলো না পুলিশ। এমনকি সাংবাদিকদেরও না।
একজন টুরিস্টকে বলতে শোনা যায়, “ইশ! কালকে যে কেন কেনাকাটা করলাম না? এখন আর কিছু কেনাই হবে না আমার!”
শনিবার যে পথেই যন্তর মন্তর অভিমুখে যেতে চেয়েছে কেউ, সেই পথেই পুলিশের বাধার মুখে পড়েছে।
হয় আটক হয়েছে, নয়তো লাঠিপেটায় ছত্রভঙ্গ হয়েছে।
এক পর্যায়ে সিজেপি সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কর্মসূচি পালনের।
সিজেপির আপৎকালীন নেতা আজিঙ্কা সিন্ধে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করা এক ভিডিওতে বলেছেন, “দিল্লি পুলিশ যেখানেই আপনাকে আটকাবে, সেটাই হবে আপনার যন্তর মন্তর।”
এর আগে নেহা বোরাও, ‘যেখানে বাধা সেখানে বসেই আন্দোলনের’ ডাক দিয়েছিলেন, কিন্তু এক পর্যায়ে আটক হন তিনি।
সকাল থেকেই সাংবাদিকেরা যন্তর মন্তরের কর্মসূচি কভার করার জন্য সেখানে জড়ো হলেও বিকেল নাগাদ সেখান থেকে সাংবাদিকেরা জানাচ্ছেন, যন্তর মন্তরে শেষ পর্যন্ত কিছুই হচ্ছে না।
কারণ পুলিশ সেখানে বিক্ষোভকারীদের জড়ো হতেই দেয়নি।
বিকেল নাগাদ সাংবাদিকেরা সেখান থেকে সরে গেছেন।
কিন্তু পুলিশ তাদের অবস্থান অটল রেখেছে।
খবর পাওয়া যাচ্ছে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী এখনো যন্তর মন্তরের দিকে এগোনোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
কারা এই ককরোচ, কেন তাদের আন্দোলন?
ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি কোন আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়।
ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া একটি মিম থেকে এই আন্দোলনের জন্ম যা ভারতে একটি গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
প্রধান বিচারপতি সুরইয়া কান্ট গত মে মাসে ভারতের বেকারদের তেলাপোকার সাথে তুলনা করে একটি বক্তব্য দেন বলে কথিত আছে - যদিও তিনি পরে বলেছেন এটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বলা।
এটা থেকে মিম হয় এবং সেই মিম থেকেই ভারতের ক্ষুব্ধ বেকারেরা ইন্টারনেটে গড়ে তোলে ককরোচ আন্দোলন। যা পরে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি নাম নেয়, যে নামটিকেই অনেকে মনে করেন বিজেপিকে ব্যঙ্গ করে রাখা।
গত জুলাই মাসে প্রথম এই দলটি ইন্টারনেট থেকে বাস্তবে নেমে আসে প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদ জানিয়ে। তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে।
ওই আন্দোলন ৫ সপ্তাহব্যাপী চলে। যা শেষ হয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে। অনেকেই সেবার মনে করেছিলেন সেই আন্দোলন বিজেপি সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলো।
সিজেপির এবারের এই দ্বিতীয় দফার আন্দোলন ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে।
তার নেতৃত্বে ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন হচ্ছে। কিন্তু সিজেপির অভিযোগ, তিনি বিজেপির স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে কোটি কোটি বিরোধী ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দিতে সাহায্য করছেন।
এই অভিযোগ অবশ্য বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
আন্দোলন ‘ফ্লপ’?
শনিবারের ঘটনাপ্রবাহকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দল বিজেপির একজন মুখপাত্র বর্ণনা করেছেন “কিছু নৈরাজ্যবাদী শক্তির ভারতকে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা” হিসেবে।
বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র এবং এমপি সম্বিত পাত্রা বলেছেন, “আপনারা যন্তর মন্তরে যা দেখছেন, কিছু সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে যা দেখছেন, সেটা পুরো ভারতের গল্প নয়”।
“ভারত শান্ত এবং সুশাসনের অধীনেই সামনে এগিয়ে যাচ্ছে”, তিনি বলেন।
তিনি আরো বলেন, “নৈরাজ্যবাদীরা” রাজধানীতে ‘ধ্বংসযজ্ঞ” এবং ‘সহিংসতা’ আমদানির চেষ্টা করেছে, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে।
“নৈরাজ্যবাদীদের ফ্লপ শোয়ের সব উপাদান পুরোপুরি ধসে পড়েছে”, বলেন তিনি।
নরেন্দ্র মোদীর প্রশাসন এবং তার দল বিজেপি দিল্লিতে ককরোচ পার্টির এই কর্মসূচিকে কতটা ‘ফ্লপ’ করতে পেরেছেন সেটা তর্কসাপেক্ষ।
তবে বিশ্ব গণমাধ্যমে এটি নিঃসন্দেহে একটি ‘হিট শো’।
কারণ শনিবার সারা দুনিয়ার নজরই ছিলো দিল্লির ওপর, যার পরিচালক থেকে শুরু করে অভিনয়শিল্পী - সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিলো সিজেপি নামে অনলাইনে গড়ে ওঠা একটি জেন-জি জনগোষ্ঠী।
আর এই জনগোষ্ঠীর এই ‘শো’ আদৌ শনিবারেই শেষ হয়ে গেল কি না, নাকি সামনে আরো চলবে, এবং সেটার ফলাফল শেষ পর্যন্ত কী হবে, সেটা সময়ই বলে দেবে।
কিন্তু সিজেপির এই তেলাপোকাদের ‘যন্ত্রণা’ থেকে নরেন্দ্র মোদী ও তার দল বিজেপি যে সহসাই পরিত্রাণ পাচ্ছেন না, তারা যে বারবারই নতুন নতুন ‘যন্ত্রণা’ নিয়ে হাজির হবেন, সেকথা বলা যায় নিঃসন্দেহে।