মায়ের কাছে ফিরে যেতে চাইছিলো না হাতি শাবকটি

একটা ফেইসবুক পোস্ট। কয়েকটা ভিডিও। প্রমত্তা তিস্তার স্রোতে একটি হাতি শাবকের ভেসে হারিয়ে যাওয়া। তারপর তার মায়ের কাছে ফিরে আসতে পারা। পেছনে কিছু মানুষের আপ্রাণ চেষ্টা। তিস্তায় ভেসে যাওয়া হাতির ছানাটি উদ্ধার এবং তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার গল্প সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই দেখেছেন। এই ঘটনাটি মানুষকে কী রকম পজিটিভ এনার্জি, ভালোলাগার অনুভূতি দিয়েছে- তা আমরা জানি। 

পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি জেলায় তিস্তার স্রোতে ভেসে যাচ্ছে একটি হাতি শাবক। দেখতেই ছুটে গেলো স্থানীয় জেলেদের দল। কোনোরকম দেরি না করে নৌকা নিয়ে তীব্র স্রোতের মধ্যে শাবকটির কাছে ছুটে যান তারা। অবশেষে উদ্ধার করা হয় ডুবন্ত শিশুটিকে। এরপর জেলেরা নিজেদের উদ্যোগেই তাকে তুলে দেন বৈকন্ঠপুর বন দপ্তরের  কাঠামবাড়ি রেঞ্জের কর্মীদের হাতে। এরপর মা হাতি নদীর চরে চলে এলে, বন দপ্তরের কর্মীরা ছোট্ট হাতিটিকে সেদিকে পাঠিয়ে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই মায়ের কাছে শাবক পৌঁছে যায়। হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে ফিরে পেয়ে মা তাকে আদর দিয়ে সাথে নিয়ে চলে যায়। সংক্ষেপে এটাই ঘটনা।

তবে এই ঘটনার সাথে ছিলো আরেকটি ঘটনা, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় বা প্রকাশিত খবরে অনেকেই দেখতে পাননি। তা হলো, উদ্ধারের পর একটা সময় যখন শিশুটিকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছিলো, তখন বাচ্চাটি প্রথমে মায়ের কাছে ফিরতে চাচ্ছিলো না। বরং সে উদ্ধারকারীদের পিছে পিছেই চলে আসতে নিচ্ছিলো। পরে তাকে বেশ বুঝিয়ে মায়ের কাছে পাঠানো হয়। এ গল্পের সেই অংশটা আসছে একটু পরে। 

ঘটনার পেছনের অনেক গল্প জানা গেছে পশ্চিমবঙ্গের বনবিভাগের একজন কর্মকর্তা, ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসার নবাংকুর ঘোষের ফেইসবুক পোস্ট থেকে। ঘটনার দিন সকাল ৮টার দিকে তিনি কাঠামবাড়ি হেডকোয়ার্টারের বিট অফিসার গোলাম সারওয়ার আম্বিয়ার ফোন পান। সারওয়ার আম্বিয়া তাকে জানান যে, তিস্তা নদীতে একটা সদ্যজাত হাতির শাবক ভেসে আসছে, গজলডোবা ১২নং থেকে স্থানীয় মৎস্যজীবীরা এবং গজলডোবা পুলিশ পোস্টের এ এস আই বিপিন তাকে খবর দিয়েছেন।

হাতিটিকে উদ্ধার করে নৌকায় তোলা হচ্ছে।

আবার, ওইদিনই শুরু হয়েছে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। বনবিভাগের স্টাফদের ডিউটি ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপদে জঙ্গল পার করে দেওয়া। তবে এর মধ্যেও একদমই সময় নষ্ট না করে সারওয়ার আম্বিয়া স্টাফ জোগাড় করে গাড়ি নিয়ে রওনা দেন গজলডোবা ১২নং এর উদ্দেশ্যে। নবাংকুর নিজেও দ্রুত বাইক নিয়ে রওনা হয়ে যান। 

সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন যে, সকালের দিকে গজলডোবা ব্যারেজের উজানে তারঘেরা থেকে সরস্বতীপুরের জঙ্গলে যাওয়ার সময় হাতির পাল থেকে একটি সদ্যজাত (আনুমানিক ৫-৬ দিন হবে বয়স) হাতির শাবক তিস্তার স্রোতে ভেসে যায় এবং দল থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং আর্তনাদ করতে থাকে। বাচ্চাটি ব্যারেজের লক গেটের মধ্যে দিয়ে গলে গিয়ে ভাটির দিকে ভেসে যেতে থাকে। তখনই সেখানের স্থানীয় মানুষজন এবং মৎস্যজীবীরা ঘটনাটি খেয়াল করেন এবং তাদের খবর দেওয়ার সাথে সাথে তৎপরতার সাথে উদ্ধারকাজ শুরু করেন।

ছোট্ট শাবকটি তিস্তার পানিতে হাবুডুবু খেতে খেতে প্রায় আরো ২-৩ কিলোমিটার ভেসে যায়। এরই মধ্যে বনবিভাগের টিম সে জায়গায় পৌঁছে যায়। উত্তরবঙ্গ মৎস্যজীবী ফোরামের সদস্য বাবলু দাস, অজয় দাস, গোপাল দাস, মিঠু দাস, বিশ্বনাথ দাস অত্যন্ত দূরদর্শিতা, উপস্থিত বুদ্ধি এবং সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তাদের ছোট্ট নৌকায় হাতি শাবককে উদ্ধার করেন এবং পাড়ের দিকে নিয়ে আসেন। ইতিমধ্যে সালুগাড়া রেঞ্জের স্টাফ এবং রেঞ্জ অফিসার নিশ্চিত করেন যে মা হাতি এবং দল সরস্বতীপুরের জঙ্গলের নিচে তিস্তার চরে অবস্থান করছে এবং মা তার বাচ্চার খোঁজে তীব্র চিৎকার করেই চলেছে।

বাবলু দাস, অজয় দাস, গোপাল দাস, মিঠু দাস, বিশ্বনাথ দাসরা হাতি শাবককে উদ্ধার করেন।

নবাংকুর ঘোষ লিখেছেন, তাদের ডিএফওকে জানানো হয় পুরো বিষয়টা। বেঙ্গল সাফারি থেকে পশু চিকিৎসক ডা. নিক রওনা দিয়ে দেন ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে। তখন তাদের মাথায় যে চিন্তা ছিলো তা হচ্ছে বাচ্চা হাতিটার সুস্থতা এবং কোথায় কীভাবে চিকিৎসা করানো যায় সেসব।

তবে বেলাকোবার রেঞ্জ অফিসারের সাথে কথা বলে তারা ঠিক করেন দ্রুত বাচ্চাকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। দ্রুত শাবকটিকে মায়ের সাথে মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করাই যথাযথ কাজ হবে। নবাংকুর এখানে উল্লেখ করেন যে, বেশি মানুষের স্পর্শে, গন্ধে থাকলে দল হাতি এমনকি মা হাতিও তার বাচ্চা আর ফিরিয়ে নেয় না বলে তারা মনে করেন। 

নবাংকুর ঘোষ একজন অভিজ্ঞ এবং নিবেদিত পেশাদার, কাজেই নিশ্চয়ই তার এই কথার একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। আবার এটি আসলেই সঠিক ধারণা, নাকি কেবলই মনগড়া চিন্তা- সেটা ঠিকঠাক বোঝার জন্য ইন্টারনেটে অনেক ধরনের তথ্যই রয়েছে।

দ্য গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনে হাতি কখনো তার বাচ্চাকে পরিত্যাগ করতে পারে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত লেখা হয়েছে। সেখান থেকে জানা যায়, এটা ঘটতেও পারে, তবে সেটা খুবই বিরল। নিউ ইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটির হান্টার কলেজের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক জোশুয়া প্লটনিক প্রায় ২০ বছর ধরে হাতির আচরণ নিয়ে গবেষণা করছেন। প্লটনিকের মতে, হাতি ছানা অসুস্থ বা আহত হলেও তাকে "পরিত্যাগ করার ঘটনা খুবই বিরল"। এর কারণ হলো মা হাতি তার সন্তানের পেছনে অনেক শ্রম আর ভালোবাসা দিয়ে সময় দেয়, লালন পালন করে। এদের গর্ভধারণ কাল প্রায় দুই বছর স্থায়ী হয় এবং ছানারা আরও বেশ কয়েক বছর মায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে। ছানা কিছুটা অসুস্থ বা আঘাত পেলে মা নিজেই সেটা সারিয়ে ফেলতে পারে।

তবে তিনি এও বলেন, "হাতি মা এবং পরিবার কখনো কখনো কোনো ছানাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে, বিশেষ করে মা যদি মানসিক চাপে থাকে, অথবা যখন পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি পালের বাকি সদস্যদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে"। এ ছাড়া মা মারা গেলেও ছানারা একা হয়ে যেতে পারে।

বাচ্চাটিকে এরপর মায়ের অবস্থানের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জন্য সবাই রওনা দেন। এরপর শুরু হয় তাদের চ্যালেঞ্জের পরবর্তী অধ্যায়, মা এবং বাচ্চা হাতির রিইউনিয়নের চেষ্টা। এ কাজে তারা বেশ হিমশিম খেয়ে যান। কারণ, তিস্তার বালিতে হাঁটা খুবই সমস্যার। অল্প পানিতে সেটা চলাচলের জন্য আরও কঠিন হয়ে যায়। পা গেঁথে যায় খুব সহজেই। বোঝাই যায় না কোথায় কতটা শক্ত কতটা নরম। অনেক কষ্ট কসরত করে বাচ্চা হাতিটিকে বেশ খানিকটা দূরে চরের কাশবনের ধারে বালি জমিতে ছেড়ে দিয়ে টিমের সবাইকে চলে আসতে বলা হয়। কিন্তু তখন শুরু হয় আরেক মজার সমস্যা। যে গল্পটা এখন বলার রয়েছে। শিশুটি তখন মায়ের কাছে যাওয়ার বদলে স্টাফদের পিছু পিছু চলে আসতে থাকে। 

এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি লিখেছেন, যখন কোনো বাচ্চা পশুকে উদ্ধার করা হয়, তখন অনেকসময় সে ভেবে নেয় যারা তাকে উদ্ধার করেছে অথবা তার সাহায্য করেছে, তারাই তার পরিবার বা প্রিয়জন, তাই তাদেরই ফলো করে। যতবার তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়, সে উল্টে পিছু পিছু উল্টো দিকে আসতে থাকে। এ কারণেই মায়ের কাছে না গিয়ে হাতির শাবকটি তার উদ্ধারকারীদের সাথে সাথেই ফিরে আসতে চাচ্ছিল প্রথমে।

এদিকে মা হাতি আর দল ঠিক উল্টো দিকে। বাঁধের উপর থেকে ভিড় কমিয়ে আবার স্টাফদের দিয়ে বাচ্চার মুখ মা হাতির দিকে করানো হয়। ততক্ষণে মা হাতি অনেকটা কাছাকাছি চলে আসে। এবার সবাই উপর থেকে সেই মুহূর্তের অপেক্ষা করতে থাকেন। বেশ কিছুক্ষণ পরে শুরু হয় সেই সন্ধিক্ষণ। মা হাতি এসে রীতিমত গর্জন করে বাচ্চাকে শুঁড় দিয়ে জড়িয়ে গ্রহণ করে। এরপর বাঁধ দিয়ে উঠে মা আর বাচ্চা নলবন আর কাশবনের মধ্যে দিয়ে মিলিয়ে যায়। একটু পরে খোঁজ নিয়ে তারা জানতে পারেন যে, দলের সাথে যুক্ত হয়ে গেছে মা আর সন্তান।

নবাংকুর সবশেষে বলেছেন, "এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে এখনো কিছু ভালো মানুষের জন্যেই পৃথিবীটা এতো সুন্দর। মায়ের কোলে বাচ্চাকে ফিরিয়ে দেওয়ার যে অনুভূতি তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এটা মানুষ বন্যপ্রাণ সহাবস্থান রক্ষার এবং কনজারভেশন এফোর্ট-এর প্রতি কমিউনিটি লেভেলের নিরলস প্রচেষ্টার এক জীবন্ত উদাহরণ হিসাবে থেকে যাবে"।