একটি চীনা মহাকাশযান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিশ্লেষকরা। পৃথিবীর কক্ষপথে অবস্থানরত যানটির আশপাশে আরও অনেক বাণিজ্যিক ও সামরিক স্যাটেলাইট হাজির ছিলো। এক সময় মহাকাশযানটি থেকে একটি ছোট স্যাটেলাইট বের হয়ে বাকি স্যাটেলাইটগুলোর আশেপাশে একবার ঘুরে আবার ভেতরে ভেতর ফিরে যায়। বিষয়টিকে হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করলেও চীন তা অস্বীকার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা লিওল্যাবসের বরাত দিয়ে এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে মহাকাশে শক্তিশালী দেশগুলোর শক্তি প্রদর্শন এবং যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতির বিবরণ দিয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স।
রয়টার্স উল্লেখ করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও এ ধরনের একটি গোয়েন্দা মহাকাশযান আছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এমন যান তৈরি ও পরিচালনার সক্ষমতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দুটি দেশই সংঘাতের সম্ভাবনা মাথায় রেখে মহাকাশে সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
চীনা সামরিক গবেষকরা মহাকাশে ব্যবহারের উপযোগী বিভিন্ন সামরিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছেন।এর মধ্যে স্যাটেলাইট থেকে শুরু করে এমন মহাকাশযান আছে যা অন্যান্য মহাকাশযানকে আটক করতে পারে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য মহাকাশে একটি যৌথ সামরিক অভিযান চালিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্পেইস ফোর্সের চিফ অব স্পেইস অপারেশনস জেনারেল চ্যান্স সল্টসম্যান বলেন, “চীনারা দ্রুতগতিতে তাদের মহাকাশ সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, এর মধ্যে মহাকাশে বিভিন্ন টার্গেটকে ধ্বংস করার মতো অস্ত্রের নকশাও আছে।” তার কথা, মহাকাশে চীন একটি ‘উল্লেখযোগ্য হুমকি’ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধক্ষেত্রে স্যাটেলাইটের ভূমিকা বাড়ছে। উক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতগুলোতে যোগাযোগ, নেভিগেশন ও গোয়েন্দা তৎপরতার ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনী প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইটকে অকেজো করে দিতেও স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
মার্কিন বিমানবাহিনীর এয়ার ওয়ার কলেজের সাবেক অধ্যাপক এভারেট ডোলম্যান বলেন, “মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতার ব্যাঘাত ঘটলে তা আমাদের সামরিক সক্ষমতাকে পঙ্গু করে দেবে।” এতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা থেকে শুরু করে গোয়েন্দা তৎপরতার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানান তিনি।
পৃথিবীর কক্ষপথে স্যাটেলাইট ও মহাকাশযানের ভিড় বেড়ে যাওয়ায় মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ‘প্রতিযোগিতা’ বাড়ছে। বর্তমানে স্পেইস এক্সের ১১ হাজার স্যাটেলাইট পৃথিবীর কক্ষপথে চলমান। এদিকে মহাকাশভিত্তিক মিসাইল ইন্টারসেপ্টর তৈরির জন্য ‘গোল্ডেন ডোম মিসাইল ডিফেন্স প্রোগ্রাম’ পরিচালনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর বিপরীতে চীনও একই রকম কর্মসূচি পরিচালনা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্পেইস কমান্ড জানায়, গত বছর সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের সাথে মহাকাশে দেশটির যৌথ অভিযান দেখাচ্ছে যে, মিত্র দেশগুলোকে সাথে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশে অভিযানের সক্ষমতা আছে। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে মহাকাশের গুরুত্ব ক্রমশ বেড়ে চলছে এবং দেশটি তার মিত্রদের সাথে মিলে জাতীয় ও সামরিক স্বার্থ রক্ষার জন্য মহাকাশে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাবে।
যুক্তরাজ্যের স্পেইস কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল পল টেডম্যান চলতি বছরের এপ্রিলে একটি সম্মেলনে বলেন, “পৃথিবীতে সামরিক অভিযানকে সমর্থন করতে এবং তার মোড় বদলে দিতে মহাকাশের ব্যবহার খুবই জরুরি।”
এদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বেইজিং মহাকাশে অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে, বরং তারা শান্তিপূর্ণভাবে মহাকাশকে ব্যবহার করতে চায়। গোয়েন্দা মহাকাশযানের বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা তাও মহাকাশে সামরিক হুমকির মুখে আছেন বলে মনে করছেন। ইউএস স্পেইস কমান্ডের প্রধান জেনারেল স্টিফেন হুয়াইটিং বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষরা দেশটির সামরিক সক্ষমতার ক্ষতি করতে তাদের মহাকাশ সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। তার কথা, এসব হুমকির মোকাবেলা করতে যুক্তরাষ্ট্রকে মহাকাশে আরও ‘মারমুখী’ অবস্থান নিতে হবে। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্বার্থ রক্ষা নয়, প্রতিপক্ষের সামরিক সক্ষমতাকে হুমকি দেওয়ার ক্ষমতাও থাকতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
পৃথিবীর কক্ষপথে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া - তিন দেশই এমন সব স্যাটেলাইট চালায়, যেগুলো অন্য মহাকাশযানকে আটকাতে কিংবা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম। এসব মহাকাশযানে ক্ষেপণাস্ত্র কিংবা লেজারের মতো অস্ত্র যোগ করা সম্ভব। বেইজিং ও মস্কোর এমন মহাকাশ প্রযুক্তি আছে যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি হুমকি হতে পারে বলে উল্লেখ রয়েছে প্রতিবেদনে।
এছাড়া, মস্কোর বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে সক্ষম স্যাটেলাইট তৈরির অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কথা অস্বীকার করেছে রাশিয়া। জুনে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেইস ফোর্স ঘোষণা দিয়েছে, তারা এমন একটি ‘ইলেকট্রোম্যাগনেটিক অস্ত্র’ তৈরি করেছে যা শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইট অকার্যকর করে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, চীন এক ধরনের ‘ডগফাইটিং স্যাটেলাইট’ তৈরি করেছে, যেখানে অনেকগুলো স্যাটেলাইট একসাথে সমন্বয় করে চলতে পারে, এবং অন্য পক্ষের একটি স্যাটেলাইটকে আটকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে পারে।
এদিকে সামরিক বাহিনীর সাথে কাজ করা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা নেট দিয়ে অন্য স্যাটেলাইটকে আটকে ফেলার মতো সামরিক স্যাটেলাইট উদ্ভাবন করছেন বলেও জানিয়েছে রয়টার্স। যদিও এসব উদ্ভাবনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি চীনের সামরিক বাহিনী। তবে তাদের একটি প্রতিবেদনে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং যুদ্ধে বিজয় অর্জনের ক্ষেত্রে মহাকাশ নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য।