রূপালি পর্দার গ্ল্যামারাস হলিউড তারকা। জন্ম জার্মানিতে বটে। কিন্তু লড়েছেন হিটলারের বিরুদ্ধেই। এটাই ছিল মার্লিন ডিট্রিখের জীবন।
বার্লিনে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই অভিনেত্রীর নিজ দেশের মানুষের প্রতি টান থাকলেও, নাৎসি বাহিনীর নির্মমতার প্রতিবাদে স্বেচ্ছায় ছেড়েছিলেন মাতৃভূমি, ছেড়েছিলেন নাগরিকত্ব।
হলিউডের শুরুর দিকের এই সাহসী তারকা নিজের আকাশচুম্বী খ্যাতিকেই নাৎসির বিরুদ্ধে এক মোক্ষম অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন।
হিটলার তাকে নাৎসি প্রোপাগান্ডার প্রধান মুখ হিসেবে দেশে ফেরাতে চাইলেও, ডিট্রিখ বেছে নিয়েছিলেন মার্কিন নাগরিকত্ব।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শুধু আর্থিক সহযোগিতা নয়, ইহুদিদের প্রাণে বাঁচানো, রেডিও প্রোপাগান্ডায় কণ্ঠ দেওয়া থেকে শুরু করে রণাঙ্গনে ছুটে গিয়ে মিত্রবাহিনীর হয়ে কাজও করেছিলেন।
ক্যাবারে থেকে হলিউড
১৯০১ সালে বার্লিনে জন্ম নেওয়া ডিট্রিখের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল আর সহিংসতার প্রভাবের ভেতর দিয়ে।
যুদ্ধপরবর্তী বার্লিনে যখন চারদিকে যখন হতাশা, তখন সেখানকার শিল্পচর্চায় নতুন জোয়ার আসে। অন্য অনেকের মতো ডিট্রিখও সেই শিল্প ও বিনোদনের দুনিয়ায় নিজেকে যুক্ত করেন।
ক্যাবারে গায়িকা ও ড্যান্সার হিসাবে খুব দ্রুতই নামডাক ছড়িয়ে পড়ে। প্রথা ভেঙে ‘উভকামী’ হিসাবে তার ‘বিতর্কিত’ জীবনযাপন সেনসেশনে পরিণত করেছিলো।
জার্মান সিনেমাতেও কাজ শুরু করেন। ১৯৩০ সালে জার্মান সিনেমা ‘দ্য ব্লু অ্যাঞ্জেল’-এর সাফল্যের পর ডিট্রিখ হলিউডের খ্যাতনামা প্রযোজনা সংস্থা প্যারামাউন্ট পিকচার্সের নজরে পড়েন।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অল্প সময়ের মাঝেই তিনি বিশ্বের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেত্রীদের একজনে পরিণত হন।
হিটলারের প্রলোভন প্রত্যাখ্যান
হলিউডে তার জনপ্রিয়তায় চোখ পড়ে নাৎসিদের। তারা মরিয়া হয়ে ওঠে জার্মানিতে ফিরিয়ে নিতে। তারা চেয়েছিলো ডিট্রিখ যেন নাৎসি প্রোপাগান্ডা ও ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির গ্ল্যামারাস মুখ হয়ে ওঠেন।
জোয়াকিম ফন রিবেনট্রপের মতো উচ্চপদস্থ নাৎসি কর্মকর্তারা তাকে জার্মানির শীর্ষ তারকা বানানোর লোভনীয় প্রস্তাব দেন।
খোদ অ্যাডলফ হিটলার ডিট্রিখের সমর্থনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। হিটলার তার সিনেমার অন্ধ ভক্ত ছিলেন। কথিত আছে যে, তিনি এই অভিনেত্রীকে তার ‘রক্ষিতা’ বানাতে চেয়েছিলেন।
ক্ষমতার মোহ অবশ্য টলাতে পারেনি ডিট্রিখকে। নাৎসিদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং প্রকাশ্যে নিন্দা জানান।
তার সাহসের মাত্রা এতোটাই বেশি ছিলো যে, এক ব্রিটিশ রেডিওতে তিনি হিটলারকে সরাসরি ‘ইডিয়ট’ বলেন।
এই অপমানের জবাবে ক্ষুব্ধ নাৎসি সরকার তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ তকমা দেয় এবং জার্মানিতে তার অভিনীত সব সিনেমা ও গান নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
তবু টলেননি ডিট্রিখ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই ডিট্রিখ নাৎসিদের বিরুদ্ধে কাজ শুরু করেছিলেন। ১৯৩৭ সালে তিনি জার্মান নাগরিকত্ব ছেড়ে দেন।
বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা বিলি ওয়াইল্ডারের সাথে মিলে একটি বিশেষ তহবিল গড়েন, যার মূল উদ্দেশ্য ছিলো ইহুদি ও অন্যান্য বিপন্ন শিল্পীদের নাৎসি জার্মানি থেকে নিরাপদে পালাতে সাহায্য করা।
১৯৩৭ সালে ‘নাইট উইদাউট আর্মার’ সিনেমায় অভিনয় করে পাওয়া তার পারিশ্রমিক তিনি এই তহবিলে দান করে দেন।
পার্ল হারবারে ১৯৪১ সালে জাপানি হামলার পর মিত্রবাহিনীর যুদ্ধ প্রচেষ্টায় স্বেচ্ছায় যোগ দেওয়া প্রথম সারির সেলিব্রিটিদের একজন ছিলেন তিনি।
যুদ্ধ পরিচালনার অর্থ জোগাড় করতে তিনি সারা যুক্তরাষ্ট্র ঘুরে পারফর্ম করেন। ১৯৪৩ সালের মধ্যে তিনি ট্যুরে থাকা অন্য যেকোনো তারকার চেয়ে সর্বোচ্চ পরিমাণ ‘ওয়ার বন্ড’ বিক্রি করেছিলেন।
কণ্ঠেই যুদ্ধের হাতিয়ার
নাৎসিদের প্রত্যাখ্যান করলেও ডিট্রিখের জনপ্রিয়তা কাজে লাগায় যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা। সিআইএ’র পূর্বসূরি অফিস অফ স্ট্র্যাটেজিক সার্ভিসেস বা ওএসএস প্রোপাগান্ডা সঙ্গীত তৈরির জন্য ডিট্রিখকে নিয়োগ দেয়।
তারা ‘মুজাক প্রজেক্ট’ নামে একটি অভিনব মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু করে। এর উদ্দেশ্য ছিলো গানের আড়ালে নাৎসি বিরোধী বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া।
ডিট্রিখ এই প্রকল্পের জন্য সৈন্যদের কাছে জনপ্রিয় গানগুলো জার্মান ভাষায় রেকর্ড করতে রাজি হন। ‘লিলি মার্লিন’, ‘মিন টু মি’, ‘টাইম অন মাই হ্যান্ডস’-এর মতো শ্রোতাপ্রিয় গানগুলো তিনি নতুন করে রেকর্ড করেন।
নাৎসি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এই গানগুলো প্রচার করা হতো। মাতৃভাষায় গাওয়া এই বিষাদময় ও আবেদনময়ী গানগুলো জার্মান ও ইতালীয় সৈন্যদের মনোবল ভেঙে দিতে বেশ প্রভাব রেখেছিলো।
রণাঙ্গনেও হাজির
১৯৪৪ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মিত্রবাহিনীর ‘ইউএসও’ ট্যুরে সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং দুঃসাহসী পারফর্মার হিসেবে আবির্ভূত হন ডিট্রিখ।
বিং ক্রসবি এবং অ্যান্ড্রুজ সিস্টার্সের মতো তারকাদের সাথে নিয়ে উত্তর আফ্রিকা থেকে শুরু করে ফ্রান্সের ফ্রন্টলাইন পর্যন্ত লাখ লাখ সৈন্যেদের মনোবল বাড়াতে ছুটে যান তিনি।
নাৎসিদের হিটলিস্টে থাকা একজন ‘চিহ্নিত বিশ্বাসঘাতক’ হওয়া সত্ত্বেও তিনি যুদ্ধের ময়দানের এত কাছাকাছি গিয়ে পারফর্ম করতেন যে, স্বয়ং জেনারেল জর্জ প্যাটনের মতো দুর্ধর্ষ সামরিক কমান্ডাররাও তার সাহস দেখে অবাক হয়ে যেতেন !
মিত্রবাহিনীর কাছ থেকে সম্মানসূচক ‘কর্নেল’ পদবি পাওয়া এই তারকা তার হাস্যরসাত্মক কমেডি পারফরম্যান্স, চমৎকার পোশাক এবং সুমধুর গানের মাধ্যমে সামরিক কর্মীদের মুগ্ধ করে রাখতেন।
সহশিল্পীরা রসিকতা করে বলতেন, “ডিট্রিখ তো সবসময় আমাদেরও মেরে ফেলার ব্যবস্থা করতো।” কারণ, আশেপাশে গোলাবর্ষণ চলছে। ফ্রস্টবাইট ও ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির মতো প্রতিকূল পরিবেশ, কোনো কিছুই তাকে আটকাতে পারত না।
তিনি সবসময় রণাঙ্গনের কাছাকাছি থাকতেন। বিদ্যুৎহীন অস্থায়ী মঞ্চে তিনি অনায়াসে নাচতেন, গ্ল্যামারাস জুতো ছেড়ে ভারী সামরিক বুট পরতেন।
আরামদায়ক হোটেল ছেড়ে সেনাক্যাম্পের তাঁবুতে ঘুমাতেন, সাধারণ সৈন্যদের সাথে বসে খাবার খেতেন, তাদের প্রশিক্ষণে অংশ নিতেন এবং প্রায়ই আহত সেনাদের সেবা করতে হাসপাতালে ছুটে যেতেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার এই অসামান্য ও নিঃস্বার্থ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৪৭ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান তাকে ‘মেডেল অফ ফ্রিডম’ সম্মাননায় দেন।
পুরস্কার নেওয়ার পর ডিট্রিখ বলেছিলেন, এটিই তার জীবনের সবচেয়ে বড় ও গর্বের অর্জন।