রাজনীতির চিত্র বদলাতে খুব বেশি সময় লাগে না, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক রাজনীতিতে একই সময়ে দেখা যাচ্ছে দুই বিপরীত চিত্র।
একদিকে হাঙ্গেরিতে ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সহযোগিতামূলক সম্পর্কের আলোচনা এবং দুই পরাশক্তির নেতৃত্বে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা নতুন এক কর্তৃত্ববাদী যুগের আগমেনর শঙ্কা তৈরি করছে।
তাই প্রশ্ন উঠছে- বিশ্ব আসলে কোন দিকে যাচ্ছে? গণতন্ত্রের দিকে, নাকি কর্তৃত্ববাদের দিকে?
এই জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানির হার্টি স্কুল এবং বার্গগ্রুয়েন ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে ‘২০২৬ বার্গগ্রুয়েন গভার্নেন্স ইনডেক্স’ বা বিজিআই।
প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ১৪৫টি দেশের শাসনব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে।
এতে বলা হয়েছে, বিশ্ব রাজনীতির গল্পটি অতোটা সরল নয়। কেবল যে গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদই আছে এমন না।
১৪৫টি দেশের শাসনব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে বিশ্বকে চারটি আলাদা ‘শাসন জগতে’ ভাগ করেছে বিজিআই।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি দেশের শাসনব্যবস্থার অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। তারা আগেও যে কাতারে ছিলো, ২৩ বছর পরেও মূলত সেই কাতারেই রয়ে গেছে।
অর্থাৎ বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত গণতন্ত্র বা কর্তৃত্ববাদের জয়-পরাজয় নয়, বরং এক ধরনের স্থবিরতা।
তবে এই স্থবিরতার মধ্যেও কিছু দেশ এগিয়েছে, কিছু দেশ পিছিয়েছে এবং ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় বাড়তে পারে তাদের সক্ষমতার ব্যবধানও।
শাসনব্যবস্থা মাপার তিনটি মাপকাঠি
বিজিআই-এর বিশ্লেষণ বুঝতে হলে প্রথমে ‘গভর্ন্যান্স ট্রায়াঙ্গেল’ বা ‘শাসন ত্রিভুজ’ ধারণাটি বোঝা জরুরি। সহজ ভাষায়- একটি দেশ কতটা ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা তিনটি বিষয় দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যাকে বিজিআই বলছে ‘গভর্ন্যান্স ট্রায়াঙ্গেল’ বা ‘শাসন ত্রিভুজ’।
‘গভর্ন্যান্স ট্রায়াঙ্গেল’-এর প্রথমটি হলো- রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা। অর্থাৎ- শুধু আইন তৈরি করা না, সেই আইন বাস্তবায়ন, প্রশাসন চালানো, সংকট মোকাবিলা এবং নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার ক্ষমতা সরকারের কতটা আছে।
দ্বিতীয়টি গণতান্ত্রিক জবাবদিহি। এর অর্থ হলো- জনগণ, আদালত, নির্বাচন, গণমাধ্যম ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছে কতটা জবাবদিহি করে সরকার।
একটি সরকার ক্ষমতায় আছে বলেই সেটি জবাবদিহিমূলক সরকার হয়ে যায় না। বরং সরকার ভুল করলে তাকে থামানো বা সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা সেই রাষ্ট্রে আছে কি না।
তৃতীয়টি হলো- জীবনযাত্রার মান বা সরকারি সেবা। একটি দেশের নাগরিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামোসহ প্রয়োজনীয় জনসেবা কতটা পাচ্ছেন, সেটিই এখানে মূল বিবেচনা।
এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে দেখলেই বোঝা যায়, শুধু গণতান্ত্রিক নির্বাচন থাকলেই একটি রাষ্ট্র ভালোভাবে পরিচালিত হয় না।
আবার কর্তৃত্ববাদী সরকার দ্রুত অবকাঠামো বা অন্যান্য সরকারি সেবা দিতে পারলেই সেটিকেও দীর্ঘমেয়াদে সফল শাসনব্যবস্থা বলা যায় না।
শাসনব্যবস্থার চার জগৎ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের দেশগুলো মূলত চারটি স্থায়ী ‘শাসনব্যবস্থার জগতে’ বা ‘গভর্ন্যান্স ওয়ার্ল্ডস’- এ বিভক্ত হয়ে আছে। গত ২৫ বছরে ৮০ শতাংশেরও বেশি দেশ তাদের নিজস্ব 'জগৎ' থেকে বের হতে পারেনি।
বিজিআই-এর চারটি শ্রেণির মধ্যে প্রথমটিতে রয়েছে ‘শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’।
পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, উরুগুয়ে ও কোস্টারিকার মতো ৩৯টি দেশ এখানে রয়েছে। এসব দেশ গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা এবং নাগরিকদের সরকারি সেবা- তিন ক্ষেত্রেই তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থান রয়েছে।
দ্বিতীয় শ্রেণিতে রয়েছে ‘সীমিত সক্ষমতার রাষ্ট্র’। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং লাতিন আমেরিকার বড় অংশসহ ৪৫টি দেশ রয়েছে এই শ্রেণিতে।
এসব দেশে মানুষ ভোট দিতে পারে, সরকারকে প্রশ্ন করার সুযোগও তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু সরকার সবসময় জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও অন্যান্য সরকারি সেবা নিশ্চিত করতে পারে না।
অর্থাৎ জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতা আছে, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রশাসনিক সক্ষমতা সেই চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।
তৃতীয় গোষ্ঠী হলো ‘কর্তৃত্ববাদী ও মিশ্র শাসনব্যবস্থার’ দেশ। চীন, রাশিয়া, বেলারুশ, ভিয়েতনামসহ ২৯টি দেশ এতে রয়েছে। এসব দেশে নাগরিকদের জন্য কিছু ক্ষেত্রে ভালো সরকারি সেবা থাকলেও গণতান্ত্রিক জবাবদিহি অনেক কম।
সবচেয়ে নিচে রয়েছে ‘কম সক্ষমতার উন্নয়নশীল রাষ্ট্র’। হাইতি, পাকিস্তান, পাপুয়া নিউগিনি এবং সাব-সাহারান আফ্রিকার বড় অংশসহ ৩২টি দেশ এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি এবং নাগরিক সেবা—তিন ক্ষেত্রেই এদের দুর্বলতা বেশি।
সবকিছু মিলিয়ে বিজিআই-এর ফলাফল বলছে, ভবিষ্যতে বড় সংকট মোকাবিলায় দেশগুলোর সক্ষমতার পার্থক্য আরও বাড়তে পারে। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের কারণে উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি বা অর্থনৈতিক সংকট তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে সামলাতে পারবে।
কিন্তু দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য এসব সংকট মোকাবিলা করা অনেক বেশি কঠিন হতে পারে।
২৩ বছরেও বদলায়নি বিশ্বের বড় অংশ
এই চারটি গোষ্ঠীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তাদের স্থায়িত্ব। ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৮০ শতাংশের বেশি দেশ একই ‘গভর্ন্যান্স ওয়ার্ল্ড’-এ থেকে গেছে। অথচ এই সময়ের মধ্যে বিশ্ব অনেক ধরনের পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে।
এই সময়ে বিশ্ব দেখেছে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, কোভিড-১৯ মহামারি, একাধিক যুদ্ধ ও সংঘাত। এতো পরিবর্তনের পরও দেশের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার মৌলিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন হয়নি।
২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মাত্র একটি দেশ শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দলে নতুন করে ঢুকেছে। সেটি হলো জামাইকা।
বিপরীতে, এই গোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে গেছে পাঁচটি দেশ। আর্জেন্টিনা, বতসোয়ানা, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ও হংকং। অর্থাৎ শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গোষ্ঠীতে প্রবেশ করার চেয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যাওয়া সহজ।
কর্তৃত্ববাদ কি সত্যিই বেশি কার্যকর?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ হলো ‘ইলিবারেল ডেমোক্রেসি’ বা অনুদার গণতন্ত্র। যার অর্থ হলো, একটি দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ঠিকই, কিন্তু বিজয়ী দল বা নেতা ধীরে ধীরে দেশের আদালত, গণমাধ্যম ও নির্বাচন কমিশনকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।
হাঙ্গেরির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান তার শাসনব্যবস্থাকে প্রকাশ্যে 'ইলিবারেল ডেমোক্রেসি' বলতেন। ওরবান ও তার দল প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য নষ্ট করলেও, সরকারি ঋণ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনুদান দিয়ে নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান বজায় রেখেছিলেন।
একইভাবে আসে চীনের উদাহরণ। প্রতিবেদন বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে চীনের গণতান্ত্রিক জবাবদিহি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অবকাঠামো সূচক ৭৩ থেকে বেড়ে ৯৭ হয়েছে।
তবে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি অনেক কম হলেও অবকাঠামো উন্নয়নে দেশটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। একে বলা হয় 'অথরিটেরিয়ান বার্গেইন' বা একনায়কতান্ত্রিক চুক্তি। অর্থাৎ, সরকার জনগণকে বলে, “তোমরা রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অধিকারের দাবি ছেড়ে দাও, আমরা তোমাদের সুন্দর রাস্তাঘাট ও জীবনমান দেব।”
এখান থেকেই আসে ‘কর্তৃত্ববাদী সমঝোতা’ ধারণাটি। সহজভাবে বললে, নাগরিকরা যদি রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহির কিছু ঘাটতি মেনে নেন, বিনিময়ে সরকার যদি উন্নত জীবনযাত্রা, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিতে পারে, তাহলে সেই ব্যবস্থাকে এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী সমঝোতা বলা যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মডেল দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই।
বিজিআই-এর তথ্য অনুযায়ী, অবকাঠামো ও সরকারি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক কর্তৃত্ববাদী দেশ অগ্রগতি করলেও রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং অর্থনীতিকে বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।
চীন, রাশিয়া, বেলারুশ, ভিয়েতনাম ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো কর্তৃত্ববাদী ও মিশ্র শাসনব্যবস্থার দেশগুলোকে একই শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। এই গোষ্ঠীর অনেক দেশ অবকাঠামো ও সরকারি সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রগতি করলেও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, নারী রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনীতির বৈচিত্র্যের মতো ক্ষেত্রে কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে।
গণতন্ত্রে শুধু ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচন করাই যথেষ্ট নয়। সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তার সিদ্ধান্তের ওপর আদালত, সংসদ, গণমাধ্যম, বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের নজরদারি থাকে। এতে সিদ্ধান্ত নিতে কখনও বেশি সময় লাগতে পারে, কিন্তু সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত চিহ্নিত ও সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়।
এ কারণেই গণতন্ত্রের শক্তি শুধু সরকার নির্বাচনের মধ্যে নয়, বরং সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখার ব্যবস্থাতেও।
গণতন্ত্র কি তাহলে ফিরতে পারে
একটি দেশে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে গেলে সেটি যে সবসময় ধীরে ধীরে আরও খারাপের দিকে যাবে, এমন নয়। জনগণ চাইলে ভোট ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে।
এখানে সবচেয়ে বড় উদাহরণ হাঙ্গেরি। ওরবানের দীর্ঘ শাসনে দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনে হাঙ্গেরির রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখিয়েছে, গণতন্ত্রের এই পতন চিরস্থায়ী নয়। জনগণ চাইলে ভোটের মাধ্যমে আবারও ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহি ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ব্রাজিলেও একই ধরনের ঘটনা দেখা গেছে। ২০০০ সালে দেশটির গণতান্ত্রিক জবাবদিহির স্কোর ছিল ৮৮, যা ২০১০-এর দশকের শুরুতে ৯২-এ ওঠে।
তবে জাইর বোলসোনারো ক্ষমতায় এলে ২০১৯ সালে স্কোর নেমে ৭৭ হয়। একই সময়ে পরিবেশ সুরক্ষাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
২০২৩ সালে লুলা দা সিলভা ক্ষমতায় ফিরলে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির স্কোর আবার ৮৪-এ ওঠে এবং পরিবেশগত সূচকও উন্নত হয়।
অর্থাৎ, কোনো দেশে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়লেই তা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায় না। রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও শক্তিশালী করা সম্ভব। তবে নির্বাচন, আদালত, গণমাধ্যম ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সময় ও ধারাবাহিক সংস্কার প্রয়োজন।
বিজিআই-এর মতে, গণতন্ত্র ও শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করার দুটি পথ রয়েছে। একটি হলো ‘গ্র্যান্ড বার্গেইন’। মানে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত সংস্কার আনা। অন্যটি হলো ‘ইনক্রিমেন্টালিজম’। মানে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা।
ধরুন, কোনো দেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি সরকার বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী ক্ষমতায় আছে। হঠাৎ বড় ধরনের গণআন্দোলন বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সেই ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে গেলো। এরপর নতুন সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ মিলে নতুন নিয়ম, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করলো। এটাই হলো গ্র্যান্ড বার্গেইন।
আর্মেনিয়া এর বড় উদাহরণ। ২০১৮ সালের ‘ভেলভেট রেভল্যুশন’-এর মাধ্যমে দেশটিতে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে। ২০১৫ সালে দেশটির গণতান্ত্রিক জবাবদিহির স্কোর ছিলো ৫৩ যা ২০২০ সালে ৮০-তে উঠে যায়।
অন্যদিকে, ‘ইনক্রিমেন্টালিজম’ মানে হলো একবারে বড় পরিবর্তন না এনে ধীরে ধীরে, ছোট ছোট সংস্কারের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা।
ধরুন, কোনো দেশের বিচারব্যবস্থা দুর্বল। সরকার একদিনে পুরো ব্যবস্থাকে বদলে না দিয়ে প্রথমে বিচারকদের স্বাধীনতা বাড়ালো। পরে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার করলো। এরপর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়া্লো। এভাবে একটি সংস্কারের পর আরেকটি সংস্কার করতে করতে ধীরে ধীরে পুরো শাসনব্যবস্থা উন্নত করাই হলো ইনক্রিমেন্টালিজম।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে
বিজিআই-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, বিশ্ব এখন একসঙ্গে গণতন্ত্র বা কর্তৃত্ববাদের কোনো একটি দিকে এগিয়ে যাচ্ছে না। কিছু দেশে গণতন্ত্র শক্তিশালী হচ্ছে, কিছু দেশে কর্তৃত্ববাদ বাড়ছে, আবার অনেক দেশে বড় কোনো পরিবর্তনও হচ্ছে না। ফলে ভবিষ্যতে বিশ্ব রাজনীতিতে গণতন্ত্র বা কর্তৃত্ববাদ—কোনো একটিরই নিশ্চিত জয় হবে, এমনটা বলা যাচ্ছে না।
বরং আগামী দিনের রাজনীতিতে বড় ভূরাজনৈতিক ঘটনা নয়, ছোট ছোট প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সরকার আদালতের স্বাধীনতা কতটা রাখছে, গণমাধ্যমকে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিচ্ছে, প্রশাসনকে কতটা দক্ষ করছে, নাগরিকদের কতটা ভালো সেবা দিচ্ছে; এসব সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত একটি দেশের শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
অর্থাৎ আগামী দিনের লড়াই হয়তো গণতন্ত্র বনাম স্বৈরতন্ত্রের লড়াই হবে না। আসল লড়াই হবে সক্ষম রাষ্ট্র বনাম দুর্বল রাষ্ট্র, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান বনাম ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন বনাম অবক্ষয়ের মধ্যে।
বিজিআই-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোনো দেশ একবার যে অবস্থায় পৌঁছেছে, সেখানেই তাকে চিরকাল থাকতে হবে এমন নয়। রাজনৈতিক পরিবর্তন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে একটি দেশ ভালো বা খারাপ, দুই দিকেই যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করছে, কতটা জবাবদিহি নিশ্চিত করছে এবং নিজেদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা শক্তিশালী করছে তার ওপর।
(প্রজেক্ট সিন্ডিকেট অবলম্বনে)