‘রাশিয়ার অ্যামাজনে’ ড্রোন হামলা: থমকে যাচ্ছে পুতিনের অর্থনীতি, বিপাকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

রাশিয়া-উক্রেইন যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এসে আরও তীব্র হচ্ছে সংঘাত, দুই দেশের মধ্যে চলছে অনবরত পালটাপালটি হামলা।

এবার হামলার কৌশল বদলে রাশিয়ার গভীরে ড্রোন হামলা বাড়িয়েছে উক্রেইন। আর নতুন কৌশলের টার্গেট হলো রাশিয়ার ই-কমার্স জায়ান্ট ওয়াইল্ডবেরিজ।

যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম টাইম’-এর খবর বলছে, সোমবার, ৩রা অগাস্ট ওয়াইল্ডবেরিজের দুটি গুদামে ড্রোন হামলা চালায় উক্রেইন। তবেই এই প্রথম নয়। তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে রাশিয়ার এই অনলাইন মার্কেটপ্লেসের বিভিন্ন গুদামে হামলা চালিয়ে আসছে দেশটি।

এই হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

উক্রেইন দাবি করছে, এই গুদামগুলো সামরিক সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত হয়। সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে নয়। রাশিয়াকে যুদ্ধের অর্থ জোগানে বাধা দিতেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে বলে দাবি করছে উক্রেইন কর্তৃপক্ষ। তবে ওয়াইল্ডবেরিজ ও রাশিয়ান সরকার জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি রুশ বাহিনীকে কোনো পণ্য সরবরাহ করে না।

তারা উক্রেইনের এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

আবার রাশিয়াও উক্রেইনের রাজধানী কিয়েভ ও এর আশেপাশের বাণিজ্যিক গুদামগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এসব হামলায় অন্তত ১৭ জন উক্রেনিয়ান নাগরিক নিহত হয়েছে।

রাশিয়ার দাবি ও উক্রেইনের দাবি এক্ষেত্রে এক। রাশিয়া বলছে, ওইস গুদাম বেসামরিক কাজের পাশাপাশি উক্রেইনের সামরিক কাজেও ব্যবহৃত হতো। 

উক্রেইনের হামলায় রাশিয়ার ক্ষতি

গত ১৮ই জুলাই থেকে ওয়াইল্ডবেরিজের গুদামগুলোতে ধারাবাহিকভাবে ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে দেশটি। এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির অন্তত ২০টি গুদামে হামলা চালানো হয়। এই হামলায় রাশিয়ার বিশাল সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে।

স্যাটেলাইট চিত্র পর্যালোচনা করে রয়টার্স জানিয়েছে, উক্রেইনের ড্রোন হামলায় প্রতিষ্ঠানটির মোট গুদামের পাঁচ ভাগের এক ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা আয়তনে প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজার বর্গমিটার।

মঙ্গলবার উক্রেইনের প্রতিরক্ষা দপ্তর জানায়, সেন্ট পিটার্সবার্গের কাছে ক্রাসনি বোর এলাকায় একটি গুদামে হামলা হয়েছে এবং সেখানে আগুন লেগেছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বিশাল ভবন জ্বলতে দেখা যায়।

উক্রেইনের দাবি, গত ৪০ দিনের ধারাবাহিক অভিযানে তারা রাশিয়ার ১৪টি তেল শোধনাগার, একাধিক তেল ডিপো ও লোডিং টার্মিনাল, ১৪টি সামরিক বিমান এবং চারটি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।

ওয়াইল্ডবেরিজ আসলে কী

রাশিয়ার সবচেয়ে বড় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ওয়াইল্ডবেরিজ। এখানে ঘরের জিনিসপত্র থেকে শুরু করে বিমানের টিকিট পর্যন্ত কিনতে পাওয়া যায়। তাদের ডব্লিউ বি ব্যাংক নামে একটা আর্থিক প্রতিষ্ঠানও আছে বলে টাইমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একে অনেকেই ‘রাশিয়ার অ্যামাজন’ বলে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার অর্থনীতির ৮ দশমিক ৫ শতাংশ পণ্য ও সেবা সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি।

তাতিয়ানা কিম নামের একজন নারী ২০০৪ সালে কোম্পানিটি শুরু করেন। এখন তিনি রাশিয়ার সবচেয়ে ধনী নারী। তার সম্পদের পরিমাণ ৮ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। এ বছর মে মাসে ওয়াইল্ডবেরিজ রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ভিটিবি ব্যাংক’-এর সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্বের ঘোষণা দেয়।

রয়টার্স বলছে, চলমান হামলার মধ্যে গত ২৮ই জুলাই ভিটিবি ব্যাংকের শেয়ারের দর প্রায় আড়াই শতাংশ পড়ে যায়।

১৮ই জুলাই ওয়াইল্ডবেরিজের গুদামগুলোতে উক্রেইনের ধারাবাহিক হামলার কয়েকদিন পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ডব্লিউ বি ব্যাংকের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তাদের দাবি, যুদ্ধের অর্থায়নে সরকারকে সাহায্য করছে রাশিয়ার এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি।

রাশিয়ার সবচেয়ে বড় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ওয়াইল্ডবেরিজ। এখানে ঘরের জিনিসপত্র থেকে শুরু করে বিমানের টিকিট পর্যন্ত কিনতে পাওয়া যায়।

ছোট ব্যবসায়ীরা বিপদে

উক্রেইনের এই হামলার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর। ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার’-এর মতে, উক্রেইনের এই ধারাবাহিক হামলা ওয়াইল্ডবেরিজ প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভর করা রাশিয়ার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলোর জন্য যেমন যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনই এর প্রভাব পড়েছে ওয়াইল্ডবেরিজের সেবা ব্যবহারকারী সাধারণ রুশ গ্রাহকদের ওপরও। বিশেষ করে শহরাঞ্চলগুলোতে, যাদেরকে ক্রেমলিন এতোদিন যুদ্ধের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করে আসছিলো।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে ভাসিলি ক্লিমভ নামে মস্কোর একজন বাসিন্দার কথা উঠে এসেছে। ওয়াইল্ডবেরিজের হাজার হাজার পিক-আপ পয়েন্টের একটি চালান তিনি। মাত্র তিন সপ্তাহ আগেও ভালোই ব্যবসা চলছিল তার। কিন্তু লোকসানে পড়ে তা বিক্রি করার চেষ্টায় আছেন।

রাশিয়া ও আশপাশের দেশে ওয়াইল্ডবেরিজের এমন প্রায় ৯৮ হাজার পিক-আপ পয়েন্ট আছে, যেখান থেকে ক্রেতারা পণ্য সংগ্রহ করেন। কোম্পানিটির হিসাবে, মোট অর্ডারের ৯৫ শতাংশ এসব পিক-আপ পয়েন্ট থেকেই নেওয়া হয়।

ক্লিমভ বলেন, গত এক মাসে বেচাকেনা প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। এখন ব্যাবসা বলতে গেলে প্রায় নেই। পুরো মাসটাই লোকসানে কেটেছে ক্লিমভের। মজা করে এক সাংবাদিককে তিনি ১ রুবল, মানে প্রায় দেড় টাকায় বিক্রির প্রস্তাবও দেন।

শুধু তিনি নন, রাশিয়া জুড়ে ৩ হাজারেরও বেশি ওয়াইল্ডবেরিজ পিক-আপ পয়েন্ট এখন বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত।

ফ্যাশন ব্র্যান্ড ফিন ফ্লেয়ার রয়টার্সকে জানিয়েছে, জুলাই মাসে একটি গুদামে আগুনে ফলে তাদের ১০ কোটি রুবলের বেশি পণ্য নষ্ট হয়েছে। এতে কমে গেছে অর্ডারও।

প্রতিবেদনে আনা স্টারোস্তিনা নামে আরও একজন ছোট উদ্যোক্তার কথা বলা হয়েছে। এক হামলায় ১৭০ বাক্স হাতে বানানো মিষ্টি হারিয়েছেন তিনি।

“আমি ক্ষতিপূরণের আশা করছি না, কারণ পরে হতাশ হতে চাই না,” বলেছেন তিনি।

ওয়াইল্ডবেরিজ বলছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত বিক্রেতাদের জন্য কিছু আর্থিক সহায়তা, ছাড় এবং সময়সীমা বাড়িয়েছে। ৯৭ হাজারের বেশি বিক্রেতাকে প্রাথমিক ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়েছে।

রাশিয়ার অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা

ওয়াইল্ডবেরিজের উপর এই হামলার প্রভাব পড়ছে রাশিয়ার অর্থনীতিতে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এলভিরা নাবিউলিনা বলেছেন, সরবরাহের এই বিঘ্ন মূল্যস্ফীতি বাড়ায় কিনা, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

কিয়েভ স্কুল অব ইকোনমিক্স এবং ওয়াশিংটনের পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্সের অর্থনীতিবিদ হলেন এলিনা রিবাকোভা। তিনি বলেন, এই হামলাগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার কমানোর প্রচেষ্টা কঠিন করে তুলছে।

তার মতে, রাশিয়ার অর্থনীতি এ বছর খুব একটা বাড়ছে না। মূল্যস্ফীতি এখনো বেশি। তাই ছোট একটি ধাক্কাও সুদের হার কমানোর পরিকল্পনা থামিয়ে দিতে পারে বলে রয়টার্সের সাথে এক ফোনালাপে উদ্বেগের কথা জানান তিনি।

এদিকে জুলাইয়ের শেষে রাশিয়ার সর্ববৃহৎ ব্যাংক স্পারব্যাংক (Sberbank) জানায়, প্রায় ৩০০টি প্রতিষ্ঠান ঋণ পুনর্গঠনের আবেদন করেছে। কারণ তাদের ব্যবসা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, “যুদ্ধের সাথে বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই এমন অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

সূত্রটি আরও জানায়, “দেউলিয়া হওয়ার একটি বিশাল ঢেউ আসবে। এই বিক্রেতাদের সাহায্য করার মতো অর্থ কারো কাছে নেই, কারণ আমরা শত শত কোটি রুবেলের কথা বলছি। এটি অর্থনীতির জন্য এক বিরাট বড় ধাক্কা।”

হামলা শুরু হওয়ার পর ক্রেমলিন জানায়, ওয়াইল্ডবেরিজকে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। সে সময় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছিলো, এই সহায়তার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে প্রতিষ্ঠান বা তার বিক্রেতাদের ঋণ দেওয়াসহ করছাড় বা ভর্তুকির বিষয়গুলো থাকতে পারে।

ওয়াইল্ডবেরিজ কেন উক্রেইনের টার্গেট

উক্রেইন দাবি করছে, ওয়াইল্ডবেরিজ রাশিয়ার সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে ড্রোন তৈরির যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।

১৮ই জুলাই ওয়াইল্ডবেরিজের কেন্দ্রগুলোতে হামলার পর উক্রেইনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ঘোষণা করেন, “মস্কো ও তামবভ অঞ্চলে দুটি প্রধান লজিস্টিক কেন্দ্রে আঘাত হানা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “আক্রমণকারী [রাশিয়া] ড্রোন তৈরি ও নেভিগেশন সরঞ্জামের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সরবরাহে এগুলোকে ব্যবহার করতো।”

ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভ ওয়াইল্ডবেরিজের গুদামগুলো রুশ বাহিনীর সরঞ্জাম সরবরাহে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ওয়াইল্ডবেরিজের প্রতিষ্ঠাতা তাতিয়ানা কিমও উক্রেইনের দাবি নাকচ করে দেন।

তিনি বলেন, অ্যামাজন বা আলিবাবার মতো শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোতে যেসব পণ্য পাওয়া যায়, ওয়াইল্ডবেরিজ তার বাইরে কোনো পণ্য বিক্রি করে না।

৩১এ জুলাই টেলিগ্রামে আপলোড করা এক ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, ওয়াইল্ডবেরিজের সাথে সম্পর্কিত কেন্দ্রগুলোতে কিয়েভের ড্রোন হামলা বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে “সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডের” শামিল।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এর আগে বলেছিলেন, যুদ্ধ সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলবে না।  কিন্তু এখন মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, ইন্টারনেট সমস্যার পাশাপাশি এই হামলাগুলো সাধারণ মানুষের উপর নতুন চাপ তৈরি করছে।

উক্রেইন বলছে, তারা যুদ্ধকে রাশিয়ার ভেতরে নিয়ে যেতে চায়। যাতে সাধারণ মানুষও এর প্রভাব বুঝতে পারে এবং মস্কোর ওপর চাপ তৈরি হয়।

অন্যদিকে, রাশিয়াও উক্রেইনের কিয়েভ অঞ্চলে গুদামে হামলা চালিয়েছে, যেখানে সামরিক কাজে ব্যবহৃত পণ্য রাখা ছিলো বলে দাবি রাশিয়ার।