টেকনাফ সীমান্ত কাঁপছে বিস্ফোরণে, মিয়ানমারের সংঘাতের আঁচ বাংলাদেশে

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা, সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবুল ফয়েজ তখন বাইরের কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরেছেন। এমন সময় তীব্র শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। ভয় পেয়ে যান ফয়েজ। তার ছোট্ট সন্তান এসে ডাক দেয়, “জলদি বাসা থেকে বের হও।” এরপর স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে বেরিয়ে যান বাসা থেকে। দেখতে পান একটু দূরেই আগুনের লেলিহান শিখা।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত ও বিমান হামলার প্রভাব সরাসরি টের পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্তে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সীমান্তের ওপার থেকে আসা একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। 

মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক, ঘরবাড়ি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন স্থানীয়রা। সীমান্ত ঘেঁষা এই এলাকায় এমন পরিস্থিতি নতুন করে নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

আবুল ফয়েজ জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠছিলো। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখেন, অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে বেরিয়ে এসেছে। 

মিয়ানমার সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরেই তার বাড়ি। তাই তার মনে হচ্ছিলো, বিস্ফোরণ বোধহয় তার বাড়িতেই হচ্ছে। 

কারও কারও দেয়ালের আস্তরও খুলে গেছে বলে জানান আবুল ফয়েজ। 

একই আতঙ্কের কথা জানা জানান স্থানীয় সাংবাদিক আব্দুর রহমানও। 

তিনি জানান, বিস্ফোরণের শব্দে একটু পরপরই কেঁপে ওঠে টেকনাফ। স্বাভাবিকভাবেই সবার মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। 

সীমান্তের বাসিন্দারা বলছেন, আবারও যেন যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব অনুভব করছেন তারা।
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতেও দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ। মিয়ানমারে থাকা স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন হাজারো রোহিঙ্গা। 

 “স্থানীয়দের মধ্যে এই আতঙ্ক তো আছেই, আর অনেক রোহিঙ্গাও এখানে বাস করে। ফলে তাদের স্বজনরা রাখাইনে কী অবস্থায় আছে, সেই দুশ্চিন্তাও তাদের মধ্যে ছিলো,” বলেন আব্দুর রহমান। 

কী হচ্ছে মিয়ানমার সীমান্তে

টানা ১১ মাস যুদ্ধের পর ২০২৩ সালের ৮ই ডিসেম্বর রাখাইন রাজ্য থেকে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে মংডু, বুথিডং ও রাচিডং টাউনশিপসহ ৮০ শতাংশ এলাকা (২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত) দখলে নেয় আরাকান আর্মি। 

২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে আরাকান আর্মির অবস্থানে নতুন করে হামলা শুরু করে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী। পাশাপাশি মিয়ানমারের তিনটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গেও আরাকান আর্মির সংঘাত চলছে। 

আরাকান আর্মির দখল করা এই এলাকার বিপরীতে বাংলাদেশের টেকনাফ, উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা অবস্থিত। ফলে সীমান্তে সংঘাত হলে তার প্রভাব এসে পড়ে বাংলাদেশেও। 

রাখাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল আরাকান নেটওয়ার্ক দাবি করেছে, বুধবার বুথিডং উপজেলার কিয়েত মাউক তাউং (মুসলিম) গ্রামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী একটি যুদ্ধবিমান ও একটি ওয়াই-টুয়েলভ উড়োজাহাজ ব্যবহার করে বোমা নিক্ষেপ করে।

আর সংবাদমাধ্যম ইরাবতীর তথ্য অনুযায়ী,  বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের বুথিডং ও মংডুতে বিমান হামলা শুরু করেছে জান্তা বাহিনী। 

তারাও জানিয়েছে, ওয়াই-টুয়েলভ মডেলের যুদ্ধবিমান দিয়ে মংডুর গ্রামে বোমা হামলা চালায়। এতে অন্তত চারজন আহত হয়েছেন। 

এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে বুথিডং শহরেও হামলা চালায় জান্তা বাহিনী। এই দুটি শহরই আরাকান আর্মির দখলে রয়েছে। রাখাইন রাজ্যের ১৭টি শহরের মধ্যে ১৪টিই তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। 

স্থানীয়দের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম মাতৃভূমি জানায়, বুধবার রাত থেকেই বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইনে হামলা চালানো শুরু করে জান্তা বাহিনী। স্থানীয় সময় রাত সাড়ে নয়টার দিকে অন্তত চারটি বিস্ফোরণের আওয়াজ পাওয়া যায়।

তারা জানিয়েছে, বাংলাদেশের কক্সবাজারের টেকনাফেও এই বিস্ফোরণের আওয়াজ পাওয়া গেছে। জাদিমুরা থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বাসিন্দারা আতঙ্কে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।

 তবে বাংলাদেশে এখনো কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। 

টেকনাফ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান জিহাদ আলাপ-কে জানান, বিস্ফোরণের শব্দে সবার মধ্যে আতংক কাজ করেছে। তবে এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে। কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। 

“প্রশাসন তৎপর আছে। কোনো হতাহত বা অনুপ্রবেশের ঘটনা এখানে ঘটেনি,” বলেন তিনি।ম