মন্তব্য প্রতিবেদন

নীতি-আদর্শহীন মমতার দলের এই পরিণতিই হওয়ার ছিলো

বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাস্ত ও নাস্তানাবুদ হওয়াটা বিস্ময়ের ছিলো না। পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে যে মাফিয়ারাজ তিনি চাপিয়ে দিয়েছিলেন, রাজ্যের মানুষ যে কোনও মূল্যে তা থেকে রেহাই পেতে চেয়েছেন। 

নির্বাচনের আগে ভোটারেরা তাদের সিদ্ধান্ত কাউকে বুঝতে দেননি। তারা শুধু ভোটের অপেক্ষায় ছিলেন। নির্বাচনের ফল বের হওয়ার পর দেখা গিয়েছে, একের পর এক আসন মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসের হাতছাড়া হয়েছে। তার দলের তালেবর নেতারা দল বেঁধে পরাজিত হয়েছেন।

এ যেন হওয়ারই ছিলো। কিন্তু নির্বাচনে সেই পরাজয়ের পরে মাস ঘুরতে না ঘুরতে যেভাবে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেস তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে, তা সত্যিই চমকপ্রদ। বিধায়ক দলের নেতা নির্বাচন নিয়ে মতভেদে যে ভাঙনের শুরু, তার জেরে দলের বৃহত্তম অংশ সোমবার বৈঠক ডেকে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করেছে— যাতে খোদ মমতারই স্থান হয়নি। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, তৃণমূল কংগ্রেস কি তা হলে মমতার হাতের বাইরে চলে গেলো?

যে বৈঠকে এই নেতৃত্ব পরিবর্তন, তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘স্পেশাল সেশন’। একটি রাজনৈতিক দলের বিশেষ অধিবেশন, কিন্তু তা অতি সঙ্গোপনে শহরের বিলাসবহুল তারকাখচিত একটি হোটেলের বন্ধ কনফারেন্স রুমে। সেখানে নতুন নেতৃত্বের তালিকায় যেমন মমতা নেই, রাখা হয়নি তার ভাইপো ডায়মন্ড হারবারের এমপি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মমতার আশপাশে এখনও থেকে যাওয়া নেতাদের কাউকে।

নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন হাওড়ার বিধায়ক অরূপ রায়। সহসভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন ফিরহাদ হাকিম (সংখ্যালঘু নেতা তথা কলকাতার বিদায়ী মেয়র), অরূপ বিশ্বাস (মেসি কেলেঙ্কারি খ্যাত), রথীন ঘোষ এবং সাবিনা ইয়াসমিন। 

সাধারণ সম্পাদক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, জাভেদ খান এবং সন্দীপন সাহা। এ ছাড়া কোষাধ্যক্ষের দায়ভার দেওয়া হয়েছে আখরুজ্জামান আনসারিকে। নতুন নেতৃত্বের প্রায় সকলেই এত দিন ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী। আজ নিজেদের দল থেকে নির্মম ভাবে মমতাকেই ছেঁটে দিলেন তারা। মমতাকে ঘিরে থাকা হাতে গোনা নেতারা অবশ্য এই ‘স্পেশাল সেশন’ ও সেখানে গজিয়ে ওঠা নেতৃত্বের তালিকাকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, “তৃণমূল আর মমতা দেহ আর শ্বাসের মতো। মমতাকে বাদ দিচ্ছে ওরা কারা!!”

রাজনীতির প্রবীণেরা যদিও বলছেন, এ হওয়ারই ছিলো। বর্ষীয়ান সাংবাদিক সুমন চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, মমতার পার্টি সে হিসাবে কোনও রাজনৈতিক দলই ছিলো না। একটি দলের কোনও বিষয়েই কোনও নীতি ও আদর্শভিত্তিক অবস্থান নেই। কী তার গঠনতন্ত্র, কী তাদের কর্মসূচি, মমতার দলের কারও তা জানা থাকার কথা নয়। কারণ, তেমন কিছুর অস্তিত্ব আছে কি-না সন্দেহ। 

“আমি তৃণমূলের ছোট-বড় বহু নেতাকে জিজ্ঞেস করেছি, আপনাদের নীতি-আদর্শ কী? তারা উত্তর দিয়েছেন — কেন মমতা ব্যানার্জি!”

কোনও ব্যক্তি কোনও দলের নীতি-আদর্শ হতে পারেন কি, এই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “তৃণমূল দলটার শুধু একটাই কর্মসূচি ছিলো, কামাও আর কামাও। টাকা তোলো, আর টাকা তোলো!”

প্রবীণ এক বামপন্থী নেতার কথায়, “একটি দলে পুরসভা বা পঞ্চায়েতে কে প্রার্থী হবেন, তা যেমন ঠিক করে দেন একজনই, তিনিই আবার এমপি বা মন্ত্রী পদে কে প্রার্থী হবেন সেটাও ঠিক করেন। তার নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর কারও কোনও মতামতের কানাকড়ি মূল্য নেই। সেই দলের কে কোন পদ ও দায়িত্বে, তা-ও মমতাই তালিকা করে ঘোষণা করে দিতেন। বিন্দুমাত্র গণতন্ত্র চর্চার জায়গা নেই দলে। সেই দলের নেতাকর্মীরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী হবে, সুষ্ঠু ভোট করতে দেবে— এটা পাগলেও বিশ্বাস করবে না।”

তার ভাষ্যে, ক্ষমতা থেকে সরে গেলে, টাকা তোলার উপায়গুলোও বন্ধ হয়ে যায়। নেতাকর্মীরা তা হলে কীসের জন্য নেত্রী মানবে তাকে? 

“নির্বাচনে পরাজয়ের পরে তো এমন পরিণতিই হওয়ার কথা ছিল। ওই নেতাকর্মীরা এখন ছুটছে জয়ী পক্ষের কাছে, যাতে টাকা তোলার নতুন বন্দোবস্তে নিজেদের নাম ঢোকানো যায়।”

তবে মমতার দল স্বাভাবিক নিয়মে ভাঙছে, এমন ভাবলে ভুল হবে। তৃণমূল হয়তো ভেঙে যেতোই। দুর্নীতিতে আপাদমস্তক নিমজ্জিত, আদর্শহীন একটি দল ১৫ বছর ক্ষমতা উপভোগের পরে সরকারের বাইরে থাকাটা কাতলা মাছকে জল থেকে ডাঙায় তুলে রাখার মতো। 

তবে সেই ভাঙনে গতি দেওয়াটা নির্দিষ্ট পরিকল্পনার ফল। অবশ্যই এর পিছনে রয়েছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতাদের হাতযশ। উড়ছে কোটি কোটি টাকা। সঙ্গে ইডি-সিবিআইয়ের মতো কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। বিজেপির কথামতো না চললে গভীর রাতে ইডি বা সিবিআই এসে দরজার কড়া নাড়বে। এখন রাজ্যজয়ের পরে সিআইডি’র দলবলও চড়াও হচ্ছে। তল্লাশি হচ্ছে। জেলে নিয়ে যাওয়ার আগে মব তৈরি করে পচা ডিম বা পাঁকের কালিমায় লিপ্ত করা হচ্ছে বেয়াড়া নেতাকে। বুলডোজারের ঘায়ে তার বসতবাড়ি থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মাটিতে মেশানো হচ্ছে। সবের জন্যই অজুহাত খাড়া করা হচ্ছে ‘জনরোষ।’

আর কথা শুনলে? আদতে সেই তৃণমূল নেতা যত বড় চোর, ডাকাত, চাঁদাবাজই হোক, তার পিঠে ছাপ্পা পড়ছে — ‘ভাল তৃণমূল’। তাকে মমতার বিরোধিতা করে কথা বলতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশংসা করতে হবে। আর নবগঠিত তৃণমূলে নাম লেখাতে হবে। এই নবগঠিত তৃণমূলই সোমবার ‘স্পেশাল সেশনে’ বসেছিল। নিউটাউনের পাঁচতারা হোটেলে সারা দিনের অনুষ্ঠানের খরচ কোথা থেকে এসেছে, কেউ জানতে চাইবে না। কারণ ‘প্রশ্নটাতো সহজ, উত্তরও তো জানা!’

এই তো তৃণমূল ভাঙার একটা ফ্রন্ট। আর একটা ফ্রন্ট হইহই করে কাজ করছে নয়াদিল্লিতে। তৃণমূলের ৮০ জন এমপি’র ৬০ জনের বেশি সে দিকে। দুই ফ্রন্টের কথা এবং কাজ, দুইয়েই কিন্তু প্রবল বৈপরীত্য। 

কলকাতার ফ্রন্ট নিজেদের বিজেপির সরকারের ‘আসল ও আগমার্কা’ বিরোধীপক্ষ বলে দাবি করেছে। রাজ্যের মানুষ তাদের ‘টাকায় পোষা বিরোধীপক্ষ’ বললেও এই ফ্রন্টের নেতাদের মুখের হাসিতে টোল পড়ছে না। অর্থাৎ লোকের এমন কথাকে তারা ‘ক্যালকুলেটেড রিস্ক’ হিসেবেই নিয়েছেন। কিন্তু দিল্লির লাড্ডু খেয়েছেন যারা, দলত্যাগ-বিরোধী আইনে এমপি পদ হারানো ঠেকাতে তারা লোকসভার স্পিকারকে চিঠি দিয়ে বিজেপি-জোট এনডিএ-তে যোগ দিতে চেয়েছেন। তার আগে নামসর্বস্ব একটি পার্টির সদস্য হতে হয়েছে তাদের।

অর্থাৎ, তৃণমূল হিসাবে পরিচয় তারা নিজেরাই মুছে ফেলেছেন। বদলে গেরুয়া টিকা কপালে পরে নিয়েছেন। দিল্লি ও কলকাতার ফ্রন্টের মেলবন্ধন কী করে সম্ভব হয়, কী আছে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতাদের নাটকের স্ক্রিপ্টে, তা নিয়ে এখন কৌতূহল তুঙ্গে।

প্রশ্ন উঠেছে, তা হলে ‘অগ্নিকন্যা’ মমতার রাজনীতির কি ইতি? জল মাপতে দিন কয়েক আগে নতুন সরকারের নির্দেশে উচ্ছেদ হওয়া হকারদের সমর্থনে পথে নেমেছিলেন মমতা। লোক হয়নি সেখানে। কেউ কেউ বলছেন, যত মানুষ, তার চেয়ে বেশি পুলিশ ছিলো মমতাকে ঘিরে। কিন্তু তারপরও তিনি মমতা। দীর্ঘ লড়াইয়ে কলীঘাটের এঁদো গলি থেকে মুখ্যমন্ত্রিত্বের অনন্য উচ্চতায় উঠে এসেছিলেন তিনি। তাই মমতার ব্যাপারে শেষ কথা এখনই বলা যাচ্ছে না। কিন্তু মমতার মনোনীত উত্তরাধিকারী তার ভাইপো অভিষেকের রাজনৈতিক ভবিষ্যত যে শেষ, তা এক রকম বলেই দেওয়া যায়।

কিন্তু বিজেপি তৃণমূল কংগ্রেসকে বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরে রাজ্যের রাজনীতিতে তার কেমন প্রভাব পড়বে, সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। 

তৃণমূল অস্তিত্বহীন হয়ে পড়লে বা ‘বিজেপির পোষা বিরোধীপক্ষে’ পরিণত হলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম ভোট অন্য কোনও বিজেপি-বিরোধী দলকে যে খুঁজে নেবে, সেটাই স্বাভাবিক। এই সংখ্যালঘু ভোটের পরিমাণ খুব কম করে ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ, যার জোরে ছড়ি ঘুরিয়ে এসেছে তৃণমূল কংগ্রেস। এই ভোট এখন জাতীয় কংগ্রেস পাবে, না সিপিএমের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট? 

ভেঙে ভেঙে কংগ্রেসকে এমন পর্যুদস্ত করে রেখেছে তৃণমূল, যে পালে হাওয়া এলেও পাল টাঙানোর শক্তিই আজ আর তাদের নেই। এরই মধ্যে সংগঠনের ফাঁকফোকর ঢাকার পাশাপাশি রাস্তায় নেমে পড়েছে সিপিএম। কিন্তু বিজেপি-বিরোধী সাধারণ মানুষ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সেই আস্থা এখনও অর্জন করতে পেরেছে কি বামেরা? 

নির্বাচনের ফলাফল সেই ইঙ্গিত দিচ্ছে না। তবে রাজনীতির পরিসরে শূন্যস্থান বলে কিছু থাকে না। কে উঠে আসে বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে, সেটাই এখন দেখার।