ওহযুদ্ধক্ষেত্রে বিস্ফোরণ থামছে, কূটনীতির টেবিলে ফিরছে পক্ষগুলো। প্রায় চার মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শেষ হওয়ার পথে। কিন্তু যুদ্ধবিরতির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে যে এই যুদ্ধে আসলে কে জিতলো?
ওয়াশিংটন বলছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতায় বড় ধাক্কা দেওয়া হয়েছে। তেহরান বলছে, তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালির কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রেখেছে। অন্যদিকে ইসরায়েল তাদের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি বলে সমালোচনার মুখে। ফলে যুদ্ধ থামলেও বিজয়ীর প্রশ্নে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সংঘাতের লাভ-ক্ষতির হিসাব এখন নতুন করে কষছে বিশ্ব।
গত ২৮এ ফেব্রুয়ারি ইরানে অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। আগামী শুক্রবার ১৯এ জুন চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসান হচ্ছে এই সংঘাতের। তবে এখনো চুক্তির বিস্তারিত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
এই চুক্তি সফল হলে পশ্চিম এশিয়ায় কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটানো যুদ্ধের অবসান হতে পারে। একই সঙ্গে এটি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন হরমুজ প্রণালি খুলে যাবে। তবে ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে চুক্তি স্বাক্ষরের পরই সবকিছু বাস্তবায়ন হবে।
চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই অবশ্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। লেবাননে অভিযান অব্যহত রেখেছে ইসরায়েল। ফলে চুক্তি স্বাক্ষর হবে কি-না তা নিয়ে ধোঁয়াশা দেখা দিয়েছে।
তাই সবচেয়ে বড় যে প্রশ্ন সামনে এসেছে তা হচ্ছে, আসলে যুদ্ধে কে জয় পেলো?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বড় জয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিষয়টি এতটা সরল নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিকভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌ-প্রতিরক্ষা সক্ষমতার বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তবে একই সঙ্গে ইরান এখন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে আরও শক্ত অবস্থানে আছে। এই নিয়ন্ত্রণই ইরানকে নতুন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা দিয়েছে।
নতুন চুক্তিতে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ৬০ দিনের মধ্যে সমাধানের কথা বলা হয়েছে।
বিষয়টি যে আসলেই সমাধা হবে তার নিশ্চয়তা নেই। কারণ এটি বহু বছরের জটিল আলোচনার অংশ। এর আগে ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তিতেও সমাধান হয়নি। সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে বেরিয়ে যায়, যার ফলে বর্তমান উত্তেজনার শুরু।
এখন নতুন চুক্তি কার্যকর হলে ধীরে ধীরে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং সামরিক অবরোধ তুলে নেওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনা হচ্ছে।
তবে ইরান বলেছে, স্বাক্ষরের আগে তারা কোনো পদক্ষেপ নেবে না। সব মিলিয়ে, আগামী ১৯ জুনের স্বাক্ষর অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন চূড়ান্তভাবে নজরে রয়েছে বিশ্বজুড়ে।
তবে আসলেই কে কোন অবস্থানে আছে এই যুদ্ধে।
ইরান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরান। তাদের জাহাজ ডুবে গেছে, অনেক সিনিয়র নেতা ও সামরিক কর্মকর্তা মারা গেছেন। আগে থেকে ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, খামেইনি প্রশাসন এখনো পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে। এবং আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে আছে। এখনো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুদ রয়েছে তাদের।
২০২৫ সালে তাদের যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের হামলায় তাদের পারমাণবিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়েছিল।
কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে যায় তাদের হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। এই ‘সক্ষমতা’ নিয়েই তারা আলোচনা চালিয়ে গেছে এবং যুদ্ধ বন্ধ হয়েছে। এবং যেই প্রশাসন নিয়ে পশ্চিমাদের আপত্তি ছিলো, সেই আয়াতোল্লাহ প্রশাসন বহাল তবিয়তে আছে।
একজন বিশ্লেষক বলেছেন, হরমুজ প্রণালির ‘গেটকিপার’ হওয়ার কারণেই এই যুদ্ধে অনেকটা এগিয়ে গেছে ইরান। যুদ্ধ শুরুর আগে তাদের এই শক্তির কথা কেউ মাথায় নেয়নি।
চুক্তিতে একমত হওয়ার ঘোষণা যখন আসে তখনই ট্রাম্প বলেছিলেন যে হরমুজ প্রণালি খুলে যাবে। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেন, “সবাইকে অভিনন্দন!” তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধও তুলে নেওয়া হবে। তবে পরে তিনি নিজের অবস্থান বদলান।
ট্রাম্প জানান, এই প্রণালি শুক্রবার চুক্তি স্বাক্ষরের আগে খুলবে না।
যুক্তরাষ্ট্র
যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সরাসরি হামলার শিকার হয়নি। তবে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলো না। তেলের দাম বেড়েছে প্রায় দেড়গুণ। মার্কিন নাগরিকদের মাথাপিছু খরচ বেড়েছে ৪৫০ ডলারের মতো।
জরিপ বলছে, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়ে বিরক্ত মার্কিনিরা। ধারণা ছিল শক্তিশালী মার্কিন সেনাবাহিনী চাইলেই বড় ধরনের হামলা করতে পারতো, কিন্তু তারা সেটা পারেনি।
তাদের বিমান হামলায় আয়াতোল্লাহ রেজিমের পতন হয়নি, এমনকি ভাঙনও ধরেনি। শক্তিশালী ড্রোন ও মিসাইল তুলনামূলক স্বস্তা অস্ত্র দিয়ে প্রতিহত করেছে ইরান।
মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ২০টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইরান। এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে মিত্রদেশগুলো ক্ষুব্ধ হয়েছে এবং ট্রাম্পকে চাপে রেখেছে।
পিবিএস নিউজ আওয়ারের ফ্যাক্ট চেক অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্মুখযুদ্ধে জয় পেয়েছে। পেন্টাগন কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানের ৮০ শতাংশেরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও নৌ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে তারপরও ইরানের বিপক্ষ পূর্ণ জয় বলার সুযোগ নেই। বরং ফল অনেকটাই ইরানের দিকে ঝুঁকে আছে।
ডনাল্ড ট্রাম্প
ট্রাম্পের নির্বাচনি স্লোগান ছিলো ‘মেক অ্যামেরিকা গ্রেইট অ্যাগেইন’। তবে মার্কিনিরা মনে করেন, তার এই স্লোগানের সঙ্গে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ছিলো সাংঘর্ষিক। ফক্স নিউজের এক জরিপে দেখা যায়, অন্তত ৬০ শতাংশ মার্কিনি এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন।
এ কারণে জনপ্রিয়তা কমেছে ট্রাম্পেরও। আর শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছালেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখনো ফিরে আসেনি।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, ইরানের অস্ত্রের মজুদ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ব্যাপারে অটল যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে তাদের প্রক্সি বাহিনীকেও পুরোপুরি প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছিল তারা।
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের নৌবাহিনীকে অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পেরেছে তারা। ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ হয়তো অর্ধেক ধ্বংস হয়েছে। তবে কোথাও ইরানকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি ওয়াশিংটন।
ইরানের এখনো অনেক ইউরেনিয়াম আছে, এখনো মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রক্সি বাহিনীগুলো সক্রিয়।
ইসরায়েল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একসঙ্গেই এই যুদ্ধ শুরু করেছিল। তবে এই যুদ্ধ শেষ করছেন ট্রাম্প। নেতানিয়াহুর এখানো কোনো ভূমিকা নেই।
যুদ্ধ শুরুর আগে নেতানিয়াহু ইসরায়েলি জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তারা ইরানের আয়াতোল্লাহ রেজিমের পতন নিশ্চিত করবেন। কিন্তু তিনমাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও তারা সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
টাইমস অব ইসরায়েলের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ‘ইরানিয়ান রেজিম এখনো আছে, এখনো প্রচুর ক্ষেপণাস্ত্র ও ইউরেনিয়াম আছে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণও তাদের কাছে।
উলটো নেতানিয়াহুর ওপর হতাশ ট্রাম্প। সেজন্য যুদ্ধবিরতির সংলাপেও ইসরায়েলি নেতাকের তিনি রাখেননি বলে বলা হয় সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে।
আরব দেশ
ইরানে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করে তখন আরব দেশগুলো বিস্মিত হয়েছিল। এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও। তাদের ভূখণ্ডে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ইরান। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
এই যুদ্ধবিরতি তাই আরব দেশগুলোর জন্যও স্বস্তি নিয়ে এসেছে। তারা এখন হরমুজ প্রণালির বিকল্প রুটও খুঁজছে। কারণ এই রুটেই তাদের মূল বাণিজ্য নির্ভরশীল।
চীন
চীন সরাসরি এই যুদ্ধে অংশ না নিলেও ভূমিকা রেখেছে। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেলের ৩৫ শতাংশের গ্রাহকই চীন। তবে স্বল্পমেয়াদী এই সংকট সামাল দিয়েছে তারা। তাদের বড় ধরনের তেল মজুদ ছিলো।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এরই মধ্যে ইরানকে নিয়ে ওয়াশিংটন যে ব্যয়বহুল সংকটে পড়েছিল, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান লাভবান হয়েছে।
রাশিয়া
ইরান যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালি বন্ধ ও তেলের দাম বাড়ায় লাভবান হয়েছে রাশিয়া। তাদের অর্থনীতি এগিয়েছে, তেলের দাম বাড়ায় তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়া যে অর্থনৈতিক সংকটে ছিলো তা অনেকটােই কাটিয়ে উঠেছে। তবে যুদ্ধবিরতির তাদের ওপর কী প্রভাব ফেলছে তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না।
ইউক্রেন
ইরান যুদ্ধ ইউক্রেনের জন্য নেতিবাচক হয়ে দাঁড়ায়। পুরো বিশ্বের মনোযোগ তখন ইউক্রেন থেকে সরে যায়। তহবিল কমে যায়। তাদের পরম মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ব্যস্ত হয়ে পড়ে ইরান নিয়ে।
তবে এখান থেকেও লাভ খুঁজে নেয় ইউক্রেন। ইরানের ড্রোন হামলা থেকে বাঁচতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে সহায়তার হাত বাড়ান তিনি। কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করে ইউক্রেন।
তাই এই যুদ্ধের একক বিজয়ী কে তা বলা কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিকভাবে ইরানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পেরেছে, তবে তাদের ঘোষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি।
অন্যদিকে ইরানও বড় ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে, তবে নিজেদের শাসনব্যবস্থা, কৌশলগত প্রভাব ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে গোলাগুলি থামলেও বিজয়-পরাজয়ের লড়াই এখন চলে গেছে কূটনীতি, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নে।
(দ্য টেলিগ্রাফ, আল-জাজিরা ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে)