যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ক্ষোভে ফুঁসছে ইসরায়েল। রাজনৈতিক অঙ্গনে ওঠা এই ঝড়ের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তির ফলে ইসরায়েল ব্যর্থ হয়েছে আর এই দায় পুরো নেতানিয়াহুর।
আমেরিকা-ইরান শান্তি চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হওয়ার কথা রয়েছে ১৯এ জুন, শুক্রবার। অথচ তার আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে এখনো চুক্তির পুরোটা প্রকাশ করেননি তিনি। ফলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনো রয়েই গেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এ যুদ্ধ শুরু করেছিল- ইসরায়েল। অথচ চুক্তিতে এখনো তাদের কোনও অস্তিত্বই নেই।
১৪ই জুন হোয়াইট হাউসে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টার দিকে ট্রাম্প ডিজিটালি নথিতে স্বাক্ষর করেন। তারপরই ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করে জানান সেটি। এতে হতবাক হয়ে যান তার শীর্ষ সহযোগীরাই। কারণ তারা জানতেন, চুক্তিটি নিয়ে তখনও আলোচনা চলছে।
সোমবার শান্তিচুক্তির ঘোষণা আসার পর সংবাদ সম্মেলনে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, চুক্তি হোক বা না হোক ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে সেজন্য লড়াই চালিয়ে যাবেন তিনি।
নেতানিয়াহু বলেন, “আমি যতদিন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আছি, এটা হতে দেবো না।”
অন্যান্য ইসরায়েলি কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরাও এই প্রাথমিক চুক্তির সমালোচনা করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতানিয়াহুই ট্রাম্পকে ইরান যুদ্ধের ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। আর এখন ট্রাম্প ইসরায়েলকে যুদ্ধ থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে।
তারা বলছেন, যুদ্ধের জন্য ট্রাম্পের যে প্রত্যাশা নেতানিয়াহু তৈরি করেছেন ইরান সংলাপের মাধ্যমে তা সামাল দিয়েছে। আর এই অঞ্চলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোও যুদ্ধবন্ধের পক্ষেই ছিলো।
ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী এহুদ বারাক এক সাক্ষাতকার বলেন, নেতানিয়াহুর অদূরদর্শিতার মূল্য দিতে হচ্ছে ইসরায়েলকে।
“যত সময় গেছে, ইরান শক্তিশালী হয়েছে আর ইসরায়েল দুর্বল হয়েছে। নেতানিয়াহুর কৌশল ব্যর্থ হয়েছে,”- বলেন তিনি।
আগামী নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে যাওয়া ইয়ার লাপিদও এর সমলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ইসরায়েলের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিতে এটা সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার একটি আর এর পুরো দায় নেতানিয়াহুর।”
“এটা ঠিক করা যাবে, এবং ঠিক করতেই হবে। নেতানিয়াহু আর এটা ঠিক করতে পারবেন না, আমরা করবো।”
ইরান চুক্তিতে বাধাগ্রস্ত হবে ইসরায়েলের লেবানন অভিযান
ইসরায়েল এই চুক্তির অংশ না হলেও লেবাননের বিষয়ে অস্বস্তিতে আছে তারা। যুদ্ধ শুরুর প্রথম সপ্তাহেই লেবানন থেকে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহ ইসরায়েলি ভূখণ্ডে হামলা চালায়। জবাবে বহুদিন ধরে চলা সামরিক অভিযান জোরদার করে ইসরায়েলি বাহিনী। যুদ্ধ ঘোষণা করে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে প্রবেশ করতে থাকে দেশটির সেনা সদস্যরা।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি আলোচনা শুরুর পর থেকেই ইরান বারবরাই লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে।
তবে সবশেষ যুদ্ধবিরতির পর সোমবার ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাতজ জানিয়েছেন, তারা সিরিয়া, লেবানন ও গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না।
সংলাপ চলার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্প বারবারই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যেতে চেয়েছেন। বরং বৈরুতে হামলা চালানো নিয়ে বারবারই ইসরায়েলের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি।
একটা সময় এসে যুদ্ধ থামানোরই সিদ্ধান্ত নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এখন লেবাননে যদি ইসরায়েলের হামলাও বন্ধ করতে হয় তবুও রাজি ট্রাম্প।
আর এ কারণে বিপাকে পড়েছেন নেতানিয়াহু। ইসরায়েলিরা চায় লেবাননে অভিযান চলুক। কিন্তু ট্রাম্প চান বন্ধ করতে। ট্রাম্পের পরম মিত্র নেতানিয়াহু তাই এখন অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র রাজনৈতিক সংকটে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের ফেলো ও ইসরায়েলে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শাপিরো বলেন, হেজবুল্লাহকে শুধুমাত্র একটি রকেট হামলা করতে হবে, তাতেই চাপে পড়বেন নেতানিয়াহু। ইতোমধ্যে লেবানন যুদ্ধ নিয়ে চাপে আছেন।
“এই চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হবে নেতানিয়াহুর। আর এর মধ্যে হেজবুল্লাহও শক্তিশালী হয়ে উঠবে,” বলেন শাপিরো।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জোটের সদস্যরাও এই চুক্তির সমালোচনা করেছেন। তারা প্রধানমন্ত্রীকে লেবাননে যুদ্ধ অব্যাহত রাখার জন্য চাপ দিচ্ছেন।
ইসরায়েলের সিকিউরিটি মিনিস্টার ইতামার বেন-গভির বলেন, “হেজবুল্লাহকে নিবৃত্ত করার ব্যাপারে কোনো ছড়াই দিতে পারি না আমরা।”
নেতানিয়াহু ব্যর্থ
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তিতে নেতানিয়াহু ব্যর্থ হয়েছেন বলে মনে করেন ইসরায়েলিরা।
২৮এ ফেব্রুয়ারি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ শুরু করেছিল ইসরায়েল। কিন্তু প্রায় চার মাস পরও ইসরায়েল সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। উপরন্তু ইরান এখন আগের চেয়েও শক্তিশালী। তাদের প্রক্সি বাহিনীগুলোও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখনো ইরানের হাতেই। ফলে চাইলে বিশ্ব বাজার ও তেল বাণিজ্যের চাবিকাঠি ঘোরাতে পারছে তারা।
ইরানের পরমাণু অবকাঠামো বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার কতটুকু ইসরায়েল ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে তাও নিশ্চিত নয়।
প্রভাবশালী হিব্রু পত্রিকা মারিভে লেখা এক নিবন্ধে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যানা বার্স্কি বলেন, ইসরায়েল মনে করে যুদ্ধের মাধ্যমে তারা ইরানের পরমাণু প্রকল্প পিছিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু ইসরায়েলি কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন যে এই চুক্তির ফলে ইরান এখন বড় ধরনের অর্থ সহায়তা পাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মধ্যপ্রাচ্যের তিন কর্মকর্তা বলেন, এই চুক্তির ফলে অনেক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হতে পারে ইরানের। ছাড়া হতে পারে জব্দ হওয়া অনেক সম্পদ।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাবেক জেনারেল ইয়ার গোলান এক্স এ দেওয়া এক পোস্টে বলেন, “ট্রাম্প এমন এক চুক্তি স্বাক্ষর করলেন যানে বিলিডন ডলার সহায়তা পাবেন আয়াতোল্লাহরা। তাদের পরমাণু অবকাঠামোও অক্ষত থাকবে।”
(আল-জাজিরা ও পিবিএস অবলম্বন)