ইরান যুদ্ধের তাৎক্ষণিক অবসানের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, দুই দেশের এই সমঝোতার ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবারও জাহাজ চলাচল শুরু হবে।
তবে ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরও চুক্তির আসল কাঠামো, শর্ত এবং বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। ফলে আসলেই যুদ্ধ থামছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এই চুক্তি স্বাক্ষরের কথা জানানো হয়েছে। চূড়ান্ত সমঝোতা স্মারক এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং লেবানন ইস্যুতে আসলে কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজের ঘারিবাবাদি রাষ্ট্রীয় টিভিতে শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার খবর নিশ্চিত করেছেন। দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা একে 'ইরানের বিজয়' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ইতালি এ চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশও।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এটি কি সত্যিই স্থায়ী শান্তির শুরু, নাকি আরেক দফা কূটনৈতিক চাপ ও সামরিক হুমকির মধ্যবর্তী বিরতি?
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ধোঁয়াশা
যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের তেল পরিবহনের ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে যায়। তাই এই প্রণালি বন্ধ বা সীমিত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা লাগে।
ট্রাম্প প্রথমে বলেছিলেন, তিনি হরমুজ প্রণালির 'টোল-ফ্রি' উন্মুক্তকরণ অনুমোদন করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তার বক্তব্য ছিল, “বিশ্বের জাহাজগুলো, ইঞ্জিন চালু করো। তেল প্রবাহিত হোক।”
কিন্তু কিছু সময় পরই তিনি বলেন, প্রণালি খোলা হবে শুক্রবারের চুক্তি স্বাক্ষরের ওপর নির্ভর করে এবং সেটি মূলত মাইন অপসারণের উদ্দেশ্যে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি অবশ্য তার ঘোষণায় হরমুজ প্রণালির কথা উল্লেখ করেননি।
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম মেহর জানিয়েছে, সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, ইরানের ব্যবস্থাপনায় ৩০ দিনের মধ্যে প্রণালি পুনরায় চালু করা হবে।
ফলে হরমুজ নিয়ে স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যাচ্ছে না।
এখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র বহুদিন ধরেই বলে আসছে, হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে; কোনো দেশ একে নিয়ন্ত্রণ করবে না।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালির নেতারাও বলেছেন, এই জলপথে চলাচল হতে হবে অবাধ ও শর্তহীন।
তবে ঘোষণার পরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যায়। বাজার আপাতত শান্তির সম্ভাবনাকে ইতিবাচকভাবে দেখছে।
তবে বাস্তবতা হলো, ক্ষতিগ্রস্ত তেল ও গ্যাস স্থাপনা পুনরায় চালু করতে সময় লাগতে পারে। পাশাপাশি জাহাজ কোম্পানি ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো হরমুজ প্রণালিকে নিরাপদ মনে করবে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন।
লেবানন কি চুক্তির অংশ, নাকি আলাদা সংকট?
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার আরেকটি জটিল দিক হলো লেবানন। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেছেন, “লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ী ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছে।”
মধ্যস্থতাকারী শাহবাজ শরিফও একই ধরনের কথা বলেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই পক্ষ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে রাজি হয়েছে, যার মধ্যে লেবাননও রয়েছে।
তবে ট্রাম্প তার প্রাথমিক ঘোষণায় লেবাননের কথা বলেননি। তিনি মূলত হরমুজ প্রণালি ও তেল প্রবাহ নিয়েই কথা বলেছেন। এ কারণে প্রশ্ন উঠছে যে লেবানন কি সত্যিই এই চুক্তির অংশ, নাকি এটি ইরান ও মধ্যস্থতাকারীদের ব্যাখ্যা মাত্র?
এটি ইসরায়েলের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েল এই আলোচনার সরাসরি অংশ ছিল না। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ফলে ইসরায়েলের নতুন হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আগেও দেখা গেছে, বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলার কারণে চুক্তি ঘোষণার সময় পিছিয়ে যায়। ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, ওই হামলা চুক্তি স্বাক্ষর বিলম্বিত করেছে। ফলে লেবানন ইস্যু এখনো এই শান্তি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোর একটি।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি
ইরান যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ট্রাম্প বারবার ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কথা বলেছেন। তবে সাম্প্রতিক ঘোষণায় এই ইস্যুরও কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।
ট্রাম্প বলেছেন, “ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না।”
তবে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, পারমাণবিক আলোচনা আগামী ৬০ দিন চলবে।
ট্রাম্প নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিতে না পৌঁছায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আবার সামরিক হামলা শুরু করতে পারে।
এর অর্থ হলো, যুদ্ধবিরতি হলেও সামরিক চাপ পুরোপুরি শেষ হয়নি। বরং পারমাণবিক ইস্যুটি এখন নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে গেছে।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেছে, ইরান যদি তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নেয়, তাহলে প্রাসঙ্গিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
ইরান বরাবরই দাবি করে এসেছে, তার পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ হলো, ইরানের কাছে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এই ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যত কী হবে, তা আসন্ন আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে।
যুদ্ধ কি আসলেই থামছে?
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে গার্ডিয়ানের বিশেষ এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘোষণাকে আপাতত যুদ্ধ থামানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ বলা যায়। কিন্তু এটিকে স্থায়ী শান্তি বলা এখনই কঠিন।
চুক্তির পূর্ণাঙ্গ টেক্সট প্রকাশ হয়নি। ফলে পক্ষগুলো একই বিষয়কে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইউরোপের অবস্থানে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। যদি প্রণালি “ইরানি ব্যবস্থাপনায়” খোলা হয়, তাহলে সেটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ কতটা মেনে নেবে তাও স্পষ্ট নয়।
লেবানন ইস্যুতে ইসরায়েলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েল যদি নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই তা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
ইতালির বার্তা সংস্থা আনসার জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক লরেঞ্জো ট্রোমবেত্তার মতে, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রও ইসরায়েলের ওপর যুদ্ধ থামানোর জন্য বড় ধরনের চাপ প্রয়োগ করবে না।
আল জাজিরাকে ট্রোমবেত্তা বলেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে। এর পেছনে নিরাপত্তা ইস্যুর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাবও কাজ করছে।
তার মতে, অক্টোবরের শেষদিকে নির্বাচন সামনে রেখে নেতানিয়াহু সরকার ও তার মন্ত্রীরা নিজেদের কঠোর অবস্থান দেখাতে আগ্রহী।
“ইসরায়েল যদি সত্যিকারের যুদ্ধবিরতি মেনে চলে, তাহলে তা নেতানিয়াহু সরকারের রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে মিলবে না, ” বলেন এই বিশ্লেষক।
অর্থাৎ, লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও বাস্তবে তা কতটা মানা হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং নেতানিয়াহু সরকারের ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল এই যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যতকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা থাকছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে। বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং ভবিষ্যৎ আলোচনায় ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্র আবার সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছে। তাই যুদ্ধবিরতি হলেও যুদ্ধের ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়নি।
ইরান যুদ্ধের তাৎক্ষণিক অবসানের ঘোষণা অবশ্য বিশ্ববাজার ও কূটনৈতিক অঙ্গনে স্বস্তি এনেছে। তেলের দাম কমেছে, আলোচনার দরজা খুলেছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা আপাতত কিছুটা কমেছে।
তবে বাস্তব শান্তি নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর: হরমুজ প্রণালি কীভাবে খোলা হয়, লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ থাকে কি না, এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সমঝোতা হয় কি না তার ওপর।
(বিবিসি, আল-জাজিরা ও গার্ডিয়ান অবলম্বনে)