এয়ার ইন্ডিয়া ট্র্যাজেডির এক বছর: মিলছে না যেসব প্রশ্নের উত্তর

এক বছর আগে আজকের এই দিনে ভারতের আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই বিধ্বস্ত হয়েছিলো এয়ার ইন্ডিয়ার এআই ১৭১ ফ্লাইট।

বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনারের ওই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান মোট ২৬০ জন। বিমানে থাকা ২৪২ আরোহীর মধ্যে বেঁচে যান মাত্র একজন। নিহত হন মাটিতে থাকা আরও ১৯ জন। ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত এই ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্ণ হলেও এর প্রকৃত কারণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যায়নি।

দুর্ঘটনার প্রথম বার্ষিকীতে এসে ভারতের বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যুরো (এএআইবি) তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে নতুন কোনো তথ্য প্রকাশ করতে পারে বলে নানাবিধ আলোচনা চলছে। তবে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হবে কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। এক বছর পরও তদন্তকে ঘিরে প্রশ্ন, বিতর্ক, জল্পনা এবং পরস্পরবিরোধী তত্ত্বের শেষ হয়নি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিশ্লেষণ, এনডিটিভি'র এবং বিবিসি'র অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নানান বিশ্লেষণধর্মী চিত্র, যেখানে প্রতিটি উত্তর যেন নতুন করে আরও কয়েকটি প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

যে প্রশ্নটি এখনো তদন্তের কেন্দ্রে

দুর্ঘটনার এক বছর পরও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি একই রয়ে গেছে—উড্ডয়নের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কেন এবং কীভাবে বিমানের দুই ইঞ্জিনের জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলো?

এএআইবি-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো, বিমানটি আকাশে ওঠার পরপরই দুই ইঞ্জিনের ফুয়েল কন্ট্রোল সুইচ ‘রান’ থেকে ‘কাটঅফ’ অবস্থানে চলে যায়। এর ফলে ইঞ্জিনে জ্বালানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং বিমানটি দ্রুত শক্তি হারাতে শুরু করে।

বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, 'রান' অবস্থায় ইঞ্জিনে স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি সরবরাহ হয়। অন্যদিকে 'কাটঅফ’ অবস্থায় জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইঞ্জিন কার্যত অচল হয়ে পড়ে। তাই সুইচ দুটি কীভাবে ওই অবস্থায় গেলো, সেটিই পুরো তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

তদন্তে আলোচিত দুটি প্রধান তত্ত্ব

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে তদন্তে দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রথম তত্ত্বটি হলো ভুল বা পাইলটের নেওয়া কোনো পদক্ষেপ। পশ্চিমা কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তদন্তকারীরা ককপিটে থাকা পাইলটদের সম্ভাব্য ভূমিকা খতিয়ে দেখছেন।

দ্বিতীয়টি হলো প্রযুক্তিগত বা বৈদ্যুতিক ব্যর্থতা। ভারতের পাইলটদের সংগঠন ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান পাইলটস (এফআইপি), কয়েকজন বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এবং বোয়িংয়ের কিছু 'হুইসেলব্লোয়ারের' মতে, বড় ধরনের বৈদ্যুতিক বা সিস্টেমজনিত ত্রুটি দুর্ঘটনার কারণ হয়ে থাকতে পারে।

প্রাথমিক প্রতিবেদনের দুই অনুচ্ছেদ থেকেই শুরু বিতর্ক

দুর্ঘটনার এক মাস পর প্রকাশিত ১৫ পৃষ্ঠার প্রাথমিক প্রতিবেদনে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা সুপারিশ ছিল না। কিন্তু প্রতিবেদনের মাত্র দুটি অনুচ্ছেদ আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ককপিট ভয়েস রেকর্ডারে এক পাইলটকে অন্য পাইলটকে জিজ্ঞাসা করতে শোনা যায়, “তুমি কেন জ্বালানি বন্ধ করলে?” জবাবে অন্য পাইলট বলেন, “আমি করিনি।”

বিবিসির অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কে প্রশ্ন করেছিলেন এবং কে উত্তর দিয়েছিলেন, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ না থাকলেও এই সংলাপ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কিছু সংবাদমাধ্যম এমনও ইঙ্গিত দেয় যে তদন্তে পাইলটের ইচ্ছাকৃত পদক্ষেপের সম্ভাবনা গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে এএআইবি পরে এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদনের সমালোচনা করে সেগুলোকে “বাছাইকৃত ও যাচাইবিহীন” তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি বলে উল্লেখ করে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বানও জানানো হয়।

কেন ক্ষুব্ধ পাইলট সংগঠন?

বিবিসির তথ্য মোতাবেক, ভারতের বৃহত্তম পাইলট সংগঠন ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান পাইলটস শুরু থেকেই বিমানটির পাইলটকে দায়ী করার প্রবণতার বিরোধিতা করে আসছে। সংগঠনটির দাবি, প্রাথমিক প্রতিবেদনের সীমিত তথ্যকে ভিত্তি করে মৃত পাইলটদের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা অন্যায্য।

নিহত ক্যাপ্টেন সুমিত সাবারওয়ালের পরিবার এবং পাইলটদের সংগঠনটি তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাদের মতে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই পাইলটকে দায়ী করার চেষ্টা বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ব্ল্যাক বক্স কী বলছে?

এনডিটিভি'র প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র হচ্ছে বিমানের ব্ল্যাক বক্স।

সাধারণত একটি বিমানে দুটি ফ্লাইট রেকর্ডার থাকে, যেখানে একটি সামনের অংশে এবং অন্যটি লেজের অংশে। তদন্তকারীরা সামনের অংশে থাকা রেকর্ডার থেকে তথ্য উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। তবে লেজে থাকা রেকর্ডারটি দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো।

ফলে তদন্তকারীরা বর্তমানে উদ্ধার করা তথ্য, ককপিট ভয়েস রেকর্ডিং এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করছেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্ল্যাক বক্স থেকে পাওয়া তথ্যই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করতে পারে সুইচগুলো বাস্তবে সরানো হয়েছিলো, নাকি কোনো সিস্টেম ত্রুটির কারণে এমন সংকেত রেকর্ড হয়েছিলো।

প্রযুক্তিগত ত্রুটির তত্ত্ব কেন জোরালো হচ্ছে?

বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রযুক্তিগত ত্রুটির সম্ভাবনাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিরাপত্তা সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর এভিয়েশন সেফটি (এফএএস) দাবি করেছে, দুর্ঘটনায় পতিত বিমানটি তার ১১ বছরের কার্যকালে একাধিক বৈদ্যুতিক ও প্রকৌশলগত সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলো। 

সংগঠনটির মতে, কিছু সমস্যা হয়তো দীর্ঘদিন শনাক্ত হয়নি। এসব 'ল্যাটেন্ট ডিফেক্ট' বা সুপ্ত ত্রুটি হঠাৎ সক্রিয় হয়ে একাধিক সিস্টেমে একযোগে বিপর্যয় ঘটাতে পারে।

কিছু নিরাপত্তা বিশ্লেষকের ধারণা, উড্ডয়নের সময় যদি বড় ধরনের বৈদ্যুতিক ব্যর্থতা ঘটে থাকে, তাহলে ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডারে ফুয়েল সুইচ ‘কাটঅফ’ অবস্থায় দেখা গেলেও বাস্তবে সুইচ শারীরিকভাবে সরানো হয়নি।

কোর নেটওয়ার্ক ত্রুটিও আলোচনায়

বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এএআইবি'র প্রাথমিক প্রতিবেদনে বিমানের ‘কোর নেটওয়ার্কে’ একটি পরিচিত ত্রুটির কথাও উল্লেখ করা হয়েছিলো। এই নেটওয়ার্ককে অনেক বিশেষজ্ঞ বিমানের ‘সেন্ট্রাল নার্ভ সিস্টেম’ হিসেবে বর্ণনা করেন, কারণ এটি বিভিন্ন কম্পিউটার ও ইলেকট্রনিক ব্যবস্থাকে সংযুক্ত রাখে।

প্রযুক্তিগত ত্রুটির তত্ত্বের সমর্থকদের মতে, এই অংশে কোনো বড় ধরনের ব্যর্থতা ঘটলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

জরুরি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিয়েও নতুন প্রশ্ন

বিবিসির অনুসন্ধান অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পরপরই বিমানের জরুরি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা বা 'র‍্যাম এয়ার টারবাইন' বা 'র‍্যাট' সক্রিয় হয়েছিলো।

সাধারণত বিমানের প্রধান বিদ্যুৎ বা হাইড্রোলিক ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে র‍্যাট চালু হয়। কিছু বিশেষজ্ঞ ও নিহতদের পরিবারের আইনজীবীদের দাবি, র‍্যাট সক্রিয় হওয়ার সময় নিয়ে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা দুর্ঘটনার সময়রেখা সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।

তাদের মতে, যদি র‍্যাট ধারণার চেয়ে আগেই চালু হয়ে থাকে, তাহলে তা বড় ধরনের বৈদ্যুতিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত হতে পারে।

তদন্ত এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে

এনডিটিভি জানিয়েছে, তদন্ত এখনো আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে চলছে। সম্প্রতি তদন্তকারীরা ফ্রান্স সফর করে ইঞ্জিন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করেছেন। পাশাপাশি ইঞ্জিন ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের বিশ্লেষণও অব্যাহত রয়েছে।

যেহেতু বিমানটি বোয়িং নির্মিত এবং এর ইঞ্জিন যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি, তাই যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ডও (এনটিএসবি) তদন্তে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে।

কেন এখনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন আসেনি?

বড় ধরনের বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত অত্যন্ত জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। শুধু ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার বা ককপিট ভয়েস রেকর্ডার বিশ্লেষণ করলেই তদন্ত শেষ হয় না।

তদন্তকারীদের ইঞ্জিন, সফটওয়্যার, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ নথি, পাইলটদের প্রশিক্ষণ ইতিহাস, নির্মাতার প্রযুক্তিগত তথ্য এবং সিমুলেটর পরীক্ষার ফলাফলও যাচাই করতে হয়।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, এআই ১৭১-এর ইঞ্জিন এবং ইঞ্জিন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিস্তারিত প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এখনো সম্পন্ন হয়নি। এ কারণেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

সবার নজর এখন এএআইবি-এর দিকে

আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইসিএও)-এর অ্যানেক্স থারটিন অনুযায়ী, দুর্ঘটনার এক বছরের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ সম্ভব না হলে তদন্তের অগ্রগতি জানিয়ে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন প্রকাশ করা যেতে পারে।

তবে এফআইপি সতর্ক করেছে, অসম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশ করলে নতুন করে বিভ্রান্তি ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম হতে পারে।

এক বছর পরও এআই ১৭১ ট্র্যাজেডির তদন্ত এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একটি প্রশ্নের উত্তরই পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা বদলে দিতে পারে দুই ইঞ্জিনের জ্বালানি সরবরাহ কেন বন্ধ হয়েছিলো?

সেই উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে, এটি মানুষের ভুল ছিল, নাকি আধুনিক উড়োজাহাজ প্রযুক্তির ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ও রহস্যময় ব্যর্থতা।