মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। গত দুই দিনের উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি হামলা শুধু সামরিক স্থাপনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; জ্বালানি অবকাঠামো, শিল্প কারখানা এবং বেসামরিক এলাকাও এর আওতায় এসেছে।
শেষ পর্যন্ত ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধ বন্ধের দাবি করা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি এখনও ঝুঁকিপূর্ণ।
ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ড খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা “সশস্ত্র অভিযান বন্ধের ঘোষণা দিচ্ছে।” তবে একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে, যদি হামলা চলতে থাকে, বিশেষ করে দক্ষিণ লেবাননে, ইরান প্রতিক্রিয়া জানাবে “আগের চেয়ে আরও কঠোর ও বলিষ্ঠভাবে।”
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তারা যুদ্ধের ময়দানও ছাড়েনি, আলোচনার টেবিলও ছাড়েনি। এক্স এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, “দেশের মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তিই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”
দক্ষিণ বৈরুতের ইসরায়েলের হামলার জবাবে রবিবারই ইরান এই সামরিক অভিযান শুরু করেছিল । এরপরই ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় শহর হাইফার একটি পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, ইসরায়েল “একটি বিপজ্জনক খেলা” শুরু করেছে। তারা বলছে, এটি ছিল ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মাহশাহরে অবস্থিত একটি পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধ।
ট্রাম্পের প্রচেষ্টা
ইরান হামলা বন্ধের ঘোষণা দেওয়া আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করেছিলেন যে ইসরায়েল ও ইরানকে অবিলম্বে পরস্পরের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে।
ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে অনুরোধ করেছিলেন যেন তারা তারা ইরানি হামলার জবাব না দেন।
পরে আরেকটি পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেছেন, শান্তি নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা চলছিল, কিন্তু 'অবজ্ঞা বা বোকামি সেটার জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে'।
তিনি দাবি করেন, “ইসরায়েল ও ইরান, উভয়পক্ষই দ্রুত একটি যুদ্ধবিরতি করতে চায়''।
“অবরোধ পুরোদমে এবং পুরো শক্তিতে কার্যকর থাকবে, যতদিন না একটি চূড়ান্ত চুক্তি হয়। পুরো বিষয়টি দ্রুত হয়ে যাওয়া উচিত,” লিখেছেন ট্রাম্প।
এই উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্প এক বার্তায় দাবি করেছেন, ইসরায়েল এবং ইরান উভয়পক্ষই এখন একটি "এক্সিট রুট" খুঁজছে।
তার ভাষায়, উভয় দেশই তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতির বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনায় আগ্রহী এবং শান্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।
তবে তিনি সতর্ক করেছেন, "অজ্ঞতা কিংবা বোকামি" এই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।
তেল স্থাপনাই লক্ষ্য?
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো উভয়পক্ষ এখন একে-অপরের জ্বালানি ও শিল্প স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে।
অতীতে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে "শ্যাডো ওয়ার" বা ছায়াযুদ্ধ মূলত গোয়েন্দা অভিযান, সাইবার হামলা এবং প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হতো।
তবে বর্তমানে সেই সীমা অতিক্রম করে সরাসরি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবকাঠামোর ওপর হামলা শুরু হয়েছে।
হাইফা ইসরায়েলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বন্দরনগরী। অন্যদিকে মাহশাহর ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
দুই স্থানই হামলর শিকার হয়েছে। এটি প্রতিপক্ষের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে দুর্বল করার কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম, জ্বালানি পরিবহন এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। এর মধ্যে তেল স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
নেতানিয়াহুর কারণেই যুদ্ধ দীর্ঘ হচ্ছে?
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফোয়াদ ইজাদি মনে করেন, বর্তমান সংকটের পেছনে শুধুমাত্র নিরাপত্তা বিবেচনা নয়, রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও কাজ করছে।
তার মতে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কখনোই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা বা শান্তি চুক্তি সফল হোক তা চাননি। কারণ একটি সফল কূটনৈতিক সমাধান ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা বর্ণনাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
ইজাদি আরও দাবি করেন, নেতানিয়াহু বর্তমানে একাধিক দুর্নীতি মামলার মুখোমুখি এবং তার বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া রয়েছে। যুদ্ধাবস্থা এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংকট তাকে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা সুবিধা দিচ্ছে। তার ভাষায়, "যুদ্ধ নেতানিয়াহুর জন্য শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়, রাজনৈতিক টিকে থাকার প্রশ্নও।"
অবশ্য ইসরায়েলি সরকার বরাবরই এই ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। তাদের বক্তব্য, ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক ইসরায়েলের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি তৈরি করছে, তাই আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া তাদের বিকল্প নেই।
ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছেন, ইসরায়েল ও ইরানকে “তৎক্ষণাৎ অস্ত্রবিরতি” বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বিশেষভাবে ইসরায়েলকে সতর্ক করেছেন, লেবাননের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে যেন ইরান-ইসরায়েল বিরোধের সমাধানে সম্ভাব্য কূটনৈতিক চুক্তি বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়।
তবে ইসরায়েল এই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে হামলা চালিয়েছে।
বাস্তব নিরাপত্তা চায় তেহরান
ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের বক্তব্যে একটি বিষয় বারবার উঠে আসছে। তারা এমন কোনো অস্ত্রবিরতিতে আগ্রহী নয়, যা কেবল কাগজে-কলমে থাকবে কিন্তু বাস্তবে হামলা চলতেই থাকবে।
তেহরানের দৃষ্টিতে অতীতের অনেক অস্ত্রবিরতি চুক্তি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে গাজা ও লেবাননের অভিজ্ঞতা সামনে রেখে ইরান মনে করে, স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে হলে হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি প্রয়োজন।
গুরুত্ব পাচ্ছে লেবানন ইস্যু
ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের সবচেয়ে বড় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে লেবাননে।
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালামের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ এপ্রিল ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও ৭ জুন পর্যন্ত ইসরায়েল প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বিমান হামলা চালিয়েছে।
একই সময়ে শত শত নিয়ন্ত্রিত ধ্বংস অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং দক্ষিণ লেবাননের কয়েকটি গ্রাম পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।
লেবানন সরকারের দাবি, এই হামলাগুলোর ফলে নতুন করে ব্যাপক জনসংখ্যা স্থানচ্যুত হয়েছে। রাজধানী বৈরুত, সাইদনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা এতটাই বেড়েছে যে দেশটির ধারণক্ষমতা প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ইসরায়েলি হামলায় দেশটির ১০ লাখেরও বেশি মানুষ এখন বাস্তুচ্যুত, যা মোট জনসংখ্যাার ২০ শতাংশ।
সংকট কোন দিকে যাচ্ছে?
বিশ্লেষকরা সম্ভাব্য তিনটি দৃশ্যপটের কথা বলছেন। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যস্থতায় একটি সীমিত যুদ্ধবিরতি হতে পারে। এতে সরাসরি সংঘর্ষ কমবে, কিন্তু মূল বিরোধ অমীমাংসিতই থেকে যাবে।
দ্বিতীয়ত, সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে লেবাননের হেজবুল্লাহ, ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনের হুথিদের আরও সক্রিয় অংশগ্রহণ ঘটাতে পারে। এতে পুরো অঞ্চল একটি বহুমুখী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে।
তৃতীয়ত, উভয় পক্ষ যদি জ্বালানি অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা অব্যাহত রাখে, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন ধাক্কার মুখে পড়বে।
আল-জাজিরা ও বিবিসি অবলম্বনে