সমঝোতার পথে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র: কী থাকছে চুক্তিতে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা অবসানে ‘মোটামুটি চূড়ান্ত’ হয়েছে সমঝোতার রূপরেখা। যার আওতায় খুলে দেওয়া হবে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনের পথ হরমুজ প্রণালি। চুক্তিটির চূড়ান্ত বিষয়গুলো নিয়ে চলছে আলোচনা। শিগগিরই তা ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।

এই চুক্তিকে ২০২৬ এর ফেব্রুয়ারি থেকে চলা যুদ্ধের অবসান এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন। কিন্তু তেহরান, এমনকি ট্রাম্পের নিজের রাজনৈতিক শিবিরের একটি বড় অংশই সংশয় প্রকাশ করেছে এই চুক্তির স্থায়িত্ব এবং শর্ত নিয়ে। ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কট্টরপন্থি রিপাবলিকানরা এই পদক্ষেপকে দেখছে ‘ইরানের জয়’ হিসেবে। 

কী আছে চুক্তিতে 

আলোচনার সাথে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, ট্রাম্প যে সমঝোতা স্মারকটি সই করতে যাচ্ছেন, তা মূলত দুই দেশের মধ্যে চলমান শত্রুতা ও যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটাবে। এর বিনিময়ে খুলে দেওয়া হবে হরমুজ প্রণালি। পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হবে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ। একইসাথে এই চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের বিপুল পরিমাণ অর্থ আংশিকভাবে মুক্ত করা হবে।

সুত্রের মতে, এই চুক্তিটি দুই দেশের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তৈরি হওয়া অচলাবস্থার স্থায়ী সমাধানের জন্য অন্তত ৩০ দিনের একটি সময়সীমা বা 'ক্লক' চালু করবে। এর মধ্যে তেহরানের কাছে থাকা ‘প্রায় অস্ত্র তৈরির উপযোগী’ ইউরেনিয়াম মজুদের ভবিষ্যত কী হবে, তা নির্ধারিত হবে।

এই চুক্তিটি মূলত দুটি ধাপে বাস্তবায়িত হবে বলে জানিয়েছে সিএনএন। প্রথম ধাপে হরমুজ প্রণালীকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু করা হবে। একইসাথে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার নিশ্চয়তা দিতে হবে তেহরানকে। বিনিময়ে ইরান পাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও তেলজাতীয় উপাদান বিক্রির অনুমতি।

দ্বিতীয় ধাপে আলোচনা হবে দীর্ঘমেয়াদী পারমাণবিক ইস্যু এবং অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলো নিয়ে।

এই চুক্তির খসড়ায় কী আছে তা নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদ মাধ্যম অ্যাক্সিওস। 

একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, এই সমঝোতা স্মারকটির প্রাথমিক মেয়াদ হবে ৬০ দিন, যা উভয় পক্ষের সম্মতিতে পরবর্তীতে বাড়ানো যেতে পারে।

এই সময়ের মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে তাদের পুঁতে রাখা সব মাইন অপসারণ করতে সম্মত হয়েছে বলে জানায় অ্যাক্সিওস। এতে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো কোনো টোল ছাড়াই যাতায়াত করতে পারবে। 

ওই কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেন, ইরান চুক্তি সইয়ের সাথে সাথে তাদের সমস্ত অবরুদ্ধ তহবিল ফেরত এবং স্থায়ীভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি করেছিলো। তবে ‘দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি’ না দেখালে তা করতে অসম্মতি জানায় যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের আলোচনার এই নীতিকে বলা হচ্ছে ‘রিলিফ ফর পারফরম্যান্স’ বা ‘কাজের ভিত্তিতে ছাড়’।

সমঝোতার এই আলোচনায় ইরান ‘কখনই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করা’র মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে জানায় অ্যাক্সিওস। তারা আরও জানায়, লেবাননে ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে চলা যুদ্ধের অবসান চুক্তির একটি প্রচ্ছন্ন শর্ত।

কার জয়? কার পরাজয়?

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য এই চুক্তিকে ইরানের কূটনৈতিক এবং কৌশলগত বিজয় হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।

‘ইরান যা চেয়েছিল’ এই চুক্তিতে তার সবকিছুই পাচ্ছে বলে মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব তেহরানের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ফুয়াদ ইজাদি। 

কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া বক্তব্যে ইজাদি বলেন, ইরানের ওপর থেকে অবরোধ তুলে নিতে বাধ্য হচ্ছেন ট্রাম্প। তার মতে, মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ইরান কখনই হরমুজ প্রণালি খুলতো না। আটকে থাকা টাকা ফেরত পাওয়া এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতি, সবকিছু ইরানের পক্ষেই যাচ্ছে বলে মত অধ্যাপক ইজাদির।

এই চুক্তির মাধ্যমে ৩৭ বছরের মার্কিন-ইরান শত্রুতার অবসান ঘটতে পারে বলে মনে করেন কুইন্সি ইনস্টিটিউটের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং ইরান বিশেষজ্ঞ ত্রিতা পারসি।

আল জাজিরাকে তিনি বলেন, কে কার কাছে নতি স্বীকার করবে তা এখনই বলা যাবে না। তবে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উঠে গেলে এবং পারমাণবিক সমস্যার সমাধান হলে তা প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার করা চুক্তির চেয়েও বড় এবং ঐতিহাসিক হবে বলে মত তার।

ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, এই সমঝোতায় উল্লেখ থাকবে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, ইরানের তেলের ওপর সমস্ত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখা এবং ‘ফ্রিজ’ করা অর্থের একটি বড় অংশ অবমুক্ত করার শর্ত।

এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও দেখা দিয়েছে ব্যাপক আলোচনা- সমালোচনা। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এই চুক্তির সমালোচনা করে লিখেছেন, এটি কোনোভাবেই 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতি হতে পারে না। এই চুক্তিকে ওবামা আমলের চুক্তির মতোই ‘দুর্বল ও ক্ষতিকর’ বলে অভিহিত করেছেন পম্পেও।

পম্পেওর এই মন্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন হোয়াইট হাউসের কমিউনিকেশন ডিরেক্টর স্টিভেন চাং। পম্পেওকে তার ‘বোকা মুখটা’ বন্ধ রাখতে এবং আসল কাজটা পেশাদারদের করতে দেওয়ার পরামর্শ দেন চাং। 

ইউনাইটেড স্টেটস সিনেট কমিটি অন আর্মড সার্ভিসেস চেয়ারম্যান রজার উইকার এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামও ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন। 

এক এক্স পোস্টে গ্রাহাম লিখেছেন, ইরানকে (এই চুক্তির মাধ্যমে) আরও শক্তিশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। যাকে দমনে কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজন। চুক্তিটি এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি বড় পরিবর্তন আনবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের জন্য একটি দুঃস্বপ্ন তৈরি করবে।

ইরানের ইসলামপন্থি শাসনের সাথে চুক্তি করার ক্ষেত্রে এই ‘তাড়াহুড়ো’ আমেরিকার দুর্বলতা হিসেবে প্রকাশ পাবে বলে মন্তব্য করেছেন সিনেটর উইকার। 

আঞ্চলিক কূটনীতি: পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতা ও এরদোয়ানের সমর্থন

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য এই চুক্তির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান ও কাতার। পাকিস্তানের সামরিক প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির গত শুক্র ও শনিবার তেহরানে অবস্থান করে দুই দেশের মধ্যে নিবিড় মধ্যস্থতা চালান বলে জানায় সিএনএন ও অ্যাক্সিওস। 

শান্তি প্রতিষ্ঠার ‘অসাধারণ প্রচেষ্টার’ জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট  রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানও ট্রাম্পের সাথে ফোনালাপে এই চুক্তিকে পূর্ণ সমর্থনের কথা জানিয়েছেন বলে উঠে এসেছে আল জাজিরা প্রতিবেদনে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে মুক্ত ও নিরাপদ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত হলে তা বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের স্বস্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এনে দেবে বলে বিবৃতিতে জানায় আঙ্কারা।

‘হরমুজ প্রণালীর সংকট সমাধানে একটি খসড়া রূপরেখা তৈরিতে ভালো অগ্রগতি হয়েছে’ বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন ভারতের সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।

তেহরানের হুঁশিয়ারি ও ইসরায়েলের উদ্বেগ

চুক্তির সম্ভাবনা যতই ঘনিয়ে আসছে, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা ততই বাড়ছে। 

নিজেদের দেশ এবং জাতির অধিকারের প্রশ্নে এক চুলও পিছু না হটার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও এই সমঝোতার প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।

হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেবল ইরান, ওমান এবং এই প্রণালির সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে হওয়া উচিত বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। এখানে আমেরিকার ‘নাক গলানোর সুযোগ নেই’ বলে জানান তিনি। ট্রাম্পের দাবি ‘বাস্তবতার সাথে সংগতিপূর্ণ নয়’ বলে জানান বাঘাই। 

অন্যদিকে, এই চুক্তিকে নিজেদের জন্য একটি ‘ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে দেখছে ইসরায়েল। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের এই চুক্তির দুটি ধারা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছে সিএনএন এবং ইসরায়েলি পাবলিক ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (কান)। 

একটি হলো লেবাননে হিজবুল্লাহর সাথে যুদ্ধবিরতি। অন্যটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়টিকে দীর্ঘমেয়াদে ঝুলিয়ে রাখা। ইসরায়েলের আশঙ্কা, ইরান এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির সুযোগ নিয়ে একইসাথে নিষেধাজ্ঞা থেকে নিজেকে রক্ষা করার পাশাপাশি গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করবে। 

এই বিষয়ে আলোচনার জন্য নেতানিয়াহু নিরাপত্তা ক্যাবিনেটের জরুরি বৈঠক ডাকে বলেও জানায় সিএনএন।

ইউনিভার্সিটি অব তেহরানের ওয়ার্ল্ড স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক সেতারেহ সাদেকি বলেন, ‘দুই পক্ষই বলছে তারা চুক্তির খুব কাছে, আবার একই সাথে অনেক দূরে’। 

আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, ট্রাম্পের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তিনি ইসরায়েলের স্বার্থকে উপেক্ষা করে এই চুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন কিনা। ইসরায়েল যে কোনো মূল্যে এই চুক্তি নস্যাৎ করতে চাইবে বলে মনে করেন অধ্যাপক সেতারেহ। 

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেন যে, আঞ্চলিক নেতাদের সাথে বসার আগে এই চুক্তির সফলতার সম্ভাবনা ছিল ‘ফিফটি-ফিফটি’। একইসাথে হুমকি দিয়ে রেখেছেন আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরানকে ‘উড়িয়ে দেওয়ার’। 

ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকটি শেষ পর্যন্ত একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তিতে রূপ নেবে, নাকি আরও বড় যুদ্ধের সূচনা করবে তা নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।