রাত চারটা। হাসপাতালের ওয়ার্ড একদম শান্ত। একজন ডাক্তার গত নয় ঘণ্টা ধরে একটানা ডিউটি করছেন। তিনি প্রচণ্ড ক্লান্ত, শরীর ব্যথা করছে এবং চোখ ভেঙে ঘুম আসছে। সকাল ছয়টায় ডিউটি শেষে বাড়ি ফেরার পর কোনোভাবেই ঘুম আসছে না।
আমাদের দেশেও এমন অসংখ্য কর্মজীবী আছেন যারা শিফটে কাজ করেন। এদের মধ্যে আছেন নার্স, প্যারামেডিক, পুলিশ, নিরাপত্তা প্রহরী, ইঞ্জিনিয়ার, রিকশাচালক এবং কারখানার শ্রমিক। পুরো দেশ যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন তারাই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
প্রশ্ন হলো, কেন এমন হয়? বিজ্ঞানীরা দেখেছেন লাখ লাখ বছরের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া মানুষের শরীরের বায়োলজিক্যাল ক্লক সূর্যের আলো ও অন্ধকারের সাথে মিশে গেছে।
সেই বায়োলজিক্যাল ক্লক জানান দিচ্ছে যে, সকাল হয়ে গেছে। এখন জেগে উঠতে হবে, কাজে মন দিতে হবে। তাই ঘরকে অন্ধকার বানিয়ে, কানের প্লাগ দিয়ে বা জানালার কালো পর্দা দিয়েও দিনের বেলায় ঘুমানো সম্ভব হচ্ছে না।
রাতের শিফটে কাজ শেষ করে সকালে বাড়ি ফিরে কেন আমাদের ঘুম আসে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখেছেন ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির স্ট্রোক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক হিউ মার্কাস।
এই বায়োলজিক্যাল ক্লক এবং আধুনিক জীবনযাত্রার সাথে প্রতিনিয়ত মানুষকে লড়াই করতে হচ্ছে, এর মূল্যও দিতে হচ্ছে। গবেষণায় উঠে আসছে- রাতে না ঘুমানোর কারণে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, ক্যানসার, মানসিক অবসাদ, এমনকি স্মৃতিশক্তিও হারিয়ে যেতে পারে।
বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন ঘুমের ধরনের কিছুটা পরিবর্তন এনে নাইট শিফটের এবং অনিয়মিত ঘুমের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো কিছুটা কমানোর। তারা গবেষণায় পেয়েছেন, দিনের বেলা জোর করে একটানা দীর্ঘ সময় ঘুমানোর চেষ্টা না করে, ঘুমকে যদি দুটি আলাদা ভাগে ভাগ করে নেওয়া যায়, তবে সেটি হয়তো কিছুটা কার্যকর উপায় হতে পারে।
শিফট ওয়ার্ক বা পালাক্রমে কাজের ক্ষতি
অনেকেই ভাবেন, ঘুম শুধু মস্তিষ্ক এবং শরীরকে বিশ্রাম দেয়। কিন্তু তার কাজ আরও বড়। মানুষ যখন ঘুমায়, তখন মস্তিষ্ক আমাদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে। পাশাপশি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত পেশীগুলোকে মেরামত করে।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ঘুম বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রাসেল ফস্টার বলেন, “খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যায়ামের মতো ঘুমও স্বাস্থ্যের একটি মূল ভিত্তি। তাই ঘুমের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে হবে।”
গবেষকরা বলছেন, আমরা যখন ঘুমাই, তখন মস্তিষ্ক নিজে নিজে পরিষ্কার হয়। মস্তিষ্কের ভেতর ‘গ্লিম্ফ্যাটিক সিস্টেম’ নামের চমৎকার এক ড্রেনেজ বা নিষ্কাশন ব্যবস্থা আছে। ঘুমের সময় মস্তিষ্কের রক্তনালীর পাশ দিয়ে এক ধরনের তরল প্রবাহিত হয়, যা জেগে থাকার সময় মস্তিষ্কে জমে থাকা সকল বর্জ্য পদার্থ পরিষ্কার করে দেয়।
তাহলে, ঘুম ঠিকমতো না হলে এই ক্ষতিকর বর্জ্যগুলোর কী হয়?
ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির স্ট্রোক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও নিউরোলজিস্ট অধ্যাপক হিউ মার্কাস এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। মার্কাস ৪০ হাজারের বেশি মানুষের মস্তিষ্কের স্ক্যান পরীক্ষা করেছেন।
তিনি বলছেন, অনেকের এই নিষ্কাশন ব্যবস্থা বেশি দুর্বল ছিলো। কয়েক বছর পর তাদের ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি বেড়ে যায়।
“সাধারণ মানুষের মধ্যে ডিমেনশিয়া হওয়ার অন্যতম বড় একটি লক্ষণ, মস্তিষ্কের বর্জ্য নিষ্কাশন প্রবাহে বাধা পাওয়া।”
মস্তিষ্কের এই বর্জ্যগুলোর মধ্যে ‘অ্যামাইলয়েড’ এবং ‘টাউ’ নামের প্রোটিনও থাকে, যা মূলত অ্যালঝাইমার্স বা স্মৃতি বিলোপ রোগীদের মস্তিষ্কে জমা হতে দেখা যায়।
মাত্র এক রাতের অনিদ্রাই মস্তিষ্কের তরলে অ্যামাইলয়েডের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। আর বছরের পর বছর ধরে যদি এই অনিয়ম চলতে থাকে, তাহলে পরিণতি সত্যিই আশংকাজনক হতে পারে মনে করেন মার্কাস।
সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের গবেষকরা ১৩ হাজারের বেশি শিফট-কর্মীর ওপর প্রায় ৪১ বছর ধরে একটি গবেষণা চালিয়েছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাঝবয়সে শিফট ওয়ার্ক করার কারণে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। একজন ব্যক্তি যতো বেশি সময় ধরে এই শিফটে কাজ করেন, তার ঝুঁকিও ততো বাড়ে।
অধ্যাপক ফস্টার বলেন, “আমরা সরাসরি বলতে পারি না কম ঘুমের কারণেই ডিমেনশিয়া হয়। আপনার যদি আগে থেকেই এই রোগের ঝুঁকি থাকে, তবে ঘুম না হওয়াটা সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেবে।”
মার্কাস বলেন, “ঘুম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে রক্তচাপ, ধূমপান, ডায়াবেটিসের মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে, অ্যালঝাইমার্সের ঝুঁকি কমাতে এই বিষয়গুলো কতোটা ভূমিকা রাখে। অথচ এগুলো আমরা চাইলেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।”
ঘুমের ব্যাঘাত হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়ায়। ২০২৫-এ প্রকাশিত ৩৫টি গবেষণার একটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, টানা তিন বা তার বেশি রাত যদি কেউ সাড়ে চার ঘণ্টার কম ঘুমায়, তবে তার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অতিরিক্ত বেড়ে যায়। যা শরীরের ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা তৈরি করলেও দীর্ঘস্থায়ীভাবে ইনফ্লামেশন তৈরি করে। আর শরীরের এই প্রক্রিয়া হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে।
অনিয়মিত ঘুম শরীরের স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’ বাড়িয়ে দেয়। যা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে শরীরকে ডায়াবেটিসের দিকে ঠেলে দেয়। কর্টিসলের উচ্চমাত্রা ঘুমকে আরও নষ্ট করে। এছাড়া রাতে বেশিক্ষণ জেগে থাকলে মানুষের মধ্যে মিষ্টি বা চিনিযুক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
এখানেই শেষ নয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যানসার গবেষণা সংস্থা আইএআরসি বলছে, রাতের শিফটের কাজ মানুষের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। ব্রেস্ট, প্রোস্টেট এবং কোলন ক্যানসারের সাথে এর সংযোগ পাওয়া গেছে।
বাইফেজিক স্লিপ বা দুই দফার ঘুম
নাইট শিফটের কর্মীদের এই স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে আশার আলো দেখাচ্ছেন নরওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অকুপেশনাল হেলথের গবেষক ডক্টর লাইন ভিক্টোরিয়া মোয়েন। আর্কটিক সার্কেলে বা যেখানে গ্রীষ্মে সূর্য ডোবে না, এমন জায়গায় কাজ করা শিফট-কর্মীদের ওপর গবেষণা করে তিনি একটি চমকপ্রদ তথ্য পান।
কর্মীরা কাজ শেষে একটানা না ঘুমিয়ে সকাল এবং বিকেল- এই দুই ভাগে ঘুমকে ভাগ করে নিচ্ছেন। বৈজ্ঞানিক ভাষায় একে বলা হয় 'বাইফেজিক স্লিপ'।
শিল্পবিপ্লবের আগে যখন কৃত্রিম আলোর ব্যবহার ছিলো না, তখন মানুষ সাধারণত এই দুই ভাগেই ঘুমাতো।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া টেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ রজার একির্চ প্রায় ৪০ বছর ধরে ইউরোপের শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের ঘুমের অভ্যাস নিয়ে গবেষণা করেছেন।
তার গবেষণায় দেখা যায়, তখন মানুষ একটানা ঘুমাতো না। সাধারণত রাত নয়টার দিকে ঘুমিয়ে মধ্যরাতে একবার জেগে উঠতো। এক ঘণ্টা প্রার্থনা, ঘরের কাজ বা গল্প করার পর তারা আবার ঘুমাতো, যাকে বলা হতো ‘দ্বিতীয় ঘুম’।
তবে কৃত্রিম আলোর ব্যবহার বাড়ার পর, বিশেষ করে ১৮০৭ সালে লন্ডনের রাস্তায় গ্যাস ল্যাম্প চালু হওয়ার পর, মানুষ রাত জেগে বেশি সময় কাটাতে শুরু করে। ফলে দুই ধাপে ঘুমানোর এই অভ্যাস ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
এই বিষয়ে অধ্যাপক ফস্টার বলেন, “একটানা এক ব্লকে ঘুমানোটা মানুষের স্বাভাবিক বা ডিফল্ট সেটিং নয়।”
ঘুম নিয়ে দুশ্চিন্তা বা স্লিপ অ্যাংজাইটি
শিফট-কর্মীরা প্রায়ই দিনের বেলা একটানা ঘুমাতে না পেরে স্লিপ অ্যাংজাইটিতে ভোগেন। তাই ডা. মোয়েন শিফট-কর্মীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন তৈরির কাজ করছেন, যাতে তারা বুঝতে পারেন যে একটানা ঘুমাতে না পারাটা কোনো রোগ নয়।
মোয়েনের এই গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো শিফট-কর্মী এবং যাদের ঘুমের সময় নির্দিষ্ট নয়, তাদের জন্য একটি বৈজ্ঞানিক গাইডলাইন তৈরি করা।
মোয়েন বলেন, “শিফট-কর্মীরা নাইট শিফটের পর বেশিক্ষণ ঘুমাতে না পেরে ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। আমরা যদি তাদের বৈজ্ঞানিকভাবে আশ্বস্ত করতে পারি যে, বিকালের দিকে একটি ভালো ঘুম বা ছোট ন্যাপও তাদের শরীরের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পারে, তবে তারা মানসিক শান্তি পাবেন।”
বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ডিউটির ফাঁকে সুযোগ বুঝে একটু ঘুমিয়ে নিলে ক্লান্তি কমে এবং কাজের মনোযোগ বাড়ে।
স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডিউটির সময় বা পরে মাত্র ২০ থেকে ৫০ মিনিটের একটি ছোট ঘুমও মনোযোগ অনেক বাড়িয়ে দেয় এবং বাড়ি ফেরার পথে ঘুম ঘুম চোখে গাড়ি চালানোর ঝুঁকি কমায়।
ডা. মোয়েনের নিজের স্বামীও একজন শিফটকর্মী। শিফটে কাজ করা মানুষের সমস্যাগুলো তাই তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
মোয়েন তার স্বামী এবং বিশ্বের কোটি কোটি শিফট-কর্মীকে এই বার্তা দিতে চান যে, শরীরের এই সিগনালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করে, এর সাথে মানিয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।