পোষা বিড়ালের আবরণে বুনো বিড়াল: সাইকোপ্যাথ চেনার উপায়

সাইকোপ্যাথ মানেই ভয়ংকর অপরাধী, এ ধারণা ভুল হতে পারে। বাইরে থেকে স্বাভাবিক, আত্মবিশ্বাসী ও সফল মনে হওয়া মানুষের মধ্যেও থাকতে পারে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ, প্রতারণা ও শোষণের প্রবণতা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, তারা অনেক সময় এতটাই স্বাভাবিক ও আত্মবিশ্বাসের সাথে মিথ্যা বলেন যে বিপদের সংকেত বুঝে উঠতে দেরি হয়ে যায়।  

আপডেট : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম

সাইকোপ্যাথ। শব্দটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভয়ংকর কোনো অপরাধীর ছবি। কিন্তু সাইকোপ্যাথ মানেই কি ভয়ংকর অপরাধী? বাস্তবতা মোটেও এমন নয়।

সমাজে এমন মানুষও আছেন, যারা বাইরে থেকে একেবারেই স্বাভাবিক। কেউ কেউ আবার সফল ও ক্ষমতাবান। অথচ তাদের মধ্যে থাকতে পারে সহমর্মিতার অভাব, মিথ্যাচার, প্রতারণা ও অন্যকে শোষণের প্রবণতা। আর এমন মানুষই কখনো কখনো তাদের আশপাশের মানুষের জীবনে বড় ক্ষতি ডেকে আনেন।

মনোবিজ্ঞানীরা এ ধরনের মানুষকে বোঝাতে ‘ডার্ক পার্সোনালিটি’ বা ‘পারসিস্টেন্ট প্রিডেটরি পার্সোনালিটি’ শব্দ ব্যবহার করছেন। এদের চেনা কঠিন। বাইরে থেকে তাদেরকে আত্মবিশ্বাসী, মিশুক এবং স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। এমনকি মিথ্যা বলার সময়ও তাদের মধ্যে অস্বস্তি বা নার্ভাসনেস দেখা যায় না। ফলে বিপদের সংকেত বুঝে ওঠার আগেই তারা অন্যের ক্ষতি করে ফেলতে পারেন।

সাইকোপ্যাথ শনাক্তের পুরোনো পদ্ধতি ও সীমাবদ্ধতা 

সাইকোপ্যাথ চেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিচিত গবেষণাগুলোর একটি করেন কানাডার মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক রবার্ট হেয়ার। ১৯৮০ সালে তিনি সাইকোপ্যাথদের আচরণ ও ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য নিয়ে ২০টি বিষয়ের একটি তালিকা তৈরি করেন।

এই তালিকায় একজন মানুষ কীভাবে মিথ্যা বলেন, অন্যকে প্রতারণা করেন, নিজের কাজের দায় নেন কি না, অন্যের কষ্ট বুঝতে পারেন কি না এসব বিষয়গুলো ছিলো।

তালিকায় থাকা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে ছিলো 'প্যাথোলজিকাল লাইয়িং', অর্থাৎ প্রয়োজন না থাকলেও বারবার মিথ্যা বলা। সহমর্মিতার অভাব, অর্থাৎ অন্যের অনুভূতি বা কষ্ট বুঝতে না পারা; এবং প্রতারণামূলক আচরণ, মানে নিজের স্বার্থে অন্যকে ব্যবহার করা। দায়িত্বহীনতা ও নিজের কাজের পরিণতির প্রতি উদাসীনতাও এই বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে ছিলো।

তবে হেয়ারের এই গবেষণার একটি সীমাবদ্ধতা ছিলো। তার তালিকাটি মূলত কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে করা গবেষণার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিলো। ফলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত, সফল কিংবা অপরাধে না জড়ানো ব্যক্তিদের মধ্যে একই ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকলে তাদের ক্ষেত্রে এই তালিকা কতটা কার্যকর, সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

হেয়ার নিজেও বিষয়টি স্বীকার করেছিলেন। ১৯৭৬ সালে তিনি বলেছিলেন, কারাগারের বাইরে থাকা সাইকোপ্যাথদের ক্ষেত্রে তার গবেষণার ফলাফল কতটা প্রযোজ্য, তা তিনি জানেন না। তিনি বিশেষ করে নারী সাইকোপ্যাথদের বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন।

সমস্যার আরেকটি জায়গা হলো সাইকোপ্যাথদের নিয়ে গবেষণায় তাদের নিজেদের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করা কঠিন। কারণ মিথ্যা বলা ও তথ্য গোপন করাও তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হতে পারে।

‘ডার্ক পার্সোনালিটি’র ধারণা 

উচ্চমাত্রার কার্যক্ষমতাসম্পন্ন সাইকোপ্যাথ নিয়ে গবেষণা করেছেন অস্ট্রেলিয়ার গবেষক ড. কারেন মিচেল। ড. কারেন মিচেল প্রথমে সাইকোপ্যাথির গবেষক ছিলেন না। তিনি ৩০ বছর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমস্যা সমাধান ও করপোরেট সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেন, কিছু নির্দিষ্ট মানুষের আচরণ থেকেই কর্মক্ষেত্রে বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। 

কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেন, অনেক প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের সমস্যার পেছনে নির্দিষ্ট কিছু মানুষের আচরণ দায়ী। তারা অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করেন, নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেন, ভয় দেখান বা নানা কৌশলে মানসিক চাপ তৈরি করেন। এসব আচরণ কীভাবে কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ ও অন্য মানুষের জীবনে ক্ষতি করে, তা থেকেই মিচেলের এ বিষয়ে গবেষণার আগ্রহ তৈরি হয়।

পরে মিচেল কর্মক্ষেত্রের বাইরেও একই ধরনের আচরণ খুঁজে দেখতে শুরু করেন। তিনি দেখেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিশুদের যৌন নির্যাতন, মানবপাচার, পারিবারিক সহিংসতায় অন্যকে জোর করে নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা সন্ত্রাসবাদের মতো ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রেও কিছু আচরণগত মিল রয়েছে।

এসব ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিদের বোঝাতে আলাদা আলাদা নাম ব্যবহার করা হয়। যেমন, ‘ম্যালিগন্যান্ট নার্সিসিস্ট’, ‘ডার্ক ট্রায়াড’, ‘করপোরেট সাইকোপ্যাথ’, ‘ম্যাকিয়াভেলিয়ান’ বা ‘টক্সিক লিডার’।

ম্যালিগন্যান্ট নার্সিসিস্ট’ বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করেন এবং নিজের স্বার্থে অন্যকে অপমান, নিয়ন্ত্রণ বা ক্ষতি করতে পারেন। ‘ম্যাকিয়াভেলিয়ান’ বলতে এমন মানুষকে বোঝায়, যিনি নিজের উদ্দেশ্য পূরণে কৌশল, প্রতারণা ও অন্যকে নিয়ন্ত্রণের আশ্রয় নেন।

‘করপোরেট সাইকোপ্যাথ’ বলতে কর্মক্ষেত্রে সাইকোপ্যাথিক বৈশিষ্ট্য থাকা ব্যক্তিকে বোঝানো হয়। বাইরে থেকে তিনি আত্মবিশ্বাসী ও সফল মনে হলেও নিজের স্বার্থে অন্যকে ব্যবহার বা ক্ষতি করতে পারেন। আর ‘টক্সিক লিডার’ বলতে এমন নেতাকে বোঝায়, যার আচরণ কর্মীদের জন্য ক্ষতিকর। তার বৈশিষ্ট্য হলো কর্মীকে ভয় দেখানো, অপমান করা, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করা বা কর্মীদের নিজের স্বার্থে ব্যবহার করা।

অন্যদিকে, ‘ডার্ক ট্রায়াড’ হলো তিন ধরনের ব্যক্তিত্বগত বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়। নার্সিসিজম, ম্যাকিয়াভেলিয়ানিজম ও সাইকোপ্যাথ।

তবে মিচেলের মতে, নাম আলাদা হলেও এদের মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তারা অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করেন, নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেন, প্রতারণা করেন এবং অন্যের ক্ষতি করতেও পিছপা হন না।

এই মিল থাকা বৈশিষ্ট্যগুলোকে মিচেল একসাথে নাম দিয়েছেন ‘ডার্ক পার্সোনালিটি’। 

কীভাবে চিনবেন এ ধরনের মানুষকে?

২০২৪ সালে মিচেল একটি পিএইচডি গবেষণা প্রকাশ করেন। গবেষণায় তিনি এমন পেশাজীবীদের সাক্ষাৎকার নেন, যারা কাজের সূত্রে এ ধরনের ব্যক্তিত্বের আচরণ কাছ থেকে দেখেছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মানবসম্পদ কর্মকর্তা, সমাজকর্মী, পারিবারিক আদালতের সঙ্গে যুক্ত পেশাজীবী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সদস্য, ধর্মীয় নেতা এবং বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করা শিক্ষাবিদ। অর্থাৎ, ভিন্ন ভিন্ন পেশায় থাকা এসব মানুষ নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে একই ধরনের ক্ষতিকর আচরণ কীভাবে দেখেছেন, সেটিই মিচেল তার গবেষণায় তুলে ধরেন।

পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন পেশাজীবীর অভিজ্ঞতা ও সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে মিচেল এ ধরনের ব্যক্তিত্বের ২০টি বৈশিষ্ট্য এবং অন্যদের প্রভাবিত করার ২৫টি কৌশল চিহ্নিত করেন। বিশটি বৈশিষ্ট্যকে তিনি চারটি ভাগে সাজিয়েছেন।

প্রথম ভাগ: নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা

এই ধরনের মানুষ অন্যকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান। তারা নিজেকে অন্যদের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যোগ্য বা ক্ষমতাবান মনে করতে পারেন। কেউ তাদের সমালোচনা করলে বা তাদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে সেটি সহজভাবে নেন না। বরং অতিরিক্ত রেগে যাওয়া, প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করা কিংবা বিরোধী ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা দেখা যেতে পারে। নিজের স্বার্থের সঙ্গে আপস করতেও তারা অনিচ্ছুক।

দ্বিতীয় ভাগ: অন্যকে ব্যবহার ও শোষণ

এই পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্য মানুষের প্রতি তাদের আচরণ। তারা নিজের সুবিধার জন্য অন্যকে ব্যবহার বা শোষণ করতে পারেন। অন্যের কষ্ট বা ক্ষতির বিষয়টি তাদের কাছে খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। আইন, সামাজিক নিয়ম বা নৈতিকতার সীমারেখাকেও তারা উপেক্ষা করতে পারেন। এমনকি ব্যক্তিগত ও যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অন্যের সম্মতি বা সীমারেখাকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা থাকতে পারে। একই সঙ্গে অন্যদের কাছে এমন কিছু প্রত্যাশা করেন, যা বাস্তবে অযৌক্তিক বা পূরণ করা কঠিন।

তৃতীয় ভাগ: স্বাভাবিকতার আড়ালে থাকা

এ ধরনের মানুষকে চেনা কঠিন হওয়ার অন্যতম কারণ এটি। তারা নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যাতে বাইরে থেকে তাদের একেবারে স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। পরিস্থিতি ও মানুষের ধরন বুঝে তারা নিজেদের আচরণও বদলে নিতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী একেকজনের সামনে একেক রকম আচরণ করার এই ক্ষমতা তাদের সহজে ধরা পড়তে দেয় না।

এর পাশাপাশি তারা মিথ্যা বলতে পারেন, কৌশলে অন্যকে প্রভাবিত করতে পারেন এবং প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারেন। নিজের আচরণে অন্যের যে ক্ষতি হয়েছে, তার দায়ও তারা নিতে চান না। বরং পরিস্থিতির জন্য অন্য কাউকে দায়ী করার চেষ্টা করতে পারেন।

চতুর্থ ভাগ: আবেগের ঘাটতি ও আত্মকেন্দ্রিকতা

এই ধরনের ব্যক্তিদের আবেগ প্রকাশ অনেক সময় স্বাভাবিক মনে হলেও সেটি গভীর বা আন্তরিক নাও হতে পারে। তারা অন্য মানুষের সঙ্গে প্রকৃত আবেগীয় সম্পর্ক বা ঘনিষ্ঠতা অনুভব করেন না। অন্যের কষ্ট, ভয় বা অনুভূতির প্রতিও তাদের সহমর্মিতা কম থাকে।

নিজের স্বার্থই তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্যের ক্ষতি করলেও অনেক সময় অনুশোচনা দেখা যায় না। এমনকি নিজেদের আচরণ নিয়ে লজ্জা বা সংকোচও নাও থাকতে পারে। ফলে তারা প্রকাশ্যে এমন কিছু কাজও করতে পারেন, যা সাধারণ মানুষ সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য মনে করবে। 

কেন তাদের মিথ্যা সহজে ধরা পড়ে না?

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ডেভেলপমেন্টাল সাইকোপ্যাথোলজি অধ্যাপক এসি ভিডিংয়ের মতে, এ ধরনের ব্যক্তিদের চেনা কঠিন হওয়ার বড় একটি কারণ হলো তাদের মিথ্যা বলার ধরন।

সাধারণত কেউ মিথ্যা বললে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় কাজ করে। মিথ্যা বলতে গিয়ে ধরা পড়লে মানুষ অস্বস্তিতে পড়ে, লজ্জা পায় বা নার্ভাস হয়ে যায়। কিন্তু এ ধরনের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সেই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া অনেক সময় দেখা যায় না। মিথ্যা বলার সময় বা মিথ্যা বলে ধরা পড়ার পরও তারা আত্মবিশ্বাসী ও স্বাভাবিক থাকতে পারেন।

ভিডিংয়ের মতে, এই অস্বাভাবিক আত্মবিশ্বাসই অন্যদের বিভ্রান্ত করতে পারে। কারণ মানুষ সাধারণত ধরে নেয়, কেউ মিথ্যা বললে তার আচরণে অস্বস্তি বা নার্ভাসনেস দেখা যাবে। কিন্তু সেটি না থাকায় বিপদের সংকেত বুঝতে অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।

তার ভাষায়, এ ধরনের মানুষকে দেখে আমরা সহজে বুঝতে পারি না যে তারা বিপজ্জনক বা ক্ষতিকর হতে পারেন। তাদের আত্মবিশ্বাসী ও স্বাভাবিক আচরণ আমাদের সন্দেহ করার ক্ষমতাকে অনেকটা দুর্বল করে দেয়। ফলে তারা যে ক্ষতি করছেন, তা বুঝতে বুঝতে অনেক দেরি হয়ে যায়।

ভিডিং ২০১৯ সালে 'জার্নাল অব পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার্স'-এ প্রকাশিত একটি গবেষণার কথাও উল্লেখ করেন। ওই গবেষণায় বলা হয়, সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যে দুটি আচরণ সাধারণত একসঙ্গে দেখা যায় না, ‘ডার্ক পার্সোনালিটি’র মানুষের মধ্যে তা একসঙ্গে থাকতে পারে। যেমন, তারা একদিকে খুব আত্মবিশ্বাসী থাকেন, অন্যদিকে একই সময়ে সম্পূর্ণ মিথ্যাও বলতে পারেন। 

সমস্যা হলো, আমরা সাধারণত ধরে নিই কেউ মিথ্যা বললে তার আচরণে অস্বস্তি, দ্বিধা বা নার্ভাসনেস দেখা যাবে। কিন্তু কেউ যদি খুব স্বাভাবিক ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিথ্যা বলেন, তখন তাকে মিথ্যাবাদী বলে সন্দেহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। আর এই সুযোগেই ধরা পড়ার আগেই তিনি অন্যের বড় ধরনের ক্ষতি করে ফেলতে পারেন।

কর্মক্ষেত্রেও ভয়াবহ ক্ষতি

মিচেলের গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের ব্যক্তিত্বের ক্ষতিকর আচরণ শুধু অপরাধ বা সহিংসতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কর্মক্ষেত্রেও তারা সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ ও ভয় তৈরি করতে পারেন।

মিচেলের সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া এক মানবসম্পদ কর্মকর্তা জানান, তিনি সবসময় আশঙ্কায় থাকতেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তার পেশাগত জীবন ও ক্যারিয়ার নষ্ট করে দিতে পারেন। একজন সমাজকর্মীও জানান, তিনি ভয় করতেন ওই ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পারেন। 

তবে সমস্যা শুধু ভয় বা মানসিক চাপেই শেষ হয় না। মিচেলের মতে, এ ধরনের ব্যক্তিরা নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারেন যে আশপাশের মানুষ প্রকৃত ঘটনা বুঝতেই পারেন না। তারা নিজেদের নির্দোষ বা ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরতে পারেন, আবার প্রকৃত ভুক্তভোগীকেই অপরাধী হিসেবে দেখাতে পারেন।

মিচেলের গবেষণায় এমন ঘটনাও উঠে এসেছে, যেখানে সহকর্মীরা শেষ পর্যন্ত প্রকৃত ভুক্তভোগীকেই ‘ডার্ক পার্সোনালিটি’ হিসেবে মনে করতে শুরু করেন। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তাকেই উল্টো দোষী মনে করা হয়েছে।

এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। কারণ ভুক্তভোগী তখন শুধু ওই ব্যক্তির আচরণের শিকার হন না; কর্মক্ষেত্রের অন্যদের অবিশ্বাস ও ভুল ধারণারও মুখোমুখি হন। এর ফলে তার পেশাগত সুনাম, কর্মজীবন এবং ব্যক্তিগত জীবন সবকিছুই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

রাজনীতিতেও কি এসব বৈশিষ্ট্য দেখা যায়

রাজনীতির ক্ষেত্রে কোনো জনপরিচিত ব্যক্তিকে শুধু তার প্রকাশ্য আচরণ দেখে ‘সাইকোপ্যাথ’ বলা ঠিক নয়। ‘গোল্ডওয়াটার রুল’ অনুযায়ী, কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিগতভাবে কাউকে পরীক্ষা বা মূল্যায়ন না করে তার মানসিক রোগ নির্ণয় করতে পারেন না।

সহজভাবে বললে, কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ শুধু টিভিতে কোনো রাজনীতিবিদকে দেখে বা তার বক্তব্য শুনে বলতে পারবেন না ‘এই ব্যক্তির সাইকোপ্যাথি আছে’ বা ‘তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ’। 

কোনো জনপরিচিত ব্যক্তির মানসিক রোগ সম্পর্কে মত দিতে হলে চিকিৎসককে ওই ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে পরীক্ষা ও মূল্যায়ন করতে হবে। শুধু সংবাদ, ভিডিও, বক্তব্য বা প্রকাশ্য আচরণ দেখে রোগ নির্ণয় করা যাবে না।

তবে অধ্যাপক এসি ভিডিংয়ের মতে, কাউকে সরাসরি ‘সাইকোপ্যাথ’ বলার প্রয়োজন নেই। তার আচরণ কেমন, তিনি অন্যদের সঙ্গে কীভাবে ব্যবহার করেন এবং তার মধ্যে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ বা শোষণের মতো বৈশিষ্ট্য আছে কি না, সেগুলো দেখেই তার আচরণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।

ভিডিং বলেন, “তাদের রোগ নির্ণয় করার প্রয়োজন নেই। তাদের কিছু ব্যক্তিত্বগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং আপনি সেই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষকে চিনতে পারেন।”

রাজনীতিতে মিথ্যা বলার ধরনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি খুব বড় বা অবিশ্বাস্য কোনো মিথ্যা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, তখন অনেক মানুষ সেটিকে সরাসরি মিথ্যা বলে ধরে নিতে পারেন না। কারণ তাদের মনে হয়, এত বড় মিথ্যা কেউ এতটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কীভাবে বলতে পারেন?

ফলে মানুষ অনেক সময় মিথ্যা ও সত্যের মাঝামাঝি কোনো ব্যাখ্যা খুঁজতে শুরু করে। কেউ ভাবেন, কথাটির হয়তো কিছুটা সত্যতা আছে। আবার কেউ মিথ্যাটি সত্য ধরে নিয়ে নিজের ধারণাই বদলে ফেলেন। এভাবেই একটি মিথ্যা মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কেন বিষয়টি নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি?

মিচেলের মতে, একজন মানুষের মধ্যে এ ধরনের বৈশিষ্ট্য যত বেশি মাত্রায় থাকে, তার আচরণে অন্যদের ক্ষতির ঝুঁকিও তত বাড়ে। তাই এ ধরনের মানুষের আচরণের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মানুষকে জানানো জরুরি।

মিচেল বলেন, “এরা সম্পূর্ণ সীমাহীন ও বিপজ্জনক মানুষ, যাদের মস্তিষ্ক অন্যরকম। অনেকটা গৃহপালিত বিড়াল আর বুনো বিড়ালের পার্থক্যের মতো।”

তার মতে, এসব আচরণের সতর্কসংকেত সম্পর্কে মানুষ জানেন না বলেই বহু মানুষ ক্ষতির শিকার হয়েছেন। তাই কাউকে শুধু ‘সাইকোপ্যাথ’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেয়ে তার আচরণের ধরন বুঝতে শেখানো বেশি জরুরি।

অধ্যাপক ভিডিংও মনে করেন, মানুষের মধ্যে থাকা এসব বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি নির্মূল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই কীভাবে মানুষকে এ ধরনের ব্যক্তির ক্ষতিকর আচরণ চিনতে এবং তার শিকার হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে শেখানো যায় তা নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। 

(দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে)