“আমি দেশ ছেড়ে, দেশের মানুষকে ছেড়ে কোনদিন কোথাও যাব না” ।
ওয়ান ইলেভেনের সরকারের সময় যখন কথিত ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার আওতায় বিএনপি চেয়ারপার্সন ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বারবার বিদেশে নির্বাসনে যাওয়ার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছিল, তখন তিনি একাধিক বক্তৃতায় এই কথা বলেছেন।
বারবার কারাবরণ করেছেন, কিন্তু চাপ দিয়ে কোন সরকার, কোন সংস্থা কখনো কোনদিন খালেদা জিয়াকে সচেতন অবস্থায় বিদেশে পাঠাতে পারেনি। যে নির্বাচনে যোগ দেবেন না বলে ঘোষণা করেছেন, সেই নির্বাচনে জেল-জুলুম-অপমান করেও যোগ দেয়ানো যায়নি তাকে।
এজন্য দলের নেতা-কর্মীরা ভালবেসে, সম্মান করে তাকে ডাকতেন ‘আপসহীন নেত্রী’।
সেই আপসহীন নেত্রী অবশেষে ‘দেশ ছেড়ে, দেশের মানুষকে ছেড়ে’ এবং পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন ।
গত ২৩এ নভেম্বর থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। বেশ কয়েকদিন ধরেই তিনি সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন।
মঙ্গলবার ভোর ছটায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
ম্যাডাম থেকে মা
২০১৮ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি ভিন্ন ঘটনার সাক্ষী হয় বাংলাদেশ। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যাচ্ছেন গুলশানের বাসভবন থেকে পুরোনো ঢাকার বিশেষ আদালতে। রাস্তার দুই পাশে মানুষের ঢল।
সেদিন সবাই তাকে মা বলে ডাকছিল- মানুষ কেঁদে বুক ভাসিয়েছিল। তাদের স্লোগান ছিল- “আমার নেত্রী আমার মা, বন্দী হতে দেবো না।” সেদিন খালেদা জিয়াকে দণ্ড দিয়ে কারাবন্দি করা হয়।
এর আগে যিনি ছিলেন ম্যাডাম, বছরের পর বছর সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর্যুপরি নিপীড়নের শিকার ছিলেন, তারপরও যাকে কখনো আপস করতে দেখেনি কেউ, সেই মানুষটি কী করে যেন হয়ে উঠলেন সবার মা। সেই ঘটনার সাড়ে সাত বছর পর, আবার সেই মায়ের সন্তানদের কেঁদে বুক ভাসানোর দিন এসেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতির আলোচিত, অপরিহার্য ও প্রভাবশালী এক ব্যক্তিত্ব খালেদা জিয়া। পাঁচবার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনবার হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী এবং দুইবার বিরোধীদলীয় নেতা।
তার জনপ্রিয়তা এতটাই আকাশচুম্বী ছিল যে তিনি কখনো কোনোদিন কোনো সংসদ নির্বাচনে ভোটে হারেননি।
চার দশকেরও বেশি আগে দেশের প্রতিকূল সময়ে বিএনপির নেতৃত্বে এসেছিলেন। সুদীর্ঘ পথচলায় মুখোমুখি হয়েছেন নানা বাধা-বিপত্তির।
কখনো কারাবাস, কখনো নির্যাতন, কখনো অপমান- কিন্তু কিছুই তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি পেয়েছিলেন তার দৃঢ় মানসিকতার জন্য।
প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
১৯৯১ সালের ২০ মার্চ ঢাকায় রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের কাছে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন খালেদা জিয়া।
এর আগে শাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বেই অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোট। আর দেশ পায়, নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়।
শপথ অনুষ্ঠানের পরের দিন দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ছিলো, “দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শপথগ্রহণ।”
শপথ পাঠের বর্ণনা দিয়ে সংবাদে লেখা হয়েছে, “৪৬ বছর বয়স্কা প্রধানমন্ত্রীকে এ সময় অত্যন্ত আত্মপ্রত্যয়ী মনে হইতেছিল। তাঁহার পরনে ছিল জামদানী শাড়ী। অনুষ্ঠানটি ছিল সংক্ষিপ্ত এবং অনাড়ম্বর।”
এ ঘটনার ১০ বছর আগে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তার স্ত্রী খালেদা জিয়া অল্প সময়ের মধ্যেই দলকে আবারও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে সক্ষম হন।
প্রয়াত সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ তার ‘বেগম খালেদা জিয়া: হার লাইফ, হার স্টোরি’ বইতে লিখেছেন, “তিনি এমন এক রাজনৈতিক পরিসরে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে পুরুষদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল।”
পুতুল থেকে বিএনপির প্রধান
ইস্কান্দার মজুমদার ও বেগম তৈয়বা মজুমদার কন্যা খালেদা খানম। ফুটফুটে সুন্দরী ছিলেন। তাই বাবা মা আদর করে ডাকতেন পুতুল নামে।
আদি নিবাস ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রাম। ব্যবসার কারণে ইস্কান্দার মজুমদার বসতি গেড়েছিলেন দিনাজপুর জেলায়। বিএনপির ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সেখানেই জন্ম হয়েছিল খালেদা খানমের।
১৯৬০ সালে দিনাজপুরে সরকারি দায়িত্বে কর্মরত ছিলেন এক তরুণ সামরিক কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান; ডাক নাম কমল। শৈশব কেটেছে বগুড়া ও কলকাতায়। পরে যোগ দেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে।
পোস্টিংয়ের সূত্রেই পরিচয় খালেদা খানমের সঙ্গে। সেখান থেকে পরিণয়। খালেদা খানম হন বেগম খালেদা জিয়া। পরবর্তী দেড় দশক এই জিয়া দম্পতিই বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করেন।
বিয়ের শুরুর দিকে খালেদা জিয়ার জীবন ছিল একেবারেই গৃহিণীর। স্বামী, সংসার আর পরিবার ঘিরেই তার দিনযাপন। দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো।
কিন্তু কিছু ঘটনার অভিঘাতে খালেদা জিয়ার জীবনে আসে নাটকীয় পরিবর্তন। এমন সব ঘটনা, যা তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে পারেনি। ধীরে ধীরে তিনি ঘরের চার দেয়াল পেরিয়ে প্রবেশ করেন দেশের রাজনীতির অগ্রভাগে।
প্রাথমিকভাবে রাজনীতি তার লক্ষ্য ছিল না, এ কথা নিজেও স্বীকার করেছেন। কিন্তু সময়, পরিস্থিতি আর জাতীয় সংকট তাকে নিয়ে যায় রাজনীতির জটিল এক পথে।
খালেদা জিয়া হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, প্রভাবশালী ও আলোচিত এক চরিত্র।
১৯৮১ সালের ৩০এ মে ভোরবেলা। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ঘটে যায় এক রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থান। বিদ্রোহী সেনাদের হাতে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। দেশের রাজনীতিতে নেমে আসে গভীর শোক আর অনিশ্চয়তার কালো ছায়া।
সেই সময় উপরাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার। জিয়ার মৃত্যুর পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। আর দেশের সেনাবাহিনীর শীর্ষে ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ।
১৯৮২ সালের ২৪এ মার্চ বাংলাদেশ আবারও মুখোমুখি হয় সামরিক অভ্যুত্থানের।
সেনাপ্রধান এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন। জারি করেন সামরিক শাসন। জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিসভা ভেঙে দেন। সংবিধান স্থগিত করেন এবং রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে সরিয়ে দেন। শুরু হয় তার দীর্ঘ স্বৈরশাসন।
জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড শুধু দেশকে নাড়িয়েই দেয়নি, বিএনপিকেও বিভক্ত করে দিয়েছিল।
এমন সংকটময় মুহূর্তে দলকে ঐক্যবদ্ধ করার দায়িত্ব নিতে খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান জানান বিএনপির নেতারা। কিন্তু শুরুতে তিনি রাজি হননি।
সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ ‘বেগম খালেদা জিয়া: হার লাইফ, হার স্টোরি’ বইতে লিখেছেন, “বেগম খালেদা জিয়া মাত্র ৩৬ বছর বয়সে বিধবা হন। সেই সময় থেকেই নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন জাতির সেবায়”।
“প্রথমে রাজনীতি ও পরে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করা ছিল একই সঙ্গে সময়ের দাবি এবং একটি ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জের প্রতিক্রিয়া। খালেদা জিয়াকে নিয়ে এ পর্যন্ত বহু বিবরণ লেখা হয়েছে। কিন্তু কোনোটিই তার জীবন ও গল্পকে সম্পূর্ণ তুলে ধরতে পারেনি,” লিখেছেন প্রয়াত সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ।
খালেদা জিয়া কীভাবে রাজনীতিতে এলেন তা নিয়ে ২০১৯ সালে বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলেছিলেন মাহফুজ উল্লাহ।
সেখানে তিনি বলেন, “জিয়াউর রহমানের আকস্মিক হত্যাকাণ্ড তাঁর (খালেদা জিয়া) মনের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। তিনি হয়তো ভাবতে শুরু করেছিলেন যে রাজনীতি হয়তো মানুষকে এ ধরনের করুণ পরিণতির দিকে ঠেলে নিয়ে যায়।”
“রাজনীতির কঠিন পদযাত্রা সামলাতে পারবেন কিনা, সেটি নিয়েও তাঁর মনে প্রশ্ন ছিল। তাছাড়া পারিবারিকভাবে তাঁর পিতা মেয়ের রাজনীতির ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না।"
তবুও দলীয় নেতাকর্মীদের অবিরাম অনুরোধ ও পরিস্থিতির চাপে খালেদা জিয়া রাজনীতির কঠিন পথে পা বাড়ান।
১৯৮২ সালের শুরুতে তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ নেন। পরের বছর ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
এরপর বিএনপির সবচাইতে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী মুখ হিসেবে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন এই পদে।
রাজনীতির কঠিন পথে অবিরাম যাত্রা
১৯৮৩ সালে খালেদা জিয়ার উদ্যোগে বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত হয় সাত দলীয় ঐক্যজোট। এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে সেই ঘটনাই সংগঠিত রাজনৈতিক প্রতিরোধের আনুষ্ঠানিক সূচনা বলে মনে করেন অনেকে।
এরপর শুরু হয় তুমুল আন্দোলন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করেন এরশাদ। তখন আওয়ামী লীগও ছিল এরশাদবিরোধী আন্দোলনে।
শেষ মুহূর্তে আন্দোলন ছেড়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে আন্দোলনে অটল থাকে।
১৯৮৭ সালে খালেদা জিয়া ঘোষণা করেন এক দফা - 'এরশাদ হঠাও'। এই কর্মসূচি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে নাড়িয়ে দেয়।
এরপর ১৯৮৮ সালে এরশাদ আরেকটি বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন করলে বিএনপি সেটিও বর্জন করে।
এরশাদের পতনের আগেই কয়েকবার গ্রেপ্তার করা হয় খালেদা জিয়াকে। কিন্তু একের পর এক গ্রেপ্তার, হয়রানি, কারাবাস - কিছুই তাকে আন্দোলন থেকে সরাতে পারেনি।
কারামুক্ত হয়েই তিনি আবার রাজপথে ফিরেছেন। বারবার। টানা সংগ্রাম, অবিচল অবস্থান এবং স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তার দৃঢ় ভূমিকার জন্য দলীয় নেতাকর্মীরা তাকে উপাধি দেন ‘আপসহীন নেত্রী’।
প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে নারী শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সংস্কার
গণঅভ্যুত্থানে ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর পতন ঘটে এরশাদ শাসনের। তিন মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় নির্বাচন। দেশের মানুষ ফিরে পায় গণতন্ত্রের পথ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখা হয় সেই নির্বাচনকে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিএনপি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে দলটি। আর খালেদা জিয়া শপথ নেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।
সেই নির্বাচনে তিনি পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবটিতেই জয় পান। তার নেতৃত্বে দেশে পুনঃপ্রতিষ্ঠা পায় সংসদীয় গণতন্ত্র।
প্রথম মেয়াদে খালেদা জিয়া বাজারমুখী অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করেন এবং বিস্তৃত অর্থনৈতিক সংস্কার আরও গতিশীল করে তোলেন।
তার নেতৃত্বেই ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ যোগ দেয় জিএটিটি চুক্তিতে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে দেশের সংযোগ আরও দৃঢ় করে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ঢাকার কাছে নতুন রপ্তানি প্রক্রিয়াজতকরণ এলাকা বা ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করা হয়। দেশে প্রথমবারের মতো মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ব্যবস্থা চালু হয়, যা পরবর্তীতে সরকারের রাজস্ব আয়ের প্রধান ভিত্তিগুলোর একটিতে পরিণত হয়।
নারী শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও সে সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার। শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়াতে চালু করা হয় বৃত্তি। দরিদ্র পরিবারের শিশুদের স্কুলমুখী করতে শুরু হয় বিখ্যাত ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি।
পল্লী অঞ্চলের মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা করা হয় সম্পূর্ণ বিনামূল্য। আর মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রীদের জন্য দেশব্যাপী একটি উপবৃত্তি কর্মসূচি চালু হয়, যা পরবর্তীতে নারী শিক্ষার বিস্তারে অসামান্য ভূমিকা রাখে।
স্বল্প সময়ের প্রধানমন্ত্রী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার
প্রথম মেয়াদের বহু সাফল্য রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝড়ে আড়াল হয়ে যায়। ১৯৯৪ সালে মাগুরার একটি আসনে উপনির্বাচনকে ঘিরে ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগ ওঠে।
সেখান থেকেই বিরোধী দলগুলো দাবি তোলে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত করার দাবি ওঠে। বিএনপি তখন সেই দাবি মানতে প্রস্তুত ছিল না।
পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হতে থাকে। একদিকে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলতে থাকে। অন্যদিকে বিরোধীদের একের পর এক হরতাল-অবরোধে দেশ অচল হয়ে পড়ে। টানা আন্দোলন অর্থনীতিকে নড়বড়ে করে দেয়।
আন্দোলনের মুখেই ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অধিকাংশ দলই ভোট বর্জন করে।
নির্বাচনে বিএনপির ৪৬ জন প্রার্থী বিনাভোটে নির্বাচিত হন। দলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে।
খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। তবে সময়টা খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র ১২ দিন ছিল এই সরকারের মেয়াদ।
বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের চাপ এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে শেষ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করে সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়।
ওই বছরের জুন মাসে আরেক দফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যার মাধ্যমে ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে আসে আওয়ামী লীগ।
তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও কৌশলে বিএনপি আবারও ক্ষমতায় ফেরে।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় পেয়ে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। সেই নির্বাচনে ১৯৩টি আসন পেয়ে সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিএনপি; জোটবদ্ধভাবে মোট আসন দাঁড়ায় ২১৬টি।
আওয়ামী লীগের ব্যাপক ভরাডুবি ঘটে। মাত্র ৬২ আসন পেয়ে বিরোধীদলে জায়গা হয় তাদের।
খালেদা জিয়ার তৃতীয় মেয়াদের বেশ কয়েকটি ঘটনা নিয়ে এখনও আলোচনা হয়। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ এবং এলিট ফোর্স ‘র্যাব’ গঠন নিয়ে এখনও কথা হয়।
তৃতীয় মেয়াদে উন্নয়ন, বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষটিও আলোচিত।
বিএনপির অফিসিয়াল ফেইসবুক পেইজে সম্প্রতি এক পোস্টে দাবি করা হয়েছে, “বিশ্ব ব্যাংকের ‘জবস ডায়াগনস্টিক: বাংলাদেশ’ প্রতিবেদন মতে, ২০০৩ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে গড়ে চাকরির সুযোগ তৈরি বেড়েছে ৩ দশমিক ১ শতাংশ হারে, যেখানে কর্মক্ষম মানুষ বেড়েছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে এবং শ্রমশক্তি বেড়েছে ২ দশমিক ৯ শতাংশ হারে। অর্থাৎ যত মানুষের চাকরির দরকার ছিল, তার চেয়ে বেশি চাকরির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
“কেন? কারণ বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী নীতি। তিনি মাত্র ৫ বছরে দেশের তরুণদের জন্য ৮৪ লক্ষ নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি করেছিলেন। দেশের অর্থনীতি বাড়ছিল, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ছিল গড়ে ৬ শতাংশ হারে, মাথাপিছু আয়ও বাড়ছিল। সাথে সাথে দেশের মানুষ এই প্রবৃদ্ধির সুফলও পাচ্ছিলেন।”
তবে এই মেয়াদেই দেশে ব্যাপকভাবে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটে। ২০০৫ সালে দেশের সব জেলায় একইদিনে সিরিজ বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। জঙ্গি সংগঠন জেএমবির নানা কর্মকাণ্ডে মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে।
টিআইবির দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশের উপরের সারিতে উঠে আসা, বিরোধীদলীয় নেত্রীর ওপর গ্রেনেড হামলা, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড, দশ ট্রাক অস্ত্রের চালান ধরা পড়ার মতো নানা ঘটনায় পুরো শাসনামলের ভাল দিকগুলো ঢেকে যায়।
আর এই মেয়াদের শেষে ক্ষমতা হস্তান্তর ঘিরে বড় ধরনের রাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়।
ওয়ান ইলেভেন, বিশ্বাসভঙ্গ, গ্রেফতার
২০০৬ সালের শেষ দিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। এরপরই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
এক পর্যায়ে ক্ষমতায় আসে আরেকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার। যা পরে সেনা সমর্থিত ‘ওয়ান-ইলেভেন’ সরকার নামে পরিচিতি পায়।
তখনই শোনা যায় ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার কথা। অর্থাৎ দুই প্রধান দলের দুইজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেত্রী খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন ড. ফখরুদ্দীন আহমদ, যিনি খালেদা জিয়ার আমলেই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন।
আর সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ। তিনিও সেনাপ্রধান হয়েছিলেন খালেদার জিয়ার সময়ে।
মাইনাস টু ফর্মুলার টার্গেট হন খালেদা জিয়া। তাকে বিদেশে পাঠানোর চেষ্টা চলছে এমন খবর ছড়িয়ে পড়তো প্রায় প্রতিদিনই।
কিন্তু কোন চেষ্টায়, কোন চাপেই নত করা যায়নি তাকে। অনড় থাকেন নিজের অবস্থানে। এক পর্যায়ে ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। একই বছর শেখ হাসিনাকেও কারারুদ্ধ করে ওয়ান ইলেভেনের সেনা সমর্থিত সরকার।
জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের পাশাপাশি দুটি ভবনে বন্দী করে রাখা হয় খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে। যদিও এগুলো যখন বানানো হয়, তখন ধারণাও করা হয়নি এখানে বন্দী থাকতে হবে সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রীকে।
ওয়ান ইলেভেনের সময় নানা চাপে ও সংকটে পড়েছিল বিএনপি, খালেদা জিয়ার ওপর সেই চাপ ছিল আরও বেশি। দলের অনেক নেতা বিশ্বাসভঙ্গ করতে থাকেন, কেউ হয়ে যান নিষ্ক্রিয়।
এমনকি প্রভাবশালী নেতা দলের মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়াকেও বহিষ্কার করতে বাধ্য হন খালেদা জিয়া। দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো গ্রেফতার হন। কারাগারে যেতে হয় শীর্ষ সারির প্রায় সব নেতাকেই। বাকিরা বেশিরভাগই হয়ে যান পলাতক।
এক বছরের বন্দিদশা থেকে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জেল থেকে ছাড়া পান খালেদা জিয়া। তখন বিএনপি একেবারেই এলোমেলো। এর মাঝে ভোটের দামামা বেজে ওঠে।
কারামুক্ত হয়েই ওয়ান ইলেভেনের দুঃসময়ে দল পুনর্গঠনে সক্রিয়ভাবে মাঠে নেমে পড়েন খালেদা জিয়া।
নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি সারাদেশে জনসভা ও পথসভা করে দলকে নতুনভাবে সংগঠিত করেন। সেই নির্বাচনের পর তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হন।
বিভাজনের রাজনীতি, কারাবাস, অসুস্থতা
২০০৮ সালের নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করবার পর দেশের রাজনৈতিক বিভাজন চরমে পৌঁছে।
ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোডের যে বাড়িতে খালেদা জিয়া ৩৮ বছরেরও বেশি সময় বসবাস করেছিলেন, সেটিও তাকে ছাড়তে বাধ্য করে আওয়ামী লীগ সরকার।
এরপর আওয়ামী লীগ সরকার বাতিল করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। এর প্রতিবাদে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন খালেদা জিয়া। নির্বাচনটি হয় একতরফা।
এর পরের বছর খালেদা জিয়ার জীবনে ঘটে যায় ব্যক্তিগত এক দুঃখজনক ঘটনা।
২০১৫ সালে মালয়েশিয়ায় মারা যান তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো। শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন তিনি।
পরে আরও দুটি জাতীয় নির্বাচন হয়, যার লক্ষ্য ছিল বিএনপি ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকে ভোটের মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়া।
আন্দোলন চালিয়ে যেতে গিয়ে কখনো মৌখিক আক্রমণ, কখনো বাড়ির সামনে বালিভর্তি ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার মতো পরিস্থিতির মুখেও পড়তে হয় খালেদা জিয়াকে।
প্রথম নারী হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ২৭ বছর পর ২০১৮ সালে তাকে ফের গ্রেফতার করা হয়।
তিনি জানতেন সেদিন তাকে দীর্ঘ কারাবাসে যেতে হতে পারে। সেভাবেই গুছিয়ে নিয়েছিলেন সুটকেস; বাসভবন থেকে বেরিয়ে উঠেছিলেন একটি সাদা রঙের নিশান পেট্রল এসইউভিতে।
পুরো বাংলাদেশ থমথমে। গুলশান থেকে পুরোনো ঢাকার একটি অস্থায়ী আদালত পর্যন্ত ১২ কিলোমিটারের মত পথ যেতে সেদিন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের লেগে যায় কয়েক ঘণ্টা।
তাকে পায়ে হেঁটে এসকর্ট করছিল অসংখ্য নেতাকর্মী। তারা কাঁদছিল। "মা! মা!" করে চিৎকার করছিল। রাগে ক্ষোভে ভাঙচুর করেছিল। পুলিশের দিকে ইটের টুকরো ছুঁড়ছিল।
খালেদা জিয়াকে বহনকারী এসইউভিটি এগোচ্ছিল কচ্ছপের গতিতে। নেতা-কর্মীরা কোনোভাবেই তাদের নেত্রীকে, তাদের মাকে জেলে যেতে দেবে না।
কথিত দুর্নীতি মামলার রায় হওয়ার কথা সেদিন। আদালতে হাজিরা দেয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।
পুরো বাংলাদেশ উৎকণ্ঠিত চোখে টিভির দিকে তাকিয়ে। কী হবে?
শুরু থেকেই মামলার প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বিএনপি নেতা ও আইনজীবীরা। তাদের অভিযোগ মামলাটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সরকার আদালতকে ব্যবহার করেই এটি সাজিয়েছে।
তারা আশঙ্কা করছিলেন, আসন্ন নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই খালেদা জিয়াকে দণ্ডিত করে কারাগারে পাঠানো হবে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছিল।
কয়েক ঘণ্টা পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী আদালতকক্ষে পৌঁছান। বিচারক তাকে দণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
অনেকের মতে, ওই দিনের সেই কারাদণ্ডের মধ্য দিয়েই খালেদা জিয়ার দীর্ঘ ও বর্ণিল রাজনৈতিক জীবনের এক ধরনের সমাপ্তি ঘটে। তাকে রাখা হয় পরিত্যক্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভূতুড়ে একটি ভবনে।
দুই বছর পর দেশজুড়ে শুরু হয় মহামারি। নির্জন কারাগারে থাকার পর বিশেষ শর্তে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু অধিকার ছিল সীমিত। বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ তাকে দেওয়া হয়নি।
তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হয়েও পূর্ণ স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত ছিলেন তিনি। অবশেষে ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় শেখ হাসিনার। এরপরই মুক্তি পান বেগম খালেদা জিয়ার, ফিরে পান তার রাজনৈতিক অধিকার ও মর্যাদা।
দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম সফলতার মুখ দেখে কিন্তু ততদিনে শরীর ভেঙে পড়েছে তার। বাসা বেঁধেছে নানা রোগব্যাধি। কারামুক্ত হলেন ঠিকই, কিন্তু রাজনীতির মাঠে আর সেভাবে ফিরতে পারলেন না।
একজন গৃহবধূ থেকে নেতৃত্বের শীর্ষে উঠে আসা খালেদা জিয়ার ৪৩ বছরের রাজনৈতিক পথচলা ছিল অদম্য সাহস, দৃঢ় বিশ্বাস এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে অবিচল থাকার প্রমাণ। তার রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
অসংখ্য বাধা, অপমান, ষড়যন্ত্র ও দুঃসময়ের মধ্য দিয়েও তিনি কখনো পিছপা হননি। তার সংগ্রাম প্রমাণ করে একজন দৃঢ়চেতা নেতার ইচ্ছাশক্তিকে বন্দি করে রাখা যায়, কিন্তু পরাজিত করা যায় না।
খালেদা জিয়াও পরাজিত হননি। মৃত্যুর পরেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রাসঙ্গিক থাকবেন বহু বহুকাল।