তিস্তা নদীর ঘোলা স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল একটা হাতির শাবক। ছোট্ট শরীরটা কোনোমতে মাথা তুলে রাখার চেষ্টা করছিল পানির ওপর। স্থানীয় কিছু জেলে সেটা দেখে ফেলেন, আর দেরি করেননি। স্রোতের পরোয়া না করে নৌকায় করে এগিয়ে যান ডুবে যেতে থাকা শিশুটির কাছে, উদ্ধার করেন। আর এরপর বন বিভাগের কর্মীরাও খুঁজে বের করেন মা হাতিটিকে। তারা শাবকটাকে তুলে আনেন, আর তারপর তাকে ফিরিয়ে দেন তার মায়ের কাছে।
এই খবরটায় বেশ কিছুদিন আগে পুরো সোশ্যাল মিডিয়া একেবারে ভরে উঠেছিল। শুধু বাংলাদেশ বা ভারতে না, বলতে গেলে এই ঘটনা পুরো দুনিয়ার সোশ্যাল মিডিয়া, মেইনস্ট্রিম নিউজে অজস্র মানুষের ভালোবাসা পেয়েছে। মানুষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে, ভালোবাসা জানিয়েছে সেই সাহসী মানুষগুলোকে। সেখান থেকেই একটা ব্যাপার চলে আসে। আমাদের দেশের হাতিগুলোর কথা। কেমন আছে সেগুলো?
আপনি কি জানেন, কাগজে-কলমে বাংলাদেশে এখন বুনো হাতি অবশিষ্ট আছে মাত্র কয়েকশো? আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএন এই প্রাণীকে ঘোষণা করেছে ‘মহাবিপন্ন’ হিসেবে। এ ছাড়াও, বিভিন্ন গবেষণা এবং সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলাদেশের হাতে গোনা কয়েকশ’ বন্য হাতি বিভিন্ন ধরনের সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে চলাচলে সমস্যা, মানুষের সাথে সংঘর্ষ, বৈদ্যুতিক বেড়া বা ট্রেনের আঘাতে মৃত্যুর মতো দুর্ভাগ্যজনক বিষয়গুলো রয়েই গেছে।
সংখ্যায় বাংলাদেশের হাতি
বাংলাদেশ এমনিতেই খুব বিশাল কোনো দেশ না। কাজেই এখানে যে এমনিতেই অনেক বেশি হাতি ছিলো, ব্যাপারটা এমন না। তারপরেও একটা সময় এখানে প্রায় শ পাঁচেক হাতি জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত। তবে সেইটা প্রায় ৭৫ বছর আগে, সেই পঞ্চাশের দশকের ঘটনা। আজ সেই সংখ্যাটা নেমে এসেছে মাত্র দুই থেকে তিনশোর ঘরে। ২০১৬ সালে আইইউসিএনের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে তখন ছিলো মোট ৪৫৭টি হাতি।
এর মধ্যে ২৬৮টি স্থায়ী বাসিন্দা বা আবাসিক হাতি, ৯৩টি সীমান্ত পেরিয়ে আসা পরিযায়ী বা মাইগ্রেটরি হাতি, আর প্রায় ৯৬টি বন্দি হাতি। এগুলো সার্কাস, চিড়িয়াখানা বা ব্যক্তিগত মালিকানায় আছে।
সমস্যা হলো, এই জরিপটাও প্রায় এক দশক পুরনো। এরপর থেকে বাংলাদেশে আর কোনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় হাতি শুমারি হয়নি। তবে এ বছর একটি হাতি শুমারি হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে একটা ব্যতিক্রমী দিকও আছে। দেশের উত্তরাঞ্চলে, বিশেষ করে ময়মনসিংহ, শেরপুর আর জামালপুরের সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলে হাতির সংখ্যা বরং বাড়ছে। শেরপুরে গত ছয় বছরে প্রায় চল্লিশটি হাতির বাচ্চা জন্ম নিয়েছে, আর বর্তমানে উত্তরের হাতির সংখ্যা প্রায় ১৪০।
বন্দি হাতির সংখ্যা এখন একশ’র মতো। এগুলো সার্কাস দলে, বাণিজ্যিক প্রদর্শনীতে, গাছ টানার কাজে কিংবা ব্যক্তিমালিকানায় রয়েছে।
হারিয়ে ফেলা পথ, করিডোর সংকট
হাতি কিন্তু এক জায়গায় বা একটা নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে বসে থাকতে পারে না। একটা পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন লাগে প্রায় দুইশো থেকে আড়াইশো কিলোগ্রাম গাছপালা আর দেড়শো লিটারের মতো পানি। এই বিশাল চাহিদা মেটাতে তারা প্রতিদিন অনেকটা পথ হাঁটে, ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে এক জঙ্গল থেকে আরেক জঙ্গলে সরে যায়। হাজার বছর ধরে তারা নির্দিষ্ট কিছু পথ ব্যবহার করে এই যাতায়াত করে এসেছে। এই পথগুলোকেই বলা হয় ‘এলিফ্যান্ট করিডোর’ বা হাতির চলাচলের করিডোর।
আইইউসিএন বাংলাদেশের গবেষণা অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে; অর্থাৎ কক্সবাজার আর চট্টগ্রামে এমন অন্তত বারোটা করিডোর একসময় চিহ্নিত করা হয়েছিল, যার আটটাই ছিল কক্সবাজারে। শেরপুর-জামালপুর-নেত্রকোনা অঞ্চলেও আরও চারটার মতো করিডোর থাকার সম্ভাবনা জানা গেছে। সব মিলিয়ে ১৫-১৬টির মতো পথে একসময় বাংলাদেশ, ভারত আর মিয়ানমারের সীমানা পেরিয়ে হাতিদের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করত।
আজ এই পথগুলোর বেশিরভাগই বন্ধ, নয়তো মারাত্মকভাবে সংকুচিত।
কক্সবাজারের পাঁচটা করিডোর সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির স্থাপনের কারণে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন, কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল বা কেইপিজেড, চায়না ইকোনমিক জোন, আর আনোয়ারা-কর্ণফুলীর নানা শিল্প প্রকল্প। কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক আর রেললাইনও হাতির স্বাভাবিক বিচরণভূমি ভেঙে দিয়েছে। রামু আর টেকনাফের অন্তত তিনটা করিডোর ইতিমধ্যে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
২০০৭ সালে শেরপুর আর জামালপুরের সীমান্ত ঘেঁষে ভারতের মেঘালয়ের সীমান্তে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দীর্ঘ কাঁটাতারের বেড়া তৈরি হয়। এই বেড়া উত্তরাঞ্চলের হাতিদের চলাচলের ধরনটাই বদলে দিয়েছে। বেড়া বরাবর চুয়াল্লিশটা গেট বসানো হয়েছিল বটে, কিন্তু সেগুলো সাধারণত বন্ধ থাকে, খোলা হয় শুধু তখনই যখন হাতির পাল জোর করে পার হওয়ার চেষ্টা করে। আর হাতি পার হয়ে গেলে গেট আবার বন্ধ হয়ে যায়। ফলে একবার বাংলাদেশে ঢুকে পড়া হাতিরা আর সহজে মেঘালয়ে ফিরে যেতে পারে না।
আগে হাতিরা সাধারণত ফসল কাটার মৌসুমে বাংলাদেশে আসত, মাস দুয়েক থেকে আবার মেঘালয়ে ফিরে যেত। এখন তারা প্রায় সারা বছরই বাংলাদেশে থেকে যাচ্ছে। কারণ ফেরার পথটাই তাদের জন্য কঠিন হয়ে গেছে।
এখানেই সবচেয়ে বড় কষ্টের ব্যাপারটা। করিডোর যখন বন্ধ হয়ে যায়, হাতি রাস্তা হারিয়ে ফেলে না। সে তার পুরনো পথ ধরেই আবার হাঁটার চেষ্টা করে, শুধু সেই পথে এখন দাঁড়িয়ে আছে মানুষের বসতি, ফসলের খেত, রেললাইন কিংবা কাঁটাতারের বেড়া। অর্থাৎ সে আসলে চাইলেও তার নিজের এলাকায়, নিজের ঠিকানায় ফিরতে পারে না।
যখন হাতি লোকালয়ে আসে
আচমকাই কোনো গ্রামে হঠাৎ করে শোরগোল, হাতি এসেছে। এলাকাবাসাী কারেন্টের তার চালু করে, বা পিটিয়ে, বা যে কোনোভাবে ফসল রক্ষা করলেন। প্রাণ হারানোর ঝুঁকিও তাদের থাকে। আর অন্যদিকে পড়ে থাকে হাতির মৃতদেহ। অনেক সময় মানুষও মারা যায়। কৃষকের জন্য তার ফসল সবকিছু। অন্যদিকে হাতিও চায় চলাচল করতে, কিংবা নিজের প্রয়োজনীয় খাদ্য জোটাতে। আর এমন ঘটনা হাতির চলাচলের বিভিন্ন জায়গায় প্রায়ই ঘটে, আমরা যা মাঝেমাঝে খবরে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখতে পাই। এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটা একটা প্যাটার্নের অংশ, যা প্রতি বছর বাংলাদেশে বারবার ঘটে চলেছে।
সংখ্যাগুলো ভয়াবহ। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুসন্ধান করে দেখা যায়, গত চৌদ্দ বছরে বাংলাদেশে অন্তত ৬৬টা হাতি মারা গেছে, আর হাতির আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন ২৩৬ জন মানুষ। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শুধু মানুষ-হাতি সংঘাতে অন্তত তিরাশি জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে চুয়াল্লিশ জনই চট্টগ্রাম বিভাগে। ২০২১ সালে একবছরেই মারা গিয়েছিল চৌত্রিশটা হাতি। মৃত্যুর কারণগুলো প্রায় প্রতিটা প্রতিবেদনেই একরকম। বিদ্যুতায়ন, বিষাক্ত খাবার, রোগ, ট্রেনের ধাক্কা, আর মাঝেমধ্যে গুলি। হাতি হারাচ্ছে বাসস্থান, খাদ্য, জীবন। মানুষ হারায় ফসল। জীবনও।
গবেষকদের মতে, এমনিতে হাতি শান্ত প্রকৃতির প্রাণী, একেবারেই আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা যায় মূলত তখনই, যখন তাদের আতশবাজি, বৈদ্যুতিক বেড়া বা বিশাল জনতার ভিড় দিয়ে উত্ত্যক্ত করা হয়। এর মধ্যে এখন অনেকেরই ভিডিও করা, কনটেন্ট বানানো, বা আওয়াজ করে হাতিকে উত্যক্ত করে তোলার প্রবণতাও দেখা যায়। এ ধরনের কার্যকলাপ হাতিকে অস্থির করে তুলতে পারে। ধান পাকার সময়ে মৌসুমে হাতি গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে লোকালয়ে চলে আসে। সে সময়ে ঝুঁকিটা আরও বাড়ে।
যে হাতি বন্দি
রাস্তাঘাটে, বা সার্কাসে, রাস্তায় চাঁদা তোলায় বা কিছু কিছু উৎসবে-আয়োজনে আমরা কিছু হাতি দেখতে পাই। এরা বন্দি হাতি। এই হাতিদের সংখ্যা প্রায় একশোর কাছাকাছি।
এই হাতিদের জীবনের শুরুটাই হয় নিষ্ঠুরতা দিয়ে। "হাদানি" নামের একটা ঐতিহ্যবাহী প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে বাচ্চা হাতিদের মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে শেকলে বেঁধে রাখা হয়, না খাইয়ে রাখা হয়, মারধর করা হয়- যতক্ষণ না তাদের ভেতরের প্রতিরোধশক্তি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। এই বন্দি জীবনে অভ্যস্ত হাতি আর কখনোই মুক্ত হাতির মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে সক্ষম হতে পারে না।
বন্দি হাতিদের সঙ্গে যা ঘটে, তার মধ্যে আছে জোরপূর্বক প্রজনন, দাঁত কেটে ফেলা, অতিরিক্ত পরিশ্রম করানো, আর অপুষ্টি। জাঁকজমকভাবে সাজিয়ে প্রদর্শন করা হাতিগুলোর জীবন যে কতটা করুণ, তা আসলে কখনো দেখে বোঝা সম্ভব নয়।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটা রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে হাই কোর্ট বন্য হাতি পোষার নতুন লাইসেন্স ইস্যু আর নবায়ন স্থগিত করে দেয়। তবে যে হাতিগুলো এরই মধ্যে বন্দি, তাদের জীবনযাত্রার মান বদলায়নি।
হাতি সংরক্ষণে উদ্যোগ
বেশ কিছু উদ্যোগ এখন মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম বা ইআরটি। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, শেরপুর আর বান্দরবানের মতো হাতিপ্রবণ এলাকায় প্রায় ১৫৯ জন সদস্য নিয়ে গঠিত এই দলগুলো নিয়মিত টহল দেয়, হাতির গতিবিধি নজরে রাখে, আর হাতি আসার আগেই গ্রামবাসীকে সতর্ক করে দেয়। উত্তরাঞ্চলে প্রায় সাড়ে পাঁচশ প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে কাজ করছে ৫০টির মতো দল।
সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণও দিচ্ছে। হাতির আক্রমণ ঠেকাতে অবৈধ বৈদ্যুতিক ফাঁদের বদলে সোলার ফেন্সিং বসানোর পরিকল্পনা চলছে, যা প্রাণঘাতী নয় এমন হালকা শক দেয়। বন অধিদপ্তর পরিকল্পনা কমিশনে একটি ‘এলিফ্যান্ট কনজারভেশন প্রজেক্ট’ জমা দিয়েছে, যার আওতায় ২০২৬ সালে একটা নতুন জাতীয় হাতি শুমারি হওয়ার কথা, আর গাজীপুর সাফারি পার্কের একটা অংশ বন্দি হাতিদের পুনর্বাসনের জন্য নির্ধারণ করার পরিকল্পনাও আছে।