সায়েন্সল্যাব থেকে শিক্ষা ভবন: 'ব্রয়লার চিকেন পার্টি'র বিক্ষোভে কী ঘটলো?

'ব্রয়লার মুরগি' বলে কটাক্ষ করার অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রী আনম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগসহ ছয় দফা দাবিতে বুধবারও রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা।

মিরপুর, সায়েন্সল্যাব, উত্তরা এবং শিক্ষা ভবনের সামনে কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে তারা বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। উত্তরায় সড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় এবং দুর্ভোগে পড়েন শত শত যাত্রী।

ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা যথাসময়ে নেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তে আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিল শিক্ষার্থীরা। সেই ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে সামাজিক মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীর একটি ফোনালাপের অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের 'ফার্মের মুরগি' বলে মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ করছেন শিক্ষার্থীরা। 

এই অভিযোগ ঘিরে গড়ে ওঠা ক্ষোভ মুহূর্তেই রূপ নেয় সংগঠিত প্রতিবাদে। জেন-জি শিক্ষার্থীরা প্রচলিত রাজনৈতিক স্লোগানের বদলে ব্যঙ্গ, মিম সংস্কৃতি ও সামাজিক মাধ্যমকে হাতিয়ার করে শুরু করেন নতুন ধরনের আন্দোলন। 

১৩ই জুলাই রাতে ফেইসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে চালু হয় 'ব্রয়লার চিকেন পার্টি' নামে একটি পেইজ। অল্প সময়ের মধ্যেই সেটিকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হতে থাকে প্রতিবাদ।

মঙ্গলবার রাজপথে নেমে শুরু হওয়া সেই বিক্ষোভ বুধবারও অব্যাহত থাকে। দিনের শেষ দিকে নতুন কোনো কর্মসূচি ঘোষণা ছাড়াই শিক্ষা ভবনের সামনে থেকে ব্যারিকেড তুলে নেন আন্দোলনকারীরা।

তবে আন্দোলনের পরবর্তী পথ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মতবিরোধ প্রকাশ্যে চলে এসেছে। একাংশ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনঢ় থাকলেও, আরেক অংশ দাবি আদায়ের বিকল্প কৌশল নিয়ে ভাবার পক্ষে মত দিচ্ছেন।

ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, শিক্ষা ভবনের সামনে অবস্থান

বুধবার দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটের দিকে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড়ে জড়ো হন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। সমবেত হওয়ার পরপরই তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রায় ২০ মিনিট অবস্থানের পর দুপুর ২টা ৫৪ মিনিটে অবরোধ তুলে সচিবালয় অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন।

নীলক্ষেত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস অতিক্রম করে বেলা ৩টা ৪ মিনিটে শিক্ষা ভবনের সামনে পৌঁছান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া পুলিশ সদস্যরা তাদের অগ্রযাত্রায় বাধা দিলে শিক্ষা ভবনের সামনেই অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন তারা। এ সময় বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ দাবি করে স্লোগান দেন এবং সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ওয়ালিদ আলাপ-কে বলেন, পরীক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পরই ঘরে ফিরবেন তারা। হাসান মাহমুদ নামে আরেক পরীক্ষার্থী আলাপ-কে বলেন, শিক্ষার্থীদের যারা 'ব্রয়লার মুরগি' বলতে পারেন তাদের সাথে সমঝোতা হতে পারে না।

শিক্ষামন্ত্রীর-পদত্যাগ-চাইছে-ছাত্ররা.jpg

সাংবাদিকের ওপর হামলা, পরে দুঃখ প্রকাশ

বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শিক্ষা ভবনের সামনে দায়িত্ব পালনকালে স্টার নিউজের সাংবাদিক নাজমুলের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। 

ঘটনাস্থলের  ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে ঘিরে ধরে মারধর করছেন। ঘটনার পর অন্য শিক্ষার্থীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। পরে হামলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করলে উত্তেজনা প্রশমিত হয় এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।

কর্মসূচি নিয়ে বিভক্তি ও জনদুর্ভোগ  

বিকাল ৫টা ৩৫ মিনিটের দিকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভক্তি দেখা দেয়। 

একপক্ষ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি বহাল রাখতে চাইলেও আরেক পক্ষ শিক্ষামন্ত্রীকে সময় দেয়া যেতে পারেন বলে মনে করেন। পরে একপক্ষ শিক্ষাভবনের সামনে অবস্থান চালিয়ে গেলেও আরেক পক্ষ দূরে সরে গিয়ে সার্ক ফোয়ারার সামনে অবস্থান নেন।

৫টা ৫০ মিনিটের দিকে শিক্ষা ভবনের সামনে থেকে ব্যারিকেড তুলে নেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ ছয় দফা দাবিতে পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে বুধবার দুপুরে ঢাকার উত্তরায় সড়ক অবরোধ করেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। উত্তরায় সড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং ভোগান্তিতে পড়েন শত শত যাত্রী।

ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের উত্তরা বিভাগের বিমানবন্দর জোনের সহকারী কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন আলাপ-কে বলেন, “শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই সোয়া ১টার দিকে সড়ক অবরোধ করেন। এতে সড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।”

বেলা ৩টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তরা বিএনএস সেন্টারের সামনে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। ফলে আট লেনের সড়কটি যান চলাচলের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। এসময় টঙ্গী থেকে ঢাকামুখী শত শত যানবাহন ফ্লাইওভারের ওপর আটকা পড়ে। তবে অ্যাম্বুলেন্স চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়।

টাঙ্গাইল -ঢাকা রুটের বাসের চালক আবদুস সোবাহান আলাপ-কে বলেন, এরই মধ্যে যানজট ৪ কিলোমিটার পেরিয়ে গেছে। শিশু ও বৃদ্ধ যাত্রীরা গরমে কষ্ট পাচ্ছেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উত্তরায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে প্রস্তুত ছিলো জলকামান।

অবরোধস্থলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া তাদের আন্দোলনের সমাধান হবে না। আবদুল আলিম নামে এক পরীক্ষার্থী আলাপ-কে বলেন, “শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি এখনো বহাল আছে।”

“ফার্মের মুরগি’ মন্তব্যের জন্য সংসদে দুঃখ প্রকাশ করলেও আমরা সেটিকে যথেষ্ট মনে করি না।” ফাহিম নামে আরেক পরীক্ষার্থী বলেন, “জনসম্মুখে ক্ষমা চাওয়াই শুধু সমাধান।”

বিকেল পৌনে ৪টার দিকে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নেন। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

এদিকে দুপুর দেড়টার দিকে ৩০ থেকে ৪০ জন পরীক্ষার্থী মিরপুর ১০ নাম্বার গোলচত্বর এলাকায় জড়ো হন। তবে স্বল্প সময়ের মধ্যেই এই বিক্ষোভ শুরু হয়।