প্যালেস্টাইনের গাজায় যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফার পরিকল্পনাকে সমর্থন করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব পাস হয় গত বছরের ১৭ই নভেম্বর।
এই প্রস্তাবে থাকা পরিকল্পনাগুলোর একটি হলো, একটি ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) বা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলকরণ বাহিনী গঠন করা। যেখানে বাংলাদেশও যোগ দেওয়ার আগ্রহ জানিয়েছে। এই বাহিনী যুদ্ধবিরতি চুক্তির বাস্তবায়নের তদারকি করবে এবং নিরাপত্তা দিবে।
গাজার “বেসামরিকীকরণ” করতে ইসরায়েল ও মিসরের সাথে কাজ করবে করতে আইএসএফ। এটি প্যালেস্টিনিয়ান পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিবে।
তবে এই প্রস্তাব পাস হওয়ার পরও গাজায় বিমান হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। আর ট্রাম্পের ২০ দফার পরিকল্পনায় প্যালেস্টাইনের কোনো পক্ষের কোনও মতামত নেওয়া হয়নি।
কী এই আইএসএফ
ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স বা আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলকরণ বাহিনী মূলত একটি বহুজাতিক বাহিনী যাকে গাজায় মোতায়েন করা হবে পুলিশকে প্রশিক্ষণ দিতে, সীমান্ত নিরাপদ করতে এবং গাজার বেসামরিকীকরণ করে নিরাপত্তা বজায় রাখতে।
গত দুই দশক ধরে হামাস গাজায় যেসব নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে আসছে, এই বাহিনীটি কার্যত সেই দায়িত্বগুলোই নিবে। ২০০৬ সাল থেকে কার্যত হামাসই গাজা শাসন করছে।
আন্তর্জাতিক এই বাহিনী কারা মিলে গঠন করবে তা এখনও পরিস্কার না হলেও প্রস্তাব অনুযায়ী এই বাহিনী ইসরায়েল, মিসর ও নবগঠিত ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীর সাথে কাজ করবে যা হামাস কিংবা প্যালেস্টাইনের কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকবে না।
ট্রাম্পের এক সিনিয়র উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, মিসর, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সৈন্য পাঠানোর কথা বলেছে। যদিও আমিরাতের সরকারি কর্মকর্তা আনোয়ার গারগাশ জানিয়েছেন যে দেশটি অংশ নেবে না।
মিসর এই বাহিনীকে নেতৃত্ব দিতে পারে বলেও ধারনা করা হচ্ছে। এছাড়া ২০ হাজার সদস্যের এই বাহিনী গঠনে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশসহ ১১টি দেশ। বাকি দেশগুলো হলো তুরস্ক, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, আজারবাইজান, অস্ট্রেলিয়া, মালায়শিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, সাইপ্রাস ও মরক্কো।
যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অফ স্টেইট মার্কো রুবিও ইথিওপিয়ার কাছেও সৈন্য পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
বাংলাদেশে বিতর্ক
এই বাহিনীতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে অভ্যন্তরীণ আপত্তি ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে আইএসএফ-এ অংশগ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করার পর আলোকচিত্রী ও অধিকারকর্মী শহিদুল আলম ১২ই জানুয়ারি এক ফেইসবুক স্ট্যাটাসে এই অংশগ্রহণকে “বাংলাদেশের বিশ্বাসঘাতকতা” বলে অভিহিত করেছেন।
শহিদুল আলম ২০২৫ সালের অক্টোবরে বহুজাতিক অধিকারকর্মীদের অংশগ্রহণে গঠিত গাজামুখী ‘ফ্রিডম ফ্লোটিলা’য় ছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলের ব্লকেড ভেঙে গাজার মানুষের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো। তবে নৌবহরটি ইসরায়েলি বাহিনী আটকে দিয়েছিল এবং শহিদুল আলমসহ অন্যান্য অধিকারকর্মীদের আটক করে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়।
ইংরেজিতে লেখা স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনীতে যোগ দিতে চাওয়ার খবরটি চেহারায় একটি থাপ্পড়ের মতো। এটি আমাদের সবার প্রতি অপমানজনক যারা ন্যায়ের জন্য লড়েছি, যারা গুরুতর ব্যাক্তিগত ঝুঁকি নিয়েছি এই বৈশ্বিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। এটি সেই লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশির প্রতি অপমানজনক, যাদের দোয়া আমাদেরকে এত লম্বা সময় ধরে জিয়ে রেখেছিল।”
তিনি আরও লেখেন, “এই তথাকথিত স্থিতিশীলকরণ বাহিনীর উদ্দেশ্য শান্তি নয়। এর উদ্দেশ্য প্রতিরোধকারীদের নিরস্ত্র করা। এর উদ্দেশ্য সেই কাজটি সম্পন্ন করা যা বোমা দিয়ে করা যায়নি। সম্মানের সাথে বাঁচার অধিকার সমর্পণ করতে নারাজ এক জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণভাবে পরাধীন করে ফেলা। আমাদের নানা সমস্যা আছে, নানা অসম্পূর্ণতা আছে। তবে এতদিন পর্যন্ত একটি জাতি হিসেবে আমরা গর্বের সাথে মাথা উঁচু করে বলতে পারতাম যে আমরা বিক্রি হয়ে যাইনি। এখানে যোগ দিলে আমরা সেই দাবিটি হারাবো।”
ফেইসবুক স্ট্যাটাসে এই ভাবনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মাজহার। তিনি লিখেছেন, “প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি মানবিক বা শান্তিরক্ষী উদ্যোগ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বিষয়টি গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এটি মোটেও নিরপেক্ষ কোনো মানবিক পদক্ষেপ নয়। বরং এটি এমন একটি রাজনৈতিক অবস্থান, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের জায়নবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী নিরাপত্তা অক্ষের পক্ষে নিজেকে দাঁড় করাচ্ছে।”
বাহিনীর উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ফরহাদ মজহার। লিখেছেন, “এই বাহিনীর নকশা, ভাষা ও দায়িত্বের পরিসর এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে গাজার ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজাকে “স্বাভাবিক” করার নামে এটি মূলত যুদ্ধের ফলাফলকে মেনে নিয়ে তার ওপর একটি নতুন নিরাপত্তা-ব্যবস্থাপনা চাপিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা।”
বাংলাদেশের এখানে যোগ দেয়ার আগ্রহকে “ইসরায়েল-মার্কিন স্বার্থে সহায়ক” বলে মনে করেন তিনি।
“আন্তর্জাতিক স্থিতকরণ বাহিনীর (ISF) দায়িত্বগুলো—ডিমিলিটারাইজেশন, সীমান্ত সুরক্ষা, হামাসের নিরাপত্তা দায়িত্ব প্রতিস্থাপন, স্বাধীন কিন্তু অস্পষ্ট কর্তৃত্বের পুলিশ বাহিনী—সবই ইসরায়েলের ঘোষিত যুদ্ধলক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর বাংলাদেশ এই কাঠামোতে প্রবেশ করছে ওয়াশিংটন-কেন্দ্রিক চ্যানেল দিয়ে। ফলে এই আগ্রহ প্রকাশ কার্যত ইসরায়েল–মার্কিন যুদ্ধ কৌশলকে সহযোগিতা মাত্র”, লিখেছেন ফরহাদ মজহার।
তবে বাংলাদেশ এখনও এই বাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ তিনটি শর্ত দিয়েছে, ওইরকম পরিবেশ তৈরি হলেই যোগ দেওয়ার বিষয়ে ভাবা হবে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “প্রথমত, আমরা ওখানে লড়াই করতে যাব না। দ্বিতীয়ত, ওখানে এমন কোনো কর্তৃপক্ষ থাকবে, যাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ করা বা কথাবার্তা বলাই সম্ভব না, সে ক্ষেত্রে তো আমরা যাব না। কাজে আমাদের শর্তগুলো যেগুলো, সেগুলো মোটামুটি পরিষ্কার। কিন্তু এরপর আমরা চিন্তাভাবনা করব। কিন্তু আসলে কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।’
গত বছরের অক্টোবরে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এর্দোগানের বলেছিলেন যে তার দেশ গাজায় সমর্থন দিতে প্রস্তুত। তবে ইসরায়েল ও তুরস্কের মধ্যে সম্প্রতি উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ায় ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সা’আর বলেছেন যে গাজায় তুরস্কের সৈন্য মোতায়েন মানবে না তার দেশ।
পাস হওয়া প্রস্তাবের সাথে কখনোই একমত হয়নি হামাস। এটিকে প্রত্যাখ্যান করে তারা টেলিগ্রামে দেয়া এক প্রেস রিলিজে বলেছিল, এই প্রস্তাব গাজায় “আন্তর্জাতিক তাবেদারীর মেকানিজম চাপিয়ে দিচ্ছে”।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামাসকে নিরস্ত্র করা হবে এবং গাজায় তাদের আর কোনো ভূমিকা থাকবে না। এছাড়া, সংগঠনটির সদস্যদের হয় সহাবস্থান মেনে নিতে হবে, নয়তো গাজা থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। হামাস বারবার বলেছে যে তারা সরকার থেকে নেমে দাঁড়ালেও অস্ত্র সমর্পণ করতে রাজি নয়।
তবে হামাসকে নিরস্ত্র করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ইসরায়েল। দেশটির জাতিসংঘ প্রতিনিধি ড্যানি ড্যানন বলেন, “হামাস নিরস্ত্র হবে, তা নিশ্চিত করতে দৃঢ় সংকল্প প্রদর্শন করবে ইসরায়েল।”