মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখন যুদ্ধের মেঘ আরো ঘনীভূত, বদলে যাচ্ছে ভূরাজনীতির সমীকরণ; এর মধ্যেই সৌদি আরবের নেতৃত্বে গড়ে উঠছে নতুন এক সামরিক বলয়। আর সেই বলয়ে এবার আলোচনায় বাংলাদেশের নাম।
গত ৭ই অগাস্ট মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান সই করেছে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি।
চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জোটের কোনো একটি সদস্য আক্রান্ত হলে, সেটিকে শুধু ওই দেশের যুদ্ধ হিসেবে দেখা হবে না, প্রতিক্রিয়ায় এগিয়ে আসবে অন্য সদস্যরাও।
অর্থাৎ, সামরিক সহযোগিতার এই কাঠামোর ধরন অনেকটাই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নেটোর মতো। মানে “একজনের ওপর হামলা হলে, সবার ওপর হামলা’ নীতির আদলে তৈরি।
এই প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সুন্নি মুসলিম দেশগুলো এক জোট হলো বলে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু সৌদি আরবের প্রতিবেশী দেশগুলোই এখনো এই জোটে যোগ দেয়নি। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশকে নিয়ে ইতোমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিষয়টি এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যে, পৌঁছে গেছে জাতীয় সংসদেও।
এক প্রশ্নের জবাবে সংসদকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, “এই প্যাক্টটিকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। এতে যোগদান বা যোগদান না করার বিষয়টি এখনো আসেনি, কারণ এটা নির্ভর করছে প্যাক্টের সদস্যদের অভিপ্রায়ের ওপর।
“তারা যদি বাংলাদেশকে এই প্যাক্টে নেওয়ার বিষয়ে অভিপ্রায় প্রকাশ করে, তাহলে আমরা নিশ্চয়ই এটাকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবো।”
অবশ্য বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি শুধু একটি নতুন আন্তর্জাতিক জোটে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়।
কারণ, স্বাধীনতার পর থেকে সামরিক জোটের প্রশ্নে বরাবরই সতর্ক থেকেছে ঢাকা। অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার নানা কাঠামোয় যুক্ত হলেও সরাসরি কোনো সামরিক জোটে জড়ানো থেকে সবসময়ই দূরে থেকেছে বাংলাদেশ।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই অবস্থানে কি পরিবর্তন আসছে?
২০২৬ সালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে ইতোমধ্যেই দেখা গেছে নতুন কিছু পদক্ষেপ।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যোগদান সেই পরিবর্তনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
ফলে সৌদি আরব-তুরস্ক-পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ঢাকা যাবে কিনা, এটা এখন আর নিছক কূটনৈতিক গুঞ্জন নয়। বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে বড় একটি প্রশ্ন।
আরো একটি প্রশ্ন, এই বলয়ে বাংলাদেশ নিয়ে কেন কথা উঠছে এবং প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির জায়গা হবে কোথায়?
কেন বাংলাদেশ এই জোটে আগ্রহী হতে পারে? কী পেতে পারে ঢাকা? আর বিনিময়ে কী ধরনের ঝুঁকি নিতে হতে পারে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দিলে সেটি কি হবে বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য নতুন ঢাল, নাকি হবে নতুন এক ভূরাজনৈতিক ফাঁদ?
মক্কা চুক্তি আসলে কী?
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি হলো সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে একটি পারস্পরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এমন এক সময়ে এটি সই করা হয়েছে, যখন চলমান ইরান যুদ্ধের মধ্যে সৌদি আরবের মতোই উপসাগরীয় অন্য আরব দেশগুলোর সামরিক দুর্বলতা প্রকাশ্যে এসেছে।
এছাড়াও উলটপালট করে দিয়েছে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে।
ব্রিটানিকায় লেখা হয়েছে, এই চুক্তির পেছনে থাকা অন্যান্য সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিলো, তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে, ২০২৪ সালে বাশার আল-আসাদের পতন এই দুই দেশকে সিরিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তারের বৃহত্তর সুযোগ করে দেয়।
মক্কা চুক্তির আগেই সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের মধ্যে সই হয় আরেকটি প্রতিরক্ষা চুক্তি। ওই ঘটনাই মক্কা চুক্তিতে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করেছে বলে ব্রিটানিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
চুক্তির একটি ধারার সঙ্গে মিল রয়েছে উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা নেটোর ‘আর্টিকেল ফাইভ’-এর। সেখানে উল্লেখ রয়েছে, কোনো একজন সদস্যের ওপর আক্রমণকে সমস্ত সদস্যের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চুক্তির পর এক যৌথ বিবৃতিতে জোটভুক্ত দেশগুলো জানিয়েছে, ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ মূলত যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছে।
এই চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে, তা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
মক্কা চুক্তিতে আরো রয়েছে সামরিক উৎপাদন, যৌথ মহড়া এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সহযোগিতা।
যদিও চুক্তিটির মূল দলিল এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে এটি সদস্যদের সামরিক-শিল্প খাতের মধ্যে পারস্পরিক প্রবেশাধিকার ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে মক্কা চুক্তি কোনো আক্রমণের জবাবে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ এই জোটের নেই নেটোর মতো কোনো সমন্বিত কমান্ড স্ট্রাকচার বা নেতৃত্ব কাঠামো।
তাই মক্কা চুক্তি সই হওয়ার পরপরই ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধা সৌদি আরব ও ইয়েমেনে হামলা চালালেও তুরস্ক ও পাকিস্তান সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় তাৎক্ষণিকভাবে এগিয়ে আসেনি।
কেন মক্কা চুক্তি, এতে কী হবে?
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন আঞ্চলিক উত্থান-পতন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে এবং এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই এই তিন দেশ ইসরায়েল ও ইরান উভয়েরই ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী সামরিক অবস্থানের বিষয়ে একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সৌদি আরবভিত্তিক থিংক ট্যাংক 'গালফ রিসার্চ সেন্টার'-এর চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগের রয়টার্সকে বলেছেন, "মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী তিনটি দেশ চরম অনিশ্চয়তার এই মুহূর্তে একত্রিত হচ্ছে, যা নিরাপত্তা বিষয়ে আরো ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও মধ্যম শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান আগ্রহকেই প্রমাণ করে।"
সাগের আরো যোগ করেন, "এই ত্রিপক্ষীয় কাঠামো তিনটি দেশের সম্মিলিত কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা গুরুত্বকে শক্তিশালী করতে পারে এবং একই সাথে আরো বেশি আঞ্চলিকভাবে পরিচালিত একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার উত্থানে অবদান রাখতে পারে।"
নেটোর সদস্যদের মধ্যে তুরস্কের সামরিক বাহিনী দ্বিতীয় বৃহত্তম। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণেও দেশটি এগিয়ে চলেছে। সৌদি আরব ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থানগুলোর আবাসভূমি এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তেল রপ্তানিকারকদের অন্যতম। পাকিস্তানের রয়েছে বড় সামরিক বাহিনী ও পারমাণবিক অস্ত্র।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক খালিদ আল জাবের আল-জাজিরায় এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, “এই চুক্তিটি মূলত এমন তিনটি আঞ্চলিক শক্তিকে একত্রিত করেছে, যাদের সক্ষমতা একে অপরের পরিপূরক।”
“সৌদি আরব দিচ্ছে বিপুল পুঁজি, ভৌগোলিক অবস্থান, রাজনৈতিক গুরুত্ব এবং একটি বিশাল প্রতিরক্ষার বাজার। তুরস্ক অবদান রাখছে তার উন্নত সামরিক-শিল্প ভিত্তির মাধ্যমে। বিশেষ করে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ-প্ল্যাটফর্ম এবং ইলেকট্রনিক সিস্টেমের ক্ষেত্রে। আর পাকিস্তান যুক্ত করছে একটি বিশাল ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী, গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সক্ষমতা এবং এই জোটের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হওয়ার গৌরব।”
হঠাৎ করেই মক্কা চুক্তির প্রসঙ্গ আসেনি। এর পেছনে রয়েছে চলমান ইরান যুদ্ধ। এই যুদ্ধ সৌদি আরবকে কম শিক্ষা দেয়নি।
প্রধানত দুটি সমীকরণ মাথায় রাখতে হচ্ছে সৌদি আরব ও তুরস্ককে। একদিকে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। আরেকদিকে ইরানকে মোকাবিলা করা।
আমেরিকা-ইরান যুদ্ধে সৌদি আরব নিজেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো কীভাবে হুমকির মুখে পড়ে, সেটি তারা সরাসরি দেখেছে।
আর এখানেই আসছে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রসঙ্গ। যে মিত্রের ওপর এখন আর ‘সম্পূর্ণভাবে নির্ভর’ করতে চাইছে না সৌদি।
প্রশ্ন উঠছে যে, মার্কিন ক্ষমতা কতটা টেকসই ও বন্ধুসুলভ? এমনকি এই ক্ষমতা ব্যবহারের নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকান মিত্ররা।
কয়েক দশক ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো বিশেষ করে সৌদি আরব হয়ে উঠেছে আমেরিকান অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ভোক্তা।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাবে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মার্কিন অস্ত্র রপ্তানির ১২ শতাংশই গেছে সৌদি আরবে। এর দাম হতে পারে ১০০ বিলিয়ন ডলার।
ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ২০২৬ সালে সৌদি আরবের সাথে ১৪০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির চুক্তি করেছে আমেরিকা।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও মার্কিন অস্ত্রের বড় ভোক্তা হিসেবে পরিচিতি। অস্ত্রশস্ত্র কেনা ছাড়াও মার্কিন বাহিনীকে দেশে থাকার সুযোগ দেওয়া, পশ্চিমা প্রযুক্তিতে তৈরি গোয়েন্দা তথ্য, যোগাযোগ ও সুরক্ষা নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করেছে সৌদিসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য মার্কিন মিত্ররা।
এই মডেলটি অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর প্রমাণিত হলেও এর মধ্যে কাঠামোগত ত্রুটি ছিলো বলে মনে করেন মিডল ইস্ট কাউন্সিল অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক খালিদ আল জাবের।
তিনি লিখেছেন, “একটি দেশ হয়তো শত শত কোটি ডলার মূল্যের মার্কিন অস্ত্র কিনতে পারে, তাদের ঘাঁটি ও সৈন্যদের জায়গা দিতে পারে এবং ওয়াশিংটনের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে গিয়ে দেখতে পারে যে, পাশে দাঁড়ানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি আসলে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ দ্বারা নির্ধারিত হচ্ছে, যার সাথে মিত্রদের নিরাপত্তার সম্পর্ক খুবই সামান্য।”
“উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজধানীগুলো এখন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, অংশীদারিত্ব যতোই গভীর হোক না কেন, তা সুরক্ষার কোনো স্বয়ংক্রিয় গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা নয়।”
খালিদ আল জাবের মন্তব্য করছেন, “এর ফলে উদ্ভূত কৌশলটি খুবই সহজ ও স্পষ্ট। ওয়াশিংটনের সাথে জোট বজায় রাখা, কিন্তু এর বাইরেও নিজেদের বিকল্প বা পথ তৈরি করা। এটি আমেরিকান শিবির থেকে দলত্যাগ করে চীনা, রুশ বা তুর্কি শিবিরে যোগ দেওয়া নয়। বরং এটি শিবিরের রাজনীতির ঊর্ধ্বে ওঠার বা এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার একটি প্রচেষ্টা।”
ইরান তার সীমানা ছাড়িয়েও পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের জন্য কাজ করছে কয়েক দশক ধরে। উপসাগরীয় ও আরব দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার হুমকি অব্যাহত রেখেছে।
অন্যদিকে, সামরিক ও গোয়েন্দা শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে চলছে ইসরায়েল। সমস্ত মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতাও দেখিয়েছে একাধিকবার। একই সাথে আরব রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ এবং তাদের ভূখণ্ড দখল ও বসতি স্থাপনের নীতিও অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল।
“আমেরিকান প্রভাব হ্রাস পাওয়ার ফলে এই অঞ্চলটি এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে যেতে পারে, যার নিয়মকানুন কেবল দুটি পক্ষ দ্বারা নির্ধারিত হবে; ইসরায়েল ও ইরান,” লিখেছেন খালিদ আল জাবের।
তাই মক্কা চুক্তিকে একটি ‘তৃতীয় মেরু’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রাথমিক প্রচেষ্টা বলে মনে করছেন এই বিশ্লেষক।
“এমন একটি জোট, যার এই দুই (ইসরায়েল ও ইরান) শক্তির কোনোটির সাথেই যুদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই অঞ্চলে তাদের যেকোনো একপক্ষের একচেটিয়া আধিপত্যকে রুখে দেওয়ার মতো যথেষ্ট গুরুত্ব বা শক্তি এর রয়েছে। এর উদ্দেশ্য বিজয় অর্জন নয় বরং আধিপত্য বিস্তার রোধ করা,” লিখেছেন মিডল ইস্ট কাউন্সিল অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের নির্বাহী পরিচালক।
মক্কা চুক্তিতে অন্যান্য আরব দেশ নেই কেন?
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে বাংলাদেশ যাবে কিনা, তা নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখন সেই জোটেই এখনো অন্তর্ভুক্ত হয়নি উপসাগরীয় দেশগুলো।
সৌদি আরব ছাড়া অন্য কোনো আরব দেশ নতুন জোটে নেই। যেমন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, মিশর অন্তর্ভুক্ত না থাকাটা আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে।
এদের না থাকার পেছনেও কয়েকটি কারণ দেখছেন বিশ্লেষকরা।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান বা কাতার সুনির্দিষ্ট কোনো সামরিক ব্লক বা শিবিরের রাজনীতিতে আর জড়াতে চাইছে না।
উপসাগরীয় দেশগুলোর বর্তমান কৌশল হলো, একদিকে ওয়াশিংটনের সাথে জোট বজায় রাখা। অন্যদিকে চীন, রাশিয়া বা তুরস্কের মতো শক্তির সাথেও পৃথক সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া।
এই দেশগুলোর জোটে যোগ না দেওয়ার আরেকটি কারণ হলো, ইরানের সাথে স্থায়ী ফ্রন্ট বা শত্রুতা এড়ানোর নীতি।
মক্কা চুক্তির অন্যতম প্রধান অনুঘটক হলো ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ। নিজস্ব সীমান্তের বাইরেও প্রভাব বিস্তার করে উপসাগরীয় ও আরব দেশগুলোকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আওতায় রেখেছে ইরান।
কাতার, কুয়েত এবং ওমানের মতো দেশগুলোর সাথে ইরানের রয়েছে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক।
কাতার ও ইরান বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস ফিল্ড ভাগাভাগি করে। কাতার ভালো করেই জানে যে, ইরানকে উপসাগরীয় সমীকরণ থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়।
তাই মক্কা চুক্তির মতো একটি শক্তিশালী সামরিক জোটে সরাসরি যোগ দিয়ে তেহরানের সাথে স্থায়ী কোনো শত্রুতা বা ফ্রন্ট খুলতে রাজি নয় কাতার।
এই দেশগুলোর মক্কা চুক্তিতে না যাওয়ার আরেক কারণ হলো, আগে যেসব জোট তৈরি হয়েছিলো, সেগুলোর তিক্ত অভিজ্ঞতা। আরব দেশগুলোর ইতিহাসে জোট গঠনের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অঞ্চলে কখনোই অভাব ছিলো না চুক্তির। একের পর এক চুক্তি ও জোট হয়েছে। কিন্তু অভাব ছিলো চুক্তি বাস্তবায়নে অভিন্ন রাজনৈতিক ভিত্তির।
এর আগে অনেক চুক্তি হয়েও সেসবের বাস্তবায়ন হয়েছে সামান্যই।
২০১৫ সালের ইয়েমেন যুদ্ধের সময় যে আরব জোট গঠিত হয়েছিলো, পরে তা ভেস্তে যায় ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে।
‘ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেরোরিজম কোয়ালিশন’ গঠিত হয় ২০১৫ সালের ১৫ই ডিসেম্বর। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উদ্যোগে প্রাথমিকভাবে ৩৪টি দেশের অংশগ্রহণে এই কোয়ালিশনের যাত্রা শুরু হয়, যার বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৪৩।
কিন্তু এই জোটও শেষ পর্যন্ত একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে রূপান্তরিত হতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
এসব তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে অন্য আরব দেশগুলো নতুন কোনো সামরিক প্রতিশ্রুতিতে তাড়াহুড়ো করে ঢুকতে চাইছে না।
এদিকে জোটে মিশরের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও দেশটির তরফ থেকে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
মিশর নিয়ে টানাটানির কারণ হলো, দেশটি যোগ দিলে আরব বিশ্বে মক্কা চুক্তির রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেড়ে যাবে।
কিন্তু ১৯৭৯ সাল থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি বজায় রেখে চলছে মিশর। গাজা নিয়ে কূটনীতি এবং রাফাহ-সংক্রান্ত আলোচনাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে মিশরের। এসব কারণেই কায়রো এখনো কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি।
এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর ভূরাজনৈতিক সংকট।
আপাতদৃষ্টিতে দেশ দুটিকে ঘনিষ্ঠ মিত্র মনে হলেও, মধ্যপ্রাচ্য, লোহিত সাগর এবং আফ্রিকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের মধ্যের প্রতিযোগিতা এখন রূপ নিয়েছে এক ধরনের শীতল যুদ্ধে।
বিশেষ করে ইথিওপিয়া, আফ্রিকা এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের কেন্দ্র করে দুই দেশের ভেতরে চলছে কৌশলগত দ্বন্দ্ব।
২০১৫ সালে সৌদি ও ইউএই যৌথভাবে হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেও, বর্তমানে ইয়েমেন নিয়ে তাদের লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সৌদি আরব চায়, নিজেদের দক্ষিণ সীমান্তে একটি অখণ্ড ও স্থিতিশীল ইয়েমেন। আরব আমিরাতের লক্ষ্য হলো, ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চল এবং কৌশলগত সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
হর্ন অব আফ্রিকা হিসেবে পরিচিত ইথিওপিয়া কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা নিয়েও তীব্র প্রক্সি যুদ্ধ চলছে সৌদি আরব ও ইউএই’র মধ্যে।
সব মিলিয়ে আরব দেশগুলোই এখন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না যে, তারা সৌদি নেতৃত্বাধীন মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা জোটে অংশ নেবে, নাকি নেবে না।
বাংলাদেশের আগ্রহ কেন?
বাংলাদেশ যদিও এখনো মক্কা চুক্তি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি, তারপরও আলোচনা থেমে নেই।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সংসদে বলেছেন, “তার আগে এর (প্যাক্ট) ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা করাটা, সম্ভবত সে সময় আসেনি। আমরা নিশ্চয়ই এসব বিষয় বিবেচনা করবো।”
“তবে আমাদের মনে রাখতে হবে একটা কথা, এ প্যাক্ট যদি বিস্তৃত হয়, এটা হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা। এটা আমাদের পরিবার। এটা মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তা নিয়ে কারও, অন্যান্যদের উদ্বেগের অবকাশ নেই।”
তবে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা সরাসরি বলেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির।
"মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আমরা আগ্রহ প্রকাশ করেছি। মক্কার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক আবেগের। মিডল ইস্টে যদি এমনও হয় যে ইসলামিক নেশনসদের মধ্যে একটা সিকিউরিটি প্যাক্ট হয়, তাহলে ওখানে তো আর অস্বাভাবিক না যাওয়া। দেখা যাক কী হয়। আমরা বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি,” সাংবাদিকদের বলেন তিনি।
এমনকি এই জোটে যোগ দেওয়ায় বাংলাদেশে ‘ঝুঁকির কিছু নেই’ বলেও মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। “এটাতে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটা একটা অনন্য চুক্তি, যাতে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখানে ঝুঁকির কিছু নেই।”
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির জন্য হতে চলেছে সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহাসিক একটি জলবিভাজক ঘটনা।
আর ‘সীমিত কৌশলগত গভীরতা ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান’ জটিল করে তুলেছে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি এবং অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়"।
এই নীতি অনুসরণ করেই গত সাড়ে পাঁচ দশকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, উন্নয়নমূলক ও সামাজিক সংস্থা, ফোরাম ও জোটে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ।
২০২৬ সাল পর্যন্ত সেই নীতিতে অটুট থাকতে পারলেও এই বছরের মাঝামাঝিতে আগের সেই নীতি বদলে যায়।
কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ না দেওয়ার দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে সরে এসেছে ঢাকা। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আরেকটি প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়া নিয়ে বাংলাদেশের সামনে যেমন রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জ, তেমনি লাভের অঙ্কও দেখছেন কেউ কেউ।
পরিবর্তিত বিশ্ব ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় নতুন চুক্তির প্রতি ঢাকার আগ্রহের পেছনে তিনটি মূল কারণ রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে, ইসলামিক ব্লক ও সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো, কৌশলগত গভীরতার প্রমাণ দেওয়া এবং তুরস্কের সহযোগিতায় প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ ও প্রযুক্তি লাভের সুযোগ।
চুক্তিতে যোগ দেওয়া পক্ষের আলোচকরা মনে করছেন, মক্কা চুক্তির অংশীদার হওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের কিছু ভূরাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনতে পারে। সেগুলো হলো, যৌথ নিরাপত্তা বলয় তৈরি, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শ্রমবাজারের সুরক্ষা।
বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পক্ষে বেশ কয়েকটি যুক্তি তুলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাহাব এনাম খান।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেছেন, "এই প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশে যুক্ত হলে তা সামরিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক দিক থেকেও লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে।”
সাহাব এনাম খানের মতে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুব একটা নেই। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি আর তুরস্ক-পাকিস্তানের সামরিক শক্তি ও কৌশল আছে।
"আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। যেহেতু বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চাচ্ছে। সেদিক বিবেচনায় পাকিস্তান-তুরস্ক ও চীন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
সবশেষে বাংলাদেশের জন্য নানাভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো সৌদি আরব। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হলো মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি।
মক্কা চুক্তি যদি ভবিষ্যতে একটি বড় আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোয় পরিণত হয়, তাহলে শ্রমবাজার, বিনিয়োগ ও জ্বালানি সহযোগিতায় বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তবে কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করছেন যে, লাভের পাশাপাশি সামরিক এই জোটে যোগ দেওয়া হবে বাংলাদেশের গত সাড়ে পাঁচ দশকের ঐতিহ্যবাহী "ভারসাম্যপূর্ণ এবং জোট-নিরপেক্ষ" পররাষ্ট্রনীতির জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ জুয়া খেলা।
কারণ, এই জোটে গেলে পড়তে হবে ভারতের তীব্র ক্ষোভ ও ভূরাজনৈতিক চাপের মধ্যে, বাংলাদেশ থেকে বহু দূরের যুদ্ধের মধ্যে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং বাংলাদেশ যে কূটনৈতিকভাবে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করছে, তা হারানোরও আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশকে কেন মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া উচিত নয়, তার পেছনে পাঁচটি প্রধান কারণ তুলে ধরেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের চেয়ারম্যান মো. শরিফুল ইসলাম।
দ্য ডেইলি স্টারের এক বিশ্লেষণে তিনি দেখিয়েছেন, জোটভুক্ত তিন দেশের মতো বাংলাদেশের বড় ধরনের বাহ্যিক সামরিক হুমকি নেই, এই চুক্তির ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বৈরিতা হতে পারে, যা এড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, অন্য আরব দেশগুলো যোগ না দেওয়ায় অভিবাসন কূটনীতিতে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব এড়ানো, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন নিয়ে ঝুঁকির শঙ্কা এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যুদ্ধের খরচ বহনে বাংলাদেশে অক্ষমতা।
এই পাঁচ কারণে যৌথ প্রতিরক্ষা জোট “বাংলাদেশের সর্বোত্তম স্বার্থের অনুকূল নাও হতে পারে” বলে মনে করেন অধ্যাপক শরিফুল ইসলাম।
বাংলাদেশের গ্যাস আমদানির দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে কাতারের সঙ্গে। সেই গ্যাস আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে। একই নৌপথ বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরিশোধিত তেলের প্রায় শতভাগ আমদানিও এই পথের ওপর নির্ভরশীল।
সুন্নি মুসলমানপ্রধান দেশগুলো নিয়ে গড়ে ওঠা নতুন এই জোট নিয়ে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি ইরান। কিন্তু এই জোটকে নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসাবে দেখার যথেষ্ট কারণ আছে ইরানের।
বাংলাদেশ যদি এই সামরিক জোটে যদি যোগ দেয়, ইরান যদি জোটের বিরুদ্ধে যায়, তাহলে কোনো আঞ্চলিক সংঘাতের সময় বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ কতটা নিরাপদ থাকবে?
ঝুঁকির ওপরে আরো বড় প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসন।
এতোদিন বাংলাদেশ চেষ্টা করেছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে। আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গেও থাকবে।
কিন্তু কোনো একটি পক্ষের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে পড়বে না, যাতে অন্য পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হয়। এই ভারসাম্যই ছিলো বাংলাদেশের কূটনীতির বড় শক্তি।
কিন্তু সামরিক জোটের চরিত্র আলাদা। অর্থনৈতিক জোটে যে ধরনের মতভেদ করা যায়, সামরিক জোটে সেটার সুযোগ খুবই সীমিত। প্রতিরক্ষা জোটে বড় প্রতিশ্রুতি হলো, সংকটের মুহূর্তে কে কার পাশে দাঁড়াবে?
আবার জোটভুক্ত তিন দেশে সৌদি আরব-তুরস্ক-পাকিস্তানের এক জায়গায় মিল আছে। তা হলো, প্রায়ই তাদের সরাসরি অথবা প্রক্সি যুদ্ধ করতে হয়। অর্থাৎ এই তিন দেশের শত্রুর অভাব নেই। অথবা এই দেশগুলো অনেকের শত্রু।
এই জোটে গেলে বাংলাদেশকে জড়িয়ে পড়তে হতে পারে অনেক দূরের যুদ্ধে। ধরুন, জোটের কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলো। তখন বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে?
ঢাকা কি বলবে, “এই যুদ্ধ আমাদের না? আমরা এতে অংশ নেবো না!” নাকি চুক্তির শর্ত মেনে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, আক্রান্ত দেশের পাশে দাঁড়াবে?
এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু খুবই জটিল। আর যদি চুক্তি মানতে হয়, তাহলে জটিলতা আরো বাড়বে।
গবেষক ও বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়েছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো সবাই এখন পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার পথ খুঁজছে। তারই ধারাবাহিকতা এই মক্কা প্যাক্ট।”
তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ এই জোটে যখনই যুক্ত হবে, তখন প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারত এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন হবে। যেটি একদিক বিবেচনায় বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকির কারণ হিসেবেও দেখছেন তিনি।
"এটার তাৎক্ষণিক একটি প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। কারণ তখন ভারত ভাবতে পারে সে অনিরাপদ। তখনই সে ইসরায়েলের শরণাপন্ন হতে পারে। এই ইস্যুতে তখন ভারতকে সহযোগিতায় আগ্রহী হতে পারে ইসরায়েল। দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হতে পারে সামরিক উত্তেজনা,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন আলতাফ পারভেজ।
তিনি আরো বলেছেন, "এই উত্তেজনায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রক্সি ওয়ার এবং প্রক্সি ফোর্সের সংখ্যা বাড়তে পারে। সেদিক থেকে বাংলাদেশ বাড়তি ঝুঁকিতে থাকবে। সেক্ষেত্রে চুক্তিতে ঝুঁকলেও এক ধরনের ঝুঁকি, না ঝুঁকলেও থাকবে আরেক ধরনের ঝুঁকি।”
সামরিক জোটে যোগ দিলে নানা প্রশ্ন আসবে বাংলাদেশের সামনে এবং সেসব উত্তরই কিন্তু নির্ধারণ করতে পারে পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ।
কারণ, বাংলাদেশ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা বদলে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। আমেরিকার ওপর নির্ভরতা নিয়ে মিত্রদের প্রশ্ন উঠছে। চীন, তুরস্ক, রাশিয়া, ইরান ও ভারত সবাই নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে।
আর বাংলাদেশও নিজের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য নতুন পথ খুঁজছে।
তাই বাংলাদেশ কি এমন কোনো নিরাপত্তা কাঠামোয় যাবে, যেখানে অন্যের যুদ্ধের দায়ও একসময় নিজের কাঁধে নিতে হতে পারে?