সার্জিও গোরের সফরে ঢাকার পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে চাইবে ওয়াশিংটন

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বুঝতে ঢাকা আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর, যিনি একই সাথে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসাবে নিযুক্ত। 

তাই কূটনৈতিক অঙ্গনে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী সফর হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

এই সফরে মূলত নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নানা ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান ও ভাবনা যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে চাইবে বলে মনে করছেন কূটনীতি বিশ্লেষকরা।

একইসাথে বাংলাদেশও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় রেখে তুলে ধরতে পারবে প্রাপ্তি-প্রত্যাশার খতিয়ান। বাণিজ্য চুক্তি, চীনের সাথে সম্পর্কসহ ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের সম্ভাবনা-অস্বস্তি সবই থাকবে আলোচনার টেবিলে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে করা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি যেমন নিশ্চিত হতে চাইবেন সার্জিও গোর। তেমনি চীনের সাথে সম্পর্ক নিয়েও তাদের ‘কনসার্ন’ জানাতে পারেন।

সব মিলিয়ে দুই দেশের জন্যই ভূরাজনীতি এবং বাণিজ্য-এই দুই খাত গুরুত্ব পাবে সার্জিও গোরের ঢাকা সফরে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ওবায়দুল হক মনে করেন, সার্জিও গোরের এই সফর প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশকে বোঝার জন্য। উনি দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার দায়িত্বে আছেন। তাকেতো সব দেশকেই বুঝতে হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদও বলছেন, সার্জিও গোর এই দায়িত্বে নতুন। তাই তাকে পুরো অঞ্চলের সমীকরণ বুঝতে হলে বাংলাদেশকেও বুঝতে হবে।

“বাংলাদেশ সম্পর্কে যতো বেশি জানা যায়, যে বাংলাদেশ কী চিন্তা করে, আঞ্চলি বৈশ্বিক ভাবনা কী, সার্বিক পররাষ্ট্রনীতিই বুঝতে চাইবেন তিনি।” 

কর্মসূচিতে যা আছে

ত্রিশে জুলাই সন্ধ্যায় তার ঢাকা পৌঁছানোর কথা রয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেছেন, সার্জিও গোরের সফর ঢাকা-ওয়াশিংটনের সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করবে।

তবে এই সফরের বিস্তারিত সফরসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট বা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বার্তা দেওয়া হয়নি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে,সার্জিও গোর দেখা করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাথে। 

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও তার সফরের কথা আছে। তার প্রথম বাংলাদেশ সফর তিন দিনের হবে বলেও জানা গেছে।

নির্বাচনের পর ঢাকা সফর করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি পল কাপুর এবং সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে,সার্জিও গোর দেখা করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাথে। 

বাণিজ্য চুক্তি আর চীন ঘনিষ্ঠতা

নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেইড’ বা আর্ট শিরোনামে বাণিজ্যচুক্তি সই করে বাংলাদেশ।

এই চুক্তি নিয়ে সমালোচনা হয়েছে ঢের। চুক্তির অনেক ধারাকে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বলেছেন অনেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ওবায়দুল হকের মতে, “চুক্তির টাইমিংটাই বলে দেয় যে, ওই ট্রেইড এগ্রিমেন্টটা তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা বুঝেছে যে, রাজনৈতিক সরকার এমন চুক্তি করতে গেলে তাকে অনেক ভাবতে হবে। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই তারা চুক্তিটি করে নিয়েছে।”

এই সফরে চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আরো স্পষ্টভাবে বুঝতে চাইবে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও এর আগে পল কাপুরের সফরের সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, পল কাপুর আশ্বস্ত হয়েছেন যে, বাংলাদেশ চুক্তিটি অব্যাহত রাখবে।

ওবায়দুল হক বলছেন, “তারা বুঝতে চাইবে যে, বাংলাদেশ এই চুক্তির বিষয়ে কতোটা কমিটেড। এই কমিটমেন্টটাই তারা প্রত্যাশা করবে।”

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, বর্তমান চুক্তিতে কিছু অসম বিষয় রয়েছে। এটি বাংলাদেশের স্বার্থের সাথে পুরোপুরি যায় না।

তাই ঢাকা এই চুক্তির শর্তগুলো পর্যালোচনা বা রিভিউ করার প্রস্তাব দিতে পারে। বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর বিষয়গুলো মানা সম্ভব নয়, এই বার্তাটি স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

“বাংলাদেশ চাইলে বলতে পারে যে, চুক্তির কোন জায়গাগুলো রিভিউ করে দেখা দরকার। এটা চাইলেই চাপিয়ে দিতে পারে না তারা”, যোগ করেন মুন্সি ফয়েজ।

সার্জিও গোরের সফরের বড় ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট হলো বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর নতুন রূপরেখা তৈরি হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা বাড়ছে। ওয়াশিংটন তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

চীন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে যুক্ত করে অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব দিয়েছে। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বেইজিংয়ের কৌশলগত উপস্থিতিও বাড়ছে। এগুলো নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের গভীর পর্যবেক্ষণ রয়েছে।

এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্বস্তি থাকাটা স্বাভাবিক বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর।

তিনি বলেন, “এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার পরিষ্কার। প্রধানমন্ত্রীর সফরে চীনের কাছ থেকে অনেক বড় প্রকল্পের প্রস্তাব আছে, সেগুলো নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কী, এটা সম্পর্কে তারা যুক্তরাষ্ট্র জানতে চাইবে।”

“তারা বাংলাদেশকে হয়তো মনে করিয়েও দিতে পারে যে, এআরটির আওতায় বাংলাদেশ একটা আবদ্ধতায় আছে। কারণ, ননমার্কেট ইকনমির সাথে ইন্টার‌্যাকশনে গেলে তার কনসিকুয়েন্স হতে পারে”, বলেন এম হুমায়ুন কবীর।

বাংলাদেশ এখানে চুক্তির প্রতি ‘কমিটমেন্ট’ প্রকাশ করবে মনে করেন শিক্ষক ওবায়দুল হক। 

তিনি বলেন, “এখানে রিজার্ভেশন প্রকাশের কোনো সুযোগ বা সক্ষমতা আমাদের এখনো নেই।”

“পরাশক্তিগুলোর বর্তমান প্রতিযোগিতা মূলত অর্থনৈতিক। এখানে ভূরাজনীতির চেয়ে ভূঅর্থনীতি বেশি কাজ করছে। বঙ্গোপসাগরের বন্দর ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণই এখানে মূল লক্ষ্য।”

ক্যাপশন গত মার্চে ঢাকা সফর করেন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি পল কাপুর

গৌণ হলেও আলোচনায় থাকবে ভারত

সার্জিও গোর একই সাথে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত। তার এই দ্বৈত দায়িত্বের কারণে ঢাকা সফরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্কও আলোচনায় আসবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

তবে মুন্সি ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, আলাপ হলেও এটি অতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে না।

তিনি বলেন, “ভারত সম্বন্ধে বাংলাদেশ কী ভাবে তা জানার চেষ্টা করতে পারেন তিনি। কিন্তু সেটা আমি মনে করি না যে খুব গুরুত্ব পাবে। হলেও সেটা একটা ‘প্রাইভেট’ ব্যাপার হবে।

শিক্ষক ওবায়দুল হকও এখানে একমত। তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেখতে চায় ‘ইন্ডিপেন্ডেন্টলি’। আগে যে বলা হতো যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ভারতের চোখে দেখে, ওই পর্যায় থেকে আমরা বের হয়ে এসেছি।”

তবে এই সফরে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ডিল’ করতে হবে বলে মনে করেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

তারা সবাই বলছেন, বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দুই দেশই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভাষার ব্যবহারে ও ভারসাম্য রক্ষায় ঢাকার নেতৃত্বকে অত্যন্ত কৌশলী হতে হবে।