বাংলাদেশ–চীন সম্পর্কের ইতিহাসে নতুন এক কৌশলগত অধ্যায় রচিত হলো বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে। চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরের শেষ দিনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং এর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকে বাণিজ্য, অবকাঠামো, বন্দর উন্নয়ন, রোহিঙ্গা সংকট, এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডোরসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যাপক অগ্রগতি আসে।
এই বৈঠককে কেন্দ্র করে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন, এবং বাংলাদেশ–চীন–মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরসহ (বিসিআইএম) আঞ্চলিক সংযোগের নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং “নতুন যুগের কৌশলগত অংশীদারিত্ব” ঘোষণা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে
বৈঠকে সবচেয়ে আলোচনায় ছিল অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব। শি চিনপিংয়ের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডোর গঠনের প্রস্তাব দেয় বেইজিং।
একইসঙ্গে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর উন্নয়ন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ব্রিকস সদস্যপদের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।
এই বৈঠকের আগে একই স্থানে জাতীয় গণকংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
এর আগে সকালে বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক তিয়েনআনমেন স্কয়ারে স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে চীনের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং বিউগলের করুণ সুর বাজানো হয়।
যেসব বিষয়ে আলোচনা হলো
চীন সফরে দেশটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সাথেও একাধিক বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ ছাড়া চীনের দালিয়ান শহরে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের 'সামার দাভোস ২০২৬' সম্মেলনেও অংশ নেন তিনি।
চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজি এর সঙ্গেও বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সবশেষ শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি
বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলন করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। বৈঠকে আলোচনা হওয়া নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন তিনি।
বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক আরও জোরদার করা এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল জানিয়ে মাহদী আমিন জানান, কৌশলগত সহযোগিতা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উন্নয়ন প্রকল্প এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার লক্ষ্য ছিলো।
তিনি জানান, দুই দেশের শীর্ষ নেতার আলোচনায় ‘পরস্পরের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার’ বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, দুই নেতার আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি ছিল তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা। এই প্রকল্পের কারিগরি সহায়তা এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিষয়ে চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া, বিসিআইএম (বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার) অর্থনৈতিক করিডোর, চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান পিএমও মুখপাত্র।
তিনি জানান, “দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনার ভিত্তিতে ১৬ দফার একটি যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও বড়ো সিদ্ধান্তগুলো জায়গা পেয়েছে।”
বৈঠকে দুই দেশের বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চীনের শিল্প স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
উন্নয়নের ক্ষেত্রে সড়ক, সেতু ও রেলওয়ে অবকাঠামোর পাশাপাশি আনোয়ারায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে চীন।
সমঝোতা স্মারক
বৈঠকের পর মাহদি আমিন বলেন, “বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে হওয়া সমঝোতার ভিত্তিতে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।”
তিনি জানান, এর মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক দুই দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের উপস্থিতিতে সই করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বিভিন্ন চীনা প্রতিষ্ঠান ও অংশীজনের মধ্যে আরও তিনটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে বলে জানান তিনি।
পিএমও মুখপাত্র বলেন, বর্তমানে দুই দেশের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মোট ১৩টি মন্ত্রণালয়-পর্যায়ের, তিনটি বিডা ও চীনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এবং একটি দুই দেশের শাসক রাজনৈতিক দলের মধ্যে সই হয়েছে।’
মাহদী আমিন এসব সমঝোতা স্মারককে প্রধানমন্ত্রীর সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীনের সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে।
বৈঠকে বন্দর উন্নয়ন নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়। চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে চীন আগ্রহ প্রকাশ করে এবং মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণেও সহযোগিতার কথা জানায়।
পাশাপাশি দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি, জ্ঞান বিনিময় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে।
সফরে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে চীনের সহযোগিতার অংশ হিসেবে তৃতীয় ভাষা হিসেবে ম্যান্ডারিন শেখার ওপর গুরুত্ব বাড়ানোর কথা বলা হয়। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় চীনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি চীনা ভাষা শিক্ষায় শিক্ষক ও অবকাঠামোগত সহায়তার আশ্বাসও আসে।
স্বাস্থ্যখাতেও সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব আসে। আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি, রোবটিক সার্জারি, হাসপাতাল উন্নয়ন এবং চিকিৎসা ভিসা সহজীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশিদের জন্য চিকিৎসা সুবিধা বাড়াতে চীন আগ্রহ প্রকাশ করে।
সফরে রোহিঙ্গা ইস্যুতেও আলোচনা হয়। বাংলাদেশ তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে যে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান। চীন এ বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপে সহায়তার আশ্বাস দেয়।
এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক “টু প্লাস টু” সংলাপ কাঠামো নিয়ে সমঝোতা হয়, যার মাধ্যমে নিয়মিত কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সংলাপ চালু হবে।
যা বলছে চীন
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈঠকের পর একটি বিবৃতি দিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যেখানে সম্পর্ক উন্নয়ন, সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সমর্থন এবং উন্নয়ন অংশীদারিত্বের বিষয়ে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “বিশ্ব পরিস্থিতি যেমনই পরিবর্তিত হোক না কেন, চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মূল লক্ষ্য থেকে বেইজিং কখনও সরে আসবে না। চীন সবসময়ই বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু, সুপ্রতিবেশী এবং ভালো অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে।”
এ ছাড়া চীন বাংলাদেশের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা রক্ষার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে এবং যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধী বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
তিস্তা নিয়ে সহায়তার আশ্বাস
তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা ঝুঁকি মোকাবেলা, নদী খনন, নদীভাঙন রোধ এবং সেচ ও নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে বাংলাদেশ ও চীন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই রাষ্ট্রীয় সফরে বৃহস্পতিবার চীনের পানি সম্পদ মন্ত্রী লি গুয়োয়িংয়ের সাথে এক বৈঠকে এসব বিষয়ে দুই দেশ ঐকমত্য হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানিয়েছেন।
নদী ব্যবস্থাপনাসহ এই খাতে একসাথে কাজ করা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন চীনের পানি সম্পদমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ায় তার প্রথম বিদেশ সফরের পর চীনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বুধবার দেশটিতে সফর করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা আমিন বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন, চীনের স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এর সঙ্গে ঐতিহাসিক গ্রেট হলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে যান তারেক রহমান। এর আগে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া সফর করেন এবং পরে চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সামার দাভোস ২০২৬-এ অংশ নেন।
সেখান থেকে তিনি বেইজিংয়ে পৌঁছান এবং একাধিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন।
বেইজিং সফরের সময় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দুই দেশের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
একই সঙ্গে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি এবং বিএনপির মধ্যে পৃথক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। বিভিন্ন চীনা শিল্পগোষ্ঠী ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরাও বাংলাদেশের সঙ্গে বিনিয়োগ ও সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন।
সফরকালে “ইনভেস্ট বাংলাদেশ” শীর্ষক বিনিয়োগ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান। এ ছাড়া তিনি চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের সঙ্গেও বৈঠক করেন।
সহযোগিতামূলক সম্পর্কের আশ্বাস
সফর শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়, ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ ও চীন ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক আস্থা সুদৃঢ় করেছে, ঐতিহ্যবাহী বন্ধুত্ব জোরদার করেছে এবং ফলপ্রসূ বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা পরিচালনা করেছে।
চীন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় অভিনন্দন জানায় এবং নতুন সরকারের কার্যক্রমের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে।
এ ছাড়া দুই দেশই উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ অব্যাহত রাখা, শাসনব্যবস্থা বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় বৃদ্ধি এবং সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে কৌশলগত সংলাপের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘২+২ সংলাপ’ চালুর সম্ভাবনা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বিবৃতিতে দুই দেশই পরস্পরের স্বার্থ ও প্রধান উদ্বেগের বিষয়ে দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশ পুনরায় ‘এক চীন নীতি’র প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিশ্বে একটিই চীন রয়েছে, তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বেইজিং সরকারই সমগ্র চীনের একমাত্র বৈধ সরকার।
অন্যদিকে, চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় উচ্চমানের সহযোগিতা জোরদার এবং আধুনিকায়নের লক্ষ্য অর্জনে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। চীন বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় বাড়াবে এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি জনগণের জীবনমান উন্নয়নমূলক ছোট প্রকল্পেও সহায়তা দেবে। এ ছাড়া শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।
বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প, সরবরাহ শৃঙ্খল ও বিনিয়োগে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিৃবতিতে বাংলাদেশকে শতভাগ পণ্যে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা দেওয়ার জন্য চীনকে ধন্যবাদ জানানো হয়। বাংলাদেশও চীনা বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
একই সঙ্গে মংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত প্রকাশ করে দুই উভয় দেশ।
বিবৃতিতে পুনরায় তিস্তা নিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, পানি পরিকল্পনা, জলবিদ্যাগত পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, নদী খনন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ।
চীন তার সক্ষমতা অনুযায়ী তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (টিআরসিএমআরপি) সহায়তা দেবে। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত সম্পন্ন করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে কাজ করবেন। এছাড়া সামুদ্রিক বিষয়েও সহযোগিতা জোরদার করা হবে।
উভয় দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সফর, প্রশিক্ষণ এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে পারস্পরিক সম্পৃক্ততা আরও জোরদারে সম্মত হয়েছে।
২০২৫ সালে চীন-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি এবং ‘চীন-বাংলাদেশ জনগণের মধ্যে বিনিময় বর্ষ’ সফলভাবে উদযাপনের প্রশংসা করা হয়েছে।
দুই দেশ গণমাধ্যম, থিংক ট্যাংক, শিক্ষা, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা, যুব, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি খাতে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ জোরদারে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
চীন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখবে বলেও জানানো হয়।
‘মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্য গঠনের ধারণা এবং প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং প্রস্তাবিত বৈশ্বিক উদ্যোগসমূহের প্রতি বাংলাদেশ সমর্থন জানায় বলে বলা হয়েছে বিবৃতিতে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া জনগোষ্ঠীর সংকট সমাধানে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ। চীনও রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করেছে এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করার পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বহুপাক্ষিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে চীন সমর্থন জানায়। উভয় দেশ জাতিসংঘকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক আইনভিত্তিক শৃঙ্খলা সমর্থন করে।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীন মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপে সহায়তার আশ্বাস দেয় এবং বাংলাদেশ মানবিক সহায়তার জন্য চীনের ভূমিকার প্রশংসা করে।
শুক্রবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ১৫ মিনিটে সফর শেষে দেশের উদ্দেশে রওনা দেন তারেক রহমান।
তিনি বেইজিং ড্যাক্সিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চায়না সাউথার্ন ফ্লাইটে রওনা হয়েছেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
সে সময় প্রধানমন্ত্রী ও তার সহধর্মিনী জুবাইদা রহমানকে বিদায় জানান চীনের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত ইউয়ে শিয়াওইয়ং। তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমান গাড়ি থেকে নেমে লালগালিচায় হেঁটে বিমানে ওঠেন।