মধ্যপ্রাচ্য সংকট আর বৈশ্বিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে ক্রমেই বাংলাদেশের জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সার আমদানি।
যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ডলারের বাজারে।
অতিরিক্ত দামে এসব পণ্য আমদানিতে যে সংকট তৈরি হচ্ছে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে মূল্যস্ফীতিতে।
তেল, গ্যাস ও সার তিনটিই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও এর সরবরাহের সঙ্গে।
সামগ্রিক অর্থনীতিতে আসন্ন এই চাপ সামলাতে জুন পর্যন্ত সরকারের প্রয়োজন হবে অন্তত ৩২০ কোটি ডলার।
এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও পণ্য আমদানির প্রস্তুতি নেওয়া না গেলে সংকট তীব্র হবে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এমনকি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগও।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম আলাপ-কে বলেছেন, “গরম শুরু হয়ে গেছে। মধ্য এপ্রিল থেকে সেচের জন্য জ্বালানি চাহিদাও বাড়বে। বিদ্যুতের লোডশেডিং শুরু হয়ে গেছে। তার মানে সংকট তীব্র হতে যাচ্ছে। ইরি ও বোরো ধান চাষের জন্য সেচের জন্য জ্বালানি, প্রয়োজনীয় বীজ ও সার আমদানির ব্যবস্থা করা না গেলে সংকট বাড়বে।”
এদিকে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ ঋণ চাইতে শুরু করেছে সরকার।
বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার তহবিল চেয়ে ‘এশিয়া জিরো এমিশন কমিউনিটি (এজেক) প্লাস অনলাইন সামিটে’ বক্তব্য দিয়েছেন।
“সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান এই সম্মেলনের সম্মিলিত আলোচ্যসূচির শীর্ষে থাকা উচিত। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ তার জরুরি জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহের চেষ্টা করছে। আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই আহ্বানে দ্রুত ও ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি,” বলেছেন তিনি।
ভর্তুকি সামলাতে চাই ৩৮ হাজার কোটি
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি দামে এসব পণ্য আমদানিতে মার্চ, এপ্রিল, মে ও জুনে সরকারকে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হবে ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ডলারের হিসাবে যা ৩২০ কোটি ডলার।
এমন তথ্য জানিয়ে সরকারকে প্রস্তুতি নিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি শাখা।
বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ পাওয়া যায় কি না, তা আলোচনা করে দেখতে রবিবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) চিঠিও দিয়েছে তারা।
যেখানে যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর তৈরি হওয়া চাপ বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে।
যেখানে বলা হয়েছে এই ঋণ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ধরে রাখা এবং জ্বালানি, সার ও খাদ্য আমদানি নিশ্চিতে সহায়তা করবে।
একই সাথে ঋণের অর্থে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সহায়তা দিতে ভূমিকা রাখবে। দেশে জ্বালানি তেল, গ্যাস, সার ইত্যাদির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতেও তা ব্যয় করা যাবে।
রিজার্ভে চাপ
বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি, খাদ্য ও কৃষি সংশ্লিষ্ট পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাংলাদেশের ডলার রিজার্ভে চাপ তৈরির শঙ্কা দেখছে সরকারের নীতিনির্ধারকরা।
বিশেষ করে জ্বালানির দাম বাড়লেই বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। যার সরাসরি প্রভাব পড়ে রিজার্ভ এবং মূল্যস্ফীতিতে।
২০২৫ সালের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত জ্বালানি ও সার আমদানিতে ৩০১ কোটি ডলার খরচ হয়েছিল।
চলতি বছরের একই সময়ে তা ৫৫৮ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম পণ্য অর্থাৎ জ্বালানি আমদানিতে খরচ করেছে ৫১৪ কোটি ডলার। এছাড়া সার আমদানিতে লেগেছে আরও ২৬২ কোটি ডলার।
সব মিলিয়ে ৬ হাজার ৮৩৫ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে ওই বছর।
সোমবার পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভে ২ হাজার ৯৭৭ কোটি ডলার আছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর বলছে, যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ২৫০ শতাংশ, এলএনজি ১০০ শতাংশ এবং সারের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
তাই আমদানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে গেছে। যর ফলে এবারও রিজার্ভ ও মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরনের চাপ পড়বে বলেই মনে করেন জাহিদ হোসেন।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন আলাপ-কে বলেন, “রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যখন শুরু হয়েছিল তখন তার বড় ধরনের প্রভাব পড়েছিল আমাদের অর্থনীতিতে। আরও সঠিক করে বললে আমাদের রিজার্ভে।”
সেই সংকট মোকাবেলায় তৎকালীন সরকার যে পথে হেঁটেছিল, এতে সংকট আরো ‘ঘনীভূত হয়েছে’। এমনকি তখন বেড়ে যাওয়া ‘মূল্যস্ফীতি এখনও কমেনি’ বলে জানিয়েছেন এই অর্থনীতিবিদ।
ভর্তুকিতে সংকট কতটা
বিশ্ববাজারে বাড়লেও এপ্রিলে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি সরকার। তবে শিগগিরই এখানে সমন্বয় হতে পারে। বিশেষ করে বিদ্যুতে।
বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ে ৯ই এপ্রিল একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার প্রধান অর্থমন্ত্রী।
তবে এই বাড়তি ভর্তুকি সমন্বয় না হলে বাজেট বরাদ্দে বড় ধরনের চাপে পড়বে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ আছে ৫৯ হাজার কোটি টাকা।
অথচ চলতি অর্থবছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার মাসেই জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকির যে হিসাব করা হয়েছে তার পরিমাণ ৩৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা।
এ পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হলে এই অর্থবছরে সব মিলিয়ে ভর্তুকি দাঁড়াবে ৯৭ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা।
বৈদেশিক ঋণ নিয়ে শঙ্কা
জরুরি ঋণের জন্য বিভিন্ন দাতা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকার।
একদিকে প্রধানমন্ত্রী যখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামিটে আহ্বান জানাচ্ছেন সহায়তার তখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের চলমান বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণ সহায়তার প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ। যা শুরু হয়েছে সোমবার। বৈঠক চলবে ১৮ই এপ্রিল পর্যন্ত।
এতে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৪ সদস্যের একটি দল অংশ নিচ্ছে।
আলোচনায় নতুন করে ঋণ চাইবে বাংলাদেশ সরকার, তা আগেই জানিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী।
আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনের সঙ্গে গত ২৪এ মার্চ ঢাকায় বৈঠকের পর আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “এই প্রোগ্রাম (চলমান ৫৫০ কোটির ঋণ) তো বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে। এটা আবার ফারদার রিভিউতে যাবে, সেটা অসুবিধা নাই। ইন দ্য মিনটাইম অর্থনীতির যে অবস্থা, সেখান থেকে উত্তরণের জন্য যে প্রোগ্রামগুলো আছে, এই সংকট থেকে উত্তরণের ব্যাপারে, সেগুলো আমরা আলাপ করেছি।”
২০২২ সালের সংকট কাটাতেই আইএমএফের দ্বারস্থ হয়েছিল তৎকালীন সরকার। প্রথমে ৪৭০ কোটি, পরে অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণে।
গত বছরের ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশ এখনো তা পায়নি। অন্তবর্তীকালীন সরকার আইএমএফের বিভিন্ন শর্ত ও সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় তা আপাতত স্থগিত অবস্থায় রয়েছে।
আর আগামী ঋণ সহায়তার জন্য এখানেই চ্যালেঞ্জ দেখছেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। বিশেষ করে যখন পুরো বিশ্বই ছুটছে দাতাদের পেছনে।
“দাতারা ঋণ দিলে শর্তও জুড়ে দেয়। সরকার এই মাসে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করেনি। এখন যদি আইএমএফের কাছে ঋণ চাওয়া হয়, তারা বলবে তুমি তো ভালো অবস্থায় আছো। দাম সমন্বয় করতে হয়নি। তাহলে আমাদের কাছে ঋণ সহায়তা চাইছো কেন?”