জ্বালানির বাজারে কালোবাজারিদের উত্থান, মন্ত্রী বললেন অতিরিক্ত না কিনতে   

ছুটি শেষে নড়াইলের লোহাগড়া থেকে নিজের বাইকে সোমবার ঢাকা ফিরছিলেন সহকর্মী সন্ধি তীর্থ। ভাঙায় পৌঁছানোর আগে চারটি ফিলিং স্টেশনে থামলেন তেল নেওয়ার জন্য। 

কিন্তু তিনটি পাম্প থেকে জানানো হয়েছে, বাইকের তেল নেই। এক পাম্প থেকে বলা হলো, তাদের কাছে অকটেন নেই, শুধু পেট্রোল আছে।  

অগত্যা অকটেনচালিত বাইকে সামান্য জ্বালানি নিয়ে ঢাকার দিকে এগোতে থাকলেন সন্ধি। ভাঙার মোড়ে পৌঁছে দেখলেন, একটি দোকানে ব্যারেল থেকে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। 

ওই দোকানে অকটেন আছে। তবে প্রতি লিটারের দাম হাঁকা হলো ১৮০ টাকা, যা পাম্পের নির্ধারিত দামের তুলনায় লিটারে ৬০ টাকা বেশি। 

“আমি দেখলাম, সেখান থেকে অনেকেই জার ভরে ভরে তেল নিয়ে যাচ্ছেন,” বলেন সন্ধি। 

ঢাকার পথে অকটেন আর মিলবে কি না, সেই আশঙ্কায় নিজেও দাম বেশি দিয়ে বাইকের ট্যাংকে অকটেন ভরলেন বলে জানান তিনি। 

রাজধানী ঢাকাসহ বাংলাদেশের নানা জায়গায় তেল কিনতে ক্রেতাদের ভিড় জমছে।

জ্বালানি সংকট দেশজুড়ে 

এই ঘটনা শুধু সন্ধির সঙ্গে নয়, এখন সারাদেশের চিত্রই এমন। গ্রাহকরা ফিলিং স্টেশনে তেল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন। আর ফিলিং স্টেশন মালিকরা বলছেন, সরকার তাদেরকে তেল দিচ্ছে না। আবার সরকার বলছে, আগের তুলনায় বাড়ানো হয়েছে সরবরাহ। 

ফেইসবুকে #জ্বালানি লিখে সার্চ দিলে যে পোস্টগুলো আসছে, তার বেশিরভাগই তেলের সংকট নিয়ে পোস্ট। 

‘চলতি সময়’ নামে ‘নিউজ ও মিডিয়া’ বিষয়ক একটি পেইজ থেকে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের ‘তেল সংকট ও কালোবাজারি’ নিয়ে একটি ভিডিও পোস্ট দেওয়া হয়েছে। 

সেই ভিডিওতে বন্ধ ফিলিং স্টেশন দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সাইজের ব্যারেল, বোতল ও জারভর্তি জ্বালানি তেলও দেখানো হয়েছে। 

চলতি সময়ের পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “রামগঞ্জ বাজারসহ উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারের ছোট দোকানগুলোতে বোতলভর্তি পেট্রোল ও অকটেন লিটার প্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।” 

“ফিলিং স্টেশানগুলোতে তেল না পাওয়ায় মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের চালকরা বাধ্য হয়ে এসব দোকান থেকে অতিরিক্ত দামে তেল কিনছেন,” লেখা হয়েছে সেখানে। 

শুধু তেলের সংকট ও কালোবাজারিই নয়, জ্বালানির অভাব কীভাবে দৈনন্দিন জীবনকে সংকটময় করে তুলেছে তাও উঠে আসছে ট্রেন্ডিংয়ে। 

‘আজকের বগুড়া’ নামে একটি পাবলিক গ্রুপে অ্যাম্বুলেন্সের একটি ফটো কার্ড পোস্ট করে লেখা হয়েছে, “গাইবান্ধায় তেল সংকটে অ্যাম্বুল্যান্স অচল, চিকিৎসা না পেয়ে প্রাণহানি।” 

ওই ঘটনাটি গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায় ঘটেছে বলে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে। 

‘নির্বাণ’ নামের একটি মিডিয়া পেইজ থেকে ঝিনাইদহের এক ফিলিং স্টেশনে জ্বালানির জন্য দীর্ঘ লাইনের ভিডিও পোস্ট করে লেখা হয়েছে, তেলের জন্য হাহাকার! ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে মানুষ।

তেল সংকটের এই দৃশ্য রাজধানীতেও। ঢাকার পাম্পগুলোতেও তেলের জন্য ক্রেতাদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। 

সোমবার বিকেলে একটি সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম ছিলো, “তেলের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, বিজয় সরণির লাইন ঠেকেছে মহাখালী।”

ফিলিং স্টেশনের মালিকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, পরিস্থিতি না বদলাতে পাম্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

ফিলিং স্টেশন বন্ধ হওয়ার শঙ্কা

জ্বালানি তেলের চলমান সংকটের মধ্যে রবিবার রাতে পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠন থেকে জানানো হয় যে, “সব মিলিয়ে অবস্থা এখন এমনিই হয়ে পড়েছে, যে কোন সময় সারা দেশের পেট্রোল পাম্পগুলি নিরাপত্তার এবং তেল সরবরাহ না পাওয়ার কারণে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।” 

এই খবর বের হতে ভোক্তাদের আতঙ্ক আরো বেড়েছে। নতুন করে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় পড়েছেন তারা। 

সংকট কতটা- জানতে চাওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটর্স, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিমের কাছে। 

জবাবে তিনি আলাপ-কে বলেন, “প্রচণ্ড সংকট। ক্রেতার চাহিদা আমরা মেটাতে পারছি না। আর আমাদের চাহিদা তেল কোম্পানি মেটাতে পারছে না।” 

“কেন তারা চাহিদা মেটাতে পারছে না, সেটা উনারাই (সরকার) বলতে পারবেন। তবে তাদের বিক্রির একটা প্যারামিটার আছে। নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি দিচ্ছে না।”

পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠনের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংকটের শুরু ডিপো থেকে। 

সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি, বিক্রি, বিপণনের কাজ করে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। 

তিনটি কোম্পানি-পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা- এই তিনটি বাজারজাতকারী কোম্পানির মাধ্যমে সারাদেশের বিভিন্ন ডিপো থেকে তেল বিক্রি করা হয়। ফিলিং স্টেশনগুলো হলো এইসব কোম্পানির ডিলার। এ ছাড়া তাদের রয়েছে অসংখ্য এজেন্ট। 

পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠনের আহ্বায়ক সাজ্জাদুল করিম মনে করছেন, মূল সমস্যা তিনটি। 

প্রথমত, ফিলিং স্টেশনে গাড়ি ভরে তেল দিচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক বন্ধ থাকায় পে-অর্ডারে সমস্য এবং তৃতীয় সমস্যা হলো- বাইকের চালকদের ‘মারমুখী’ আচরণ।  

“সংকট একদিন দুইদিন হয়, দীর্ঘদিন ধরে এটা মোকাবিলা করার শক্তি তো আমাদের নাই। সেই জনবলও নাই।” 

পাম্প মালিকরা বলছেন, ডিপো থেকে ফিলিং স্টেশনের ট্রাকে তেল এক তৃতীয়াংশ দেওয়া হচ্ছে। আর এতে বিপাকে পড়েছেন তারা। 

“সাপ্লাই একেবারের কমিয়ে রেখেছে কোম্পানিগুলো। আগে যা দিত, এখন তার অর্ধেকের কম দিচ্ছে,” আলাপ-কে বলেন পেট্রোল পাম্প মালিকদের সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান রতন। 

ডিপো থেকেই তেলের কালোবাজারি শুরু হচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি। 

মিজানুর রহমান বলেন, “এজেন্টরা যারা পাচ্ছে, তারা ডিপোর আশেপাশে বেশি দামে বিক্রি করে দিচ্ছে। ওইটা যারা কিনছে, তারা আবার হাটেবাজারে ইচ্ছেমতো দামে বিক্রি করছে।” 

’আলটিমেটলি কালোবাজারির’ হাতে চলে যাচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি। 

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম।

সংকট থেকে উত্তরণ কীভাবে? 

বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের প্রায় শতভাগ আমদানিনির্ভর। দেশের উত্তোলিত গ্যাসের উপজাত থেকে পেট্রোল ও অকটেন তৈরি হলেও এই দুই ধরনের তেল মোট জ্বালানির চাহিদার সামান্য। 

আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে হিসাব কষে চলতে হচ্ছে। 

মার্চের শুরুতে সরকার তেল বিক্রির পরিমাণ ‘কিছুটা’ কমিয়ে দিলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে শুরু হয় ক্রেতাদের ভিড়। অনেকে ‘প্যানিক বাই’ শুরু করেন। 

যদিও ঈদের আগে রেশনিং তুলে নেওয়া হয়, কিন্তু পরিস্থিতির তেমন একটা উন্নতি হয়নি। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে হাজির হয়েছে ‘কালোবাজারি’। 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম আলাপ-কে বলেন, “সংকট দেখা দিলে একটা অসাধু চক্র মাথাচাড়া দেয়। এখানেও তাই হচ্ছে। তারা তেল কিনে বেশি দামে বিক্রি করছে।” 

ম. তামিম মনে করেন, সরকারের দায়িত্ব হবে ‘সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো’ ও কালোবাজারিদের কঠোর তদারকিতে রাখা এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। 

কালোবাজারিদের ওপর নজরদারি চালানো এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না? 

“সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং সব ব্যবস্থাই নিয়েছি,” আলাপ-কে বলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। 

তিনি বলেন, “মানুষ প্যানিকড না হলে এটা হতো না।” 

“আমরা অনুরোধ করছি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল যেন না কেনেন। যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু কেনেন,” বলেন মন্ত্রী। 

ইকবাল হাসান মনে করেন, ঈদের কারণে ‘গত দুইদিন’ ডিপো বন্ধ ছিলো। পেট্রোল পাম্পও বন্ধ ছিলো। 

তবে ঈদের পর ‘স্বাভাবিক’ হতে শুরু করেছে বলেও জানান তিনি। 

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত করার সক্ষমতা কম। ঠিক কতদিনের জ্বালানি বাংলাদেশ মজুত করতে পারে, এর সঠিক হিসাব পাওয়া যায় না। তবে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করেন, একমাসের মতো জ্বালানির মজুত ক্ষমতা আছে। 

স্বাভাবিকভাবেই যুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে ‘হিসাবনিকাশ’ করে চলার পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ম. তামিম। 

তিনি বলেন, “যে পরিস্থিতি, তাতে ১০ দিনের জ্বালানি দিয়ে কীভাবে ১৫ দিন চলবে, সেই উপায় বের করতে হবে।” 

পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে জ্বালানি কেনা শুরু করেছে বাংলাদেশ।  

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “জনগণের কাছে আমি আহবান করছি, আপনারা প্যানিক করবেন না।” 

“আপনাদের প্রয়োজনের বেশি তেল নিয়েন না। যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু নেন। তেলের কোনো সমস্যা হবে না।”  

গতবছরের তুলনায় এবছর ২৫ শতাংশ বেশি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। 

মন্ত্রী বলেন, “আমরা তেল সরবরাহ করছি এবং করে যাবো। পেট্রোল পাম্পেও আমরা তেল ডেলিভারি দিচ্ছি। এখন জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন।” 

বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের চলমান সংকট শুধু সরবরাহের ঘাটতিই নয়। এখানে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, তদারকির ঘাটতি এবং প্যানিক বাই। 

পরিস্থিতির ‍সুযোগে ফাঁক গলে শক্ত অবস্থান নিচ্ছে কালোবাজারি চক্র। সব মিলেই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

আর সংকটময় পরিস্থিতি সামাল দিতে শুধু সরবরাহ বাড়ানো নয়, ডিপো থেকে পাম্প পর্যন্ত পুরো চেইনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, কালোবাজারির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলেও মনে করছেন এই খাত সংশ্লিষ্টরা।