ভোটের মাঠে উড়তে থাকা বিপুল টাকা অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে

এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোটার গাজীপুর-২ আসনে; আট লাখ চার হাজারের কিছু বেশি। বিধি অনুযায়ী এই আসনে প্রার্থীরা ভোটার প্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা করে ব্যয় করতে পারবেন। সে হিসাবে ব্যয় সীমা ৮৪ লাখ টাকার কিছু বেশি।

আর সবচেয়ে কম ভোটার ঝালকাঠি-১ আসনে। ভোটার সংখ্যা বিবেচনায় প্রার্থীদের নির্বাচনি ব্যয় হওয়ার কথা ২২ লাখ ৮৪ হাজার ৩১০ টাকা। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী আড়াই লাখের কম ভোটার আসনগুলোতে প্রার্থীদের ব্যয় সীমা ২৫ লাখ টাকা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) 'নো ইউওর ক্যান্ডিডেট' পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, ১২ই ফেব্রুয়ারি হতে যাওয়া নির্বাচনের ১,৯৮১জন প্রার্থী তাদেরহলফনামায় ব্যয়ের যে হিসাব প্রকাশ করেছেন, তার পরিমাণ সাড়ে ৪০০ কোটি টাকার বেশি।

নির্বাচন কমিশন প্রার্থী হিসাবে প্রতিটি দলের জন্য যে খরচের হিসাব বেঁধে দিয়েছে তাতে এবারের ভোটে অংশ নেয়া ৫১টি দল খরচ করতে পারবে আরও সর্বোচ্চ ১৫৫ কোটি টাকা।

কিন্তু এই টাকাই কি সব? ওয়েস্টমিনস্টার ফাউন্ডেশন ফর ডেমোক্রেসি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে 'দ্য কস্ট অব পলিটিকস ইন বাংলাদেশ' নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনের তথ‍্য বলছে এটা কেবলই এক কাগুজে হিসাব।

প্রতিবেদনটি দাবি করেছে, বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যয়বহুল, যেখানে প্রার্থীরা কেবল নির্বাচনি প্রচারণাতেই ব্যয় করেন কয়েক কোটি টাকা। এছাড়া নির্বাচনের আগে প্রার্থীতা পেতেও তারা ব্যয় করেন বিপুল অর্থ। যার কিছুটা ইঙ্গিত দেখা গিয়েছিল কিছুদিন আগেই। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বিরানব্বই দিনের মধ্যে কোটিপতিরা ব্যাংক থেকে তুলে নিয়েছিলেন প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার বড় অংশই প্রাক-নির্বাচনি লেনদেনে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে বলে তখন শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন অর্থনীতিবিদরা।

অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনে সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকায়।

ভোটের মাঠে উড়ছে বিপুল এই টাকা। হাতবদল হওয়া এই টাকা দেশের অর্থনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে? স্থবির হয়ে থাকা অর্থনীতিতে তা কি গতি ফেরাবে, নাকি মানুষের হাতে যাওয়া অতিরিক্ত অর্থ ফের উসকে দেবে মূল্যস্ফীতির পারদ, কী বলছেন বিশ্লেষকরা?

হলফনামার হিসাবে প্রার্থী ব্যয় ৪৬৩ কোটির বেশি

গাজীপুর আর ঝালকাঠির উদাহরণটা নিশ্চয়ই পড়ে এসেছেন। ভোটার আড়াই লাখের বেশি হলে, প্রার্থী ব্যয় করতে পারবেন ভোটার প্রতি ১০ টাকা; নয়তো সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করে এবার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও সংশোধন করা হয়েছে।

সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেই ভোটার প্রতি ১০ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয় সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা বহাল ছিল। 

নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া হলফনামায় প্রার্থীরা সেই বিবেচনায় নিজেদের সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাবেও তুলে ধরেছেন।

টিআইবি’র প্রকাশিত ‘নির্বাচনি হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ২৯৮ আসনের মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, এবারের নির্বাচনে প্রার্থীরা ব্যয় করছেন ৪৬৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

এর মধ্যে প্রত্যেকটি আসনে অংশ নিয়ে বিএনপির প্রার্থীরা ব্যয় করবেন ১১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অন্যদিকে জামায়াতের ২৫৩ আসনের প্রার্থীরা খরচ করবেন ৮০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। 

এই হিসাবে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সংখ্যায় তৃতীয় সর্বোচ্চ। ৪৭৮ জন প্রার্থীর মোট খরচ যোগ করলে দাঁড়ায় ৬৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালে প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয় নির্ধারিত ছিল সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা। এরপর ১৯৮৭ সালে সীমা তুলে দেওয়া হয়। ফের নির্বাচনি ব্যয়ের বিধান যুক্ত করা হয় ১৯৮৫ সালে।

১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে ৩ লাখ টাকা, ২০০১ সালে ৫ লাখ টাকা, ২০০৮ সালে ১৫ লাখ টাকা ও ২০১৩ সালে প্রার্থী ব্যয় সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয় আরপিওতে। 

দলের ব্যয় কত

প্রার্থীর পাশাপাশি দলগুলোও তাদের নির্বাচনি প্রচারণায় আলাদা করে অর্থ ব্যয় করতে পারে। 

আরপিও অনুযায়ী, কোনো দলের প্রার্থী ২০০ জনের বেশি হলে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা, প্রার্থীর সংখ্যা ১০০ থেকে ২০০ জনের কম হলে ব্যয় করতে পারবে ৩ কোটি টাকা। 

কোনো দলের প্রার্থীর সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০ হলে দেড় কোটি টাকা এবং ৫০ জনের কম হলে সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবে।

এবারের নির্বাচনে অংশ নেয়া ৫১টি রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী ১ হাজার ৭৩২ জন।

এর মধ্যে দুইশ'র বেশি প্রার্থী রয়েছে বিএনপি, জামায়াত এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের। এই তিন দল মিলে খরচ করতে পারবে ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। 

এছাড়া জাতীয় পার্টি একাই রয়েছে ৩ কোটি টাকার ক্যাটাগরিতে। আর দেড় কোটির তৃতীয় ক্যাটাগরিতে রয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি)। এই তিন দলের খরচ দাঁড়াচ্ছে ৬ কোটি টাকা।

অন্যান্য ৪৫টি দল মিলে খরচ করতে পারবে আরও ১৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সব মিলে দলগুলোর নির্বাচনি খরচ হতে পারবে ১৫৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

দল ও প্রার্থীদের ব্যয়ের হিসাব

আর্থিক লেনদেন

গেল বৃহস্পতিবার নগদ টাকায় ভোট কেনার অভিযোগ করেছেন, খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ও দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

তার দাবি, দিনমজুর, গরিব মানুষ, সংখ্যালঘু নারীদের ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। কেউ কেউ 'বিরিয়ানি আর নগদ টাকার বিনিময়ে' ভোট কেনার চেষ্টা করছে।

আরপিওতে প্রার্থীদের জন্য ঠিক করা টাকা যৌক্তিক বললেও এর বাইরে নির্বাচনের মাঠে টাকা উড়তে শুরু করেছে বলেই মনে করছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।

আলাপকে বলেন, “ইতোমধ্যেই শোনা যাচ্ছে ভোটের আগের দিন টাকা পাঠানোর কথা বলে জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ টাকা নিশ্চয় বৈধভাবে দেওয়া হবে না।”

এজন্য নির্বাচন কমিশনকে আরও বেশি সতর্ক থাকার পরামর্শ তার।

প্রার্থীর ব্যয় কতটা বাস্তব?

ওয়েস্টমিনস্টার ফাউন্ডেশন ফর ডেমোক্রেসি (ডব্লিউএফডি) গবেষণায় বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের নির্বাচন ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। 

যেখানে একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনি প্রচারণা পরিচালনার জন্য সাধারণত পাঁচ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হয়। 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনি প্রচারণার সময় নির্বাচনি এলাকা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা অনুযায়ী প্রার্থীদের তিন থেকে পাঁচ কোটি টাকা বা তারও বেশি ব্যয় করতে হয়।

এমনকি ভোটের দিন গড়ে অন্তত ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়। 

২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোট কেনার প্রবণতাও লক্ষ্য করা গেছে, যেখানে প্রতি ভোটের জন্য এক থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ৫০টি আসনের ওপর গবেষণায় দেখা যায়, নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার আগ থেকে ভোটের দিন পর্যন্ত একজন প্রার্থীর গড় ব্যয় ছিল ১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যা নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকার সীমার ছয়গুণ বেশি।

“দলগুলোর সার্বিক কর্মকাণ্ড এবং ব্যয়ের ধরন বিবেচনা করে বলা যায়, তারা নির্ধারিত সীমা অনেক আগেই অতিক্রম করেছেন,” বলেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।

নির্বাচনে অপ্রদর্শিত ব্যয়ের বিষয়ে সতর্ক না থাকলে তা নির্বাচনের ওপরই বড় ধরনের প্রশ্ন তুলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন দৈনিক নয়া দিগন্ত সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর।

আলাপকে তিনি বলেন, “কালো টাকা ব্যবহার নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক থাকতে হবে। অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। চুরি চোট্টামি যাতে না হয় সেটা নিশ্চিত করতে না পারলে নির্বাচন প্রশ্নের মুখে পড়বে।”

নির্বাচনে সরকারের ব্যয়

অর্থনীতিতে গতি ফিরবে নাকি বাড়বে শঙ্কা

বিপুল এই টাকা অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

“অর্থনীতিতে এক ধরনের স্থবিরতা চলছে। তবে জাতীয় নির্বাচনের সময় প্রচার-প্রচারণার জন্য টাকা খরচ হয়। বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ বেড়ে যায়। এতে হয়ত অর্থনীতি কিছুটা চাঙ্গা হবে,” বলছেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

তবে এর বিপরীত দিকও আছে— নির্বাচনকে ঘিরে বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ বাড়লে তা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে বলে সতর্ক করছেন তিনি।

তবে মোস্তাফিজুর রহমান মনে করছেন, নির্বাচনের হাওয়ায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি সেভাবে বাড়বে না, তবে প্রভাব ফেলতে পারে গ্রামের অর্থনীতিতে।

তার ভাষায়, “জনপ্রতি হয়ত এক হাজার টাকা করে খরচ করবেন প্রার্থীরা, এতে অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়বে বলে আমার মনে হয় না।”

এইতো গেল দল ও প্রার্থীদের টাকার হিসাব, এর বাইরে এবারের নির্বাচনে সরকারের পক্ষ থেকেও ব্যয় বাড়ছে। যা সবশেষ নির্বাচনের চেয়ে অনেক বেশি।

সবশেষ ২০২৪ এর দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। যা এবার ছাড়িয়ে যাচ্ছে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি।

নির্বচন কমিশনের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, নির্বাচন পরিচালনাকারীদের খোরাকি (৭৩০ কোটি), সম্মানি (৫১৫ কোটি), যাতায়াত (১০৯ কোটি), ব্যালট পেপার প্রিন্টিং (২৬ কোটি ব্যালটে ৪০ কোটি), ভোটের প্রচারণায় (গণভোটসহ) প্রায় ২৪৩ কোটি টাকাসহ এবারের নির্বাচনে সরকারের মোট ব্যয় হচ্ছে ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।

প্রদর্শিত ও অপ্রদর্শিত অর্থ মিলিয়ে হাজার কোটি টাকার নির্বাচন কতটা প্রাণ সঞ্চার করতে পারে স্থবির হয়ে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।