বাংলাদেশ থেকে একটি শার্ট এখন যদি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান ১০ ডলারে ক্রয় করে থাকে তবে বর্তমান ট্যারিফে তার আমদানি খরচ পড়ছে ১৩ ডলার ৬০ সেন্ট ।
ডনাল্ড ট্রাম্পের ট্যারিফ নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা পালটা শুল্কহার থেকে যদি অন্তত ৫ শতাংশ কমে আসে তবে দাম পড়বে ১৩ ডলার ১০ সেন্ট।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কমবে বাংলাদেশি পণ্যের দাম। এতে বাড়বে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও।
এতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরবে বলেই মনে করছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ ও মন্দার আশঙ্কার মধ্যে অন্তবর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে এসে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক কমানো বাংলাদেশের জন্য একটি স্বস্তির বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
যা আবার বাংলাদেশের সামনে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় এগিয়ে থাকার সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির ফলে বাংলাদেশের সুফল কী হবে, তা স্পষ্ট নয়। পাশাপাশি চুক্তির শর্ত কী থাকবে তা না জানায় চুক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা।
শুল্ক কমছে কত শতাংশ, শর্ত কী?
ট্রাম্পের 'শুল্কযুদ্ধ' শুরু আগে বাংলাদেশের পণ্যে শুল্ক ছিল প্রায় ১৬ শতাংশ। এরপর ২০২৪ সালের ২রা এপ্রিলে ‘রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পালটা শুল্ক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন।
এই নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় প্রথমে ৩৫ শতাংশ এবং পরে গত অগাস্ট মাসে ২০ শতাংশ শুল্ক নিয়ে সমঝোতা হয় দুই দেশের মধ্যে। তবে তখন কোন চুক্তি হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে এখন সেই চুক্তি সই হতে যাচ্ছে। যাতে শুল্ক আরও কমবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান।
“আশা করছি শুল্ক কিছুটা কমবে। তবে কতটা কমবে এটা এখনই বলা যাচ্ছে না,” আলাপ-কে বলেছেন বাণিজ্য সচিব।
আগামী ৯ই ফেব্রুয়ারি এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ৫ই অথবা ৬ই ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিনিধি দল যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন।
শুল্ক কমে আসলে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তা বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে জানিয়ে মাহবুবুর রহমান বলেন, “ডেফিনেটলি শুল্ক কমলে আমাদের জন্য ভালো হবে। আমরা সে চেষ্টাই করছি।”
তবে চুক্তির শর্ত সম্পর্কে কোন কিছু জানাতে অসম্মতি জানান বাণিজ্য সচিব। “চুক্তির খসড়া পাঠানো হয়েছে তবে এ সম্পর্কে কিছু জানানো যাচ্ছে না।”
'বড় ধরনের সুযোগ'
বাংলাদেশ মূলত মধ্যম ও কম দামের পোশাক রপ্তানি করে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এসব পণ্যের দাম সাধারণত ১৫ থেকে ৬০ ডলারের মধ্যে। এখানে চীন সবসময়ই বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী। পাশাপাশি ভারত, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়াও রয়েছে।
এখন যে ২০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর আছে সেটা অব্যাহত থাকলেও এই দেশগুলোর চেয়ে প্রতিযোগিতায় হয় এগিয়ে নয়তো সমানে সমান আছে বাংলাদেশ।
তবে 'ট্যারিফ বেনিফিট' যেটা আসবে তার সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করতে পারলে অর্থনীতিতেও তা বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
চলমান বাণিজ্যযুদ্ধে বাংলাদেশের সামনে এটা বড় ধরনের সুযোগ নিয়ে এসেছে বলেই মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
তার মতে, তৈরি পোশাক থেকে শুরু করে চামড়া শিল্প, সব খাতের বাজার বিস্তৃত করার এটাই সুযোগ। “আমাদের প্রতিপক্ষ দেশগুলোর তুলনায় শুল্ক হার কমলে বায়াররা গার্মেন্টসের ক্ষেত্রে সে দেশে বাণিজ্য করতে বেশি আগ্রহী হবে না,” আলাপ-কে বলেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক এই প্রধান অর্থনীতিবিদ।
বাণিজ্যের প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর তথ্যমতে, শুল্ক বেশি থাকলে রপ্তানি আয় ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা ছিল। কিন্তু শুল্ক আরও হ্রাস পেলে তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি বাজার আরও সুরক্ষিত হবে।
যার পজিটিভ প্রভাব পড়বে প্রায় স্থবির হয়ে থাকা অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করে তৈরি পোশাক, যা এই খাতে রপ্তানির প্রায় ৪০ শতাংশ। তাই শুল্ক কমলে এখানে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরবে বলেই মনে করছেন বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল।
তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর সাবেক এই পরিচালক আলাপ-কে বলেন, “শুনতে পাচ্ছি ৫ শতাংশ শুল্ক কমতে পারে। যদি সেটা হয় তবে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরবে।”
“নতুন করে কিছু সুবিধা পাওয়া গেলে” সেটা বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করছেন সিপিডি’র ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
চুক্তির শর্ত অজানা
যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক কমলে বাংলাদেশের রপ্তানিতে সুবিধা হবে। তবে ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্রের কী কী শর্ত মানতে হবে এবং সেসব শর্ত মানলে বাংলাদেশের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর কেমন প্রভাব পড়বে।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আলাপ-কে বলেন, “চুক্তির খসড়ায় কী আছে জানা নেই। বলা হচ্ছে এটা ‘নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট’ (এনডিএ)।”
উপদেষ্টা ও সচিবের সঙ্গে আলোচনায় তেমন কিছুই জানা যায়নি জানিয়ে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, “ভালো ভালো কিছু জিনিস যেমন তাদের দেশের ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করলে এই শুল্ক প্রযোজ্য হবে না- এমন কিছু কথা আমরা জানি। কিন্তু চুক্তিতে দেশ বিরোধী কিছু আছে কিনা আমরা জানি না। দেশের ক্ষতি হবে, এমন কোন শর্ত থাকলে এই চুক্তি আমরা চাই না।”
গেল বছরের জুনে চুক্তির সব কিছু গোপন রাখার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এনডিএ সই করেছে বাংলাদেশ।
ওয়াশিংটনে শুল্ক আলোচনা শেষে গত বছরের ২রা আগস্ট পাল্টা শুল্কের হার ঠিক হয় ২০ শতাংশ। তখন বাণিজ্য উপদেষ্টা গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, চুক্তিতে “দেশের স্বার্থবিরোধী” কিছু থাকবে না। আর “যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি সাপেক্ষে” এটি প্রকাশও করা হবে।
গত বছরের ৭ই আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের হার কার্যকর রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার, যেখানে প্রধানত তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। এছাড়া জুতা, প্লাস্টিক পণ্যও রপ্তানি হয়। অন্যদিকে আমদানি হয়, সয়াবিন, তুলা ও যন্ত্রাংশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে, গেল ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি করছে প্রায় ৮৭৬ কোটি ডলারের পণ্য। আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের পণ্য।